রেনে দেকার্ত – সংশয়বাদের জনক

'আই থিঙ্ক, দেয়ারফোর আই এ্যাম' আলোড়ন জাগানো এহেন উক্তির মধ্যে দিয়ে যিনি মৃত্যুর ৪০০ বছর পরেও এক বহুল আলোচিত নাম সেই রেনে দেকার্ত-এর জন্মদিন আজ। চিন্তা, দর্শন, সৃষ্টিতত্ত্ব, গণিত ও মননের জগতে নতুন যুগের সূচনা করা যুগপুরুষ রেনে দেকার্ত-এ শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করার পাশাপাশি আসুন চিনে নেওয়ার চেষ্টা করা যাক মানুষটিকে।

রেনে দেকার্ত

৫৯৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩১ মার্চ ফ্রান্সের লা-এ (LA HAYE) শহরে জন্মগ্রহণ করেন দেকার্ত। অবশ্য পরবর্তীতে শহরটির নামকরণ হয় তাঁর নামে 'লাএ দেকার্ত' (LA HAYE DESCARTES)বাবা জোয়াকিম দেকার্ত ছিলেন একজন উকিল ও ম্যাজিস্ট্রেট; আর মা জান ব্রোশার, দেকার্তের জন্মের দুই মাস পর মে মাসে মারা যান। মা মারা যাবার পর কিছুদিনের মধ্যে তাঁর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন এবং অন্যত্র গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। মায়ের মৃত্যুর পরে দেকার্ত, তাঁর বড় দাদা (পিয়ের) ও দিদির (জান) সাথে দাদীর বাড়িতে চলে যান। 

ছোট বেলা থেকেই দেকার্ত ছিলেন দুর্বল ও রোগা প্রকৃতির! ৮ বছর বয়সে তিনি জেস্যুইট স্কুলে (Jesuit school) ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই রেনে দেকার্ত পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন আদব কায়দা; নিয়মশৃঙ্খলা ও সামাজিক শিষ্ঠাচার সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন। দুর্বল স্বাস্থ্যের জন্য তিনি নিয়মিত প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারতেন না। 

অত্যন্ত মেধাবী দেকার্ত গণিত ও জ্যামিতির উপর বিশেষভাবে আকর্ষিত হন। স্কুলে আট বছর পড়াশোনা করার পরে তিনি গ্রামে ফিরে যান এবং সেখানে এক বছর কাটান। তাঁর বাবা ছিলেন যথেষ্ট বিত্তবান, তিনি দেকার্ত-কে পড়াশোনার জন্য, একজন গৃহভৃত্য দিয়ে প্যারিসে বসবাস করার জন্য পাঠিয়ে দেন। ১৬১৫ সালে পোয়াতিয়ে (Poitiers) বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। একবছর পর তিনি ধর্মীয় অনুশাসন ও দেওয়ানি আইনে বাকালোরেয়া (baccalauréat, অর্থাৎ "উচ্চ-মাধ্যমিক সনদ") ও লাইসেন্স লাভ করেন। স্কুলজীবনে সবকিছুই অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে পড়লেও তাঁর শিক্ষাজীবন দীর্ঘমেয়াদী হয়নি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে স্বশিক্ষার দিকে ঝুঁকে পড়েন। 

দেকার্ত ছিলেন জ্ঞানপিপাসু শৌখিন মানুষ যাঁকে জীবিকার্জন নিয়ে ভাবতেও হয়নি কোনদিন। তিনি সর্বদা নিজের জ্ঞান আহরণ আর দার্শনিক ভাবনা নিয়েই থাকতেন। চলার মতো প্রয়োজনীয় সম্পদ তিনি বাবার কাছেই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। চব্বিশ বছর বয়সে সেগুলো একেবারে বিক্রি করে বিশাল অঙ্কের অর্থের মালিক বনে যান, যা দিয়ে বাকি জীবনটা আরামেই কাটিয়েছেন! শুধু কি কাটিয়েছেন? জীবনের প্রায় ২০ বছর তিনি কাটিয়েছেন ভ্রমণ করেই! 

দেকার্তে কখনো বিয়ে করেননি। তবে হল্যান্ডে ভ্রমণকালীন এক সুন্দরী আয়ার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে এক সন্তানের পিতা হন। মেয়েটির নাম রাখেন ফ্রান্সিন। স্কারলেট জ্বরে ভুগে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে ফ্রান্সিন মৃত্যুবরণ করলে মর্মপীড়ায় ভোগেন দেকার্ত। আরো দুঃখের ব্যাপার হলো, ফ্রান্সিনের মৃত্যুর পর ফ্রান্সিনের মা দেকার্তকে ছেড়ে অন্য এক লোকের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। 

'ডিসকোর্স অন মেথড' (১৬৩৭) রেনে দেকার্তের অমর কীর্তি, যার জন্য বিজ্ঞান চিরকাল ঋণী থাকবে তাঁর কাছে। তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বিজ্ঞানকে পদ্ধতিগত করেছেন। তাঁর সবচেয়ে বৈপ্লবিক চিন্তা হচ্ছে স্কেপ্টিসিজমবা সংশয়বাদ। এই তত্ত্বের মূল কথাই হচ্ছে সব কিছু নিয়েই সংশয় থাকতে হবে এবং কোনোকিছু নিয়ে ততক্ষণ নিশ্চিত হওয়া যাবে না, যতক্ষণ না তা প্রমাণ করা যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের জন্য তিনি চারটি মূল ধারণা দিয়েছেনঃ (ক) কোনোকিছু ততক্ষণ বিশ্বাস না করা, যতক্ষণ একে সন্দেহ করার মতো সকল বিষয় মিথ্যা প্রমাণ না হবে। (খ) একটি যথার্থ সমাধানে পৌঁছুতে একটি সমস্যাকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ সংখ্যক ভাগে ভাগ করা। (গ) চিন্তাগুলোকে ক্রমানুসারে এগিয়ে নেয়া। প্রথমে সবচেয়ে সহজ ভাবনা, তারপর ধীরে ধীরে আরো গভীর এবং জটিল ভাবনার দিকে যাওয়া। (ঘ) পরিগণনা ও পুনঃসমীক্ষা সর্বদা পরিপূর্ণ হতে হবে, যেন কোনোকিছুই বাদ না যায়। 

জ্যামিতির ক্ষেত্রে দেকার্ত একরকম বিপ্লব সাধন করেন। তিনি জ্যামিতিক সমস্যাবলীকে বীজগণিতে রূপান্তর করে সেগুলো সমাধানের উপায় আবিষ্কার করেন। তাঁর এই পদ্ধতিকে বলা হয় অ্যানালিটিক্যাল জিওমেট্রি (বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতি)। লা জিওম্যাত্রি-তে দেকার্ত দেখান, বক্র রেখাকেও দ্বিমাত্রিক সমতলে X Y অক্ষরেখায় প্রকাশ করা সম্ভব যা থেকে বীজগণিতে রূপান্তর সহজ হয়ে যায়। তবে ঠিক দেকার্তের সময়েই ফ্রান্সের আরেকজন গুণী বিজ্ঞানী এবং গণিতবিদ পিয়েরে ডি ফারম্যাট বিশ্লেষণাত্মক জ্যামিতি নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে কাজ করছিলেন এবং সফলও হয়েছিলেন। ইতিহাসবিদরা উভয়কেই অ্যানালিটিক্যাল জিওমেট্রি আবিষ্কারের সম্মান দেন। 

দেকার্তের একটি বড় সাফল্য এই যে, তিনি সূচক লেখার আধুনিক পদ্ধতি তৈরি করেন। যদি বলা হয় আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান গণিতের কোন্ অংশটি ছাড়া অচল, তাহলে উত্তর আসবে- ক্যালকুলাস। গণিত এবং বিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটানো এই ক্যালকুলাস নিউটন এবং লিবনিজ উভয়ের দ্বারাই পৃথকভাবে আবিষ্কৃত হলেও, দেকার্তের মূল দর্শন, সমস্যাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভাগ করা” –কেই ক্যালকুলাসের পথপ্রদর্শক বলে মনে করা হয়। এছাড়াও দেকার্ত বক্ররেখার ট্যানজেন্ট নির্ণয় করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন, যা পরবর্তীকালে নিউটন এবং লেবিনিজের জন্য সহায়ক হয়; কেননা এই পদ্ধতি ডিফারেনসিয়াল ক্যালকুলাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

এই সময় তিনি 'লামন্ডে' বা বিশ্ব বা দি ওয়ার্ল্ড গ্রন্থটি রচনা করলেও তা প্রকাশে আগ্রহী হননি। কারণ সে সময় চার্চের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর ধারণার বৈপরীত্য ছিল। 'পৃথিবী ঘূর্ণায়মান এবং এই বিশ্ব অনন্ত' ধারণার উল্লেখ ছিল গ্রন্থে। যে কারণে তাঁর মৃত্যুর পর ১৬৬৪ সালে এই গ্রন্থের কিছু অংশ প্রকাশিত হয়। বাকিটা থাকে অপ্রকাশিত। 

১৬৫০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি স্টকহোমে মৃত্যুবরণ করেন রেনে দেকার্ত। তাঁকে স্টকহোমের অ্যাডলফ ফ্রেডরিক চার্চে সমাহিত করা হয়। তাঁর মৃত্যুর ১৬ বছর পরে তাঁর দেহাবশেষ স্টকহোম থেকে সরিয়ে প্যারিসের সেন্ট আঁতেইন দ্যু মন্তএ এনে সমাহিত করা হয়। ১৮১৯ সালে পুনর্বার তাঁর দেহাবশেষ সেখান থেকে সরিয়ে প্যারিসের সেন্ট জার্মে দেস প্রাসচার্চে আনা হয়। তবে এখানেই তাঁর স্থায়ী ঠিকানা হয়েছে, অন্তত এখনো পর্যন্ত এখানেই আছেন। মৃত্যুর আগে তিনি ভ্রাম্যমাণ ছিলেন, মৃত্যুর পরেও তা-ই ছিলেন!

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন