আর একটা ২৪’শে সেপ্টেম্বর, চলে গে’ল নিঃশব্দে, সকলের অগোচরে। ভুলে যাওয়ার, ভুলতে পারার, ভোলা’টাকেই স্বাভাবিক একটা ঘটনা হিসেবে পরিগণিত করতে পারার এক অনন্য ক্ষমতা এখন আমাদের! আমাদের এই অনন্যতাও বোধহয় লজ্জিত হবে, এরকম একটা দিন’কে ভুলে যেতে পেরে।
১৯৩২ সালের ২৪’শে সেপ্টেম্বর, রাত দশটা। চট্টগ্রামের পাহাড়তলি’র ইউরোপিয়ান ক্লাবের
সাহেব-মেমরা তখন নাচ-গান আর খানাপিনায় মত্ত। হঠাৎ গোটা ক্লাবঘর কেঁপে উঠল প্রচণ্ড
বিস্ফোরণে। একই সঙ্গে গর্জে উঠল কয়েকটি পিস্তল, আর ধ্বনিত হ’ল ‘বন্দে মাতরম্’।
মৃত্যুর আগের দিন অজ্ঞাতবাস থেকে
মা-কে লেখা তাঁর শেষ চিঠিতে মায়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে প্রীতিলতা লিখেছিলেন, দেশের স্বাধীনতা যজ্ঞে অনেক পুত্র প্রাণ দিয়েছে, কিন্তু কোনও কন্যা এখনও প্রাণ দেয়নি। তাঁদের অনুপ্রেরণা
দিতেই মৃত্যুবরণ করছেন তিনি। তাঁর এই ত্যাগ, সমর্পণ হোক দেশের চলার পথে পাথেয়।
১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই মে
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন প্রীতিলতা। ছয়
ভাই-বোনের মধ্যে প্রীতিলতা ছিলেন দ্বিতীয়।
উল্লেখ্য, এঁদের আদি পদবী ছিল দাশগুপ্ত। পরিবারের কোন এক পূর্বপুরুষ
নবাবী আমলে 'ওয়াহেদেদার' উপাধি পেয়েছিলেন। কালক্রমে এই পদবি হয়ে গিয়েছিল
ওয়াদ্দেদার। অনেকসময় ওয়াদ্দাদারও বলা হতো।
১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে ডাঃ খাস্তগীর উচ্চ
বালিকা বিদ্যালয়ে লেখাপড়া শুরু করেন প্রীতিলতা। অত্যন্ত মেধাবী এই ছাত্রীর প্রাতিষ্ঠানিক
শিক্ষা শুরুই হয়েছিল তৃতীয় শ্রেণি থেকে। ১৯২৬ সালে তিনি মেধা তালিকায় বৃত্তি লাভ
করেন। ডাঃ খাস্তগীর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে লেটার মার্কসহ
ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে লেখাপড়ার জন্য তিনি ভর্তি হন
ইডেন মহিলা কলেজে। ১৯২৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মিলিত মেধা তালিকায় পঞ্চম
স্থান এবং মেয়েদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করে আইএ পাস করেন প্রীতিলতা। এরপর
তিনি কলকাতার বেথুন কলেজ ভর্তি হন এবং ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে এই কলেজ থেকে
দর্শনশাস্ত্রে ডিস্টিংশনসহ গ্রাজুয়েশন করেন। কিন্তু, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকায় কৃতিত্বের সাথে
স্নাতক পাস করলেও তিনি এবং তাঁর সঙ্গী বীণা দাসগুপ্তের পরীক্ষার ফল স্থগিত রাখা
হয়। ১৯৩২ সালে চট্টগ্রামে ফিরে এসে তিনি নন্দনকানন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের (যা
বর্তমানে অপর্ণা চরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত) প্রধান
শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন।
১৯২৪ সালে বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স নামক
এক জরুরি আইনে বিপ্লবীদের বিনা বিচারে আটক করা শুরু হয়। চট্টগ্রামের অনেক
বিপ্লবীও সেই সময় কারারুদ্ধ হন। তখন বিপ্লবী সংগঠনের ছাত্রদের অস্ত্রশস্ত্র, বইপত্র গোপনে রাখার ব্যবস্থা করতে হত। প্রীতিলতার
নিকটাত্মীয় পূর্ণেন্দু দস্তিদার বিপ্লবী দলের কর্মী ছিলেন। তিনি সরকার কর্তৃক
বাজেয়াপ্ত কিছু গোপন বই প্রীতিলতাকে রাখতে দেন। তখন তিনি সবে দশম শ্রেণির ছাত্রী।
লুকিয়ে পড়ে ফেলেন বাঘা যতীন, ক্ষুদিরাম আর
কানাইলালের জীবনের কথা। মূলত এই সমস্ত বই পড়েরই তিনি বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত
হন।
তখনও পর্যন্ত বিপ্লবী দলে মহিলা
সদস্য গ্রহণ করা হত’না। প্রীতিলতা যখন ঢাকায় পড়তে যান, তখন ‘শ্রীসঙ্ঘ’ নামে একটি বিপ্লবী সংগঠন ছিল, যার একটি মহিলা শাখা ছিল ‘দীপালি সঙ্ঘ’। লীলা নাগের নেতৃত্বে পরিচালিত এই সংগঠনে প্রীতিলতা যোগ
দেন। লাঠি খেলা, ছোরা খেলা শেখেন।
১৯৩১ সালের ৪ অগস্ট বিপ্লবী
রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ফাঁসি হয়। এই ঘটনা প্রীতিলতাকে গভীর ভাবে প্রভাবিত করে। এর পর
আরও ন’মাস তাঁকে কলকাতায় থাকতে হয়েছিল বিএ পরীক্ষার জন্য। বাড়ি
ফিরে এসে দেখেন বাবার চাকরি নেই, সংসারের অর্থকষ্ট
মেটানোর জন্য তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। মাস্টারদা সূর্য সেন ও
প্রীতিলতার প্রথম সাক্ষাৎকার বর্ণনাতে মাস্টারদা লিখেছেন, “তার চোখেমুখে একটা আনন্দের আভাস দেখলাম, এতটা পথ হেঁটে এসেছে তার জন্য কোনও ক্লান্তির চিহ্নই দেখলাম
না।”
১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই এপ্রিল, মোট ৬৫ জন যোদ্ধা নিয়ে সূর্যসেন রাত দশটার চট্টগ্রাম পুলিশ
লাইনে আক্রমণ করে। আক্রমণ শেষে ১৯শে এপ্রিল এঁরা সারাদিন সুলুক পাহাড়ে আশ্রয় নেন।
এরপর ফতেয়াবাদে কিছুটা সময় কাটিয়ে, সূর্যসেন সবাইকে নিয়ে জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নেন। ঠিক এই দিনই প্রীতিলতা আই এ
পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম ফিরে আসেন । প্রীতিলতার একটি লেখা থেকে জানা
যায়- 'পরীক্ষার পর ঐ বছরেরই ১৯শে এপ্রিল সকালে বাড়ি ফিরে আমি
আগের রাতে চট্টগ্রামের বীর যোদ্ধাদের মহান কার্যকলাপের সংবাদ পাই। ঐ সব বীরদের
জন্য আমার হৃদয় গভীর শ্রদ্ধায় আপ্লুত হল। কিন্তু ঐ বীরত্বপুর্ণ সংগ্রামে
অংশগ্রহণ করতে না পেরে এবং নাম শোনার পর থেকেই যে মাষ্টারদাকে গভীর শ্রদ্ধা করেছি
তাঁকে একটু দেখতে না পেয়ে আমি বেদনাহত হলাম'।
প্রীতিলতার ভীষণ ইচ্ছা ছিল
মাস্টারদার সাথে পরিচিত হবার। প্রীতিলতার প্রবল আগ্রহে এবং বহু চেষ্টার পর ১৯৩২
সালের মে মাসে মাস্টার দা সূর্য সেনের সঙ্গে তার দেখা হয়।
১৩৩২ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই জুন পটিয়ার
ধলঘাটে সাবিত্রী দেবীর বাড়িতে গোপন বৈঠকের জন্য সূর্যসেন, নির্মল সেন, প্রীতিলতা ও অপূর্ব সেন মিলিত হন। সেখানে হঠাৎ গুর্খা সৈন্য নিয়ে হানা দেয়
ক্যাপ্টেন ক্যামেরন। এখানকার যুদ্ধে ক্যাপ্টেন ক্যামেরন নিহত হয়। বিপ্লবীদের পক্ষে
শহিদ হয়েছিলেন নির্মল সেন। পরে পালিয়ে যাওয়ার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন অপূর্ব
সেন (ভোলা)।
জুলাই মাসে সরকার সূর্য সেনকে ধরিয়ে
দেওয়ার জন্য দশ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে। তৎকালীন আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৩-ই
জুলায় ১৯৩২ এই বিষয়ে একটি খবর প্রকাশিত হয়। এর দশ দিন পর অর্থাৎ আনন্দবাজার
পত্রিকায় 'চট্টগ্রামের পলাতকা' নামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। তাতে লেখা হয়, “'চট্টগ্রাম জিলার পটিয়া থানার ধলগ্রামের শ্রীমতী প্রীতিলতা
ওয়াদ্দাদার গত ৫ই জুলাই, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম
শহর হইতে অন্তর্ধান করিয়াছেন। তাঁহার বয়স ১৯ বৎসর। পুলিশ তাঁহার সন্ধানের জন্য
ব্যস্ত”।
এই সময় সূর্যসেন প্রীতিলতা এবং
কল্পনা দত্ত নামক অপর বিপ্লবীকে আত্মগোপনের নির্দেশ দেন। পলাতক অবস্থায় স্বদেশি
আন্দোলনের সর্বাধিনায়ক মাস্টার দা সূর্য সেন প্রীতিলতার দায়িত্ববোধ, সাহসিকতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তায় আস্থাশীল হয়ে তাঁকে পাহাড়তলীতে
অবস্থিত ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ অভিযানের নেতৃত্বদানকারী হিসেবে নিযুক্ত করেন।
শুরু হয় দলের প্রস্তুতিপর্ব। অভিযান
সফল করার লক্ষ্যে তাদের অস্ত্রচালনা প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আট সদস্য বিশিষ্ট এই দলের
দলপতি ছিলেন প্রীতিলতা। তিনি ছাড়াও এ দলের বাকি সাতজন হলেন-- বিপ্লবী কালিকিংকর দে, শান্তি চক্রবর্তী, বীরেশ্বর রায়, প্রফুল্ল দাস, সুশীল দে, মহেন্দ্র চৌধুরী
এবং পান্না সেন।
প্রীতিলতার নেতৃত্বে এই অভিযান শুরু
করা হয় ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাত ১১টায়। অতিশয় দুঃসাহসিক ভাবে ইয়োরোপীয়ানদের
উপর আক্রমণ হয়। আক্রমণকারীরা ঘরের মধ্যে বোমা নিক্ষেপ করে। এর ফলে একজন ইয়োরোপীয়ান
মহিলা নিহত এবং ইন্সপেক্টর ম্যাকডোন্যাল্ড, সার্জেন্ট উইলিস এবং অপর ছয়জন ইয়োরোপীয়ান আহত হন।
নিয়মে আছে, সামরিক কায়দায় আক্রমণের সময় নেতা থাকবে সবার আগে এবং ফেরার
পথে সাথীদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়ে নেতা ফিরবে সবার পরে। এই নিয়ম
অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন প্রীতিলতা।
অভিযান সফল হওয়ার পর হুইসেল বাজিয়ে
সদস্যদের ফিরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি। পরবর্তীতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন
প্রীতিলতা। কিন্তু শেষ মূহুর্তে আত্মগোপনকারী এক ইংরেজ সৈনিকের গুলিতে বিদ্ধ হন
প্রীতিলতা। ইতোমধ্যে দলের অন্যান্য সকল সদস্য নিরাপদ স্থানে পৌঁছে যেতে সক্ষম
হয়েছেন। দলের সকল সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই প্রীতিলতা তার সঙ্গে বহন করা
‘পটাশিয়াম সায়ানাইড’ মুখে দিয়ে আত্মাহুতির পথ বেছে নেন, যাতে ইংরেজ সৈন্যরা তাকে জীবিত অবস্থায়
মারতে না পারে। এখানে উল্লেখ্য, পূর্বেই নির্দেশ
ছিল যেকোনো অবস্থাতেই শত্রুর হাতে জীবিত অবস্থায় ধরা দেয়া যাবে না। আহত অবস্থায়
যাতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাকে জীবিত ধরে ফেলতে না পারে সে জন্য তিনি
পূর্বনির্দেশের প্রতি অবিচল থেকে সায়ানাইড বিষপান করে আত্মাহুতি দেন।
পরদিন ২৪ সেপ্টেম্বর ভোরে ব্রিটিশ
পুলিশ প্রীতিলতার মৃতদেহ খুঁজে পেতে সক্ষম হয়। একজন নারীকে আক্রমণকারী হিসেবে
শনাক্ত করে তারা হতভম্ব হয়ে যায়। ময়নাতদন্ত শেষে, তাঁর মৃতদেহ পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
