২০১৩ সালের ২০-শে আগস্ট অন্যান্য দিনের মতই পুনের ওঙ্কারেশ্বর সেতুর উপরে প্রাত্ঃভ্রমণ করছিলেন তিনি। সহসাই মাথার পিছন দিকে গুলিবিদ্ধ হন। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ৬৭ বছরের মানুষটি। ডান চোখ বিদ্ধ করে আর একটি গুলি। এভাবে অতর্কিতে চিরনিদ্রায় চলে যাওয়া এই মানুষটির নাম নরেন্দ্র দাভোলকরকে। হত্যার ছয় বছরের মাথায় এই খুনের দায় স্বীকার করে নেয় এক হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের কর্মী শরদ কালাশকর। কিন্তু এখনও এহেন বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত ও মূল চক্রী কারোরই সাজা হয়নি; ঝুলে রয়েছে মামলা।
![]() |
| নরেন্দ্র দাভোলকার |
কুসংস্কার বিরোধী আন্দোলনের নেতা, লেখক, যুক্তিবাদী, সমাজকর্মী ও চিকিৎসক দাভোলকার-এর মৃত্যুদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি আর একটু ভালো করে চেনার প্রয়াস করা যাক মানুষ দাভোলকারকে।
নরেন্দ্র দাভোলকরের জন্ম ১৯৪৫ সালের
১-লা নভেম্বর। বাবার নাম অচ্যুত দাভোলকার, আর
মায়ের নাম তারাবাঈ। ১০ ভাই বোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো দাভোলকার-এর শিক্ষাজীবন শুরু
হয় সাতারার “নিউ ইংলিশ স্কুল”-এ। পরবর্তীকালে
সাঙ্গলির “উইলিংডন কলেজ” হয়ে ডাক্তারি
পড়ার জন্য মরাজ-এর সরকারি মেডিক্যাল কলেজে সুযোগ পান এবং এখান থেকেই এমবিবিএস
ডিগ্রী লাভ করেন।
পড়াশুনায় এরকম উজ্জ্বলতার পাশাপাশি কাবাডি খেলাতেও দারুণ পারদর্শী ছিলেন দাভোলকার। ছোটোবেলা থেকেই কাবাডির প্রতি ছিল তাঁর অদম্য আকর্ষণ। পরবর্তীতে শিবাজী ইউনিভার্সিটি কাবাডি দলের অধিনায়ক হ’ন এবং ভারতের কাবাডি দলের হয়ে বাংলাদেশ সফরেও যান। মহারাষ্ট্র সরকারের “শিব ছত্রপতি যুবরাজ” সম্মানে ভূষিত করা তাঁকে, কাবাডিতে তাঁর পারদর্শিতার জন্য।
প্রায় ১২ বছর সক্রিয়ভাবে মানুষকে চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ার পরে, ১৯৮০ সাল থেকে সমাজকর্মী হিসেবে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে নিয়োজিত করেন দাভোলকার। “বাবা আদভ”-এর “এক গাঁও এক পানোঠা” (One village – One well) আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে দাভোলকর কুসংস্কার বিরোধী আন্দোলনের মুখে উঠতে থাকেন। “অখিল ভারতীয় অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি”-র সাথে যুক্ত হয়ে ১৯৮৯ সালে তিনি স্থাপনা করেন “মহারাষ্ট্র অন্ধশ্রদ্ধা নির্মূলন সমিতি”। সমাজে অন্ধবিশ্বাসের প্রকোপ আটকাতে এবং কুসংস্কার নির্মূল করে বিজ্ঞানমনস্কতা গড়ে তুলতে কাজ করে এই সংগঠন। পঁচিশ বছরে মহারাষ্ট্র জুড়ে ২২৫-টি এইরকম কেন্দ্র চালু করেছেন দাভোলকর। যেসব চমৎকারী কাণ্ডকারখানা নানা সাধু-সন্তরা দেখিয়ে থাকেন, তার পেছনে লুকিয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিগুলো তিনি ফাঁস করে দিতেন। প্রায় তিন দশক ধরে এইসব ভণ্ড সাধুবাবাদের মুখোশ খুলে দিয়েছিলেন তিনি। “সাধনা” পত্রিকার সম্পাদক নরেন্দ্র দাভোলকরের নেতৃত্বে আন্দোলনের জেরে মহারাষ্ট্রে “কুসংস্কার ও ব্ল্যাক ম্যাজিক বিরোধী বিল” পাস হয়।
২০১৩ সালের ২০ অগস্ট এক দক্ষিণপন্থী উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নির্দেশে খুন করা হয় নরেন্দ্র দাভোলকরকে। চাঞ্চল্যকর এক স্বীকারোক্তিতে একথা জানিয়েছেন নরেন্দ্র দাভোলকর হত্যা মামলার অন্যতম আসামী শারদ কলসকর। তিনি আরও জানিয়েছেন ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে কর্ণাটকের বেলগাঁওতে এক বৈঠকে হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে কাজ করেন এরকম কিছু মানুষকে হত্যা করা হবে বলে ঠিক করা হয়েছিলো।
দাভোলকরের জীবৎকালে পঁচিশ বছর ধরে যে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছিলো, তাঁকে হত্যার মাত্র ছয় বছরেই সমপরিমাণ কাজ হয়েছে। পূর্বের পাঁচ হাজারের সঙ্গে সমসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক তাঁর সংগঠনে যোগ দিয়েছেন এবং নূতন ১২৫-টি কেন্দ্র চালু হয়েছে, যা দেখে পুরাণের রক্তবীজের কথা মনে পড়তে পারে। নদী স্রোতস্বিনী হলে সহস্র শৈবালদাম তাকে বাঁধতে পারে না, প্রমাণ দাভোলকর। প্রতিবাদীরা বলেন, মানুষকে হত্যা করা যায়, চেতনার মৃত্যু হয় না, প্রমাণ দাভোলকর।
দাভোলকর যখন খুন হন, তখন মহারাষ্ট্রে ‘কুসংস্কার বিরোধী ও ডাকিনীবিদ্যা আইন’ দীর্ঘ দিন স্থগিত হয়ে ছিল। তিনি খুন হবার চার দিনের ভিতর অর্ডিন্যান্স পাশ হয়ে যায়। এর পর ‘জাত পঞ্চায়েত’-এর ক্ষমতা কেড়ে নিতে অন্য একটি জরুরি বিল পাশ করাতে সক্ষম হয় এই সংগঠন। এই যাবৎ কাল অসাংবিধানিক কিন্তু শক্তিশালী ‘ক্যাঙারু কোর্ট’ ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে বিবিধ কানুন পাশ করিয়ে নিত, সেটা রদ করা গেছে। বস্তুত, দাভোলকরের মৃত্যুর পর থেকে যুক্তিবাদী ব্যক্তিবর্গ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মনোযোগের কেন্দ্রে আছে এই সংগঠন আর তারই দৌলতে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে উঠছে যুক্তিবাদী আন্দোলন। যে দক্ষিণপন্থীরা যুক্তিবাদকে হত্যা করবার লক্ষ্যে যুক্তিবাদীর বুকে গুলি চালিয়েছিল, তারা কেবল ব্যর্থ এমনটাই নয়, হিতে বিপরীত হয়েছে।
আজ তাই শুধু দাভোলকর-কে স্মরণ করার দিন না, তাঁর লড়াইকে সততার সাথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বপালনের অঙ্গীকার করার দিনও। আর সেটাই হবে সত্যিকারেরে উত্তরাধিকার। বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তিবাদের জয় অবিসম্ভাবি।
(তারিণী খুড়ো)
