শতাব্দীর
এক সেরা, কিন্তু কম আলোচিত প্রেমের কাহিনী শোনাবো আজ; যেখানে দুজন মিলিত হয়েছিলেন
শুধুমাত্র মনের টানে।
| রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর তার মীরু |
আমেরিকার ইলিনয় স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিজ্ঞানে স্নাতক হয়ে রবিঠাকুরের ছেলে রথীন্দ্রনাথ দেশে ফিরে উঠলেন শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে। সেই প্রথম এক জমিদার বাড়ির ছেলে মাঠে নামলো উন্নত চাষের কাজে। সেখানে রথীন্দ্রনাথ গড়ে তুললেন প্রশস্ত খেত। মাটি পরীক্ষার গবেষণাগার। বিদেশ থেকে আমদানি করলেন ভুট্টা এবং গৃহপালিত পশুর খাওয়ার মতো ঘাসের বীজ। তৈরি করালেন দেশের উপযোগী লাঙল, ফলা আর নানা যন্ত্রপাতি। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কাছ থেকে চেয়ে আনলেন একটা ট্রাক্টর। চালাতেন নিজেই।
২৭-শে
জানুয়ারি ১৯১০, মা মৃণালিনী দেবীর ইচ্ছায় বিয়ে করলেন
অবনীন্দ্রনাথের ভাগ্নী বাল্য বিধবা প্রতিমাকে। ঠাকুর বাড়িতে সেই প্রথম বিধবা
বিবাহ। বিয়ের কয়েক মাস পর বছর পাঁচেকের ছোট প্রতিমাকে শিলাইদহে নিয়ে এলেন রথী। সখ্যতা
গড়ে উঠলো দুজনার। ঠিক এই সময়েই হঠাৎ একদিন ডাক এলো বাবা
রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে; যেতে হবে শান্তিনিকেতনে আশ্রমবিদ্যালয়ে, লালমাটির দেশে
গড়ে তুলতে হবে সবুজ প্রান্তর ঘেরা এক বিশ্ব মানের বিদ্যালয়। শান্তিনিকেতনে তখন বিশ্ববিদ্যালয়
তৈরির কাজ চলছে, একাই থাকতেন সেখান রথী। স্ত্রীর সাথে ধীরে
ধীরে তৈরি হতে লাগলো মানসিক দুরত্ব। ঠিক এই সময়েই অন্তর্মুখী রথীন্দ্রনাথের জীবনে এলেন
মীরা, আশ্রমের অধ্যাপক নির্মল চট্টোপাধ্যায়ের স্ত্রী, বয়সে
রথীর থেকে একত্রিশ বছরের ছোট!
রবীন্দ্রনাথ
মারা যাওয়ার পর রথীন্দ্রনাথের মূল কাজ ছিল, বিশ্বভারতীর ভাঙন
ঠেকিয়ে রবি ঠাকুরের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানকে একটা স্থায়িত্ব দেওয়া। আর সেই
লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৫১-য় বিশ্বভারতীকে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় করতে রাজী
হলেন হলেন রথীন্দ্রনাথ; তিনি-ই হলেন তার প্রথম উপাচার্য।
কিন্তু অচিরেই
বুঝলেন আশ্রম থেকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে বদলে যাওয়াটা আসলে এক পরাধীনতা। ক্ষমতার
রাজনীতি তো ছিলই, তার সঙ্গে এ বার বিশ্বভারতীতে জুড়ে গেল
নিয়মের ঘেরাটোপ! ব্যক্তিগত আক্রমণ আর কুৎসায় নাজেহাল হয়ে গেলেন রথীন্দ্রনাথ।
আর্থিক অনিয়মের মিথ্যে অভিযোগে ফাঁসানোর চেষ্টাও হল তাঁকে। বাঁচালো আদালত।
তবে
সবকিছু কে ছাপিয়ে গেল মীরার সঙ্গে রথীন্দ্রনাথের প্রথাভাঙা অন্তরঙ্গতা।
ঘটনার
রেশ পৌঁছালো জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতেও। আশ্চর্যজনক ভাবে এনিয়ে কোন প্রতিক্রিয়া
প্রকাশ করেননি প্রতিমা দেবী আর সবকিছু জেনেও নীরব ছিলেন মীরার স্বামী নির্মল
চট্টোপাধ্যায়। গুঞ্জন তৎকালীন আচার্য নেহেরুজীর কানে পৌঁছালে, রবীন্দ্রানুরাগী
নেহেরু নিজেও রথীন্দ্রনাথের বিষয়ে বিব্রত হন। প্রশান্ত মহালনবীশকে দিয়ে তাঁর কাছে
খবর পাঠানো হলো; যে, ‘বার্তা’র সারমর্ম ছিলো,
চট্টোপাধ্যায় দম্পতিকে শান্তিনিকেতন থেকে হটাও। রথীন্দ্রনাথ
উল্লিখিত ‘বার্তা’র মর্মার্থে অপমানিত
হয়ে শরীর খারাপের অজুহাত দিয়ে নেহেরুজীর কাছে পাঠিয়ে দিলেন পদত্যাগ পত্র।
ঠিক
করলেন বিশ্বভারতীর কলুষিত পরিবেশ ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাবেন, তবে একা নয় মীরাকে সঙ্গী করে। কোলের ছেলে জয়ব্রতকে নিয়ে মীরাকে
রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেহরাদুনে গিয়ে বসবাসের সম্মতিও দিয়ে দিলেন তাঁর উদার-হৃদয়
স্বামী। নিজে রইলেন মেয়েকে নিয়ে। মীরা চট্টোপাধ্যায় ও রথীন্দ্রনাথের মধ্যে যে
সম্পর্কই থাকুক না কেন, সম্ভবত তা শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল
মীরার স্বামী নির্মল চট্টোপাধ্যায়ের কাছে। তাঁর কোনও বিরোধিতা ছিল বলেও মনে হয় না।
তাঁর সংরক্ষণে থাকা একটি চিঠিতেই ‘মীরু’র উদ্দেশে ‘রথীদা’ নিজের তীব্র
অনুভূতি উজাড় করে দিয়েছেন: “আমার কেবল মীরু আছে— সেই-ই আমার
সমস্ত জগৎ ব্রহ্মাণ্ড।... তাকে আমার সবকিছু দিয়েছি— নিজেকেও
সঁপে দিয়েছি।“ প্রথাগত প্র্যাকটিসে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাননি রথীন্দ্রনাথ।
১৯৫৩
সালের আগস্টে শান্তিনিকেতন ছাড়লেন কবিপুত্র। যাওয়ার আগে প্রতিমাকে রথীন্দ্রনাথ
লিখে গেলেন, ‘‘আমি লুকিয়ে চুরিয়ে যাচ্ছি না, এখানে সবাইকে জানিয়েই যাচ্ছি মীরা আমার সঙ্গে যাচ্ছে।’’
জবাবে
প্রতিমা রথীকে লিখেছিলেন, শুধু ‘‘ভাল আছ এই
খবর পেলেই খুশী হব।’’ ভাল থাকার খবর দিয়ে দেরাদুন থেকে প্রতিমাকে
নিয়মিত মমতায় মাখা সব চিঠি লিখেছেন রথীন্দ্রনাথ। এদিকে অদৃষ্টের হাতে সব ছেড়ে
দিয়েও রথীর জন্য উতলা হতেন প্রতিমা।
দেরাদুনে
প্রথমে তিনটে ভাড়াবাড়ি তারপর রাজপুর রোডে নিজের তৈরি বাড়ি ‘মিতালি’তেই মীরাকে নিয়ে জীবনটা কাটিয়ে দিলেন। ১৯৬১ তে চলে গেলেন রথীন্দ্রনাথ,
আর তার দুবছর পর মীরাও!
কি
বলবেন হে পাঠক..... প্রেম না ব্যাভিচার ??
ঠাকুরবাড়ির
ঝকঝকে,
পবিত্র-পবিত্র উঠোনে রথীন্দ্রনাথ ছিলেন ব্যতিক্রমী। সমালোচিত হয়েও,
স্বতন্ত্র।
(সংকলন তারিণী খুড়ো)