সদ্য পার হ’ল ২৩-শে জানুয়ারী, নেতাজীর জন্মজয়ন্তী। তাঁর স্মরণেই আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
সন ১৯৩৬। রেঙ্গুন শহরের এক অত্যন্ত ধনী খনি মালিকের গৃহে অতিথি হয়ে এসেছেন গান্ধীজী। আপ্যায়নের মাঝেই আবিষ্কৃত হলো গৃহস্বামীর সাধের কন্যাটি অনুপস্থিত। চারিদিকে চললো খোঁজাখুঁজি এমনকি গান্ধীজীও যোগ দিলেন। শেষমেশ দেখা পাওয়া গেল বাড়ির পেছনের বাগানে বছর আটেকের ছোট্ট মেয়েটা এয়ারগান নিয়ে খেলা করছে। গান্ধীজী শিশুটির মাথায় হাত রেখে জিজ্ঞেস করলেন বন্দুক নিয়ে কি করছো? ওনার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলো ইংরেজদের মেরে তাড়াবার প্রস্তুতি নিচ্ছি!
সরস্বতী রাজামনি - জীবনের বিভিন্ন সময়ে
“কিন্ত হিংসা দিয়েতো একাজ হবেনা খুকি, আমরা অহিংস পথে তাদের সাথে লড়াই করবো”, বললেন গান্ধীজী।
“বারে! আপনার বাড়িতে কেউ ডাকাতি করতে এলে তাকে কি গুলি করবেন না? ইংরেজরা তো এদেশে ডাকাতি করতে এসেছে, বড় হয়ে একটা ইংরেজ আমি মারবোই”, গান্ধীজীকে হতবাক করে জবাব দিলো মেয়েটি।
১৯২৮ সালে বার্মায় এক সম্ভ্রান্ত তামিল পরিবারে জন্ম নেয় লক্ষী। খোলামেলা পরিবেশে বড় হওয়ার সাথে সাথে ছোট থেকেই জাতীয়তাবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। পুতুল খেলার চেয়ে ঘোড়ায় চড়া ও বন্দুক চালানোতেই ছিল বেশি আগ্রহ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন বার্মা রণাঙ্গনে, নেতাজী তার আজাদ হিন্দ বাহিনী নিয়ে পৌঁছালেন সেখানে। বাসিন্দাদের আহ্বান জানালেন বৃটিশের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার, "Give me blood I will give you freedom !"
ভীষণ ভাবে নাড়া দিল এই আহ্বান ষোল বছরের মেয়েটিকে, একদিন গিয়ে তার যাবতীয় সোনা হীরের গয়না তুলে দিল INA এর সদর দপ্তরে। বিস্মিত নেতাজী জানতে পেরে পরদিন ওগুলো নিয়ে হাজির হলেন লক্ষীর বাড়িতে।
ওর বাবাকে ডেকে বললেন, “ছোট মেয়ে তাই হয়তো দাম না বুঝেই দিয়ে ফেলেছে এত দামী গয়ণা, আপনি ফেরত নিন”।
বাবাটিও কিন্ত ইতিমধ্যেই গোপনে দান করেছিলেন বিশাল অঙ্কের টাকা কিন্তু সেসব না বলে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন। খবর পেয়ে ততক্ষণে সেখানে হাজির লক্ষী, বললো, “এগুলো সব আমার পাওয়া গয়ণা, একটাও বাবার নয়। মরে গেলেও আমি ফেরত নেবো না”!
আপ্লুত নেতাজী তার নাম শুনে বললেন লক্ষী তো সচলা, যায় আসে কিন্তু তোমার মধ্যে তো জ্ঞানের দেবী বাস করছেন, আমি তোমাকে সরস্বতী বলে ডাকবো! সেদিন থেকে মেয়েটির পরিচয় হলো ‘সরস্বতী রাজামনি’, আজাদীর লড়াইয়ে প্রথম ভারতীয় মহিলা গুপ্তচর।
এরপর সেই মেয়ে সেখানেই থেমে থাকলো না; নেতাজীকে ধরে বসলো তাকে ও তার তিন বন্ধুকে ফৌজে ভর্তি করতে হবে। তাদের আগ্রহের কাছে হার মেনে নেতাজী পরদিন বললেন দেখা করতে এবং সেনাপতিদের পরামর্শের ভিত্তিতে তাদের ফৌজের গুপ্তচর বাহিনীর সদস্য হিসেবে ভর্তি করে নেওয়া হলো। প্রয়োজনীয় ট্রেনিংয়ের পর বালক সেজে তারা ইংরেজ অফিসারদের চাকর রূপে সেনা ছাউনিতে ঢুকে পড়ে। ইংরেজী জানায় মণির (কোড নাম) একটা বিরাট সুবিধা ছিল, সেনাদের কথোপকথন ও চিঠির বিষয় হুবহু INA ক্যাম্পে এসে বলতে পারতো। তার দেওয়া খবরের ওপর ভিত্তি করে নেতাজী নিয়েছিলেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
কেটে গেলো প্রায় দুবছর, বস্তুত তাদের দেওয়া খবরের ওপর নির্ভর করে INA বাহিনীর মুভমেন্ট নিয়ন্ত্রিত হতো। হঠাৎই ধরা পড়ে গেল তাদের একজন। সরস্বতী রাজমনি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি বন্ধুকে ব্রিটিশের কবল থেকে মুক্ত করে আনবেন। নর্তকীর বেশে ঢুকে পড়েন ছাউনিতে আর তারপর সেনাদের মদের সাথে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে সুযোগ মতন বন্ধুকে নিয়ে চম্পট দেন। কিন্তু পালাবার সময় এক ব্রিটিশ সৈন্যের ছোড়া গুলি তার পায়ে এসে লাগে। হাঁটতে অত্যন্ত অসুবিধা হচ্ছিল। পিছনে ব্রিটিশ সৈন্যরা ধাওয়া করেছিল। এরকম সময় তিনি একটি গাছে উঠে গুলিবিদ্ধ পা সহ তিন দিন ধরে ওই গাছে অবস্থান করেন। নিচে ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনী তাকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু, না ধরা পড়েননি কেউই। জঙ্গলে তিনদিন লুকিয়ে ফিরে আসে INA ঘাঁটিতে। সাহসিকতার জন্য নেতাজী নিজ হাতে তাকে মেডেল পরিয়ে দেন এবং ঝাঁসি ব্রিগেডে লেফটেন্যান্ট রূপে প্রমোশন দেন। জাপানের তৎকালীন সম্রাট নিজে পদক দিয়েছিলেন রাজামণিকে।
সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হওয়ার কারণে তার পা খোড়া হয়ে গেছিল। সারা জীবন তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটেন এবং তা নিয়ে তিনি গর্ববোধ করতেন কারণ তিনি স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এই অবস্থার শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু কেউ সহানুভূতি দেখালে তিনি রেগে যেতেন। মেরুদন্ড সোজা রেখে গুলির চিহ্ন দেখিয়ে বলেন “এই চিহ্ন আমার লড়াইয়ের স্মৃতি, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অলংকার।
এলো ১৯৪৫, মিত্রবাহিনীর কাছে পরাজয় অবশ্যম্ভামী বুঝে নেতাজী আজাদ হিন্দ বাহিনী ভেঙে দেন এবং সদস্যদের দেশে ফিরে যেতে বলেন। ইতিমধ্যে বাবা মা দুজনেই চলে গিয়েছেন, ‘না ফেরার দেশে’, নিঃস্ব অসহায় সরস্বতী ভারতে ফিরে আসেন। একদিন বাবার অতি আদরের যে মেয়েটির অঙ্গে কোটি টাকার অলঙ্কার শোভা পেত, কপর্দক হীন হয়ে চেন্নাইয়ের এক বস্তিতে বহুদিন তাকে কাটাতে হয়েছিল। ২০০৫ সাল নাগাদ তাঁর আর্থিক অবস্থা এমন হয় যে দুবেলা দুমুঠো অন্ন সংস্থান করতেও তিনি অপারক হয়ে পড়েন। এমতবস্থায় তৎকালীন তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী কুমারী জয়ললিতা তাঁকে এককালীন ৫ লক্ষ টাকা ও আজীবন থাকার জন্য একটি বিনা ভাড়ার ঘরের ব্যবস্থা করেন। সম্বল বলতে সেদিন তার কাছে ছিল নেতাজীর দেয়া মেডেল আর বেশ কিছু বাহিনীতে থাকা সময়ের ছবি। মাঝে কলকাতায় এসে সেই মেডেলটাও নেতাজী ভবনে দিয়ে গেছেন।
ওই বয়সেও নিজেকে হারিয়ে ফেলেননি রাজামণি। তিনি দর্জিদের দোকানে দোকানে ঘুরে ছিট কাপড়ের টুকরো সংগ্রহ করতেন। তারপর সেগুলো দিয়ে জামা বানিয়ে বিতরণ করতেন বিভিন্ন অনাথআশ্রমে। ২০০৪ সালে বিধ্বংসী সুনামির পরে রিলিফ-ফান্ডে দান করেছিলেন নিজের এক মাসের পেনশন।
২০১৮ সালে ১৩-ই জানুয়ারী সবার অলক্ষে নীরবে চলে গিয়েছেন সেই ‘না ফেরার দেশে’, স্বাধীনতা আন্দোলনের এই মহীয়সী নারী। আজীবন সংগ্রামের এই জীবনকাহিনী একইসাথে সম্ভ্রম ও অনুপ্রেরণা জাগায়; কিন্তু কজনই না জানি তাঁর নাম, তাঁর এহেন লড়াইয়ের কাহিনী?
(সংকলন - তারিণী খুড়ো)