জন্মদিনে স্মৃতিচারণ – কানন দেবী

আজ লেনিন দিবস। সারা পৃথিবীর শোষিত ও নিপীড়িত জনগণের মুক্তির প্রতিভূ কমরেড লেনিন-কে নিয়ে তো আজ সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ বলবেন, লিখবেন, ভাববেন; আমি বরং আজ এমন একজন বঙ্গ ললনার কথা আপনাদের স্মরণ করাতে চাই, যিনি পরিচারিকা থেকে হয়ে ওঠেন দেশের প্রথম সুপারস্টার।

কানন দেবী - বিভিন্ন বয়সে

কাননের জন্মের সন-তারিখেরই ঠিক নেই। কোথায় জন্ম, তা নিয়েও নানান বিরোধী মত আছে। কোনও তথ্যই যেখানে নেই সেখানে মতামত নিয়েই চলতে হয়। যেমন এক মতে স্থির হয়েছে কানন দেবীর জন্ম ২২-শে এপ্রিল, ১৯১৬। আরেক মতে— সালটা ১৯১২।

কে বাবা, কেউ জানে না। দর্জির মেয়ে, নাকি বাঈজির? গল্পগাছা, শোনা কথা ছাড়া কাননের মেয়েবেলায় ঢোকার উপায়ই বা কী? এ ভাবেই জন্মস্থানও স্থির হয়েছে কলকাতার কাছেই— হাওড়া।

আর কাননের কষ্টের বেড়ে ওঠা?

তা তো ভাষায় আনা যায় না। তিনি নিজেও সেটা পারেননি সন্ধ্যা সেনকে শোনানো ওঁর আত্মজীবনী ‘সবারে আমি নমি’-তে। 

মা নেই, বাবা নেই, খাওয়া-পরা নেই, ঝি-গিরি করে, দোরে দোরে মাথা ঠুকে, কানন থেকে কাননবালা হয়ে কাননদেবী হওয়া বাংলা তথা ভারতীয় সিনেমার সব চেয়ে আশ্চর্য সাফল্য গাথা।

একটি শ্রুতি কোনও ভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তা হল কাননকে প্রতিপালন করেছেন রাজবালা দেবী ও রতনচন্দ্র দাস।

কানন দেবী ওঁর আত্মকথায় ওঁদেরই মা ও বাবা বলে উল্লেখ করছেন। অমিয়া নামে এক দিদির কথাও বলছেন। কিন্তু বলছেন না বাড়িটা কোথায় ছিল বা কোন ধরনের মানুষের আনাগোনা ছিল সেখানে। রাজবালা নাকি নানা ঠিকানায় কাজের লোক ছিলেন, কাননকে ওঁর জিম্মায় রাখা হয়েছিল বড় করে তোলার জন্য। এই করতে করতে ওর মা বনে যান। কিন্তু কাননের জন্মদাত্রী মা ছিলেন না।

কানন দেবী মেনে নিয়েছিলেন যে ওঁর মা ও বাবার হয়তো বিয়েই হয়নি কখনও। বলেছেন, ‘‘কে বাবা, কে মা, এই ভেবে বুকের ব্যথা বাড়িয়ে কাজ কী? আমি কানন, এই পরিচয়টুকুই তো যথেষ্ট।’’

রতনচন্দ্রের টাকা ডুবেছিল রেসে। সঙ্গে তাসের জুয়ো ও মদ্যপানও ছিল। মার্চেন্ট অফিসে চাকরি ও একটা সোনার দোকান ছিল ওঁর। নিজের ফিটন হাঁকিয়ে বেড়াতেন। এই করে অকালে গতও হলেন এবং রাজবালাকে হঠাৎ করে নেমে আসতে হল পরিচারিকার জীবনে, কারণ রতনচন্দ্রের আত্মীয়রাই হাতিয়ে নিল তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি।

তবে ওই সীমিত ক’বছরের প্রতিপালনে কাননের মধ্যে দু’দুটো টান তিনি সৃষ্টি করে গেছিলেন। বইয়ের প্রতি আর গানের দিকে। কানন তখনও পড়তে শেখেনি, রতনচন্দ্র বই কিনে এনে ওকে পড়ে শোনাতেন। আর ওকে গান শোনানোর জোগাড়যন্ত্র করতেন। সেই সব গল্প ও গান শুনে শুনে বালিকার অভ্যেস তৈরি হল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নেচে গেয়ে নায়িকা সাজা।

রতনচন্দ্রের সম্পত্তির কানাকড়িও জোটেনি রাজবালার, কারণ তিনি তো রক্ষিতা মাত্র! কিন্তু গায়ের গয়না, ঘরের আসবাব বেচে ও টুকিটাকি জমানো টাকা দিয়ে শুধতে হল ‘বাবু’র অঢেল ধার।

বাবুর বাড়ির কাজের মেয়ে কাননকে ইস্কুল ছাড়িয়ে লাগানো হল ধনীগৃহে রান্না, ঘর ঝাড়া, ঘর নিকানো, কাপড় কাচার কাজে। পড়াশুনো দূরস্থান, একটু আধটু খেলার সময়ও নেই, খাওয়া জোটে এক বেলা, তাও চাট্টিখানি ভাতের সঙ্গে ডাঁটার সবজি, কচুঘেচু ইত্যাদি!

খাটাখাটুনিতে রাজবালার শরীরস্বাস্থ্য চেহারা দিনকে দিন ক্ষয়ে শুকনো হল, কিন্তু না খেয়ে, শুকিয়ে শিটিয়েও কাননের পরির মতো রূপে আঁচড়টি পড়ল না। তবে কানন স্মৃতিকথায় জানাচ্ছেন যে, দুঃসহ পরিস্থিতির সামাল দিতে ওদের এক সময় উঠতেই হল চন্দননগরে এক অবস্থাপন্ন আত্মীয়ের বাড়ি।

আত্মীয়ই বটে, যে দিন ওরা গিয়ে উঠল সে দিনই ওরা বাড়ির কাজের লোকেদের বিদেয় করে দিলেন! কারণ নতুন কাজের লোক তো এসেই গেছে না?

কাননদেবী তাঁর এই আত্মীয়দের নাম জানাননি, যদিও ওখানে মা-মেয়ের উদয়াস্ত ঝিগিরির নিটোল বর্ণনা দিয়েছেন। ওঁর পুত্রবধূর অবশ্য দৃঢ় ধারণা ওই আত্মীয় কাননেরই দিদি অমিয়া।

ওই বাড়িতে মা-মেয়ের কাজের বহর আর গালমন্দ শোনার রুটিন বাঁধিয়ে রাখার মতো। তার পর এক দিন রাজাবালার হাত থেকে একটা রেকাব ছিটকে পড়ে ভাঙামাত্র গালাগালির ঝড়। কানন তখন রাজবালার হাত ধরে বলেছিল, ‘‘না, মা, আর একটা দিনও এখানে নয়। এক্ষুনি চলো। না খেয়ে মরলে মরব।’’

সেখান থেকে বেরিয়ে হাওড়ার যে-ঘোলাডাঙ্গা পল্লিতে আস্তানা হল কানন ও রাজবালার সেটা তখন ছোট ব্যবসায়ীদের আড়ত। সেখানে সংসার করা লোকজনের বাড়ির সামনে বোর্ড ঝুলত— ‘এটা গৃহস্থের ভিটা’। কে জানে, পাশের বাড়িটাই হয়তো বারবনিতাদের।

ঘোলাডাঙ্গা নিয়ে কানন দেবীর কথা আছে: ‘‘চারপাশের পরিবেশে শ্বাস নিতে অসুবিধে হত।’’ কিন্তু এখানেও বড় করে নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা হয়েছিল কাননের।

এক রোগাসোগা মধ্যবয়সি বিপত্নীক ভোলাদা। সন্ধেকালে তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে বসে ভক্তিগীতি ধরলে একটা নতুন জগৎ খুলে যেত কাননের। কাননকে তিনি একে একে ধরাতে থাকলেন কীর্তন, বাউল, ভাটিয়ালি, কর্তাভজা, মীরা ও সুরদাসের ভজন, সংস্কৃত মন্ত্র, ব্রহ্মসঙ্গীত এবং অতুলপ্রসাদের গান। এক সময় লালনের গান এল। কানন শুধোতে লাগল, ‘‘এর মানে কী, ভোলাদা?’’ ভোলাদা মানে বোঝাতে লাগলেন।

এক দিন সহসা আর জিজ্ঞাসার সুযোগ রইল না। ভোলাদা নিজেই কোথায় যে হারিয়ে গেলেন ইঙ্গিতটুকুও না দিয়ে। তখন কাননের আশ্রয় হলেন সেকালের এক অতি আশ্চর্যময় কণ্ঠের গায়িকা আশ্চর্যময়ী দাসী। কাননদের বাড়ির পাশেই থাকতেন, মেয়েটির অপরূপ রূপ আর অপূর্ব কণ্ঠ ওঁকে টানল। ‘আশ্চর্যময়ী’ কাননকে গানের জগতে টানার জন্য তালিম দিতে লাগলেন। মন ভাল করার জন্য তখন ওঁর ওখানে না গেলেই নয় কাননের।

কানন দেবী শুধু বায়োস্কোপের যুগের স্বপ্নসুন্দরী বললে কিছুই বলা হয় না। তাঁর জীবন শুরু নির্বাক ছবির আগের যুগে। যে-বছর জীবনের প্রথম রোল পেল কানন ‘জয়দেব’ বায়োস্কোপে সেই ১৯২৬ সালটার একটা তাৎপর্য আছে। সেই বছরই ওয়ার্নার ব্রাদার্স পৃথিবীর প্রথম টকি বা সবাক ছবি আনল বাজারে। ‘ডন জুয়ান’। সবাক, তবে কোনও সংলাপ নেই, কণ্ঠ ও যন্ত্রসঙ্গীতে মোড়া।

‘জয়দেব’-এর পর আরেকটা ছোট্ট রোল পেয়েছিল কানন ‘শঙ্করাচার্য’ (১৯২৭) ছবিতে। এর পর তো টানা বেশ কয়েক বছর হাতে কাজ নেই। কাজে ফিরতে ফিরতে পেরিয়ে গেল অনেকগুলো বছর। 

প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ ছবিতে প্রথন গান এল রবীন্দ্রনাথের। গাইলেন কানন। ছবি তো দেদার হিট। বলা শুরু হল এবং হতেই থাকল যে কাননের এই হল সেরা অভিনয়। সেই সঙ্গে একটা কাণ্ডও ঘটেছিল শহরের এক প্রেক্ষাগৃহে। ছবিতে কাননের পা হাঁটু অবধি দেখানোয় ক্ষিপ্ত জনতা হলের সিট ভাঙাভাঙি শুরু করেছিল।

সেটা কতখানি রাগ বা কতটা যৌবনের আবেগ, কে জানে! সালটা তো ১৯৩৬।

রাইচাঁদ বড়াল মশাই স্নেহের সুরে বলতেন কানন।  কাননকে দিয়ে রাইবাবু বাংলা ছবিতে প্রথম লাইভ গাওয়ালেন। বললেন, ‘‘সংলাপের মতো গানটা গেয়ে গেল কানন। কোনও যন্ত্র নেই, কিছু না। অথচ ওই এক টেকেই নিখুঁত। যন্ত্র ছাড়া এ ভাবে আর গাইতে পারত সায়গল।’’

কানন কিন্তু একাই এক নিখুঁত, অতুলনীয় প্যাকেজ। যেমন অভিনয় তেম্ন গানের গলা। কী বাংলায়, কী হিন্দিতে। রবীন্দ্রনাথ সিনেমায় তাঁর গানের চিত্ররূপ অনুমোদন করলে সেই প্রথম গানটি ছিল কাননের— ‘আজ সবার রঙে রং মেশাতে হবে’। গান নিয়ে করা প্রমথেশ বড়ুয়ার ‘মুক্তি’ ছবি দুরন্ত হিট হওয়ার পর হিন্দুস্তান রেকর্ডজে কবিকে প্রথম দেখা কাননের।

প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ আলাপ করাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘‘এ হল কানন, তারকা অভিনেত্রী।’’ কানন প্রণাম করতে রবীন্দ্রনাথ ওঁর ঠোঁট ছুয়ে বলেছিলেন, ‘‘কী সুন্দর মুখ তোমার! গান করো?’’

এ ঘটনা ‘বিদ্যাপতি’ ছবির সময়কার। কবির মনে ছিল না এই মেয়েটিই ‘মুক্তি’-তে ওঁর গান গেয়েছে। প্রশান্তচন্দ্র তখন যোগ করলেন, ‘‘ও তো আপনার গান গেয়েই বিখ্যাত।’’ রবীন্দ্রনাথ তখন বলেছিলেন, ‘‘তাই? তা হলে একবার শান্তিনিকেতনে এসে গান শুনিয়ো আমাকে।’’

সেই সৌভাগ্য কাননের আর হয়নি।

কানন দেবী বিয়ে করেন অক্সফোর্ড ফেরত অশোক মৈত্রে-কে, যিনি দেশে ফিরে কবির বিশ্বভারতীতে পড়ানো শুরু করেছিলেন। অশোকের বাবা হেরম্বচন্দ্র মৈত্র ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের দোর্দন্ডপ্রতাপ নেতা ও সিটি কলেজের অধ্যক্ষ। 

অশোক ও কাননের প্রথম আলাপও যেন বায়োস্কোপ থেকে তোলা। অশোক শান্তিনিকেতনে পড়ান। আর ফুরসত হলেই কলকাতা চলে আসেন, সাহেবি আমলের কলকাতা বলে কথা!

অশোক রাইফেল হাতে পাকা শিকারি। ওঁক কল্পনা ও আবেগ জুড়ে তখন একটাই মুখ, একটাই মানুষ। কাননবালা! তো এক বার কলকাতা সফরে অঢেল পান হল্লার পর নেশায় চুর অশোক বলেই দিলেন, ‘‘এখন এই সন্ধ্যায় চাওয়া-পাওয়ার কী-ই বা বাকি রইল, শুধু কাননকে পাশে পাওয়া ছাড়া।’’

সঙ্গীসাথীরা বন্ধুর এই বাসনাটুকুও বাকি রাখতে চায়নি। তাই ওঁকে প্রায় বেহুঁশ অবস্থায় বৌবাজার পল্লির কাপালিতলা লেনে কাননের বাড়ির দোরগোড়ায় ফেলে চম্পট দেয়।

সুদর্শন, সুবেশ, নিদ্রিত পুরুষটিকে বাড়ির বাইরে ভোরবেলা আবিষ্কার করেন কাননই। ওঁর মাথাটা তুলে নিয়েছিলেন নিজের কোলে। আধো ঘুম ও খোঁয়ারির মধ্যে চোখ মেলে নায়িকাকে দেখে অশোকের মনে হয়েছিল স্বপ্নেই আছেন।

কানন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘আপনি কে? কেমন করে এখানে আসা হল?’’

অশোক তখন নাকি চোখ মুদে বলেছিলেন, ‘‘চলে যান, স্বপ্ন ভাঙবেন না। আমি এখন কানন বালার সঙ্গে আছি।’’

বলা বাহুল্য, এর পর অশোক-কাননের প্রেম দানা বাঁধতে সময়ে নেয়নি। কিন্তু বিয়ে করা যাচ্ছে না, চিনের প্রাচীরের মতো সম্মুখে হেরম্বচন্দ্র। ওঁরা রাজভবনে হাতার মধ্যে এজরা ম্যানসনে মিলিত হতে লাগলেন। এ ছাড়া সিনেমা দেখা ছিল। আর সময় হলেই গাড়ি হাঁকিয়ে লং ড্রাইভ। কত যে ট্রিপ হয়েছে এ ভাবে! শুধুই ফলতা বন্দর! যাওয়া হয়েছে কাশিমবাজার, মুর্শিদাবাদ। হাঁটা হয়েছে নিজামত ইমামবাড়া চত্বরে।

কাননকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন অশোকের মা কুসুমকুমারী। তবু অপেক্ষা করতে হয়েছিল হেরম্বচন্দ্রের মৃত্যু অবধি। সে-বিয়ে হল ১৯৪০-এর ডিসেম্বরে। অশোকের বয়স যখন ছত্রিশ, কাননের পঁচিশ।

বিয়ে করে গান ও অভিনয় ছাড়তে রাজি হননি কানন, আর কানন সেটা করলেন না বলেই কালো মেঘ জমল সম্পর্কের আকাশে। কানন দেবী স্বীকার করে গেছেন যে, যে-অশোককে তিনি দেবতার মতো পুজো করেছেন, ওঁর সংস্পর্শে এসে জীবনের রূপরসগন্ধের স্পর্শ পেয়েছেন, পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গে দীক্ষা পেয়েছেন, জেনেছেন ভালবাসা কারে কয়, সেই ঘরের মানুষটিই বিবাগী হয়ে গেল স্ত্রী যে-কাজটা ভালবাসে সেটাই করে বলে! পাঁচ বছরের মধ্যে বিয়ে ভাঙল।

দ্বিতীয় বিয়ে হতেই কেচ্ছা শুরু। বিয়ে করেন সেই সময়ের মোস্ট এলিজেবল ব্যাচেলর হরিদাস ভট্টাচার্য-কে। যিনি ছিলেন অতি রূপবান, ভারী ভদ্র, উচ্চমনা ও রসময়। ১৯৪৯-এ কানন দেবীর বর হওয়ার আগে থেকেই কিন্তু হরিদাস ভট্টাচার্য কেউকেটা। যখন বিয়ে হচ্ছে, তখন তিনি ক্যাপ্টেন হরিদাস ভট্টাচার্য। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল ড. কৈলাসনাথ কাটজুর এডিসি। কলকাতার মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলারদের এক। মেয়েরা ওঁকে বর আর তাদের মায়েরা ওঁকে জামাই করতে চায়। কিন্তু হঠাৎ একদিন এই যুবকের চোখ পড়ল কাননবালার ওপর।

হরিদাস ওঁর স্মৃতিচারণায় লিখেছেন....

‘‘এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম ড. কাটজুর সঙ্গে। সেখানেই দেখা কানন বালার সঙ্গে। প্রায় বাধ্য হয়েই সেখানে এসেছিল ও। সারাক্ষণ মঞ্চে থেকেও একটি কথাও বলেনি।’’ এর পর দ্বিতীয় দেখা রাজভবনে গান গাইতে এলেন যখন কানন। সেই আমন্ত্রণও হরিদাসই জানিয়েছিলেন। এর পর ফের সাক্ষাৎ যখন নায়িকার ছবির শ্যুটিঙের পারমিশন জোগাড় করে দিলেন রাজ্যপালের এডিসি। কারণ লোকেশন হল সরকারি ঘেরাটোপের ফলতা। কাননের প্রেমের সঙ্গে আবার জুড়ে গেল ফলতা।

কানন দেবী বলেছেন যে, একজন জীবনসঙ্গীর কাছে যা কিছু তাঁর চাওয়ার ছিল, সবই পেয়েছিলেন হরিদাসের কাছে। সব চেয়ে বড় পাওয়া হরিদাসের মনের জোর। কাননের অতীত নিয়ে কোনওই প্রশ্ন বা কৌতূহল ছিল না ওঁর।

বিয়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে যা চর্চা লেগে গেল এবং কাগজপত্রে যা লেখালেখি শুরু হল তাতে বিয়ে টেকানো দায়। ওদের সুন্দর ভাবে বেঁধে রাখলো তিনটে জিনিস— ভেতরের টান, বাগানের নেশা আর সিনেমার প্রেম।

কানন ও হরিদাসকে নিয়েই একটা স্বতন্ত্র বৃত্তান্ত হয়। ওঁদের দ্বৈত পরিচালনার শ্রীমতী পিকচার্সের ছবি তো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে জায়গা নিয়েছে। প্রযোজিকা হিসেবে কানন দেবী এবং পরিচালক হিসেবে হরিদাস ভট্টাচার্য এক দুরন্ত হিট জুটি।

শ্রীমতী পিকচার্সের প্রথম হিট ‘মেজদিদি’-তে হরিদাস সহ পরিচালক। তিনি স্বাধীন ভাবে পরিচালনায় এলেন ‘নববিধান’ ও ‘দেবত্র’-য়। ‘দেবত্র’-য় একবারই মাত্র কানন দেবী, উত্তম ও সুচিত্রা ত্রয়ী এক সঙ্গে পর্দায় এলেন।

আর কানন দেবীকে তো বাঙালি প্রেমে পড়ে, নিন্দে করে, ভালবেসে, গাল পেড়ে, তার পর বুকে ধরে কাটিয়ে দিয়েছে যুগের পর যুগের পর যুগ।

‘আমি বনফুল’ গেয়ে বাঙালিকে এক কালে মাতিয়েছিলেন যে-নায়িকা তাঁকে আর প্রশ্ন করার ছিল না ‘তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা’?

শেষ দিন অবধি অবশ্য হরিদাস ও কানন একসঙ্গে থাকতে পারেননি। ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছিল। যদিও তার মাত্র ক’বছর আগে কানন দেবী আত্মকথায় লিখছেন, ‘‘যখন হরিদাস ভট্টাচার্যকে বিয়ে করি তখন লোকের ধারণা ছিল এ বিয়ে পনেরো দিন টিকলে হয়। সেই বিয়েই তো চব্বিশ বছর টিকে গেল।’’

১৯৭৭-এর জানুয়ারিতে হরিদাস ও কানন জোড়ে গিয়েছিলেন দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে, যে দিন কানন দেবী দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার নিলেন। আর ১৯৮৯ সালের এক দিন ওঁর টাকাপয়সা, কাগজপত্র, শখের পিস্তল ও রিভলভার গুছিয়ে হরিদাস ওঁদের ১নং রিজেন্ট গ্রোভের বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন।

কিছু দিনের মধ্যে কানন দেবীও ১৭-ই জুলাই, ১৯৯২-এ বেল ভিউ ক্লিনিকের এক নির্জন কেবিনে প্রায় চুপি চুপি সংসার ছেড়ে চলে গেলেন চিরতরে।

পরের পর ছবি হিট করানো, রুপোলি পর্দা ও পর্দার বাইরেও সমানভাবে নায়িকা থাকা, ইন্ডাস্ট্রির মাথাদের কব্জায় আনা, নিজেকে প্রায় একটা ব্র্যান্ডে গড়ে নেওয়া এবং সর্বোপরি, কয়েক প্রজন্মের পুরুষের স্বপনচারিণী হয়ে ভেসে থাকা কানন দেবী আজও বেঁচে আছেন সকল চলচিত্র প্রেমীদের মনে।

(সংকলন - তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন