উইলিয়াম শেক্সপিয়র - জন্ম ও মৃত্যুদিনে শ্রদ্ধার্ঘ

আজ ২৩ এপ্রিল। প্রবাদপ্রতিম নাট্যকার-সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপিয়রের জন্মদিন। একইসঙ্গে আজ তাঁর মৃত্যুদিনও। বিশ্বসাহিত্যের এই কালজয়ী লেখকের মৃত্যু তাঁর জন্মদিনের দিনই। আজ থেকে ৪০০ বছর আগে তাঁর সৃষ্ট রোমিও জুলিয়েট, হ্যামলেট, ওথেলো, কিং লিয়র চরিত্রগুলি আজও অমর।

উইলিয়াম শেক্সপিয়র

তাঁর মৃত্যুর চারশো বছর পরেও আমরা ‘টু বি অর নট টু বি’ অথবা ‘দেয়ার আর মোর থিংস ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ’-জাতীয় বাক্যকে আমাদের বাগধারার অন্তর্ভুক্ত করে ব্যবহার করে চলেছি। যাঁর লেখা নাটক আজ, এত দিন পরেও সমান জনপ্রিয়, ব্রডওয়ে থেকে হলিউড, এমনকি সুদূর জাপান থেকে আমাদের বলিউড পর্যন্ত যে প্রতিভাবানের লেখা বার বার ছুটে যায়, সেই শেক্সপিয়র-কে আর একটু ভালো করে জানার প্রয়াসের মধ্যে দিয়েই আজকের এই বিশেষ দিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাবো আমরা।

জন শেক্সপিয়র ও মেরি আরডেন-এর তৃতীয় সন্তান হিসেবে ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের অন্তর্গত এভন নদীর তীরে স্ট্রাটফোর্ড শহরে ১৫৬৪ সালের ২৩-শে এপ্রিল জন্ম হয় উইলিয়াম শেক্সপিয়রের। সেযুগের কোনো লিখিত প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, অধিকাংশ জীবনীকার মোটামুটি একমত যে শেক্সপিয়র সম্ভবত স্ট্র্যাটফোর্ডের কিং'স নিউ স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন।

১৮ বছর বয়সে শেক্সপিয়র ২৬ বছর বয়সী অ্যানি হ্যাথাওয়েকে বিবাহ করেন। বিয়ের ছয় মাস পরে অ্যানি, সুজানা নামে একটি মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন। এর প্রায় দুই বছর বাদে শেক্সপিয়র দম্পতির হ্যামনেট নামে এক পুত্র ও জুডিথ নামে এক কন্যা জন্মায়। এরা ছিল যমজ। ১৫৯৬ সালে, মাত্র ১১ বছর বয়সে হ্যামনেটের মৃত্যু হয়।

যমজ সন্তানের জন্মের পর শেক্সপিয়রের পরবর্তী ঐতিহাসিক উল্লেখ পাওয়া যায় ১৫৯২ সালে লন্ডনের একটি মঞ্চদৃশ্যের বর্ণনায়। ১৫৮৫ থেকে ১৫৯২ পর্যন্ত বছরগুলিকে বিশেষজ্ঞেরা তাই শেক্সপিয়রের জীবনের "হারানো বছর" বলে উল্লেখ করে থাকেন। বিভিন্ন জীবনীকারেরা নানা অপ্রামাণিক গল্পের ভিত্তিতে এই পর্বের নানা বিবরণ প্রস্তুত করেছেন। শেক্সপিয়রের প্রথম জীবনীকার তথা নাট্যকার নিকোলাস রো স্ট্র্যাটফোর্ডের একটি কিংবদন্তির উল্লেখ করে বলেছেন, হরিণ রান্না করার অপরাধে বিচারের হাত থেকে বাঁচতে শহর ছেড়ে লন্ডনে পালিয়ে গিয়েছিলেন শেক্সপিয়র। অষ্টাদশ শতাব্দীতে প্রচলিত আর একটি গল্প হল, শেক্সপিয়র লন্ডনের থিয়েটার পৃষ্ঠপোষকদের ঘোড়ার রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে নাট্যশালায় কাজ করতে শুরু করেন। জন অব্রে লিখেছেন শেক্সপিয়র গ্রামের স্কুলশিক্ষকের চাকরি করতেন। বিংশ শতাব্দীর কয়েকজন গবেষকের মতে ল্যাঙ্কাশায়ারের আলেকজান্ডার হঘটন নামে এক ক্যাথলিক ভূস্বামী তাকে স্কুলশিক্ষক রূপে নিয়োগ করেছিলেন। তবে এই সব গল্পের সমর্থনে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

খুব সম্ভবত এরপরে তিনি স্ট্রাটফোর্ড ছেড়ে করে লন্ডন শহরে আসেন। নতুন শহরে এসে নাটকের দলের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি।। সম্ভবত মঞ্চের প্রয়োজনেই প্রথম লেখার শুরু তাঁর। রচনার কাল অনুসারে শেক্সপিয়রের নাটকগুলোকে প্রধানত চার ভাগে ভাগ করা যায়।

প্রথম ভাগ ১৫৮৮ থেকে ১৫৯৫ সাল পর্যন্ত। এই পর্বের উল্লেখযোগ্য নাটক 'রিচার্ড থ্রি', 'কমেডি অব এররস্', 'টেমিং অব দি শ্রু', 'রোমিও জুলিয়েট'। এরপর দ্বিতীয় ভাগ ১৫৯৬ থেকে ১৬০৮ সাল পর্যন্ত। এই সময়ে রচিত হয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ চারটি ট্র্যাজেডি- 'হ্যামলেট', 'ওথেলো', 'কিং লিয়ার', 'ম্যাকবেথ'। শেষ পর্বে যে ৫টি নাটক রচনা করেন তাঁর মধ্যে দুটি অসমাপ্ত, তিনটি সমাপ্ত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'দি টেম্পেস্ট'।

শেক্সপিয়রের এই নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে কমেডি, ঐতিহাসিক নাটক, ট্র্যাজেডি, রোমাঞ্চ। কমেডি-শেক্সপিয়রের উল্লেখযোগ্য কমেডি হলো 'লাভস লেবারস লস্ট', 'দি টু জেন্টলম্যান অব ভেরোনা', 'দি টেমিং অব দি শ্রু'।  'এ মিড সামার নাইটস ড্রিম', 'মার্চেন্ট অব ভেনিস', 'ম্যাচ অ্যাডো অ্যাবাহুট নাথিংস', 'টুয়েলফথ নাইট', 'অ্যাজ ইউ লাইক ইট'। এর মধ্যে মাত্র কয়েকটিকে বাদ দিলে সমস্ত নাটক এক অসাধারণ সৌন্দর্যে উজ্জ্বল। প্রতিটি চরিত্রই জীবন্ত প্রাণবন্ত সজীবতায় ভরপুর। 

ঐতিহাসিক নাটক-ইতিহাসের প্রতি শেক্সপিয়রের ছিল গভীর আগ্রহ। ঐতিহাসিক নাটকগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'রিচার্ড থ্রি', 'হেনরি ফোর', 'জুলিয়াস সিজার', 'অ্যান্টনি ও ক্লিওপেট্রা'।

শেক্সপিয়রের শেষ পর্যায়ের লেখাগুলো ট্র্যাজেডি বা কমেডি থেকে ভিন্নধর্মী। রোমাঞ্চ, নাটকীয়তা, বিচিত্র কল্পনার এক সংমিশ্রণ ঘটেছে এসব নাটকে। সিমবেলিন, উইন্টার্সটেল, টেমপেস্ট তাঁর শেষ পর্যায়ের উল্লেখযোগ্য নাটক। নাটক ছাড়াও কিছু কবিতা লিখেছিলেন তিনি।

শেক্সপিয়র সব মিলিয়ে সাঁইত্রিশটা নাটক লিখেছিলেন। কী নেই তাতে? যমজ চরিত্র নিয়ে মশকরা, মুখরা নারীকে বশ করা, গাধার মুখোশ পরা গেঁয়ো লোকের সঙ্গে পরীদের রানির প্রেম, বীভৎস খুন, ধর্ষণের পর জিভ এবং হাত কেটে ফেলা, মহাযুদ্ধ, রাজদ্রোহ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, ইডিপাস কমপ্লেক্সে ভুগে মা’র প্রতি বিষোদ্গার, বাবাকে নৃশংস ভাবে অন্ধ করে দেওয়া, গর্ভবতী স্ত্রীকে পরপুরুষের সঙ্গে লিপ্ত বলে সন্দেহ, কী না আছে তাতে! এই নাটকের সব চরিত্র - নায়ক, নায়িকা, ভিলেন - সবাইকেই তো তিনিই সৃষ্টি করেছিলেন। তার মানে, এই চরিত্রদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে তাদের মতো করে ভাবা বা ব্যবহার করার কথা কল্পনা করতে হয়েছিল তাঁকে!

উইলিয়াম শেক্সপিয়র রচিত 'কমেডি অফ এররস্' অবলম্বনে ১৮৬৯ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর-এর হাতে রচিত হয় বাংলা গ্রন্থ ভ্রান্তিবিলাস। উল্লেখ্য, শোভাবাজার রাজবাড়িতে আনন্দকৃষ্ণ বসুর কাছে তিনি শেক্সপিয়রের পাঠ নেন। কথিত আছে, মাত্র পনেরো দিনে তিনি 'কমেডি অফ এররস্' এর ভাবানুবাদটি রচনা করেছিলেন।

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন