জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ - জোহরা সেহগাল

একশো-তম জন্মদিনে নিজের আত্মজীবনী প্রকাশের অনুষ্ঠানে সাংবাদিকেরা তাঁর দিকে ক্যামেরা তাক করতেই যিনি বলে ওঠেন, “মেরি লিপ স্টিক ঠিক হ্যায়?” সেই জোহরা সেহগাল-এর আজ জন্মদিন। চোখের কোণের ‘জিয়া জ্বলে’ হাসিতে মৃত্যুর কয়েক মাস আগে অবধি যাকে একুশের তরুণী মনে হ’ত, সেই ১০০ পার করা উচ্ছ্বল তরুণীর জীবন জয়ের কথা সকলের কাছে নিয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়েই তাঁর প্রতি আসল শ্রদ্ধার্ঘ নিবেদনের এ এক সামান্য প্রয়াস।

জোহরা সেহগাল - বিভিন্ন বয়সে

১৯২৭-এর ২৭-শে এপ্রিল উত্তরপ্রদেশের শাহরনপুর-এ জোহরা বেগম মুমতাজউল্লাহ খান-এর জন্ম হয় এক সাবেকী মুসলমান পরিবারে। বাবার নাম মুমতাজুল্লাহ খান আর মায়ের নাম নাটিকা বেগম। সাত ভাইবোনের তৃতীয় জোহরা ছোটোবেলা থেকেই ছিলেন ডানপিটে। মাত্র এক বছর বয়সে বাম চোখে গ্লুকোমা ধরা পড়লে বৃটেনের বারমিংহ্যামে চিকিৎসা করান তাঁর মা-বাবা।

জোহরার যখন ছয় বছর, তখনই মা-কে হারান। এরপরে তাঁর বাবা মেয়েদের ভর্তি করে দেন লাহৌরের “কুইন মেরি কলেজ”-এ। কলেজে পড়াশুনো শেষ করে জোহরা পাড়ি দিলেন ইউরোপে, অভিনয় শিখতে। তাঁর কাকার অনুপ্রেরণা ও ইচ্ছেয় তিনি জার্মানির ড্রেসডেনে ম্যারি উইঘাম ব্যালে স্কুলে প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হয়ে আধুনিক নাচের তালিম নিতে তিন বছর কাটান ড্রেসডেনে, থাকতেন কাউনটেস লিবেইন্সটাইনের বাড়িতে।

এখানেই তাঁর সাথে দেখা হয় প্রখ্যাত ভারতীয় নৃত্যশিল্পী, নৃত্য পরিকল্পক, অভিনেতা উদয়শঙ্করের সঙ্গে। উদয়শঙ্করের নাচের দলেই নাম লেখালেন জোহরা। সেখানে জন্মসূত্রে জোহরা বেগম মুমতাজ খানের সঙ্গে আলাপ হল কমলেশ্বর সেহগলের। দেখা মাত্রই নৃত্যশিল্পী-বিজ্ঞানী-শিল্প নির্দেশক কমলেশ্বর বছর আটেকের বড় জোহরার প্রেমে পড়ে গেলেন। হিন্দু প্রেমিককে সে দিন ফিরিয়ে দিতে পারেননি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা মেয়েটি। বয়স আর ধর্মের বেড়া টপকে বিয়ে করে ফেলেন দু’জনে।

ইতিমধ্যে, পৃথ্বীরাজ কাপূরের সান্নিধ্যে আসেন জোহরা। অভিনয়ের ইচ্ছেও ফিরে আসে মনে। পৃথ্বীরাজ কাপূরের কাছে কাজ শিখতে শুরু করে দিলেন। তাঁর নাটকে ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগও পেয়ে যান। সঙ্গে সিআইডি, বাজি, ন দো এগারা-র মতো হিট ছবিতে কোরিওগ্রাফি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। জোহরার জীবন যখন দুরন্ত গতিতে ছুটছে তখনই হঠাৎ থেমে গেল কমলেশ্বরের জীবন। আত্মহত্যা করলেন কমলেশ্বর। হোঁচট খেয়েছিলেন। কিন্তু থমকে যাননি জোহরা। স্কলারশিপ নিয়ে চলে গেলেন ব্রিটেনে। একা হাতেই বড় করতে লাগলেন ছেলেমেয়েকে।

জিয়া জলে গানে জোহরা সেহগাল প্রীতি জিনটা

কিছু দিনের মধ্যেই ব্রিটিশ টেলিভিশনে তাঁর ‘এ জুয়েল ইন দ্য ক্রাউন’, তন্দুরি নাইটস আর গুরিন্দ চাড্ডার ‘ভাজি অন দ্য বিচ’ নজর কেড়ে নিল সবার। ২৫ বছর ব্রিটেনে থাকার পর হিন্দি ছবিতে ‘নানি’র ভূমিকায় ফেরেন জোহরা। দেশে ফিরেই একের পর এক হিট ছবি দিল সে, হাম দিল দে চুকে সনম, বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম, বীর-জারা, চিনি কম। এবং সর্বশেষ সাওয়ারিয়া। ছোট্ট ভূমিকা আর নজরকাড়া অভিনয়। কখনও অমিতাভের মায়ের চরিত্রে, কখনও বা ঐশ্বর্যর ঠাকুমা। কখনও আবার গোবিন্দার মারকাটারি দিদিমা। হাসি-কান্না-ছেলেমানুষি সবেতেই অনবদ্য।

১০০ বছর উদযাপনের পার্টি-তে যখন এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, ১০০ পেরিয়ে জীবন থেকে কী চান? হুইলচেয়ারে বসে জোহরার ঝটপট উত্তর, “ব্লন্ড চুল, ছিপছিপে চেহারা আর ৫ ফুট ৬ ইঞ্চির বেশি লম্বা হতে চাই”। এক দিন এক সাংবাদিক তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এই বয়সেও আপনার এই চনমনে, প্রাণোচ্ছল স্বভাবের রহস্যটা কী? বলেছিলেন, “আমার মধ্যের মেয়েটা”।

সেহগালের কন্যা কিরণ, যিনি নিজে একজন ওডিসি নৃত্যশিল্পী, তাঁর মায়ের আত্মজীবনী প্রকাশ করেন, নাম “জোহরা সেহগাল: ফ্যাটি”। তাঁর সন্তান পবন সহগাল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মী।

১০২ বছর বয়েসে দক্ষিণ দিল্লীর ম্যাক্স হাসপাতালে বলিউডের ‘গ্র্যান্ড ইয়ং নানি’ জোহরা সেহগল-এর জীবনাবসান হয়, যার বাস্তব জীবনটা কোনও ফিল্মের থেকে কম নয়।  

(সংকলনে – তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন