প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধার্ঘ – যামিনী রায়

চিত্রশিল্পকে জাদুঘরের দেওয়াল থেকে মধ্যবিত্তের গৃহস্থালিতে পৌঁছে দেওয়া শিল্পী যামিনী রায়ের আজ (২৪-শে এপ্রিল) প্রয়াণ দিবস। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে নিজেকে শিল্পী না বলে পটুয়া বলতে স্বাচ্ছ্যন্দবোধ করা যামিনী রায়কে শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়াস হিসেবে আসুন জেনে নেওয়া যাক এই বিরল প্রতিভাধর মানুষটিকে।

তাঁর আঁকা ছবির সাথে যামিনী রায়

বিশ্ববরেণ্য শিল্পী যামিনী রায় ১৮৮৭ সালের ১১ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড় গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা রামতরণ রায়ও ছিলেন শিল্প অনুরাগী। সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন শুধু শিল্পকর্মে মনোনিবেশ করবেন বলে।

ছোটবেলায় বাড়িতে একেবারেই মন বসতো না যামিনীর। হন্যে হয়ে বাবা রামতরণ ছোট্ট যামিনীকে খুঁজে বেড়াতেন। শেষ পর্যন্ত দেখা মিলত পাড়ার পটুয়াদের আস্তানায়। গ্রামে দুর্গাপুজো হোক কিংবা কালী পুজো, যামিনীর আসল আকর্ষণ ঠাকুর গড়ার কৌশল দেখা। সারা দিন নাওয়া-খাওয়া শিকেয় তুলে যামিনী বসে থাকতেন পোটো পাড়ায়। ঘরের দেয়ালে, মেঝেতে কিংবা হাতের কাছে যা-ই পেতেন, তাতেই পুতুল, হাতি, বাঘ, পাখি ইত্যাদি এঁকে গেছেন নিজের মনে।

নিজের প্রতিভাকে নিজেই চিহ্নিত করে ১৬ বছর বয়সেই কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই ১৯১৪ সালে ফাইন আর্টে ডিপ্লোমা করেন। সেই সময় ওই প্রতিষ্ঠানের ভাইস-প্রিন্সিপালের দায়িত্বে ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজেই ‘ক্লাসিকাল আর্ট ফর্ম’ নিয়ে পড়াশোনা করেন যামিনী। বাঁকুড়ার পটুয়া যামিনীর সঙ্গে পাশ্চাত্যের আর্ট-এর দিকপাল পিকাসো, সেজান ও ভ্যান গখের চিত্রকলার সাথে হ’ল পরিচিতি।

এর পরে সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ‘পোর্ট্রেট ড্রয়িং’-এর মাধ্যমে দিনযাপন করতে শুরু করেন। দিন কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু যামিনী জানতেন, কোথাও কোনও শূন্যস্থান রয়ে যাচ্ছে। ঠিক পথের সন্ধান না পেয়ে থমকে রয়েছে তাঁর নিজস্ব সৃষ্টি।

১৯২৫ সালের কাছাকাছি সময়। কালীঘাট মন্দিরের আশপাশে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে হঠাৎ পটচিত্রগুলোর উপরে চোখ পড়ল তরুণ শিল্পী যামিনী রায়ের। কালী চরিত্র এবং কাহিনী তুলির টানে, উজ্জ্বল রঙের ব্যবহারে নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। যেন ধাক্কা খেলেন। ‘ইম্প্রেশনিজম’ এবং ‘কিউবিজম’-উত্তর সময়ে শিল্পের এই সারল্য তাঁকে মুগ্ধ করল। সেদিন কালীঘাট মন্দিরের আশপাশে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ সেই পথের সন্ধান পেয়ে গেলেন তিনি। সিদ্ধান্ত নিলেন, বাংলার লোকশিল্পকেই পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করবেন। তাঁর এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বঙ্গশিল্প জগতের তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দিক খুলে গেল। দৈনন্দিন বঙ্গজীবন অতি সহজেই ধরা দিল শিল্পীর তুলিতে। আর এই সহজবোধ্য শিল্প সহজলভ্য হয়ে উঠল বঙ্গবাসীর কাছে। পৌঁছে গেল মধ্যবিত্তের অন্দরে। তৃতীয়ত, পুনরুজ্জীবিত হল বাংলার লোকশিল্প।

যামিনী রায় বলতেন, ‘আমি পটুয়া’। তাঁর ছবিও পটুয়া শৈলির। তাঁর কোনও নির্দিষ্ট পটুয়া ঘরানা নেই। ছবির চরিত্র শান্ত, কোমল। বিষয় কোথাও পুরান, কোথাও লোকসামাজিক জীবন। যামিনীর সে এক নীরব বিদ্রোহ। ইউরোপীয় পদ্ধতিতে ও চিন্তনে আর কত কাল ভারতীয় চিত্রশিল্প আটকে থাকবে? যেখানে ভারত নিজস্ব চিন্তন ও দর্শনে সমৃদ্ধ। অবলীলায় ইউরোপীয় সাহচর্য ছেড়ে ফিরলেন শিকড়ের টানে। নিজস্ব সাংস্কৃতিক মূলে। তবে গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে দেখা সেজান, গগ্যাঁ, ভ্যান গখদের ছবির প্রভাব রয়ে গেল অন্তরে।

তাঁর নব অনুরাগ বাংলার লোকশিল্পে, সংস্কৃতিতে, লোকপুরাণে। লোকজ ছন্দ ও স্পন্দনে। ছবির ধারণা ও উদ্ভাবনায় বাংলার সাধারণ সমাজের ধর্ম, আচরণ, শিল্পকলা, সাংস্কৃতিক বিশ্বাস উপজীব্য হল। তাঁর ছবির ফ্রেমে বাংলার উদ্ভিদজগৎ, প্রাণিজগৎ, প্রাকৃতিক জগৎ ধরা পড়ল। তবে এ সব তিনি মূলত খুঁজে পেলেন বাংলার পটচিত্রে। পটুয়া পাড়ায়, কালীঘাট, বেলিয়াতোড়, বিষ্ণুপুরী টেরাকোটায়। বাঁকুড়ার পটচিত্রে ধর্ম, ধর্মচিহ্ন, বৈষ্ণব অনুরাগ, রামায়ণ, মহাভারত, মনসামঙ্গল, মঙ্গলকাব্য আলেখ্য রচনা করে। প্রাণি ও উদ্ভিদের ‘মোটিফ’, জ্যামিতিক গড়ন। বর্ণে লাল-হলুদ-কালো-নীল। পটে ধরা দেয় নিজ ভাবনা, গোষ্ঠীর ভাবনা, শ্রুতি, মৌখিক পরম্পরা, হেঁয়ালি-প্রবাদ নির্ভর কল্পনার জাগরণ। এক কথায় ধরা দেয় মৌখিক সাহিত্যের চিত্ররূপ। অর্থাৎ, শৈলী নিজস্ব, পদ্ধতি ‘কমিউনিটি’র। এইখানটাই গ্রহণ করেছিলেন যামিনী রায়। আটপৌরে, জাঁকজমকহীন, প্রসাধনহীন সারল্য ভরা রেখা-রং থাকে তাঁর ছবিতে। তৈরি করেন সারি সারি রামায়ণ কথা, সাঁওতাল জীবন যাপন, কৃষ্ণলীলা। চরিত্রের আশ্চর্য চোখ দর্শককে স্থির করে দেয়।

১৯৩০ সালের শুরুর দিক থেকে যামিনী রায় পটুয়া শিল্প আহরণ করে শহুরে শিল্পজগতে নিজস্ব জায়গা প্রায় পাকা করে ফেললেন। ব্রিটিশ কলকাতার রাস্তায় এই প্রথম প্রদর্শিত হল কোনও ভারতীয় শিল্পীর আঁকা ছবি।

ক্রমে পাশ্চাত্য দুনিয়াও তাঁর শিল্পের সন্ধান পেল। আগামী বছরগুলোয় যামিনী রায়ের আঁকা ছবির প্রদর্শনী হল নিউ ইয়র্কে এবং লন্ডনে। বর্তমানে পৃথিবীর একাধিক আর্ট মিউজিয়ামে যামিনী রায়ের ছবি রাখা রয়েছে। পরের দিকে শিল্পী উপকরণেও পাশ্চাত্য বস্তুবাদ দিতে শুরু করেছিলেন। ক্যানভাসের বদলে ব্যবহার করতেন কাপড় দিয়ে তৈরি উপকরণ। রঙ তৈরি করতেন প্রাকৃতিক পদার্থ দিয়ে।

দেশপ্রেমে অবিচল যামিনী রায়, একাধিকবার সুযোগ পেলেও যাননি বিদেশে। তিনি বলতেন, "আমরা গরিব দেশের মানুষ, এত পয়সা খরচ করে ওদের দেশে যাব কেন? ওদের অনেক পয়সা। ওরা এসে আমাদের দেখে যাক।" কবি বিষ্ণু দে ছিলেন যামিনী রায়ের একাত্মা বন্ধু। তাই তো মান্না দের বিখ্যাত গানে, "একটা টেবিলে সেই তিন চার ঘণ্টা চারমিনার ঠোঁটে জ্বলত। কখনও বিষ্ণু দে, কখনও যামিনী রায় এই নিয়ে তর্কটা চলত।

১৯৫৪ সালে পদ্মভূষণে সম্মানিত হন এই শিল্পী। ১৯৫৫ সালে ললিত কলা অ্যাকাডেমির ‘ফেলো’ সম্মান দেওয়া হয় তাঁকে। ১৯৭২ সালের ২৪ এপ্রিল কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

কবিগুরুও ছিলেন যামিনী চিত্র প্রেমে আপ্লুত। যামিনী রায় রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-শিল্পকর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাই দেখা যায়, যামিনী রায়ই একজন আধুনিক শিল্পী, যিনি রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা বিষয়ে লিখিতভাবে প্রথম প্রতিবেদন রেখেছেন। এই লেখা বুদ্ধদেব বসু-সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার রবীন্দ্র সংখ্যায় (আষাঢ়, ১৩৪৮) প্রকাশিত হয়। কবিতা পত্রিকায় যামিনী রায় প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথের ছবি’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি পড়ে কবি বড় আনন্দ পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। স্বয়ং কবি চিঠি লিখে যামিনীকে জানিয়েছিলেন সে কথা।

যামিনী রায়কে রবীন্দ্রনাথ আরও একটি অসাধারণ চিঠি লিখেছিলেন, যা বহুপঠিত এবং বহুচর্চিত। যেখানে আধুনিক দৃশ্যকলার একেবারে গোড়ার কথাটি নিঃসংকোচে ঘোষণা করেছিলেন তিনি। সে চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “ছবি কী– এ প্রশ্নের উত্তর এই যে– সে একটি নিশ্চিত প্রত্যক্ষ অস্তিত্বের সাক্ষী। তার ঘোষণা যতই স্পষ্ট হয়, যতই সে হয় একান্ত, ততই সে হয় ভালো। তার ভালো-মন্দের আর কোনো যাচাই হতে পারে না। আর যা কিছু – সে অবান্তর – অর্থাৎ যদি সে কোনো নৈতিক বাণী আনে, তা উপরি দান”।

১৯৭২ সালে আজকের দিনে চার পুত্রসন্তান ও এক কন্যাসন্তানের জনক যামিনী রায়ের মৃত্যু হয়। বাঙালির বাঙালিত্ব তুলে ধরতে মাছ-মিষ্টি-দই এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাশাপাশি রয়েছে যামিনী রায়ের নাম। তাঁর পটচিত্রে উঠে এসেছে ষোল আনা বাঙালিয়ানা। যামিনী রায়ের শিল্পে তাঁর জন্মস্থান বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়ার পটচিত্রের প্রভাব অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই শিকড় রক্ষার তাগিদ চোখে পড়ে না।

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন