চলচ্চিত্র জগতের প্রবাদপুরুষ হিচকক

অস্কার না পেয়ে অস্কার পুরস্কারকেই লজ্জায় ফেলা অ্যালফ্রেড হিচককের আজ প্রয়াণ দিবস। বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম প্রবাদপুরুষ স্যার অ্যালফ্রেড যোসেফ হিচকক ১৯৮০ সালের এই দিনে মারা যান যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে তাঁর বেল এয়ারের বাড়িতে; আসুন তাঁর প্রয়াণ দিবসে জেনে নেওয়া যাক নির্বাক ও সবাক দুইধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণেই সাফল্য পাওয়া এই বিস্ময়কর মানুষটিকে।

আলফ্রেড হিচকক - বিভিন্ন ভঙ্গিমায়

১৮৯৯ সালের ১৩ আগস্ট লন্ডনের লেটনস্টোন জেলায় জন্মগ্রহণ করেন আলফ্রেড হিচকক৷ তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় জিসুইট ক্লাসিক স্কুলে। এরপরে তিনি সেন্ট ইগনাতিয়াস কলেজে ভর্তি হন। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর তিনি লন্ডন কাউন্টি স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড নেভিগেশন এ যান সেন্ট ইগনাতিয়াস ছেড়ে। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি ড্রাফটসম্যান এবং অ্যাডভারটাইজিং ডিজাইনার হিসেবে কেবল্ কোম্পানি হেনলিতে কাজ শুরু করেন।

১৯১৯ সালে হেনলি টেলিগ্রাফ প্রতিষ্ঠিত হয় আর তার প্রথম সংকলনে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা গ্যাস”, যেখানে অল্পবয়সী এক নারীকে নিয়ে তাঁর লেখা আবর্তিত হয়। তাঁর পরবর্তী লেখার নাম ছিল দ্য ওমেন পার্ট”, এটাও একই সালে প্রকাশিত হয় একই পত্রিকায়।

১৯২০ সালে অ্যালফ্রেড হিচকক আগ্রহী হয়ে উঠেন ফটোগ্রাফি এবং চলচ্চিত্রের প্রতি। তিনি লন্ডনে ফিল্ম প্রোডাকশনে কাজ করা শুরু করেন। প্যারামাউন্ট পিকচার”-এর লন্ডন শাখায় তিনি টাইটেল কার্ড ডিজাইনার হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন। এরপর তিনি ইসলিংটন স্টুডিও”-তে টাইটেল কার্ড ডিজাইনার হিসেবে কাজ করতে করতে চিত্রপরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। 

১৯২২ সালে নাম্বার থার্টিননামে চলচ্চিত্রের কাজ শুরু করেন; কিন্তু তাঁর জীবনের প্রথম চলচ্চিত্রটি অসম্পূর্ণই থেকে যায়। এরপর একের পর এক তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যান। আর চলচ্চিত্রে তিনি ফুটিয়ে তুলতে থাকেন তাঁর নান্দনিকতা। ১৯২২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি  নির্মাণ করে যান বিভিন্ন চলচ্চিত্র, যাতে উঠে এসেছে সাসপেন্স, থ্রিল, রোমান্স। ১৯২৫ সালে তিনি নির্মাণ করেন দ্য প্লেজার গার্ডেন। এ চলচ্চিত্রটি ছিল ব্রিটিশ-জার্মান প্রোডাকশনের এবং চলচ্চিত্রটি দারুণ জনপ্রিয় হয়। এরপর হিচকককে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়না। বিভিন্ন প্রোডাকশনের ব্যানারে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যেতে থাকেন তিনি। ১৯২৭ সালে মুক্তি পায় তাঁর চলচ্চিত্র দ্য লডজারদ্য লেডি ভেনিশেসমুক্তি পায় ১৯৩৮ সালে এবং জ্যামাইকা ইনমুক্তি পায় ১৯৩৯-এ। তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে আমেরিকাতেও। এরই মাঝে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বরে হিচকক বিয়ে করেন আলমা রিভিলিকে।

অ্যালফ্রেড হিচকক ১৯৪০ সালে পুরো পরিবার নিয়ে হলিউডে যান। শুরু হয় তাঁর হলিউডে চলচ্চিত্র জীবন। ডেভিডও সেলযনিকের প্রযোজনায় চলচ্চিত্র রেবেকা। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ১৯৪০ সালে। ১৯৪২ সালে সাবতিউরমুক্তির পায়। এরপর একে একে মুক্তি পায় লাইফবোট (১৯৪৪), স্পেলবাউন্ড (১৯৪৫), নটোরিয়াস (১৯৪৬), রোপ (১৯৪৮), স্ট্রেন্জারস অন এ ট্রেইন (১৯৫১), ডায়াল এম ফর মার্ডার এবং রিয়ার উইন্ডো (১৯৫৪)। ১৯৫৮ আর ১৯৫৯ সালে মুক্তি পায় দুইটি চলচ্চিত্র যথাক্রমে ভার্টিগো আর নর্থ বাই নর্থওয়েষ্ট।

এরপর আসে সেই বিখ্যাত ১৯৬০ সাল। হিচককের ফিল্মোগ্রাফি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এসময় মুক্তি পাওয়া সাইকো (১৯৬০)চলচ্চিত্রটির ব্যবসায়িক সাফল্য আর দর্শকপ্রিয়তা ছিল চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম মাইলফলক। অতি সম্প্রতি হিচককের সাইকোর সিনেমা নির্মাণের ভিতরের কাহিনী নিয়ে নির্মিত হয়েছে ব্রিটিশ চলচ্চিত্র হিচকক”, যেখানে অ্যান্থনি হপকিন্স অভিনয় করেছেন হিচককের চরিত্রে।

সাইকোর পর ১৯৬৩ সালে মুক্তি পায় আরেক সাড়াজাগানো চলচ্চিত্র দ্যা বার্ডস। ফ্যামিলি প্লট” (১৯৭৬) ছিলো তাঁর পরিচালিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র। হিচককের ফিল্মোগ্রাফিতে আরেকটি উজ্জ্বলতম অধ্যায় হয়ে আছে ১৯৫৫ সালে প্রচারিত অ্যালফ্রেড হিচকক প্রেজেন্টস। এটি ছিলো একটি টিভি শো, যার প্রতিটি পর্বের ব্যাপ্তিকাল ছিলো ২৫ মিনিট। ১৯৫৫ সাল থেকে শুরু হওয়া এই সিরিজটি চলে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত।

দীর্ঘ ৫০ বছরের চলচ্চিত্র পরিচালনা জীবনে আলফ্রেড হিচকক নিজস্ব একটি ধারা সৃষ্টি করে গেছেন, যা 'হিচককিয়ান' নামে উল্লেখ করা হয়। তাঁর চলচ্চিত্রের কাহিনীতে বজায় রেখেছেন এই ধারা যেখানে উদ্বেগ, ভয়, ভীতি, টান টান উত্তেজনার সংমিশ্রণ প্রতিটি ফ্রেমে খেলা করত। এ রকম কাহিনী আর ক্যামেরাওয়ার্ক দিয়ে তিনি ঠিকই দর্শক টানতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর সে কারণেই তাঁকে দ্য মাস্টার অব সাসপেন্সবলা হয়। সিনেমার এমন সব কাহিনী নিয়ে খেলা করা হিচকককে করেছে সবার থেকে আলাদা। তাঁর প্রতিটি চলচ্চিত্রই একেকটি মাস্টারপিস

তিনি শুধু কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, একজন সুলেখকও বটে। টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রকাশিত গ্যাস’, এবং দ্য ওমেন পার্টছাড়াও সরদিদ’, ‘অ্যান্ড দেয়ার ওয়াজ নো রেইনবো’-এর মতো লেখাও তিনি লিখেছেন। তাঁর সর্বশেষ লেখা ছিল ফেডোরা। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, হিচককের লেখাগুলো মূলত নারীকেন্দ্রিক। তাঁর অধিকাংশ চলচ্চিত্রের কাহিনীও আবর্তিত হয়েছে নারীকে ঘিরে।

১৯৮০ সালের ২৯ এপ্রিল ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করার কয়েক মাস আগে রাণী এলিজাবেথের কাছে তিনি নাইট উপাধি গ্রহণ করেন।

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)    

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন