ভারতীয় সিনেমার জনক দাদাসাহেব ফালকে

চলচ্চিত্র প্রেমী মাত্রেই দাদাসাহেব ফালকে নামটার সাথে পরিচিতি থাকলেও মানুষটাকে জানি কয়জনা? আজকের থেকে ঠিক দেড়শো বছর আগে জন্মানো এই মানুষটাকে তাঁরই জন্মদিনে জেনে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর এই প্রয়াস।

দাদাসাহেব ফালকে

আসল নাম ধুন্ডীরাজ গোবিন্দ ফালকে। জন্ম ১৮৭০ সালের ৩০ এপ্রিল ব্রিটিশ ভারতের বম্বে প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ত্র্যম্বকেশ্বরে এক শিক্ষিত পরিবারে। পিতা গোবিন্দ সদাশিব ফালকে ছিলেন হিন্দু পুরোহিত ও মা দ্বারকাবাই ছিলেন সংস্কৃত'র পন্ডিত। বাবা ব্রাহ্মণ পণ্ডিত হবার সুবাদে ছোটবেলায় দাদাসাহেব বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের রীতিনীতি আয়ত্ত করেছিলেন এবং বিভিন্ন ভেষজ ওষুধ তৈরির শিক্ষাও পেয়েছিলেন বাবার কাছ থেকে। গোবিন্দ সদাশিব ফালকে উইলসন কলেজের সংস্কৃত অধ্যাপক নিযুক্ত হওয়ার ফালকে পরিবার বোম্বে চলে যায়।

ধুন্ডীরাজ গোবিন্দ ফালকের শিল্পকলার প্রতি বিশেষ অনুরাগ ছিল ছোটো থেকেই। ত্র্যম্বকেশ্বর থেকে প্রাথমিক শিক্ষা এবং বোম্বে থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে ১৮৮৫ সালে স্যার জে.জে স্কুল অব আর্টসে ভর্তি হন এবং এক বছর সেখানে অঙ্কন শিক্ষা গ্রহণ করেন। এর পরের বছরে তিনি দাদার কাছে বরোদা চলে যান এবং সেখানে মহারাজা সায়াজিরাও বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের অন্তর্গত কলাভবন থেকে তৈলচিত্র ও জলরং বিষয়ে কোর্স সমাপ্ত করেন ১৮৯০ সালে।

তিনি স্থাপত্যশিল্প ও মূর্তিনির্মাণ বিষয়েও যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন। ১৮৯২ সালে আহমেদাবাদে একটি শিল্প-সংক্রান্ত প্রদর্শনীতে একটি আদর্শ থিয়েটারের প্রতিরূপ তৈরি করে স্বর্ণপদক পান। তার কাজ দেখে খুশি হয়ে এক ব্যক্তি তাঁকে একটি দামী ক্যামেরা উপহার দেন। এর আগে এর আগে তাঁর হাফটোন ব্লক, ফটোলিথিও এবং থ্রি কালার সেরামিক ফটোগ্রাফি বিষয়ে একটা কোর্স করা ছিল এখন কলাভবনের অধ্যক্ষ তাঁকে থ্রি কালার ব্লক মেকিং, ফোটোলিথিও ট্র্যান্সফার, ডার্করুম প্রিন্টিং শিখতে মধ্যপ্রদেশে পাঠান। শিক্ষা গ্রহণ করে ১৮৯৩ সালে তিনি ফেরেন।

১৮৯৩ সালে কলাভবনের ফটো স্টুডিও ও ল্যা বে তিনি "শ্রী ফালকে এনগ্রেভিং এন্ড ফটো এডিটিং" নামে কাজ শুরু করেন। পেশাদার চিত্রগ্রাহক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ১৮৯৫ সালে তিনি গোধরা চলে যান; কিন্তু সেখানে ব্যবসায়িক অসাফাল্য ও ১৯০০ সালের প্লেগ মহামারীতে বউ ও বাচ্চাকে হারিয়ে ফিরে যান বরোদাতে। কিন্তু এখানেও ফটোগ্রাফির ব্যবসা চলে না কারণ একটি অমূলক গুজব তখন সেখানে রটে যায় যে "ফটোগ্রাফি করলে নাকি ক্যামেরা সব শক্তি শুষে নেয় এবং যার ফটোগ্রাফি করা হয় সেই ব্যক্তির মৃত্যু হয়"।

এরপর তিনি নাটকের দলের পর্দা আঁকার কাজ করে জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি নাট্যেসৃজন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা গড়ে তোলেন। এরপর বরোদাতে কাল হার্তজ নামে এক জাদুকরের কাছে যাদু শিখে তিনি প্রফেসর কেলফা (ফালকের উল্টো) নামে জাদু দেখাতে শুরু করেন এবং গিরিজা কারান্ডিকার সাথে বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ হন, পরে যার নাম হয় সরস্বতী। ১৯০৩ সালে ফটোগ্রাফার এন্ড ড্রাফটসম্যান হিসেবে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়াতে যোগ দেন এবং ছেড়েও দেন। ১৯০৬ সালে লোনাভালা-তে প্রিন্টিং প্রেস চালু করেন "ফালকে এনগ্রেভিং এন্ড প্রিন্টিং"। ব্যবসা সফল হলেও ফালকের সাথে পার্টনারদের মতানৈক্য হয় এবং নিজের তৈরি করা ব্যবসা ছেড়ে দেন দাদাসাহেব।

ব্যবসা ছেড়ে দেবার পর নানা ছাপাখানা থেকে তার কাজ করার জন্য ডাক আসে কিন্তু তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯১১ সালে ১৫-ই এপ্রিল ‘দ্যা লাইফ অফ ক্রাইস্ট' চলচ্চিত্রটি আমেরিকা ইণ্ডিয়া পিকচার প্লেস-এ দেখে সিদ্ধান্ত নেন চলচ্চিত্র তৈরি করবেন। পরের এক বছর ফালকে বিভিন্ন ক্যাটালগ, বই, সিনেমা তৈরীর যন্ত্রপাতি জোগাড় করে সিনেমা তৈরির বিষয়ে গভীর পড়াশোনা শুরু করেন। গভীর পড়াশোনার শেষে তিনি লণ্ডন যাবেন ঠিক করেন এবং জীবনবীমার টাকা বন্ধক রেখে লোন নিয়ে লণ্ডন যান। সেখানে 'বায়োস্কোপ' পত্রিকার সম্পাদক কেপবার্ণ-এর সাথে দেখা করেন এরপর তিনি ওয়াল্টন স্টুডিওর পরিচালক সেসিল হেপওয়ার্থ-এর সাথে পরিচিত হন। এঁদের উপদেশে তিনি একটি উইলসন ক্যামেরা কেনেন।

১-লা এপ্রিল ১৯১২ দেশে ফিরে "ফালকে ফিল্ম কোম্পানি" তৈরি করে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রের জন্য টাকা জোগাড় করার উদ্দেশ্যে জন্য ‘অংকুরাচি ওয়াধ’ (একটি মটর গাছের বৃদ্ধি) নামের একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র তৈরি করেন; উদ্দেশ্য যারা টাকা দিতে পারবেন এমন কয়েকজনকে দেখানো এবং তাদের মধ্যে সন্তুষ্ট হয়ে কয়েকজন টাকাও দেন। এই টাকা নিয়েই তিনি ভারতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি 'রাজা হরিশচন্দ্র'র চিত্রনাট্য লেখেন। ৪০ মিনিট দৈর্ঘ্যের (৩৭০০ ফিট, ৪ রিল) এই ছবিতে দাদাসাহেব ছিলেন একাধারে এই চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যেকার, পরিচালক, প্রোডাকশন ডিজাইনার, মেকআপ আর্টিস্ট, এডিটর। এই চলচ্চিত্রে ডি.ডি ডাবকে হরিশচন্দ্রের পাঠ করেন, কোন মহিলাকে পাওয়া না যাওয়ায় আন্না সালুঁখে নামে এক ব্যক্তি রানী তারামতি এবং দাদাসাহেবের ছেলে বালচন্দ্র হরিশচন্দ্রের ছেলে রোহিতশভার চরিত্রটি করেন।

২১-শে এপ্রিল ১৯১৩-য় অলিম্পিয়া থিয়েটারে প্রথম এই ছবি দেখানো হয় এবং ৩-রা মে ১৯১৩ সালে এই ছবি মুক্তি পায় বোম্বের করোনেশন সিনেমায়। এরপর তাঁর তৈরি মোহিনী ভষ্মাসুর ও সাবিত্রী সত্যবান বাণিজ্যিকভাবে সফলতা পায়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলার ফলে টাকার যোগান বন্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন দেশীয় রাজ্যগুলিতে তাঁর চলচ্চিত্রগুলি দেখিয়ে কিছু অর্থ জোগাড় করেন এবং পরে লোকমান্য তিলক তাঁকে কিছু সাহায্য করায় তার পরের চলচ্চিত্র "লঙ্কা দহন" (১৭-ই এপ্রিল ১৯১৭) প্রকাশ পায় ও বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়; দশদিনে ৩২ হাজার টাকা আয় করে এই ছবি।

এরপরে তিনি তার কোম্পানির ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করেন এবং "ফালকে ফিল্ম কোম্পানি"র নাম বদলে হয় "হিন্দুস্তান ফিল্ম কোম্পানি"। এই নব্য কোম্পানির তৈরি "শ্রী কৃষ্ণ জনম্ (২৪-শে আগস্ট ১৯১৮) "কালিয়া মর্দান" (৩রা মে ১৯১৯) বাণিজ্যিকভাবে সফলতা লাভ করে। চলচ্চিত্র ব্যবসায়িক সফলতা পেলেও দাদা সাহেব ও অন্যান্যদের মধ্যে মতানৈক্য ভীষণভাবে বাড়ছিল, এর ফলে তিনি নিজের কোম্পানি ছেড়ে দিয়ে সাময়িকভাবে কাশী চলে যান।

দাদাসাহেব ফালকের পরিচালিত শেষ এবং একমাত্র সবাক ছবিটি হলো "গঙ্গাভতারণ"( ৬-ই আগষ্ট, ১৯৩৭)। এরপর তিনি পুরোপুরি ভাবে অবসর গ্রহণ করেন এবং নাসিক চলে যান সেখানে ১৬-ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪ তাঁর মৃত্যু হয় বার্ধক্যবশত।

ভারতীয় চলচ্চিত্রে দাদাসাহেব ফালকে'র অবদানের স্বীকৃতিতে ভারত সরকার ১৯৬৯ সালে প্রথম দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার প্রচলন করেন। এটি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার। ভারত সরকারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে পুরস্কার হিসেবে স্বর্ণকমল পদক নগদ ১০ লক্ষ টাকা এবং একটি শাল প্রদান করা হয়। এছাড়াও 'দাদাসাহেব ফালকে একাডেমী' নামে আরও একটি সংগঠন আছে এরা ৩ ধরনের পুরস্কার প্রদান করে দাদাসাহেব ফালকের নামে। "ফালকে রত্ন পুরস্কার'', "ফালকে কল্পতরু পুরস্কার" ও "দাদা সাহেব ফালকে একাডেমি পুরস্কার"।

ভারতে সিনেমার গোড়াপত্তন, সম্পূর্ণ ভারতীয় উপায়ে সিনেমা তৈরীর প্রক্রিয়া এবং ভারতে চলচ্চিত্র ব্যবসার দিকটি উন্মোচিত করে দেওয়া দাদাসাহেব ফালকের দৃষ্টান্তমূলক অবদানের জন্য যথার্থরূপেই দাদাসাহেব ফালকেকে "ভারতীয় সিনেমার জনক" বলে অবিহিত করা হয়।

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন