নাওমি উয়েমুরা – দুর্জয় সাহসের প্রতীক

৫ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার এক মুখচোরা মানুষ ১৯৭৮ সালের ১-লা মে এমন একটি কান্ড ঘটিয়েছিলেন যা আগে কেউ কোনদিন কল্পনাতেও আনতে পারেনি। তিনি নাওমি উয়েমুরা, যার গোটা জীবনটা কেটেছে নিসঙ্গ প্রকৃতির কোলে।

উত্তর মেরু অভিযানের পথে নাওমি উয়েমুরা

১৯৭৮ সালের ১-লা মে নাওমি কী কান্ড ঘটিয়েছিলেন সেটা জানার আগে মানুষটির শৈশব ও বেড়ে ওঠার দিনগুলির কথা একটু জেনে নেওয়া যাক। ১৯৪১ সালের ১২-ই ফেব্রুয়ারী জাপানের হিওগো শহরে তাঁর জান্ম হয়। টোকিওর মেইজি বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিকাজ নিয়ে পড়াশুনার সময়েই তিনি সেখানকারই পর্বতারোহণের ক্লাবে যোগদান করেন, মূলত আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর লক্ষ্যে।

৩০-তম জন্মদিনের আগেই উয়েমুরা একা একাই আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিলিমাঞ্জারো, এন্ডিজ পর্বতমালার একোনাগুয়া শৃঙ্গ, আল্পস পর্বতমালার মন্ট ব্ল্যাংক ও মাট্টেরহর্ণ শৃঙ্গে আরোহন করা ছাড়াও জাপান দেশকে লম্বালম্বি ভাবে পায়ে হেঁটে পার হন। এছাড়াও জাপানি অভিযাত্রী দলের সদস্য হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট জয় করেন। ১৯৭০-এর আগস্ট মাসে, উয়েমুরা প্রথম মানুষ হিসেবে একা একাই মাত্র ৮ দিনে উত্তর আমেরিকার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ডেনালি (বর্তমান নাম মাউন্ট ম্যাককিনলি) জয় করেন।

পাহাড়ে চড়ার সময় ক্রিভাস (পাহাড়ের মাঝে সৃষ্টি হওয়া গভীর গর্ত, যেটি বরফে আবৃত থাকার দরুন খালি চোখে দেখা যায় না) যেকোনো পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে থাকে। এগুলি থেকে বাঁচার জন্য নাওমি একটি বাঁশের খাঁচা তৈরি করে কাঁধের সঙ্গে আটকে রাখতেন। খাঁচাটির দৈর্ঘ্য এতটা ছিল যে তিনি ক্রিভাসের মধ্যে পড়ে গেলেও পাথরের গায়ে কোন ভাবে আটকে যেতে পারেন। সেখান থেকে বেরিয়ে আসার শারীরিক কসরতও রপ্ত করেছিলেন।

এরপরে উয়েমুরার স্থির করেন, তিনি একাই অ্যান্টার্কটিকা (উত্তর মেরু) অভিযানে যাবেন এবং উত্তর মেরুর কেন্দ্র বিন্দু ছোঁয়ার পাশাপাশি অ্যান্টার্কটিকার সবচেয়ে উচ্চতম শৃঙ্গ ভিনসন ম্যাসিফে আরোহণ করবেন। এই অভিযানের প্রস্তুতির অঙ্গ হিসেবে তিনি কুকুর চালিত স্লেজে করে একাই, দুটি পর্যায়ে গ্রিনল্যান্ড থেকে আলাস্কা পাড়ি দেন, সময় লাগে ৩৬৫ দিন, অতিক্রম করেন ১২০০০ কিমি।

১৯৭৮ সালে কানাডার উত্তরাঞ্চলের বরফে ঢাকা এলেস্মেয়ার দ্বীপ থেকে উত্তর মেরুর উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন নাওমি। রাস্তায় দুবার সমূহ বিপদের মুখে পড়েন উয়েমুরা। উত্তর মেরুর দিকে যাত্রার চতুর্থ দিন তাঁকে মুখোমুখি হতে হয় একটি মেরু ভাল্লুকের। স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে নিথর হয়ে পড়ে থাকতে হয়েছিল তাঁকে বেশ কিছুটা সময়। পরে তাঁর সঞ্চিত সব খাবার-দাবার নিয়ে ভাল্লুকটি চলে যায়। পরের দিন সেই ভাল্লুকটি আবার ফিরে এলে উয়েমুরা তাকে গুলি মেরে হত্যা করেন।

এরপরের ঘটনাটি ৩৫-তম দিনের। নাওমি একটি ভাসমান বরফের চাঁইয়ের উপর বিশ্রাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মাঝ রাত্রে হঠাৎ এক গর্জনে ঘুম ভেঙ্গে উঠে দেখেন তাঁদের প্রকাণ্ড বরফের আশ্রয়স্থলটি মূল ভূখণ্ড থেকে ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। অচিরেই নাওমি বুঝতে পারলেন যে কোনো মুহূর্তে সেই বরফের চাঁইটি তলিয়ে যেতে পারে গভীরে। ১০-টি কুকুর সহ নাওমি একটি রাত সেভাবেই কাটালেন। পরদিন সকালে তিনি একটি বরফের ছোটো সাঁকো দেখতে পেলেন। সেটা দিয়ে একে একে তাঁর কুকুরগুলি সহ তিনি নিরাপদ স্থানে এসে দাঁড়ান। এই ঘটনার পরে (অর্থাৎ ৩৫-তম দিনের পর থেকে পরবর্তী) ২২-তম দিনে, মানে ১-লা মে ১৯৭৮-এ ৮০০ কিলোমিটার যাত্রা করে পৌঁছন উত্তর মেরু বিন্দুতে।

ন্যাশানাল জিওগ্রাফিককে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে জানান, কোনো কোনো দিন তিনি তাঁর কুকুরদের সঙ্গে কাঁচা মাংস দিয়েই সেই দিনের মতো ক্ষিদের জ্বালা মেটাতেন। এই অভিযানে একা থাকার দরুন তিনি যতটা সম্ভব কম সামগ্রী নিয়েছিলেন। সেই লিস্টে বাদ গেছে তাঁর একমাত্র স্টোভটিও। পরের দিনগুলো তাই তাঁকে কাঁচা মাংস খেয়েই কাটাতে হয়। স্লিপিং ব্যাগ বাদ দেওয়ার জন্য তিনি বরফের গুহাতেই শুয়ে রাত কাটাতেন।

১৯৭০ সালের আগস্ট মাসে প্রথমবার ডেনালি (বর্তমান নাম মাউন্ট ম্যাককিনলি) পর্বত শৃঙ্গ আরোহণ করেছিলেন উয়েমুরা। ১৯৮৪ সালের শীতকালে দ্বিতীয়বারের জন্য ডেনালি পর্বত শৃঙ্গে আরোহণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন তিনি। ১৯৮৪-র ১৩-ই ফেব্রুয়ারি, মানে তাঁর জন্মদিনের একদিন পরে উয়েমুরা বেতারে এক জাপানি ফটোগ্রাফার, যিনি ডেনালি পর্বতের উপর দিয়ে উড়োজাহাজে করে যাচ্ছিলেন তার সঙ্গে কথা বলেন এবং জানান যে, তিনি ডেনালি শৃঙ্গ আরোহণ করে ১৮০০০ ফিট অবধি নেমে এসেছেন, আর হয়ত দুইদিনের মধ্যেই তিনি বেস ক্যাম্পে পৌঁছে যাবেন। কিন্তু নাওমি উয়েমুরা আর কোনোদিনই বেস ক্যাম্পে ফিরে আসেননি, সেদিনের পর থেকে নাওমির আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

একটি উদ্ধারকারী দল প্রথমে আকাশপথে তাঁর খোঁজ চালায়। আবহাওয়ার অত্যন্ত প্রতিকূল ছিলো সেই সময়। দেনালি শৃঙ্গের ওপরে তাপমাত্রা ছিল মাইনাস ৪৬° সেলসিয়াস। ১৪০০০ ফুট উচ্চতায় দুজন অভিজ্ঞ পর্বতারোহীকে নামানো হয় তাঁকে খুঁজে বের করার জন্য। ২৬-শে ফেব্রুয়ারি অব্দি তন্নতন্ন করে খুঁজেও উয়েমুরার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র একটি গুহার ভেতর তাঁর ডায়েরি, ব্যাগ, এমনকি কাঁধে আটকানো সেই খাঁচাটি  খুঁজে পাওয়া যায়। বাকিদের অনুমান, যাত্রাপথের ভার হালকা করার জন্যই নাওমি সেগুলিকে পেছনে ফেলে এগিয়ে ছিলেন শৃঙ্গের উদ্দেশ্যে।

উয়েমুরার সেই ডাইরিটি পরে ইংরেজি ও জাপানি ভাষায় প্রকাশিত হয়। উয়েমুরার অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে বহুমানুষ পরবর্তীকালে একা উত্তর মেরু যাত্রা করেছেন। তাঁর লেখা ডাইরির পাতায় শেষ দুটি লাইন ছিল, "I wish I could sleep in a warm sleeping bag. No matter what happens I am going to climb McKinley."

(তারিণী খুড়ো)

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন