সুকান্ত – ক্ষনজন্মা এক প্রতিভা

ক্ষণজীবন মানে যে তার প্রভাব ক্ষণজীবী-ই হবে তার কোনই মানে নেই; তার অনবদ্য দৃষ্টান্ত তিনি। গালে হাত দিয়ে বসে থাকা সেই চিরচেনা ছবির কিশোর কবির আজ প্রয়াণ দিবস; হ্যাঁ আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কথাই বলছি। আসুন তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি একটু অন্য আঙ্গিকে চেনার প্রয়াস করা যাক কবি-কে।

সুকান্ত ভট্টাচার্য - শিহরণ জাগানো এক নাম

হঠাৎ করে একদিন রাণীদি মারা গেলে সুকান্ত প্রচন্ড ধাক্কা খান, এর কিছুদিন পর তার মাও চিরবিদায় নিলে, মৃত্যুশোক তাঁকে করে তোলে নিঃসঙ্গ থেকে নিঃসঙ্গতর; কবিতাই হয়ে ওঠে তার একাকীত্বের সঙ্গী।

সুকান্ত নামটি এসেছিল বেশ অদ্ভুতভাবে। সুকান্তের খুব কাছের ছিলেন তাঁর এক জেঠতুতো দিদি, রানী দিদি।  সেসময়ের জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক মনীন্দ্রনাথ বসুর সুকান্তগল্পটি পড়ে অভিভূত রানীদি তার নাম রেখেছিলেন সুকান্ত। এই রানীদির অকালে চলে যাওয়ায় বড় ধাক্কা পান সুকান্ত।

শৈশবেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর প্রতিভার আঁচ পাওয়া যায়, যখন বিদ্যালয়েরই একটি পত্রিকায় তাঁর লেখা ছোটগল্প সঞ্চয়আলোড়িত করে পাঠকদের। এরপর বিবেকানন্দ জীবনী’- নামে একটি গদ্য বিজন গঙ্গোপাধ্যায়ের শিখাপত্রিকায় ছাপা হয়। শিখা পত্রিকায় সেসময় প্রায়ই সুকান্তের লেখা ছাপা হতো। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় বাল্যবন্ধু ও লেখক অরুণাচল বসুর সঙ্গে মিলে একটি হাতে লেখা কাগজ সপ্তমীকাসম্পাদনা করেন। অরুণাচল বসু আমৃত্যু কবির বন্ধু ছিলেন। অরুণাচলের মা সরলা দেবীর অত্যন্ত স্নেহভাজন ছিলেন সুকান্ত।

মাত্র ১১ বছর বয়সে রাখাল ছেলেনামক একটি গীতিনাট্য রচনা করেন সুকান্ত। পাঠশালাতে পড়বার সময় ধ্রুব নাটিকার নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন তিনি।

ছোটবেলা থেকেই বিদ্যালয়ের বাঁধাধরা নিয়ম-কানুন তার একদম পছন্দ ছিলো না। জীবনের প্রতিটি অংশেই সুকান্ত যেন অনিয়মকে তার নিয়ম করে নিয়েছিলেন। ১৯৪৪ সাল থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগদান করেন এবং ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ১৯৪৪ সালেই ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘএর প্রকাশনায় তিনি আকালনামে একটি সাহিত্য সংকলন সম্পাদনা করেন। এরকম একটা আবহে বেলেঘাটা দেশবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪৫ সালে সুকান্ত প্রবেশিকা পরীক্ষা দিলেও উত্তীর্ন হতে পারেননি। এবং এরই সঙ্গে সঙ্গে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

এর আগে, ১৯৪১ সালে রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর, কলকাতা রেডিও আয়োজিত গল্পদাদুর আসর”-এ নিজের লেখা কবিতা পাঠ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান বিশ্বকবিকে। সুকান্তের মনে সবসময়ই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি গভীর অনুরাগ কাজ করতো। একবার তো তিনি কলকাতায় মহাজাতি সদনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের অনুষ্ঠানে চলে গিয়েছিলেন শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথকে দেখবার জন্য!

বই পড়তে ভালোবাসতেন সুকান্ত; প্রিয় বইয়ের তালিকায় বিভূতিভুষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালীবইটির স্থান ছিল সবার উঁচুতে; এই বইটিকে সবার ঘরে আদরের সঙ্গে রাখা উচিৎ বলে উল্লেখ করেছেন কবি।

কলকাতা শহরকে নিয়ে এক অদ্ভুত আতিশয্য ছিল সুকান্তের; কলকাতাকে এক রহস্যময়ী নারী ভেবে ভালবেসেছেন তিনি। কলকাতা তার প্রেয়সী, কলকাতা তার হারিয়ে যাওয়া মা।

সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসু সুকান্ত সম্বন্ধে বলতে গিয়ে সুকান্তর চেহারাকে ম্যাক্সিম গোর্কির সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, “কানে একটু কম শোনে, কথা বেশি বলেনা, দেখামাত্র প্রেমে পড়ার মতো কিছু নয়, কিন্তু হাসিটি মধুর, ঠোঁট দুটি সরল। বুদ্ধদেব বসু সুকান্তের কথা আরো বলেছেন, “কবি হবার জন্যই জন্মেছিলো সুকান্ত, কবি হতে পারার আগে তার মৃত্যু হলো

একুশ বছরের জীবন। যে বয়সে অন্য কবিরা হয়তো লেখালেখিও শুরু করে না, সেই বয়সে সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর স্বল্পায়ু জীবনে মাত্র ছয় সাত বছর লেখালেখিতে বাংলা সাহিত্যে নিজের আসনটি এতটাই পাকা করে গিয়েছেন যে রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের সঙ্গেই উচ্চারিত হয় তাঁর নাম।

সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর জীবদ্দশায় নিজের কোন প্রকাশিত বই-ই দেখে যাবার সুযোগ পাননি। তাঁর মৃত্যুর পর পরই ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ছাড়পত্র’, এবং এরপর এক এক করে ঘুম নেই (১৯৫০), পূর্বাভাস (১৯৫০), মিঠে-কড়া (১৯৫১), অভিযান (১৯৫৩), গীতিগুচ্ছ (১৯৬৫)।

১৯৪৭-এর ১৩-ই মে তাঁর কলম চিরতরে থেমে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছেন, “এ বিশ্বকে নবজাতকের বাসযোগ্য করে যাব আমি", সূর্যকে বলেছেন, “হে সূর্য তুমি ত জানো আমাদের গরম কাপড়ের কত অভাব!", সিগারেটের প্রতীককে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, “-হঠাৎ জ্বলে উঠে বাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে মারবো, যেমন করে তোমরা আমাদের পুড়িয়ে মেরেছ এতকাল  

দেয়ালে দেয়ালে মনের খেয়ালে লিখি কথা,

আমি যে বেকার পেয়েছি লেখার স্বাধীনতা…”

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন