সালভাদোর ডালি - ভিজুয়াল আর্টসের পথিকৃৎ

‘সুররিয়ালিস্ট’ কথাটির সাথে যে মানুষটির নাম সমার্থক, সেই সালভাদর ডালির আজ জন্মদিন। দৃষ্টিসীমার শৃঙ্খল ভঙ্গকারী দার্শনিক ও চিত্রকর এই মানুষটিকে জেনে নেওয়ার মধ্যে দিয়েই তাকে শ্রদ্ধা জানানোর প্রয়াস হিসেবে এই লেখার অবতারণা।

পেরসিস্টেন্স অফ মেমরি - সালভাদোর ডালি
পুরো নাম সালভাদোর ডোমিঙ্গো ফেলিপি জেসিন্তো ডালি ই দোমেনেখ। ১৯০৪ সালের ১১-ই মে স্পেনের ফিগুয়েরেস গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ডালি। বাবা রাফায়েল এনিসেটো ডালি কুসি ছিলেন একজন নোটারি এবং নাস্তিক মানুষ; এবং মা ফেলিপা ডমেনেচ ফেরেস ছেলের মধ্যেকার শিল্পী সত্বাকে প্রথম চিহ্নিত করেন এবং উৎসাহিত করেন।

১৯১৬ সালে তিনি প্রথম ড্রয়িং স্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৯ সালে মিউনিসিপ্যাল থিয়েটার ফিগারেস-এ প্রথম প্রদর্শিত হয় সালভাডোর ডালির ছবি। ১৯২২ সালে সান ফার্নান্দো একাডেমী অফ ফাইন আর্টস’, মাদ্রিদে চারুকলা পড়ার জন্য ভর্তি হন ডালি। সেখানে গিয়ে ভাস্কর্য আর চিত্রকলায় দক্ষতা বাড়তে থাকে তাঁর। শিক্ষকদের সঙ্গে তাঁর মতের মিল হতো খুবই কম; কিন্তু তথাপি ১৯২৫ সালে প্রথম তাঁর ছবির একক প্রদর্শনী হয়। অবশ্য পরের বছরেই একাডেমী  থেকে বহিস্কার করা হয়।

একাডেমী অফ ফাইন আর্টস-এ থাকার সময় তিনি মেটাফিজিক্যাল এবং কিউবিজম চিত্রকর্মের ওপর আকৃষ্ট হন। অন্যদিকে চালচলনে আনেন অস্বাভাবিক পরিবর্তন। বড় বড় চুলের সঙ্গে তিনি লম্বা জুলফি রাখা শুরু করেন। আর পোশাক পরতেন ইংরেজ ফুলবাবুদের আদলে। খুব অল্প দিনেই অদ্ভুত আচরণের জন্য পরিচিত হয়ে উঠলেন ডালি। 

১৯২৯ সালে ডালি দ্বিতীয়বারের মত প্যারিস ভ্রমনে যান এবং সেখানে তাঁর পরিচয় হয় স্যুরেলিজমের জনক আন্দ্রে ব্রেটন-এর সাথে। সুরিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ (Surrealism) হচ্ছে একটি সংস্কৃতিক আন্দোলন। মূলত বিংশ শতকের গোরার দিকে যখন খেয়ালবাদ বা দাদাইজমের (Dadaism) উত্থান-পতনের সমসাময়িক সময়ে প্রথম মহাযুদ্ধের অবসান ঘটে তখনই উত্থান হয় এই সুররিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদের। স্বপ্ন এবং বাস্তবতার দ্বন্দ্বের মধ্য থেকেই এই মতবাদের শুরু। ডালি নিজেও বলছিলেন “‘পরাবাস্তববাদধ্বংসাত্মক, কিন্তু এটা কেবল আমাদের সীমিত দৃষ্টির শৃঙ্খলকেই ধ্বংস করে। সকল ধরণের রীতিনীতি ভাঙ্গাই এই পরাবাস্তববাদীদের সংস্কৃতিক আন্দোলনের মূল চেতনা। ভিজুয়াল আর্টস বা দৃশ্যমান শিল্প মাধ্যমেই এই পরাবাস্তববাদের।

১৯২৯ সালে সুয়রেলিজমে অংশ নেবার সময় দালির পরিচয় হয় গালা এলুয়ার্ড-এর সাথে যিনি পরবর্তীতে ডালির স্ত্রী, প্রাথমিক মডেল হন। ডালি এবং গালার দবার বিয়ে হয়। ১৯৩৪ সাথে সিভিল আইন অনুসারে বিয়ে হয় এবং ১৯৫৮ সালে ধর্মীয় (ক্যাতালান) ভাবে।

ডালির ছবিতে একটি  বিষয় বিশেষ লক্ষণীয় যে তিনি বিভিন্ন প্রাণীর দ্বারা বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করেছে। ডালি অসামঞ্জস্যতাকে প্রকাশ করেছেন হাতির মাধ্যমে। খুব সম্ভবত হাতির দেহের তুলনায় সরু-লম্বা পা তাকে এই উপলব্ধি দেয়। তাঁর বিভিন্ন ছবিতে ডিমকে তিনি জন্মপূর্ব আশা ও ভালবাসা অর্থে প্রকাশ করেছেন। পিঁপড়াকে মৃত্যু, ক্ষয় এবং কামুকতার প্রতীক হিসেবে দেখিয়েছেন। শামুকের সাথে তিনি মানুষের মাথার সম্পর্ক তৈরি করেন। লোকাস্টের দ্বারা ভয়কে প্রকাশ করেছেন।

১৯৩১ সালে নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ তো বটেই, ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরাবাস্তব ছবি দ্য পারসিস্ট্যান্স অব মেমোরিপ্রদর্শন করেন ডালি। ছবিটিতে ছোট বড় কিছু দেয়ালঘড়ি, পকেট ঘড়িকে গলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। অথবা ঘড়িগুলো ছিল নমনীয়- যেগুলো শুকানোর জন্য গাছের ডালে নেড়ে দেয়া হয়েছে। ছবিটির শত শত অর্থ আজ পর্যন্ত তৈরি করেছেন বোদ্ধারা। তবে একটি সাধারণ অর্থ যা অধিকাংশের মনে চলে আসবে তা হচ্ছে কোনোকিছুই অপরিবর্তনীয় নয়। সবকিছুই নমনীয় এবং নশ্বর। অনেকে মনে করেন এ ছবিটি এলবার্ট আইনস্টাইনের ‘স্পেশ্যাল থিওরি অফ রিলেটিভিটি’ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়ে তৈরি। ডালিকে এ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি অবশ্য তিনি তা অস্বীকার করেন।

মাত্র ২৭ বছর বয়সে আঁকা এই পেইন্টিংটি দিয়ে ডালি ব্যাপক পরিচিত পান। এই ছবিটি মূলত অবচেতন এবং সচেতন মনের পরিস্ফুটন। ছবিটির দিকে তাকালে একটি নিঃশব্দিক আবহ অনুভূত হয়। তিনটী ঘড়ি মানুষের অবচেতন মনের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। ঘুমই মানুষের অবচেতন মনকে জাগিয়ে রাখে। অন্য কমলা রঙের ঘড়িটিতে পিঁপড়াগুলো কেন্দ্রের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। এতে তিনি বুঝিয়েছিলেন সচেতন মনের দুশ্চিন্তাগুলো ঘুমন্ত অবস্থায় বিলুপ্ত হয়। মাঝখানের প্রতিকৃতিটি ঝাপ্সাভাবে আঁকা যা অনেককে এই ধারনা দেয় যে, তিনি এর মাধ্যম্যে দুঃস্বপ্নের দানবীয় আকৃতিগুলো ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন যেগুলো অবচেতন মনে ঝাপসা হয়ে থাকে।

তার আঁকা উল্লেখযোগ্য চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে- দ্য বাস্কেট অব ব্রেড, দবস্টার টেলিফোন, কলেজ, গ্র্যাডিভা, সফ্ট কনস্ট্রাকশন উইথ বয়েল্ড বীন, অ্যাপারিশন অব ফেইস অ্যান্ড ফ্রুট ডিশ অন এ বীচ প্রভৃতি।

ডালির শিল্পকর্ম নিঃসংকোচে ব্যতিক্রমধর্মী এবং অনন্য। তাঁর বিভিন্ন কাজের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট নিরবিচ্ছিন্ন ধারা লক্ষ করা যায়। ডালির শিল্পকর্মের এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল প্রাচীন এবং আধুনিক শিল্পকৌশল দুটোরই ব্যবহার তাঁর ছবিগুলোর মধ্যে দেখা যায়। কিছু ছবিতে তিনি এদুধরনের শিল্পকৌশলকে আলাদা করেছেন, কিছু ছবিতে তাদের একসাথে করেছেন।

ডালি শুধু যে ছবি আঁকাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, তা নয়। ১৯২৯ সালে তিনি এবং তাঁর শিক্ষাজীবনের বন্ধু লুই বুন্যুয়েল মিলে তৈরি করেন ১৬ মিনিটের একটি শর্টফিল্ম। নাম Un Chien andalou (An Andalusian Dog)সুররিয়ালিজম ফিল্মের মাঝে এটা ছিল প্রথম দিকের মুভমেন্ট। এবং প্রায় একশ বছর থেকে এই মুভি দর্শকদের এখনো মুগ্ধ করে রেখেছে।

তিনি সব মিলিয়ে প্রায় ১৫০০ এর মত শিল্পকর্ম রেখে গেছেন বিশ্ববাসীর জন্য। এসব ছবির পাশাপাশি দালি ভাষ্কর্য এবং শর্ট ফিল্ম নিয়েও কাজ করেন। স্যুররিয়ালিজম সম্পর্কিত Lobster Telephone এবং Mae West Lips Sofa ডালির বিখ্যাত দুটি ভাষ্কর্যকর্ম। শিক্ষা জীবনেই ছোটবেলার বন্ধু লুই ব্যান্যুয়েলের ১৭ মিনিটের শর্ট ফিল্ম Un chein anadalou তৈরি করেন। পরবর্তীতে হিচককের সাথে Spellbound মুভির ড্রীম সিকুয়েন্স তৈরি করেন। যা এখন দর্শকদের বিভ্রান্ত করে। libretto এর সেট ডিজাইনও তিনি করেন। ডালির দ্বিতীয় ফিল্ম ছিল ব্যুনেলের সাথে L’Age d’Or,এটি প্যারিসের Studio 28 এ ১৯৩০ সালে প্রদর্শিত হয়।

শেষের দিকে তিনি ছবি আঁকা কমিয়ে দেন। তিনি এতটাই সফল ছিলেন যে তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর ছবির জন্য দুটি মিউজিয়াম তৈরি হয়েছিল। একটি হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় The Salvador Dalí Museum, অপরটি স্পেনের ফিগুয়েরসে Theatre Museum

ডালি ১৯৭৪ সালে তার নিজস্ব সংগ্রহশালা Teatro-Museo Dali, in Figueres, Spain তৈরি করেন। ১৯৮২ সালে St. Petersburg The Salvadour Dali museum স্থাপিত হয়। পরবর্তী তাঁর অপর একটী মিউজিয়াম Theatre Meuseum ফ্লোরিডার ফিগুইরাসে প্রতিষ্ঠিত হয়।

গালার মৃত্যুর পর ডালির শরীরের অবনতি  হতে শুরু করে। ১৯৮০ সালে তার শরীরের এক বিশাল পরিবর্তন ধরা পড়ে, তার নার্ভস সিস্টেমগুলো ধীরে ধীরে শিথিল হতে শুরু করেছিল। ১৯৮৯ সালে ডালি হার্ট ফেইলরের কারণে স্পেনে মারা যান।

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন