বিকাশ রায় – বিস্মৃতপ্রায় চরিত্রাভিনেতা

বাবা বললেন, ‘‘তোমার এই ছোট ছেলেটির লেখাপড়া কিচ্ছু হবে না। রিসাইটেশন শিখছে, নকল-টকল করতে পারে। যাত্রা, থিয়েটারে নোটো সেজেই ওর দিন যাবে।’’

বিকাশ রায় - বিভিন্ন ভঙ্গিমায়
কী অমোঘ ছিল সেই পর্যবেক্ষণ! বাবার ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। নোটো হয়েই দিন গেল তাঁর! পাহাড়ী সান্যাল থেকে উত্তম কুমার, মাধবী মুখোপাধ্যায় সকলেই যাঁর ফ্যান ছিলেন, সেই বিকাশ রায়ের আজ জন্মদিন; অভিনেতা বিকাশ রায়ের মধ্যেকার মানুষটিকে জানার প্রয়াসের মধ্যে দিয়েই আমাদের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিবেদনের এই প্রয়াস।

জন্ম ১৬-ই মে ১৯১৬-এ, নদিয়ার রানিনগরে। বিত্তবান জমিদার বংশের ছেলে। তবে পূর্বপুরুষের বাবুয়ানি এবং উড়নচণ্ডিপনায় ভাঁড়ার প্রায় সবটাই তত দিনে উজাড় হয়ে গিয়েছিল। টিকেছিল শুধু জমিদারিসূত্রে পাওয়া ‘রায়’ পদবিটুকু। বাবা যুগলকিশোর কলকাতায় এসে সরকারি চাকরি নিলেন। যে কোনও আদর্শ পিতার মতোই তিনি চাইতেন, ছোট ছেলে ‘বিকু’ ভাল লেখাপড়া শিখে আইসিএস হোক।

বিকাশ ভর্তি হলেন ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে। কিন্তু তাঁর বেশি আগ্রহ আবৃত্তি (সেই শিক্ষা অবশ্য বাবার কাছেই শুরু), অভিনয়ে। ম্যাট্রিকে বাংলায় লেটার ও স্বর্ণপদক নিয়ে পাশ করলেন বিকাশ। পড়তে গেলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানেও নাটকের ভূত তাঁর ঘাড়ে। তখন ঘটল আর এক কাণ্ড! কলেজের থিয়েটারের দলে ঢুকে শরৎচন্দ্রের ‘বৈকুণ্ঠের উইল’-এ পেলেন বিনোদের ভূমিকা। চরিত্রের দাবি অনুযায়ী মদ, সিগারেট সবই দরকার। কলেজের নাটকে মদ খাওয়া দেখানোর প্রশ্নই নেই। তবে সিগারেট রেখেই মহড়া হল। কিন্তু গোল বাধল শেষবেলায়। চূড়ান্ত মহড়া দেখতে এসে অধ্যক্ষ রেগে আগুন। প্রেসিডেন্সির ছেলেদের নাটকে সিগারেট খাওয়া! অতএব সেটি অভিনয় থেকে ছেঁটে দেওয়া হল। যদিও সিগারেটের নেশা তত দিনে রপ্ত হয়ে গিয়েছে বিকাশের।

আর মদ? একের পর এক চলচ্চিত্রের খল চরিত্রে মদ্যপান যাঁর কাছে জলপানের চেয়েও স্বাভাবিক লেগেছে, ব্যক্তিজীবনে সেই বিকাশ রায় নেশা করবেন, এতে আশ্চর্য কী!

সত্যিই আশ্চর্য। কারণ কোনও দিন মদের গ্লাসে চুমুকটুকুও দেননি তিনি! বিকাশ রায়ের বিভিন্ন লেখার সংকলনগ্রন্থ প্রকাশের সূত্রে বইপাড়ার প্রকাশক বামাচরণ মুখোপাধ্যায় তাঁর খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। একবার বিকাশবাবুর কাছে তিনি জানতে চান, নিজে মদ না খেলে মদ্যপের নিখুঁত অনুভূতি বোঝা যায়? বিকাশবাবু হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘‘অভিনয় তো মনে। মদ কী করবে!’’ অভিনয়ের এই সাবলীলতাই বিকাশ রায়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ। চলচ্চিত্র জগতের মানুষজন তো বটেই, একেবারে সাধারণ দর্শকও তাঁর অভিনয় প্রতিভায় মজে থেকেছেন চিরকাল।

বিকাশ রায়ের পাকাপাকি ভাবে অভিনয়ে আসার আগের পথটি কিন্তু খুব মসৃণ ছিল না। চড়াই-উতরাই ছিল বিস্তর। সংসার প্রতিপালনের জন্য কঠিন লড়াই করতে হয়েছে তাঁকে। বিলেত ফেরত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট দাদার অকালমৃত্যু, বাবার চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরে পরিবারে নিদারুণ অর্থকষ্ট, তারই মধ্যে তাঁর বিয়ে। অন্নসংস্থানের জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি ছিল তাঁর। সকালে টিউশন দিয়ে শুরু হত দিন। তার পরে বাসভাড়া বাঁচাতে ভবানীপুর থেকে হেঁটে হাইকোর্ট পাড়া। ভাগ্যান্বেষণে এ দুয়ার, সে দুয়ার।

প্রেসিডেন্সি থেকে অনার্স নিয়ে বিএ পাশ করেছেন, আইন পাশ করেছেন। ওকালতি করতে গিয়েও সুবিধে হয়নি। বহু ঘাটে ঘুরতে ঘুরতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাজারে অল্প দিন মোটা বেতনে সিভিল ডিফেন্সে পাবলিসিটির চাকরিও করলেন। কাজ করলেন একটি এরোড্রম তৈরির অফিসেও। কিন্তু কোনওটিই তাঁর জীবনে স্থায়ী হল না। অনেক কম টাকায় যোগ দিলেন রেডিয়োর চাকরিতে। মাইক্রোফোনের আকর্ষণ তাঁকে টেনেছিল। নানা বাঁক ঘুরে সেখান থেকেই তিনি এক সময় পৌঁছলেন সিনেমার জগতে। 

১৯৪৭-এ মুক্তি পায় বিকাশ রায় অভিনীত প্রথম ছবি ‘অভিযাত্রী’। তাঁর রেডিও-জীবনের বন্ধু জ্যোতির্ময় রায় নিয়ে যান বিকাশবাবুকে। আশ্বাস ছিল, নায়ক হবেন। পেলেন চার নম্বর চরিত্র এবং বাংলা চলচ্চিত্র জগৎ পেয়ে গেল অভিনেতা বিকাশ রায়কে। পারিশ্রমিক হিসেবে পেয়েছিলেন পাঁচ হাজার টাকাও। প্রথম ছবির পরিচালক হেমেন গুপ্তের কাছেই বিকাশবাবুর দ্বিতীয় ছবি ‘ভুলি নাই’। সেই সঙ্গে পরিচালকের সহকারী হয়ে বুঝতে শুরু করলেন চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্ধিসন্ধি।

১৯৫১ সালে হেমেনবাবু তৈরি করেন ’৪২। ছবিটিতে নৃশংস অত্যাচারী মেজর ত্রিবেদীর ভূমিকায় অবিস্মরণীয় অভিনয় করেন বিকাশ রায়। দেশ তখন স্বাধীন হওয়ার আবেগে উত্তাল। পর্দায় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর মেজরের অত্যাচার দেখতে দেখতে মানুষ এতটাই খেপে উঠেছিল যে, রাস্তাঘাটে বিকাশ রায়কে দেখলে তাড়া করার ঘটনাও ঘটত। ছবির প্রিমিয়ারে তাঁকে দেখতে পেয়ে জুতো তুলে ছুটে এসেছিলেন অনেকে।

পুরোদস্তুর নায়ক তিনি ছিলেন না। নায়কোচিত দর্শনধারীও নন। কিন্তু চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে তিনি বারবার যে উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, তা ভোলার নয়। যখন খলচরিত্র করতেন, মনে হত এত ঘৃণ্য লোক আর হয় না। ’৪২ ছবিতে অত্যাচারী অফিসার মেজর ত্রিবেদীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় তো বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। আবার যখন ‘আরোগ্য নিকেতন’-এর জীবনমশাই হয়ে পর্দায় এসেছেন, ‘উত্তর ফাল্গুনী’-র মনীশ হয়েছেন, তখন সেই অভিনয় দেখে সম্ভ্রমে মুগ্ধ হয়েছেন দর্শকেরা। ‘ছেলে কার’ বা ‘ছদ্মবেশী’র মতো কিছু ছবি তাঁকে চিনিয়েছে কমেডি অভিনয়ে দক্ষতার মাপকাঠিতে।

প্রমথেশ বড়ুয়া ছিলেন তাঁর প্রিয় শিল্পী। অভিনয়ে আসার আগেই বড়ুয়া সাহেবের স্টাইল তাঁকে টানত। ফিল্মে পরিমিতি বোধের অনুভূতি তিনি বুঝতে শিখেছিলেন প্রমথেশ বড়ুয়ার ছবি দেখে। বিকাশ রায়ের কাটা কাটা সংলাপ বলার ভঙ্গিতেও অনেকে তাই বড়ুয়া-স্টাইল খুঁজে পান।

ছেলেকে ডাকতেন ‘বেণুবাবু’ বলে। ছেলেকে নিয়ে এক সান্ধ্য পাঠের আড্ডায় একদিন ঘটল মজার কাণ্ড। সে দিন শেক্সপিয়র-এর লেখা পড়া হবে। বিকাশ রায়ের বাড়ি ছিল বইয়ের গুদাম। বাড়ি জুড়ে শুধুই বই, বই, আর বই। কিন্তু সে দিন শেক্সপিয়র পড়তে গিয়ে দেখা গেল, রচনাসমগ্রটি বেপাত্তা! তন্ন তন্ন করে খুঁজে বোঝা গেল, কোনও বহিরাগত অতিথি হয়তো ‘নিজের’ ভেবে সেটি কোনও দিন হস্তগত করেছেন। ‘‘সে হোক। তা-বলে শিক্ষিতের বাড়িতে শেক্সপিয়র থাকবে না! রবীন্দ্রনাথ এবং শেক্সপিয়র যে বাড়িতে নেই, সে বাড়ি বাসের যোগ্যই নয়।’’ মেজাজ হারালেন বিকাশবাবু। অতএব ছেলেকে নিয়ে ছুটে গেলেন চৌরঙ্গির ফারপো হোটেলের কাছে। ফুটপাতের এক পরিচিত বই বিক্রেতা তখন ঝাঁপ ফেলে শোওয়ার আয়োজন করছেন। বই পাওয়া গেল তাঁর ভাণ্ডারে। স্বস্তি পেলেন বিকাশ রায়!

এখন যে শ্রুতিনাটকের চল, বিকাশবাবু তার অন্যতম সূচনাকার। তাঁর পরিচালনায় ‘শেষের কবিতা’ ছিল প্রথম মঞ্চস্থ। চিত্র পরিচালক হিসেবে বিকাশ রায়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’। আনুমানিক শ’আড়াই ছবিতে কাজ করেছেন তিনি। পরিচালনা করেছেন আটটি ছবি। এর মধ্যে পাঁচটি আবার নিজেরই প্রযোজনা।

ছবির কাজ যখন কমে এল, তখন বেশি বয়সে মঞ্চে গেলেন বিকাশ রায়। সে-ও অনেক সাধ্যসাধনার পরে। তরুণকুমার এবং সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় এক রকম জোর করে রাজি করালেন তাঁকে। প্রথম নাটক ‘চৌরঙ্গি’। তিনি স্যাটা বোস। চলচ্চিত্রের দৌলতে উত্তমকুমারের স্যাটা বোস তত দিনে বাজার মাত করেছে। সেই চরিত্রকে মঞ্চে ফোটাতে গোড়ায় খুব আপত্তি ছিল বিকাশবাবুর। বলেছিলেন, ‘‘উত্তমকে পর্দায় দেখার পরে আমাকে দর্শক নেবেই না।’’ উত্তম তা শুনে বলেছিলেন, ‘‘তুমি নিজেকে এত কম ভাবছ কেন? আমি জানি, তুমি নিজের মতো করে চরিত্র ফোটাবে। আমি দেখতে যাব।’’ বিকাশবাবু উত্তরে বলেন, ‘‘দর্শক আসনে তোকে দেখলে আরও নার্ভাস হয়ে যাব রে!’’ উত্তমকুমার গিয়েছিলেন। না জানিয়ে অন্ধকারে হলে ঢুকে বসে পড়েছিলেন। পরে গ্রিনরুমে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন তাঁর বিকাশদাকে। ৫০০ রাত্রি্রও বেশি চলেছিল ‘চৌরঙ্গী’। বিশ্বরূপা থিয়েটারে তাঁর অভিনীত পরের নাটক ‘আসামী হাজির’ও দীর্ঘদিন চলেছিল। পরের নাটক ‘নহবত’ চলেছিল একহাজার রাত্রিরও বেশি।

কাজের জগতের বাইরে বিকাশ রায় ছিলেন একেবারেই পারিবারিক। স্বামী, বাবা, গৃহকর্তা ঠিক যেমনটি হন। তাঁর ছেলের কাছে শোনা, ওঁদের বাড়িতে ফিল্ম নিয়ে আলোচনা কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৬৪ থেকে ছেলে বিদেশে। কাজ না থাকলে তাঁর একমাত্র বিনোদন ছিল বই এবং গান শোনা। সিগারেট খেতেন। বিদেশি গাড়ির শৌখিনতা ছিল। আর হয়তো বংশের ধারায় কোঁচানো ধুতি, গিলে করা পাঞ্জাবি পরতে পছন্দ করতেন। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনচর্যায় অন্য কোনও উচ্ছ্বলতাকে প্রশ্রয় দেননি।

হাঁপানির প্রকোপে গলার স্বর যখন ভেঙে গেল, তখন নিজেই সিদ্ধান্ত নিলেন— আর নয়। এ বার সরে দাঁড়াতে হবে। স্ত্রীকে বলেছিলেন, ‘‘যা দিতে চাই, তা দিতে পারব না। মানুষ যা চাইবে, পাবে না। এই অবস্থায় কাজ করলে দর্শকের সঙ্গে প্রবঞ্চনা করা হবে। সেটা সইবে না।’’

ছেলে চেয়েছিলেন, বাবা-মা তাঁর কাছে আমেরিকায় গিয়ে থাকুন। যাননি। নিজের শহর, চেনা পরিমণ্ডল তাঁকে পিছু টেনে ধরেছে। শেষ জীবনে তাঁর ৪৩১, যোধপুর পার্কের ভাড়াবাড়ির রাস্তার দিকের বারান্দায় আরামকেদারায় বসে চলমান জীবন দেখতেন। বই পড়তেন, অথবা আত্মমগ্ন হয়ে ভাবতেন।

শেষজীবনে প্রিয়তমা কন্যা নন্দিনীকে মারণরোগ ক্যানসার ছিনিয়ে নেয়। মেয়ের অকালবিয়োগে তিনি খুবই ভেঙে পড়েন এবং মেয়ের মৃত্যুর এক বছর পর ১৬ এপ্রিল, ১৯৮৭ সালে ৭১ বছর বয়সে এই প্রতিভাশালী অভিনেতার জীবনাবসান হয়। বাংলা অভিনয় জগতে এক মহীরুহের পতন হয়।

বড় আক্ষেপের কথা, জীবিত অবস্থায় এই প্রতিভাবান শিল্পী উপযুক্ত কোনও সরকারি স্বীকৃতি বা পুরস্কার পাননি। এক বার উল্টোরথ নামে এক সিনেমার পত্রিকা বিকাশ রায়কে বিশেষ সম্মানে সম্মানিত করেছিল। এ প্রজন্মের কাছে বিস্মৃতপ্রায় অভিনেতা বিকাশ রায়ের প্রতি আমরা সত্যিই উদাসীন, নিস্পৃহ।

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

1 মন্তব্যসমূহ

  1. তারিণী খুড়োর অনবদ্য সবিস্তার খুটিনাটি বর্ণনায় মুগ্ধ হোতে হয়। সংকলনের ক্যারিসমা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। উদগ্রীব হয়ে থাকি তাড়িণী খুড়োর লেখা পড়ার জন্য।

    উত্তরমুছুন
নবীনতর পূর্বতন