“এই জীবনটা আসলে কেবল দু'বেলা উদরপূর্তির আশায় উপার্জনের জন্য নয়, বরং তার চাইতে আরো বেশি কিছু”; এরকমভাবে যিনি জীবনটাকে দেখতে পারেন, তিনি যে খুব সাধারণ মানুষ নন, তা বলাই বাহুল্য। এরকম জীবন দর্শন যাঁর, সেই রামকিঙ্কর বেইজের জন্মদিনে আর একটু ভালো করে চিনে নেওয়া যাক আধুনিক ভারতীয় ভাস্কর্যের অন্যতম পথপ্রদর্শক এই শিল্পীকে।

রামকিঙ্কর বেইজ - আধুনিক ভাস্কর্যের পথপ্রদর্শক
তাঁর জন্মসাল আর জন্মতারিখ নিয়ে
ব্যাপক বিভ্রান্তি আছে। অনেকে দাবি করেন ২৬-শে মে-র বদলে ২৫-শে মে তাঁর জন্মদিন।
১৯০৬ না ১৯১০, কোনটি তাঁর জন্মসাল, সে নিয়েও ধোঁয়াশা আছে যথেষ্ট। ২৫ না ২৬ –শে মে, তা নিয়ে
বিতর্ক আর গবেষণায় না গিয়ে বরং শিল্পীর বৃহৎ জীবনের গল্পটার দিকে চোখ রাখা যাক।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাঁকুড়া জেলার এক গণ্ডগ্রাম যোগী পাড়ায় তাঁর জন্ম। রামকিঙ্কর বেইজের পিতা চণ্ডীচরণ প্রামানিক ছিলেন একজন নাপিত, আর মাতা সম্পূর্ণা প্রামানিক ছিলেন একজন সাধারণ গ্রাম্য মহিলা। পরবর্তীকালে রামকিঙ্কর নিজেই তাঁর পদবী পরিবর্তন করে বেইজ রেখেছিলেন। চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ডানপিটে আর পাগলাটে স্বভাবের রামকিঙ্কর ছোটবেলায় কুমোড়দের পাড়ায় ঘুরে ঘুরে মূর্তি বানানো দেখে নিজেই কাদামাটি দিয়ে খেলার ছলে মূর্তি গড়তেন।
দারিদ্র্য সম্বল করে জন্মানো রামকিঙ্কর সেভাবে লেখাপড়ার সুযোগই পাননি কোনোদিন। বাড়ির পাশের অনন্ত কাকাই হয়ে উঠেছিলেন তাঁর শিল্পগুরু। অনন্ত সূত্রধর প্রতিমা গড়ার কাজ করতেন। সে কাজে সাহায্য করতেন কিশোর রামকিঙ্কর। কিশোর বয়সেই মূর্তি গড়ার পাশাপাশি ছবি আঁকার দিকেও ঝোঁকেন রামকিঙ্কর। কিন্তু ছবি আঁকতে যে সরঞ্জামের প্রয়োজন পড়ে, ক্ষৌরকর্ম করে সংসার চালানো পিতার সামর্থ্য ছিল না সে যোগান দেবার। কিন্তু তা বলে শিল্পীর শিল্পক্ষুধা থেমে যায়নি। সবুজ রঙের জন্য শিম গাছের পাতার রস, হলুদ রঙের বাটনা বাটা শিলের হলুদ, মেয়েদের পায়ের আলতা, মুড়ি ভাজার ভুষোকালি আর পুঁইশাক থেকে বেগুনি রঙ বের করে ছবি আঁকার সরঞ্জামের ব্যবস্থা নিজেই করে নিতেন রামকিঙ্কর। ছাগলের ঘাড়ের লোম কেটে বাঁশের কাঠির ডগায় বেঁধে নিয়ে চলত তুলির কাজ। এর সঙ্গে চলত মূর্তি গড়ার কাজ, যা তাঁকে ধীরে ধীরে ভাস্কর্যশিল্পের প্রতি আরো বেশি করে আগ্রহী করে তোলে।
পরাধীন দেশে স্বদেশী বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ ও আত্মবলিদানের ঘটনা বালক রামকিঙ্করের অন্তরাত্মাকে আন্দোলিত করে। শিল্পীর অস্ত্র রং-তুলি দিয়েই ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুললেন আন্দোলনের না-বলা আর অদেখা মুহূর্তগুলো, রং চাপিয়ে ক্যানভাসে দিলেন আন্দোলনের অভিব্যক্তি; পোর্ট্রেট করলেন বহু বিপ্লবীর। নজর পড়ল বিশিষ্ট সাংবাদিক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের, যিনি ছিলেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকা ‘মডার্ন রিভিউ’-এর সম্পাদক। পাকা জহুরির চিনে নিতে ভুল হয়নি নবীন প্রতিভাকে। তাই রামানন্দ একদিন যুগী পাড়া থেকে রামকিঙ্করকে এনে হাজির করলেন রবীন্দ্রনাথের কাছে শান্তিনিকেতনে।
১৯ বছরের রামকিঙ্কর ১৯২৫ সালে শান্তিনিকেতনে এসে ভর্তি হলেন বিশ্বভারতীর কলাভবনে। শান্তিনিকেতনে পা রেখেই বুঝতে পারলেন, এতদিন এই রসায়নের সন্ধানেই যেন ছিল তাঁর অন্তরাত্মা। নন্দলাল বসু এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়ার সাথে সাথেই কবিগুরুর বিশেষ স্নেহধন্য হয়ে উঠেছিলেন।
পাঁচ বছরের অধ্যয়নপর্ব শেষ করে, ১৯৩০ সালে রামকিঙ্কর কলাভবনে যোগ দেন খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে; ১৯৩৪ সালে পেলেন স্থায়ী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ। পরবর্তী কালে তিনি ভাস্কর্য বিভাগের প্রধানও হয়েছিলেন। আমৃত্যু ছিলেন শান্তিনিকেতনে। শান্তিনিকেতনের অদ্বিতীয় পরিবেশ রামকিঙ্করকে শুধু একজন বিশিষ্ট ভাস্করই নয়— চিত্রকর, নাট্যকার ও গায়ক হতেও সাহায্য করেছিল।
গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁকে সব সময় উৎসাহিত করেছেন, দিয়েছেন অপার স্বাধীনতা। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বলতেন, শান্তিনিকেতন আশ্রমের সর্বত্র যেন তাঁর দৃষ্টির ছোঁয়ার প্রতিফলন ঘটে তাঁর শিল্পকর্মে। মূর্তিতে মূর্তিতে ভরে দিতে বলেছিলেন আশ্রম প্রাঙ্গণ। রামকিঙ্কর তা করেওছিলেন। তাঁর হাতে গড়া গৌতম বুদ্ধ, সাঁওতাল পরিবার, মহাত্মা গাঁধী, রবীন্দ্রনাথ, সুজাতা... এ রকম অজস্র শিল্পকর্ম ছড়িয়ে রয়েছে শান্তিনিকেতন জুড়ে! শিক্ষাগুরু নন্দলাল বসুও শিল্পসাধনায় নিজস্ব ভাবনাকেই প্রাধান্য দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে গিয়েছেন রামকিঙ্করকে।
শান্তিনিকেতনে যখন কাজ জুটে গেল, রামকিঙ্করের বেতন ছিল মাত্র পঞ্চাশ টাকা। বাবা-মা এবং পরিবারের লোকেদের চাপে বেজায় চটে গিয়ে বিবাহপ্রসঙ্গের ইতি টানেন। পরবর্তী কালে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, “দেখো বিয়ে করব, সংসার করব- এমন ইচ্ছে আমার কোনোকালেই ছিল না। আমার কেবল একটাই লক্ষ্য ছিল, সকল ধরনের ঝক্কি-ঝামেলাকে দূরে ঠেলে দিয়ে কেবল আর্টওয়ার্কের মধ্যে ডুবে থাকব; ব্যস আর কিছু চাই না আমার। আর্টওয়ার্ক এতটাও সোজা নয়, যতটা তোমরা ভাবো। বিয়ে করার সুখ বলতে যা বোঝাও তোমরা, সেটা আমি আমার আর্টওয়ার্কের মধ্যেই পাই। হ্যাঁ, জীবনে অবশ্যই নারীর প্রয়োজন আছে। প্রকৃতির আসল লীলাই তো পুরুষ আর নারীর লীলা। জীবনে অনেক নারীই এসেছে; কেউ এসেছে দেহ নিয়ে, কেউবা মানসিক শান্তি নিয়ে। সবই হজম করেছি। কিছুই ছাড়িনি। এসবের মানেটা তোমরা ঠিক বুঝবে না।”
শিল্পী হিসেবে রামকিঙ্কর বেইজ যতটাই প্রাণবন্ত হোন না কেন, ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন তিনি বড়ই একলা আর নিঃসঙ্গ। কোনোদিন কোনো বাঁধনে জড়াননি তিনি। কাউকে নিজের করে চাননি কখনো, কিংবা আগলেও ধরে রাখেননি কখনো। কিন্তু শিল্পী রামকিঙ্করের জীবনের একজন নারীর নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত, সেটি হচ্ছে রাধারাণী দেবী। নয় বছর বয়সে বিয়ে হওয়া রাধারাণী সাংসারিক জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে সব ছেড়েছুড়ে রবীন্দ্রনাথের ছোট মেয়ে মীরাদেবীর বাসায় কাজ জুটিয়ে নেন। তবে মীরাদেবী রাধারাণীকে কেবল কাজের লোক হিসেবে মেনে নেননি, পরিবারের একজনই ভাবতেন। সে বাড়িতেই একদিন দেখা হয়ে যায় রামকিঙ্করের সঙ্গে। ততদিনে রবিঠাকুর গত হয়েছেন। রামকিঙ্করের কথা চিন্তা করে রাধারাণীকে তাঁর সঙ্গে যেতে দেন মীরাদেবী। রাধারাণী এসেছিলেন রামকিঙ্করের সংসার সামলাতে, কিন্তু সে সংসার সামলানোর ফাঁকে জড়িয়ে গেলেন তাঁর শিল্পকর্মের সঙ্গে, হয়ে উঠেছিলেন রামকিঙ্করের নিঃসঙ্গ আর একাকী জীবনের একমাত্র ভরসা। তাঁদের দু'জনকে নিয়ে শান্তিনিকেতনের কর্তৃপক্ষেরও ব্যাপক আপত্তি ছিল। কিন্তু রামকিঙ্কর বেইজ অনড় ছিলেন নিজের সিদ্ধান্তে। রামকিঙ্করের জীবনের উত্থান-পতনের সাক্ষী হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন ভাস্কর্য রচনার প্রেরণাও।
নিজের চোখে দেখা একদম সাধারণ আর নিত্যদিনকার জীবনটাকেই পাশ্চাত্যের ধাঁচে মিশিয়ে ভাস্কর্য গড়ার ওস্তাদ রামকিঙ্কর ছিলেন আলোর অভিলাষী এক ভাস্কর। তাঁর সবগুলো ভাস্কর্যই খোলা আর উন্মুক্ত স্থানে। রামকিঙ্কর বেইজের কাজের ধরন একদমই স্বতন্ত্র এবং তাতে ঐতিহ্যের প্রতিফলন পাওয়া যেত।
রামকিঙ্কর চিত্রকর্মগুলোও বেশ প্রাণবন্ত আর একদমই স্বতন্ত্র ধারার। শান্তিনিকেতনে তিনিই প্রথম তেলরঙের চিত্রকর্মের কাজ শুরু করেছিলেন। এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা আর বিতর্কেরও শেষ ছিল না। প্রথম প্রথম তো তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক নন্দলাল বসুও আপত্তি করেছিলেন। পরে ছাত্রের কাজের ধরন দেখে তাঁর আপত্তি 'নেই' হয়ে যায়।
১৯৭০ সালে ভারত রাজ্য সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় খেতাব পদ্মভূষণে ভূষিত করে। আকাদেমির ফেলো হন ১৯৭৬ সালে। ১৯৭৭ সালে রবীন্দ্রভারতী তাঁকে দেয় দেশিকোত্তম সম্মাননা। আর ১৯৭৯ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সম্মানজনক ডি.লিট সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।
শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই জীবনের শেষ দিনগুলোতেও শান্তিনিকেতনের ঘরেই পড়ে ছিলেন তিনি। ছাদের চাল কিংবা শণ কেনার সামর্থ্য ছিল না আর, তাই নিজের বড় ক্যানভাসগুলোকে ছাদ বানাতেন। তা-ও কারো কাছে সাহায্য পর্যন্ত চাননি। পরবর্তীতে তাঁরই অনেক ছাত্র-ছাত্রী এবং তৎকালীন রাজ্য সরকার তাঁর চিকিৎসার সুব্যবস্থা করে, তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় কলকাতায়। ১৯৮০ সালের আগস্টের ২ তারিখ তিনি মারা যান। শোনা যায়, হাসপাতালের দিনগুলোতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়িয়ে চিত্রকর্ম তৈরি করার চেষ্টা করতেন।
ভাস্কর্য আর চিত্রশিল্প রচনার পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজের জীবনের চাইতেও বড় একটা জীবন জীবদ্দশায় অতিবাহিত করেছিলেন তিনি। সঙ্গীতেও যথেষ্ট পারদর্শী ছিলেন রামকিঙ্কর। দরাজ গলায় গেয়ে ওঠা তাঁর গানে প্রায় প্রতিদিনই শান্তিনিকেতনে সন্ধ্যার আসর জমত। রবীন্দ্রনাথের মঞ্চস্থ নাটকে অভিনয়ও করেছেন তিনি। আর তাই হয়তো তাঁকে 'লার্জার দ্যান লাইফ' বলতেও দ্বিধা করেননি গুণীজনেরা এবং তাঁকে ভূষিত করেছেন ভারতের আধুনিক ধারার শিল্পকর্মের জনক বলে।
(সংকলনেঃ তারিণী খুড়ো)