সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও নারীবাদী আন্দোলনের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থেকেও কবিতার মহাবিশ্বে এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক মল্লিকা সেনগুপ্ত। ব্রাত্য নারী চরিত্রদের নিজের লেখার মধ্যে দিয়ে পুনর্জীবিত করা ৫১ বছর বয়সী এই কবিকে তাঁর একাদশতম প্রয়াণ দিবসে জানাই অসীম শ্রদ্ধা এবং পাশাপাশি তাঁকে আরও একটু ভালো করে চিনে নেওয়ার প্রয়াস করি।
![]() |
| মল্লিকা সেনগুপ্ত |
মল্লিকা সেনগুপ্তর জন্ম ২৭ মার্চের ১৯৬০ সালে ভারতের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগর শহরে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলার ছাত্রী ছিলেন মল্লিকা। মল্লিকা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিদ্যা নিয়ে এমএ এবং পিএইচডি করেছেন। পরবর্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত মহারানী কাশিশ্বরী কলেজের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপিকা হিসেবে যোগ দেন।
১৯৮৩ সালে
মল্লিকা সেনগুপ্তের ‘চল্লিশ চাঁদের আয়ু’ শীর্ষক প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়। এই প্রথম বইটিতেই তাঁর কবিতাগুলোর
ভাবনা ছিল সামাজিক পটভূমিকায় নরনারীর সম্পর্ক। শব্দের অসম্ভব শক্তিময় সঞ্চারে
সেদিনই কবিতাপ্রেমী বাঙালি পাঠক আঁচ পেয়েছিলেন এক অনন্য কবির আগমনের।
এরপর ১৯৮৮
সালে প্রকাশিত হয় ‘আমি সিন্ধুর মেয়ে’। এই বইয়ে শুধু যে পিতৃতান্ত্রিক পরাক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এসেছে শুধু
তাই নয়, এসেছে নারীর নিজস্ব বয়ান। নারীর নিজস্ব অস্তিত্ব
বিষয়ক যাবতীয় স্বপ্ন-কল্পনা-যন্ত্রণা সবই সযত্নে গেঁথেছেন কবি।
১৯৯১ সালে
প্রকাশিত “হাঘরে ও দেবদাসী”,
১৯৯৩ সালে প্রকাশিত “অর্ধেক পৃথিবী”, ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত “মেয়েদের অ আ ক খ” ও “কথামানবী”, সহ ১১-টি কাব্যগ্রন্থে তিনি পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে তীব্র কুঠারাঘাত করেছেন।
নতুন
মল্লিকার দেখা মেলে যে বইটিতে সে বইটির নাম ‘অর্ধেক পৃথিবী’৷ ‘অর্ধেক পৃথিবী’তে মল্লিকা আর শুদ্ধ কবিতার বেড়ি
পরিয়ে তাঁর কবিতাকে পঙ্গু করে রাখেননি, স্পেডকে তিনি স্পেডই বলেছেন, বর্শাফলকের মতো তাঁর কাব্যভাষা ছিন্ন করেছে সাংকেতিক কুয়াশা, আলো ফেলেছে এমন কিছু কিছু বিষয়ের উপর,
যে বিষয়গুলি মল্লিকার
আগে আর অন্য কোনও কবির কলমে ঠাঁই পায়নি৷
তাঁর
সচেতন মন-মানসিকতা সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-ঐতিহাসিক-পৌরাণিক নানা কাঠামোতে
পুরুষতন্ত্রের পীড়নের ছবি আবিষ্কার করেছে। এই সমাজ ব্যবস্থাতেই নারী তাঁর শরীর
ঢেকেছে যে কাপড়ে, সেই কাপড়ই টেনে নিয়ে বেআব্রু
করেছে সমাজ। ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এই লাঞ্ছনার কথা উল্লেখ করেছেন কবি তাঁর ‘আম্রপালী’ কবিতায়।
কিন্ত্ত
এতখানি স্পষ্ট ভাষায় কবিতা লিখলেন কেন মল্লিকা?
মল্লিকার
কবিতাগ্রন্থগুলির ধারাবাহিক পাঠ থেকে এটা বেশ বোঝা যায় যে দিন যত গিয়েছে কবি ততই
চেয়েছেন লড়াইয়ের ময়দানে তাঁর কবিতা কেবল একটি মেয়ের বন্ধুই নয়, হয়ে উঠুক তার হাতিয়ারও, আর কে না জানে হাতিয়ার যতই
ধারালো, ততই কার্যকরী! একথা মানতেই হবে যে আজকের তরুণী
কবিরা যে ভাষায় কবিতা রচনা করেন সেই ভাষাটির নির্মাণে মল্লিকা সেনগুপ্তর ভূমিকা
খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সিলেবাসের
বাইরের বইয়ের বিপুল জগৎ টানতো তাঁকে। বইকে লতার মতো জড়িয়ে ধরে থাকা মল্লিকা
আচমকা কোথা থেকে পেলেন কবিতা লিখে যাওয়ার এই তাগিদ?
২০০৪ সাল নাগাদ দেশ
থেকে প্রকাশিত “শ্রেষ্ঠ কবিতা”-র ভূমিকা সে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেছেন কবি নিজেই। অতিসংক্ষিপ্ত সেই ভূমিকা
অংশে কবি লিখেছিলেন, “একটি মেয়ে খানাখন্দ গ্রামপথে
লন্ঠন হাতে নিয়ে বয়স্ক ইস্কুলে অ আ ক খ শিখতে চলেছে পালিয়ে যাওয়া বর-কে চিঠি
লিখবে বলে। এক মহীয়সী বছরের পর নর্মদার তীরে দাঁড়িয়ে মহাবাঁধ প্রকল্পে উৎখাত হতে
থাকা মানুষদের জন্য লড়াই করছে। একজন মহাকাব্যের নায়িকা আড়াই হাজার বছর আগে
দণ্ডকারণ্যের মাটিতে দাঁড়িয়ে নিরস্ত্রীকরণের কথা বলেছিল। এরাই আমাকে কবিতা লিখতে
শিখিয়েছে; আমার কবিতা ভুলে যাওয়া,
উপেক্ষিত, ইতিহাস বিলুপ্ত এইসব মেয়েদের সুখ-দুঃখ আশা-আকাঙ্ক্ষা বিশ্বাসভঙ্গ নিগ্রহ
যন্ত্রণার অভিব্যক্তি”।
দুটি
উপন্যাস এবং বিভিন্ন প্রবন্ধও লিখেছেন মল্লিকা। ৯০ এর দশকে তিনি অপর্ণা সেন
সম্পাদিত 'সানন্দা'
পত্রিকার কবিতা
বিভাগের সম্পাদনা করতেন। স্বামী সুবোধ সরকারের সাথে তিনি 'ভাষানগর' নামক একটি সাংস্কৃতিক পত্রিকা
সম্পাদনা করতেন।
নিজ
লেখনীর গুণে আন্তর্জাতিক স্তরেও প্রতিষ্ঠা পাওয়া মল্লিকা সেনগুপ্তর লেখা ইতিমধ্যেই
বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার তাঁকে সুকান্ত পুরস্কার, বাংলা একাদেমি এ্যাওয়ার্ড এবং ফেলোশিপ ফর লিটারেচার দিয়ে সম্মানিত করেছেন।
মল্লিকার
অন্যতম এবং বহুল আলোচিত উপন্যাস “সীতায়ন” থেকে একটি অনুচ্ছেদঃ “কতটা তোমার জন্য দুঃখ হয়, জানকী। যে তুমি, বিবাহোত্তর স্বেচ্ছায় যাবতীয়
রাজসুখ ত্যাগ করে রামচন্দ্রের অনুগামিনী হয়েও লঙ্কা থেকে ফিরে আলিঙ্গনের পরিবর্তে ‘পুরস্কৃত’ হলে অগ্নিপরীক্ষায়, যে তুমি গর্ভবতী অবস্থায় নির্বাসিত হলে বাল্মীকির আশ্রমে, যে তুমি নৈমিষ অরণ্যে বারো বছর কালাতিপাত করে,
শীর্ণ দেহে আবার, আবারও সতীত্বের পরীক্ষার জন্য আদেশপ্রাপ্ত হলে দুই কিশোরপুত্রের উপস্থিতিতে, সেই তোমার জন্য কষ্ট হয়, হে আলোকসামান্যা নারী।
২০০৫ সালে
তাঁর প্রথম ক্যান্সার ধরা পড়ে। এরপর চিকিৎসা করে প্রায় সাড়ে ৪ বছর সুস্থতার সঙ্গেই
কাজ করে গেছেন। শেষের ২ বছর ধরে তিনি অসুস্থ ছিলেন। তাঁর স্তন ক্যানসার হয়েছিল। এর
জন্য তিনি অস্ত্রোপচারও করিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ক্যানসার ফুসফুসে সংক্রমিত হয়।
শেষের
দিকে বেশ কিছুদিন তিনি কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ১৭-ই মে
২০১১ সালে মল্লিকা হাসপাতাল থেকে নিজের সিরিটি হাউজিংয়ের অ্যাপার্টমেন্টে চলে
আসেন। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল জীবনের শেষ কটি দিন নিজের ঘরে কাটাবেন। সেই ইচ্ছাই তার
পূরণ হল। নিজের ঘরে ২৮-শে মে ভোর রাতের দিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
মল্লিকা ঝরে গিয়েছে অকালে। তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে নারীদের সর্বাঙ্গীন স্বাধীনতার যে বীজ বপন করেছেন, তা তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। সমসাময়িক কবি সংযুক্তা দাসগুপ্তের ভাষায় "তাঁর কবিতায় নারীস্বত্বা কেবলমাত্র অন্তর্ভূতি সচেতনতা হিসেবেই থেকে যায় না, সেটা প্রস্ফুটিত হয় সমস্ত প্রান্তিক নারীর নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক স্বতস্ফুর্ত প্রতিবাদ হয়ে।"
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)
