কাজী নজরুল ইসলাম এমনি একটি নাম যেটি আপামর বাঙালির
জীবনচর্যায় প্রবেশ করে একদম ছোটবেলায় আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকে তার
ব্যাপ্তি। আজ (২৪-শে মে) নজরুলের জন্মদিন। তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে এত লেখালিখি হয়েছে
যে নতুন করে সে পথে না হেঁটে তাঁর জীবনের খুব কম জানা বা বলা ভালো - কম আলোকপাত
হওয়া কিছু দিক ও ঘটনাসমূহের তুলে ধরার মধ্যে দিয়ে কবি নজরুলকে শ্রদ্ধা জানাবো
আমরা।
![]() |
| শেষ বয়সের নজরুল |
০২) যদিও নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই, কিন্তু মোটামুটি সব জীবনীকারেরাই অনুমানের ভিত্তিতেই বলেছেন জাহেদা খাতুনের গর্ভে নজরুল সহ তিন পুত্র আর এক কন্যার জন্ম হয়েছিল, প্রথম তিন সন্তানের অকাল মৃত্যুর পরে নজরুলের জন্ম হয় বলে শিশুকালেই তাঁর নাম রাখা হয় ‘দুখু মিয়া’।
০৩) নজরুলের মায়ের দ্বিতীয় বিয়ে হয় তার স্বামীর চাচাতো ভাই বজলে করীমের সঙ্গে। এটা ঠিক কবে জানা যায় না।
০৪) সিয়ারশোল রাজ হাইস্কুলের শিক্ষক এবং যুগান্তর দলের গোপন বিপ্লবী নিবারণ চন্দ্র ঘটক কিশোর নজরুলের মধ্যে স্বাধীনতা এবং বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার সঞ্চার করেছিলেন। বিপ্লবের সাথে যোগাযোগ আছে সন্দেহে ছাত্র নজরুলের মাসিক ৫ টাকা হারে দেওয়া ছাত্রবৃত্তি কেড়ে নেওয়া হয়, যদিও পরে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বৃত্তি পুনরায় অব্যাহত রাখা হয়।
০৫) করাচি সেনা নিবাসে কঠোর শৃংখলার মধ্যেও তরুণ নজরুলের সংগীত অনুরাগী মন শুকিয়ে যায়নি, বরং অদম্য আগ্রহে পথ খুঁজে নিয়েছিল। প্রাণবন্ত হৈ-হুল্লোড়ে আসর জমাতেন বলে সেনানিবাসে তিনি “হৈ হৈ কাজী” নামে পরিচিত ছিলেন।
০৬) ৪৯ নং বাঙালি পল্টন ভেঙ্গে দেওয়া হলে নজরুল কলকাতায়
এসে তিনি একটি মেসে ওঠেন। কিন্তু তিনি যে মুসলমান একথা জানতে পেরে মেসের পরিচারক
তাঁর এঁটো বাসন ধুতে আপত্তি জানায়। এমতাবস্থায় দুইদিনের মাথায় তিনি মেস ছাড়তে
বাধ্য হন এবং ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’র
অফিসের একটি কক্ষে মুজফফর আহমেদের সাথে থাকা শুরু করেন, যিনি
নজরুলের পরবর্তী ব্যক্তি জীবনে উল্লেখ্যযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। এই একই জায়গায়
নজরুল আসার আগে থাকতেন বাংলা ভাষার আরেকজন প্রবাদপুরুষ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।
০৭) বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিসে থাকার সময় তিনি একবার চুরুলিয়া গিয়েছিলেন। দিন কয়েক থেকে ফিরে এসেছিলেন। তারপর থেকে আর কোনোদিন চুরুলিয়া যান নি। মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি। এমনকি মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়েও যাননি।
০৮) ১৯২৪ সালে প্রমীলা সেনগুপ্তের সাথে যখন নজরুলের বিয়ে হয় কলকাতায়, তখন প্রমীলার বয়স ১৮ না হওয়ায় এবং নজরুল প্রমীলার ধর্ম পরিবর্তনে রাজী না থাকায় ‘আহলুল কিতাব’ মতে তাঁদের বিয়ে হয়। কনের মা ছাড়া কনে পক্ষের আর কেউই বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন না। নজরুলেরও হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধুই উপস্থিত ছিলেন সেখানে। দুই ধর্মের মানুষজন গোলযোগ করতে পারে এই আশঙ্কায় নতুন দম্পতিকে কলকাতা ছেড়ে হুগলি আসতে হয়, কিন্তু মুসলমান যুবক হিন্দু মেয়েকে বিয়ে করায় সেখানে কোনো হিন্দু বাড়িওয়ালা তাঁদের বাড়ি ভাড়া দিতে চায়নি।
০৯) প্রমীলা-নজরুলের সেই বিবাহিত জীবনের চলার পথ সহজ ছিলো না, কিন্তু তাঁদের পারস্পারিক ভালোবাসা আর বোঝাপড়ার অভাব ঘটেনি কখনো। কবি যখন ধীরে ধীরে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করে ক্রমশ স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলতে লাগলেন এবং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মেজাজ করতেন, রখন নিজে প্যারালাইসিস-এ আক্রান্ত হয়ে সম্পুর্ণ বিছানাগত থাকা সত্বেও কবিপত্নী প্রমীলা মাঝে মাঝেই কবিকে নিজের পাশে বসিয়ে খাইয়ে দিতেন।
১০) এই সময়ে উমা নামের একটি অল্প বয়সী মেয়ে সব সময় কবি ও কবিপত্নীকে দেখাশোনা করতেন, এই উমাকেই পরে কবির বড়ো ছেলে কাজী সব্যসাচী বিয়ে করেন।
১১) একবার কবি কাজী নজরুল ইসলাম পল্লীকবি জসীমুদ্দীনের বাড়ি বেড়াতে গেলেন। নজরুল চা পান করার আগ্রহ প্রকাশ করলে পল্লীকবি বাজার থেকে চা পাতা এনে বাড়ির বউ-ঝিকে বানানোর জন্য দেন। বউ-ঝিরা এর আগে চা বানাননি। তাঁরা বাড়িতে যত রকম মসলা ছিল (আদা, মরিচ, পেঁয়াজ, ধনে, জিরা ইত্যাদি) সবকিছু দিয়ে জম্পেশ এক কাপ চা খাওয়ালেন নজরুলকে।
১২) আলী আকবর একদিন নজরুল ইসলামকে একটি পাণ্ডুলিপি দেখিয়ে মতামত চাইলেন। পুরো পাণ্ডুলিপিটি পড়ে নজরুল বললেন, ‘আপনার পাণ্ডুলিপির ছড়াগুলো ছোটদের উপযোগী হয়নি। যদি বলেন তো আমি একটা ছড়া লিখে দিতে পারি।’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি অনুরোধ করলেন একটি ছড়া লিখে দেওয়ার জন্য। নজরুল ইসলামও দু’খিলি পান মুখে পুরে লিখলেন ‘লিচু চোর’ ছড়াটি।
১৩) কাজী নজরুল আসাদউদ্দৌলা সিরাজীর ঘরে খেতে বসেছেন। আসাদউদ্দৌলা নিজেই ইলিশ ভাজা দিচ্ছেন সবার পাতে। পাতে ইলিশ পড়া মাত্র নজরুল সেটা খেয়ে ফেললেন। তখন কে যেন আরও কয়েক টুকরো ইলিশ দিতে যাচ্ছিলেন কবির পাতে। কবি তাকে বাধা দিয়ে বললেন, ‘আরে করছ কী?’ তিনি বললেন, ‘ইলিশভাজা দিচ্ছি!’ কবি বললেন, ‘আমাকে এত ইলিশ দিও না। শেষকালে বিড়াল কামড়াবে তো?’ সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন কবির মুখের দিকে। হঠাৎ হাসতে হাসতে কবি বললেন, ‘ইলিশ মাছের গন্ধ মুখে লালা ঝরায়। বিড়াল মাতাল হয়ে যায় এর ঘ্রাণে। বেশি খেলে কি আর রক্ষে আছে? সারা দেহ থেকে গন্ধ ছুটবে আর সে গন্ধ পেয়ে বিড়াল তেড়ে আসবে।’
১৪) নজরুলের পাঁচটি গ্রন্থ (যুগবাণী, বিষের বাঁশী, ভাঙার গান, প্রলয় শিখা ও চন্দ্রবিন্দু) বাজেয়াপ্ত হয় এবং আর পাঁচটি গ্রন্থ (অগ্নিবীণা, সঞ্চিতা, ফণীমনসা, সর্বহারা ও রুদ্রমঙ্গল) নিষিদ্ধ হওয়ার প্রক্রিয়াধীন ছিল, কিন্তু বাজেয়াপ্ত হয়নি।
১৫) বাক্-শক্তিহীন অসুস্থ কবি নজরুল ইসলামের কাছে সর্বক্ষণ থাকা ও দেখভাল করার কাজে নিযুক্ত হয়েছিলেন দুলাল শেখ। তখন তিনি বেশ ছোট। নলহাটি থানার কয়থা গ্রামের এই লেখাপড়া না-জানা ছেলেটিকে কবিপুত্র কাজী সব্যসাচী তাঁর অসুস্থ পিতার পরিচর্যায়, স্ত্রী উমা কাজীকে সাহায্য করার জন্যই নিযুক্ত করেছিলেন। সেই দুলালই কবির শেষ জীবনের বেশ কয়েকটি বছর সর্বক্ষণের সেবক-সঙ্গী হিসাবে জীবন কাটিয়েছিলেন কবির সঙ্গে।
১৬) আমরা জানি, কাজী নজরুল ৭৬ বছর বেঁচে ছিলেন; কিন্তু ৩৪ বছর ১ মাস ২০ দিন নির্বাক ছিলেন। যদি এই দীর্ঘ সময় তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারতেন তাহলে তিনি বাংলা সাহিত্যকে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতেন।
১৭) কাজী নজরুল ইসলামের লেখা সর্বশেষ কবিতা গ্রন্থের নাম ‘নতুন চাঁদ’। সুস্থাবস্থায় প্রকাশিত সর্বশেষ কাব্যের নাম ‘নির্ঝর’। ১৯৩৯ সালের জানুয়ারিতে এটি প্রকাশিত হয়। কাজী নজরুল ইসলাম রচিত কবিতার সংখ্যা ৯০০।
১৮) ১৯২৮ সালের মার্চ মাসে আর্থিক শর্তে নজরুর গ্রামোফোন কোম্পানি ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’-এর সাথে যুক্ত হন। এইচএমভি-তে নজরুল সংগীতের প্রথম রেকর্ড করা শিল্পীর নাম শ্রী হরেন্দ্রনাথ দত্ত। রেকর্ড করা নজরুল ইসলামের প্রথম গানটি হলো ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত জালিয়াতি খেলছ জুয়া’। এইচএমভি থেকে রেকর্ড করা নজরুল ইসলামের প্রথম ইসলামি গানটি হলো- ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে’ : শিল্পী আব্বাস উদ্দিন আহমদ গানটি রেকর্ড করেন। গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত প্রায় ২ হাজার গানের রেকর্ড বেরিয়েছিল।
১৯) কাজী নজরুলই ঢাকা বেতার কেন্দ্রের নামকরণ করেছিলেন ‘ঢাকা ধ্বনি বিস্তার কেন্দ্র’।
২০) কবি নজরুল রচিত, চল চল চল! / ঊর্দ্ধ গগনে বাজে মাদল / নিম্নে উতলা ধরণি তল, / অরুণ প্রাতের তরুণ দল – গানটি বাংলাদেশের ‘রণ সঙ্গীত’ হিসেবে স্বীকৃত।
২১) ১৯৩১ সালে ছয় সিলিন্ডারবিশিষ্ট একটি ক্রাইসলার মোটরগাড়ি ক্রয় করেন। গাড়িতে চড়ার শখ কবির বরাবরই ছিল। আর্থিক অবস্থা একটু ভালো হতেই সেই শখ কবি পূরণ করেন। কিন্তু তার এ অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। স্ত্রী প্রমীলা অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার চিকিৎসার জন্য গাড়ি এবং পূর্বে ক্রয় করা বালিগঞ্জের জমিটিও বিক্রি করে দিতে হয়।
২২) ভারতে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সংগীত ও কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতার বিখ্যাত ‘রেড ফ্ল্যাগ’ গানটির প্রথম অনুবাদকের গৌরব কাজী নজরুল ইসলামের।
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

নজরুল সম্পর্কে অজানা অনেক কিছু জানা গেল।
উত্তরমুছুনঅনেক অপঠিত পাঠ করলাম, ধন্যবাদ রাজেশ ভাই
উত্তরমুছুন