আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক নিকোলাস কোপার্নিকাস-এর আজ
প্রয়াণ দিবস। অন্ধকার ও অজ্ঞতা ভরা যুগে আলোর দিশারী এই মানুষটিকে শ্রদ্ধাবনত
চিত্তে স্মরণ করার পাশাপাশি আসুন জেনে নেওয়া যাক ওনার জীবন ও কাজের দিকটিকে।
![]() |
| জ্যোতির্বিজ্ঞানের জনক নিকোলাস কোপার্নিকাস |
স্কুল ছাড়ার পরে, ১৪৯১ খ্রিষ্টাব্দে ১৮-বছর বয়সী কোপার্নিকাস ক্রাকৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। গণিতশাস্ত্র ও আলোকবিজ্ঞান তাঁর অধ্যয়নের মূল বিষয় হলেও এখানে তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। কিন্তু তাঁর মামা চাইলেন আজীবন আর্থিক সচ্ছলতার জন্য ভাগ্নে ফ্রাউয়েনবার্গের গির্জায় যাজকের পদ গ্রহণ করুক। এরপরে ইতালির বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা, আইন ও ধর্মশাস্ত্রে অধ্যয়নের জন্য যান লিকোলাস। সেখানে গেলে পরিচয় হয় প্রখ্যাত দার্শনিক প্লেটো এবং সে সময়ের বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ডোমেনিকোর সাথে। এই গুণী ব্যক্তির সান্নিধ্যই তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি।
সাড়ে তিন বছর ধরে তিনি গ্রিক ভাষা, গণিতশাস্ত্র ও প্লেটোর রচনাবলী অধ্যয়ন করেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্পর্কিত তৎকালীন চিন্তাভাবনার সাথেও পরিচিত হন। এছাড়াও তিনি দর্শন এবং এরিস্টটল ও আহমদ ইবনে রুশদের লিখিত প্রাকৃতিক বিজ্ঞান সম্পর্কে খুব ভালো জ্ঞান লাভ করেন, যা তাঁকে তাঁর ভবিষ্যত এর কোপার্নিকাস তত্ত্ব তৈরীতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বোলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তিনি প্রফেসর ডোমেনিকোর সাথে জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের কাজে যুক্ত ছিলেন। ১৪৯৭ খ্রিষ্টাব্দে কোপার্নিকাস নোভারার সাথে একত্রিত হয়ে একটি বড় জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁর গবেষণার ফলস্বরূপ, তিনি এই সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে চতুর্ভুজ চাঁদের দূরত্ব অমাবস্যা এবং পূর্ণিমা উভয়েরই জন্য সমান।
৩০ বছর বয়সে অধ্যয়ন শেষে কোপার্নিকাস স্থায়ীভাবে চলে আসেন তাঁর জন্মভূমিতে। ১৫১২ সালে মামার মৃত্যুর আগে পর্যন্ত কোপার্নিকাস ছিলেন মামার প্রধান সচিব এবং চিকিৎসক। তিনি হেলিসবারগের বিসপদের দুর্গেই বাস করতেন। তিনি তাঁর মামার কাছ থেকে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক সকল ধরনের দায়িত্ব সম্বন্ধীয় কাজ শেখেন। মামার জীবিতকালেই কোপারনিকাস ৭ম শতকের বাইজানটান ইতিহাস এবং ৮৫ টি কবিতা গ্রিক থেকে ল্যাটিনে অনুবাদ করে তা ছাপানোর জন্য জান হোলের ছাপাখানায় দেন। কোপারনিকাস গ্রিক থেকে ল্যাটিনে গল্পের অনুবাদ করেন, নাম দেন ‘থিওপিলাক্তি স্কলাস্তি সিমকাতি এপিস্তলয় মোড়াল’, যা তিনি তাঁর মামার নামে উৎসর্গ করেন। এই অনুবাদ দ্বারা কোপারনিকাস নিজেকে মানবতাবাদী হিসাবে প্রকাশ করেন। এছাড়াও কোপারনিকাস একটি গ্রিক কাব্য রচনা করেছিলেন, যার নাম ‘এপিগ্রাম’।
এরপরে তিনি রোম বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। সে সময় তাঁর মনে মহাবিশ্ব সম্বন্ধে টলেমির সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে সন্দেহ জাগে। পৃথিবী এই মহাবিশ্বের মাঝে অবস্থিত, পৃথিবীকে কেন্দ্র করে সূর্য, তারা আর চাঁদ ঘুরছে- এই নিয়মে তিনি কিছু ত্রুটি খুঁজে পান। ক্লাসে যখন ছাত্রদের টলেমির সিদ্ধান্ত পড়াতেন, তখন তাঁর বার বার মনে হতো তিনি ভুল শিক্ষা দিচ্ছেন। মানসিক পীড়ায় শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিলেন। এখান থেকে শুরু হলো তাঁর মনে উদ্রেক হওয়া জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার পালা।
প্রকৃত সত্যকে জানবার জন্য এ বিষয়ে আরো গভীর অধ্যয়ন শুরু করলেন। তখনও টেলিস্কোপ আবিষ্কৃত হয়নি। তাই গাণিতিক পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় ছিল না। একাকী চালিয়ে যান গবেষণা ও অনুসন্ধানের কাজ, পাহাড়ের উপরে অবস্থিত একটি গির্জা থেকে যেটিতে তিনি ছিলেন ধর্মযাজক। গির্জার দেওয়ালে একটি উঁচু চূড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি চন্দ্র, সূর্য ও গ্রহরাজির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন খালি চোখেই। নিজের পর্যবেক্ষণের ফলাফল লিপিবদ্ধ করে রাখতেন।
একনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ থেকে কোপার্নিকাস অনুধাবন করতে পারেন টলেমির ব্যাখ্যায় ত্রুটি আছে। বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলে না টলেমির মডেল থেকে। উল্টে দেখলেন সূর্যকে কেন্দ্রে রাখলে সকল কিছুর হিসাব মিলে যায়। তাঁর গবেষণালব্ধ মতবাদসমূহ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করার সাহস করেননি। কারণ তিনি ছিলেন গির্জার যাজক। তাঁর মতবাদ প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের সম্পূর্ণ বিরোধী।
১৫১০ থেকে ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত কোপার্নিকাস তাঁর নতুন মতবাদের সংক্ষিপ্তসার হিসাবে একটি পান্ডুলিপি প্রস্তুত করেন। ১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দে ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি তাঁর বন্ধুদের মাঝে প্রচার করেন।
বছর পেরোতে লাগলো, নকশা একেঁ আর গাণিতিক হিসাব করে তিনি তাঁর যুক্তিকে বিকশিত করতে লাগলেন। ১৫৩৩ খ্রিষ্টাব্দে রোমের পোপ সপ্তম ক্লিমেন্টের সামনে এগুলো ব্যখ্যা করলেন এবং তাঁর সমর্থনও লাভ করলেন।
তাঁর মতবাদ প্রকাশের জন্য ১৫৩৬ খ্রিষ্টাব্দে আনুষ্ঠানিক অনুমতি পেলেন কোপার্নিকাস। তাঁর শিষ্য রেটিকাসের প্রচেষ্টায় রচনা প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। পান্ডুলিপিটি মুদ্রণের জন্য জার্মানির নুরেমবার্গে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পায় রেটিকাস। মার্টিন লুথার, ফিলিপ মেলান্সথন ও অপরাপর সংস্কারকদের বাঁধার কারণে রেটিকাস নুরেমবার্গ ত্যাগ করে লাইপজিগে গেলেন এবং প্রকাশনার দায়িত্ব আন্দ্রিয়াস ওসিয়ান্ডারের হাতে তুলে দিলেন। সমালোচনার ভয়ে ওসিয়ান্ডার নিজ দায়িত্বে গ্রন্থের সাথে একটা মুখবন্ধ জুড়ে দিলেন। তিনি ভাবলেন, বই প্রকাশিত হলে কোপার্নিকাসের সাথে তাঁকেও বিপদগ্রস্ত হতে হবে। তাই বইয়ের প্রথমে লিখলেন-
এ বইয়ের বিষয়বস্তু পুরোপুরি সত্য নয়। অনুমানের উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে।
পাশ্চাত্যের চিন্তাধারার ক্ষেত্রে এবং আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানকে বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে প্রকাশিত হল De revolutionibus orbium coelestium (মহাজাগতিক বস্তুগুলোর ঘূর্ণন)। ছয়খন্ডে রচিত গ্রন্থটি তৃতীয় পোপের সম্মানে উৎসর্গ করে তিনি বলেন, “গণিতশাস্ত্র বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকলে কেউ যেন গ্রন্থটির সমালোচনা না করেন।"
বিশ্বব্রহ্মান্ডের কেন্দ্রীয় অবস্থান থেকে পৃথিবীর সিংহাসনচ্যুতির মতবাদ সৃষ্টি করেছিল প্রচণ্ড আঘাত। পৃথিবীকে আর সৃষ্টির আদি বলে গণ্য করা গেল না। ব্রহ্মাণ্ডের কেন্দ্রে সকল পরিবর্তন ও বিনাশের উৎস হিসেবে পৃথিবী আর পরিগণিত হতে পারল না। একে যথার্থই 'কোপার্নিসীয় বিপ্লব' বলে অভিহিত করা যায়। মহান জার্মান কবি গ্যেটের ভাষায়- “সকল আবিষ্কার ও অভিমতের মধ্যে আর কোনোটাই মানব মনের উপর এতটা প্রভাব ফেলতে পারেনি, যতটা ফেলেছিল কোপার্নিকাসের মতবাদ”।
তাঁর বইটি যখন প্রকাশ হয় তখন তিনি ছিলেন পক্ষাঘাত ও মানসিক রোগে আক্রান্ত। বইটি ছাপা অবস্থায় তাঁর কাছে এসে পৌঁছলে তখন তাঁর পড়ে দেখার মতো অবস্থা ছিল না। তিনি শুধু দু'হাতে বইটি কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করলেন। এর কয়েক ঘণ্টা পরই তাঁর মৃত্যু হয়।
তাঁর বইয়ের মধ্যে দিয়ে তিনি যে সত্যের প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তার উপর ভিত্তি করে গ্যালিলিও, কেপলার, নিউটন, আইনস্টাইন জ্যোতির্বিজ্ঞানের নতুন নতুন দিগন্তকে উন্মোচন করেন, দেড় হাজার বছরের টলেমির ভূকেন্দ্রিক মতবাদ ভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়। কোপার্নিকাস তার গ্রন্থে বলেন, "পৃথিবী থেকে গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ অনেক বেশি জটিল হওয়ার কারণ পৃথিবীর নিজের ঘূর্ণন। তাই সূর্য থেকে দেখলে পৃথিবীকে অপেক্ষাকৃত সরল ও একটি সাধারণ গ্রহ বলে মনে হবে।" তিনি আরো বলেন, "ঋতু পরিবর্তন ঘটে সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর আবর্তনের কারণে।"
১৫৪৩ সালের ২৪ মে ৭০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। পোল্যান্ডের বাল্টিক কোস্টের ফ্রমব্রোক ক্যাথেড্রালের মেঝের নিচে তাঁকে সমাহিত করা হয়। নাম-পরিচয়হীনভাবে অবহেলার সাথে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। মৃত্যুর ৫০০ বছর পর তাঁকে পুনরায় বীরের মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। এভাবেই যুগে যুগে বিপ্লব সৃষ্টি করে যাওয়া মানুষেরা স্বীকৃতি পান। সে স্বীকৃতি হতে পারে তাৎক্ষণিক কিংবা কিছুটা বিলম্বে।
To know that we know what we know, and to know that we do not know what we do, that is true knowledge. - Nicolaus Copernicus.
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)
