আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ইতিহাসে এক বহুল আলোচিত নাম। দুই সহস্রাব্দ পেরিয়ে গেলেও আলেকজান্ডারকে নিয়ে বিশ্ববাসীর আগ্রহ একটুও কমেনি। আর কমবেই বা কেন? মাত্র ১১ বছরে ২১ হাজার মাইল পথ অতিক্রম করে সাম্রাজ্যের সীমানা মেসিডোনিয়া থেকে টেনে নিয়ে গিয়েছেন হিন্দুকুশ পর্বতমালা পর্যন্ত। ৩২ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে তিনি জয় করে গড়ে তুলেছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাম্রাজ্য। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই বীরযোদ্ধার আজ প্রয়াণ দিবস। তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাঁকে জানার ও চেনার প্রয়াস হিসেবে এই লেখা।

ব্রিটিশ মিউজামে রাখা আলেকজেন্ডারের আবক্ষ মূর্তি
আলেকজান্ডার
দ্য গ্রেট-এর জন্ম হয়েছিল প্রাচীন গ্রিসের মেসিডোনিয়াতে খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬ অব্দে।
তাঁর পিতা ছিলেন মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ আর তাঁর মা ছিলেন উচ্চাভিলাষী
রানী অলিম্পিয়া। আলেকজান্ডারের জীবনে তাঁর মায়ের প্রভাব ছি’ল খুব বেশি। ছেলেবেলা থেকেই তিনি শিশু আলেকজান্ডারকে বুঝিয়েছিলেন পারস্য জয়
করার জন্য তাঁর জন্ম হয়েছে। বলা বাহুল্য অলিম্পিয়া ছিলেন ফিলিপের সাত স্ত্রীর
মধ্যে চতুর্থ। অসম্ভব বিচক্ষণ এবং বীরযোদ্ধা রাজা ফিলিপ বালক আলেকজান্ডারের
শিক্ষার কোন ত্রুটি করেননি। জগৎবিখ্যাত দার্শনিক এরিস্টোটলকে নিযুক্ত করেছিলেন
আলেকজান্ডারের শিক্ষক হিসাবে এবং তাঁর সান্নিধ্যে প্রায় তিন বছর থাকার পর ১৬ বছর
বয়সে তাঁর পাঠগ্রহণ সম্পুর্ণ হয়। গুরু এরিস্টোটলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি
বলেন, “জীবন পেয়েছি পিতার কাছে। কিন্তু সেই জীবনকে কী করে
সুন্দর করতে হয়, সে শিক্ষা পেয়েছি গুরুর কাছে।”
সে সময়
গ্রিস একক কোন সাম্রাজ্য ছিলনা বরং বিভক্ত ছিল অনেকগুলো ছোট ছোট নগররাষ্ট্রে।
পরাক্রমশালী পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর জন্য স্পার্টানরা ছাড়া
বাকি সবাই জোটবদ্ধ হয়ে তখন সম্মিলিত বাহিনী গঠন করেছিল। আলেকজান্ডারের পিতা ছিলেন
সেই সম্মিলিত বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার। মূলত তাঁর একক সামরিক প্রচেষ্টাতেই
বিবাদমান নগর রাষ্ট্রগুলোকে এক ছাউনিতে
আনা সম্ভব হয়েছিল। পারস্য জয় করা ছিল ফিলিপের একান্ত বাসনা। কিন্তু পারস্য
অভিযানের আগেই ফিলিপ আততায়ীর হাতে নিহত হলেন।
আলেকজান্ডারের
বয়স যখন কুড়ি ছুঁই ছুঁই। পিতার স্থলাভিসিক্ত হলেন যুবক আলেকজান্ডার। খ্রিস্টপূর্ব
৩৩৬ অব্দে বসলেন মেসিডোনিয়ার সিংহাসনে। এদিকে ফিলিপের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে
গ্রিসের নগররাষ্ট্র গুলো আবার বিভক্ত হয়ে পড়ল। তরুণ আলেকজান্ডারের নেতৃত্ব মেনে
নিতে চাইলনা অনেকেই। বিবাদমান নগর রাষ্ট্রগুলোকে তিনি এক শিবিরে আনতে খুব শক্ত
হাতে বিদ্রোহ দমন করে অচিরেই সম্মিলিত বাহিনী প্রস্তুত করলেন পারস্য অভিযানের
উদ্দেশ্যে।
পারস্য
অভিযানের আগে পারস্য প্রবেশের পথটা পরিষ্কার করতে আলেকজান্ডার অভিযান চালালেন
বলকান অঞ্চলে। এশিয়া মাইনর অর্থাৎ বর্তমান তুরস্কে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে পারসিয়ানদের
সাথে জেতার পর আলেকজান্ডার মিশর দখলের উদ্দেশ্যে প্রায় বিনা বাধায় এগোতে থাকেন।
অতীত জৌলুস হারিয়ে মিশর তখন পারস্য সাম্রাজ্যের সামান্য অংশ মাত্র। তবে মিশরে
প্রবেশের পথে বর্তমান ফিলিস্তিনের গাজায় শক্তিশালী বাধার সম্মুখীন হন আলেকজান্ডার।
গাজা জয় করার পর নির্বিচারে পুরুষদের হত্যা ও নারীদের বন্দীর নির্দেশ দিয়ে অত্যন্ত
হঠকারিতার পরিচয় দিয়েছিলেন আলেকজান্ডার। গাজা জয়ের পর টায়ার নগর অবরোধ করেন তিনি।
টায়ারের পরিণতিও হয়েছিল গাজার মতই। আলেকজান্ডার মিশরে পৌঁছালে তাঁকে মিশরের নতুন
ফারাও ঘোষণা করা হয়। তারপর শুরু হয় পারস্যের বিরুদ্ধে তাঁর মূল অভিযান। বেশ কয়েকটি
যুদ্ধের পর খ্রিস্টপূর্ব ৩৩১ অব্দে অবশেষে বিখ্যাত ‘গগোমেলা’-র যুদ্ধে পারস্যের রাজা তৃতীয় দারিয়ুস চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন আলেকজান্ডারের
কাছে। পরাজিত দারিয়ুস সাম্রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যান,
পরে তার সেনাপতিরাই
তাকে হত্যা করে।
পারস্য
বিজয়ের পর খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে আলেকজান্ডার
ভারতবর্ষ আক্রমণ করেন। সে সময় উত্তর-পশ্চিম ভারত অনেকগুলো পরস্পর বিবাদমান ছোট ছোট
রাজ্যে বিভক্ত ছিল। প্রথমে আলেকজান্ডার পুষ্কলাবতীর রাজা অষ্টককে, তারপর অশ্বক জাতিকে পরাজিত করেন। অন্যদিকে তক্ষশীলার রাজা তাঁর নিকট
স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করেন কিন্তু ঝিলামের রাজা পুরু তাঁর বিরুদ্ধে বীরত্বের
সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত ও বন্দী হন। বন্দী পুরু ও আলেকজান্ডারের ঘটনা তো
সর্বজনবিদিত। সবমিলিয়ে ভারতবর্ষে প্রায় ১৯ মাসের মত ছিলেন আলেকজান্ডার।
এদিকে
দীর্ঘদিন মাতৃভূমির বাইরে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী আর
সামনে অগ্রসর হতে চাইলনা। তাই বাধ্য হয়ে তিনি ফিরে গেলেন পাঞ্জাব থেকে। ফেরার পথে
বিজিত অঞ্চলগুলোতে শাসন পাকাপোক্ত করার জন্য কিছুদিন করে অবস্থান করেন
আলেকজান্ডার। পথিমধ্যে প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হলেন। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হলো
রূপকথার নগর ব্যাবিলনের নেবুচাদনেজারের রাজপ্রাসাদে। কয়েক দিন আগে থেকেই রোগের
লক্ষণ দেখা দিয়েছিল। রাত জেগে মদ পানের কারণে সম্ভবত রোগের মাত্রা বেড়ে যায়।
কিছু সময়ের জন্য জ্বর খানিকটা প্রশমিত হলেও পরে তা প্রকট আকার ধারণ করে। তিনি
নড়াচড়া করার শক্তি হারিয়ে ফেলেন আর তাঁর কথাও বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় বারো দিন
প্রচন্ড কষ্টের পর তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বিকেল চারটা থেকে
পাঁচটার মধ্যে কোনো এক সময়ে। তারিখটা খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ সালের ১১ জুন। তখন তাঁর
বয়স মাত্র ৩৩।
এক বিরাট
রাজকীয় কফিনে তাঁর প্রিয় নগরী আলেকজান্দ্রিয়ায় তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর
মৃত্যুর পর সবাই তাঁর মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছিল। কিন্তু অনিসিক্রেটাস
নামে এক গ্রিক নৌবহরের প্রধান সেনাপতি, যিনি আলেকজান্ডারের অন্যতম
ঘনিষ্ঠ বন্ধুও ছিলেন তিনি তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর এমন দাবি করেন যে তাঁকে
বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়। তার পর থেকেই এই আলোচনা শুরু হয়ে যায় যে সত্যিই কি
আলেকজান্ডার বিষ প্রয়োগেই মারা যান? তাঁর মৃত্যু একটা শতাব্দীব্যাপী
ধাঁধাঁ একটা এনিগমা যা থেকে আমরা এখনও মুক্ত হতে পারি নি।
ফিলিস্তিনের
গাজা, টায়ার ও অন্যান্য কিছু শহরে আলেকজান্ডার ভয়ানক
গণহত্যা চালিয়েছেন এটা যেমন ঠিক, আবার এই কথাও অনস্বীকার্য নতুন
দেশ জয় করে তিনি সেদেশের সভ্যতা ধ্বংস করেননি বরং আত্মীকরণ করেছেন তাদের সংস্কৃতি।
যেমন পারস্য জয়ের পর আলেকজান্ডারকে দেখা গেছে পারসিয়ান পোশাকে কিংবা ভারতের রাজা
পুরুর সাথে গড়ে তুলেছিলেন সখ্যতা। সবমিলিয়ে আলেকজান্ডার সেতু বন্ধন রচনা করেছিলেন
প্রাচ্যের সাথে পাশ্চাত্যের। ভারত, পারস্য ও গ্রীক এই তিনটি মহান
সভ্যতার সম্মিলন খুব অল্প সময়ের জন্য সম্ভব হয়েছিল তাঁর বিজয়াভিযানের ফলে। তাই
ইতিহাসে আলেকজান্ডার এত অনন্য, এত বেশি আলোচিত।
(সংকলন – তারিনী খুড়ো)