বার্নার্স-লি - ওয়েব দুনিয়ার স্রষ্টা

টিম বার্নার্স-লি বা স্যার টিমোথি জন টিমজন বার্নার্স-লি নামটার সাথে পরিচয় নেই তো? না থাকলেও কিছু এসে যায়না, ইন্টারনেট থাকতে এসব সাধারণ বিষয় জেনে নেওয়া তো জাস্ট এ মাউজ ক্লিক এওয়ে’; যে ইন্টারনেট বা ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ব্যবহার করে এসব জেনে নিতে সামান্যও সময় লাগবে না, সেই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব-এর জনক টিম বার্নার্স-লি-র আজ জন্মদিন। এহেন মানুষটির জন্মদিনে তাঁকে চেনার মধ্যে দিয়েই শ্রদ্ধা জানানোর এই প্রয়াস।

স্যার টিম টিম বার্নার্স-লি

টিম বার্নার্স-লি ৮ জুন ১৯৫৫ সালে ব্রিটেনের লন্ডনে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম কনওয়ে বার্নার্স-লি আর মায়ের নাম ম্যারি লি উড। তাঁর বাবা-মা ছিলেন কম্পিউটার বিজ্ঞানী যাঁরা প্রথম বাণিজ্যিকভাবে নির্মিত কম্পিউটারে ফেরান্টি মার্ক ওয়ান’ –এ কাজ করেছিলেন। 

কনওয়ে-ম্যারি র চার সন্তানের সবচেয়ে বড় টিম শিক্ষাজীবনের শুরুতে শিন মাউন্ট প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন এবং পরবর্তীকালে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের এমানুয়েল স্কুলে শিক্ষাগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় টিম-এর ট্রেন সম্বন্ধে এতটাই আগ্রহ ছিলো যে ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রেনের চলাচল দেখে কাটাতেন এবং ইল্কেট্রনিক্স সম্বন্ধে তিনি প্রথম শেখেন একটি খেলনা ট্রেন নিয়ে খেলতে খেলতে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কুইনস কলেজ’-এ পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক পড়াশোনা করেন এবং প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। যে সময় টিম কুইনস কলেজ-এ পড়াশুনা করছেন সেই সময়ে তাঁর বাবা ও মা মিলে একটি পুরাতন টেলিভিশন থেকে কম্পিউটার তৈরি করে ফেলেন। 

স্নাতক হওয়ার পরে, টিম ডরসেটের পুলেয় টেলিযোগাযোগ সংস্থা প্লাসি’-তে প্রকৌশলী হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে, তিনি ডরসেটের ফেরেন্ডাউনে ডি জি ন্যাশ-এ যোগ দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি প্রিন্টারের জন্য টাইপ-সেটিং সফ্টওয়্যার তৈরি করতে সহায়তা করেন। এরপরে টিম বার্নার্স-লি ১৯৮০ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সিইআরএন-এ জেনেভা হেডকোয়ার্টারসে স্বতন্ত্র ঠিকাদার হিসাবে কাজ করেন। জেনেভা থাকাকালীন, তিনি হাইপারটেক্সট ধারণার উপর ভিত্তি করে একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছিলেন, যাতে গবেষকদের মধ্যে তথ্য ভাগ করে নেওয়া এবং আপডেট করা যায়। এটি প্রদর্শনের জন্য, তিনি ইনকয়ের (ENQUIRE) নামক একটি প্রোটোটাইপ সিস্টেম তৈরি করেছিলেন। 

১৯৮০ সালের শেষদিকে সিইআরএন ছেড়ে টিম বার্নার্স-লি ডরসেটের বোর্নেমাউথের জন পুল-এর ইমেজ কম্পিউটার সিস্টেমস লিমিটেড’-এ কাজে যোগ দেন এবং তিন বছরের জন্য কোম্পানির প্রযুক্তিগত দিক দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি যে প্রকল্পে কাজ করেন সেটি হ'ল "রিয়েল-টাইম রিমোট প্রসিডিওর কল" যা তাঁকে কম্পিউটার নেটওয়ার্কিংয়ের অভিজ্ঞতা দিয়েছিল। ১৯৮৪ সালে তিনি পুনরায় সার্ন এ যোগদান করেন ফেলোহিসেবে। ১৯৮৯ সালে সিইআরএন ছিল ইউরোপের বৃহত্তম ইন্টারনেট নোড এবং বার্নারস-লি ইন্টারনেটের সাথে হাইপারটেক্সট যুক্ত করে নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ দেখেছিলেন। এই বিষয়ে প্রথমবারের জন্য বার্নার্স-লি তাঁর প্রস্তাবটি লিখেছিলেন ১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে এবং ১৯৯০ সালে এটিতে পুনরায় আরও কিছু রদবদল করে জমা দেন। তাঁর উর্ধতন পরিচালক মাইক সেন্ডালপ্রস্তাবটিকে অবাস্তব ও অস্পষ্ট বলে অবিহিত করলেও গ্রহণ করেছিলেন কারণ তাঁর মনে হয়েছিলো প্রস্তাবটি আকর্ষণীয়। 

ইনকয়ের (ENQUIRE) সিস্টেমের অন্তর্নিহিত অনুরূপ ধারণা ব্যবহার করে তিনি প্রথম ওয়ার্লড ওয়াইড ওয়েব ডিজাইন করেন এবং প্রথম ওয়েব ব্রাউজারটি ডিজাইন করেন। লেখা ও কিছু হাইপার লিংকের সমন্বয়ে সাদামাটা ওয়েবসাইট ছিল এটি। টিম বার্নার্স-লির সেদিনের সেই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব একবিংশ শতাব্দীতে এসে মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। মানুষ যেন দরকারি তথ্য ও নথি সহজে খুঁজে পায়, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে এমন এক ব্যবস্থা বানাতে চেয়েছিলেন তিনি। প্রথম ওয়েবসাইটেই তাঁর সেই পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করেন তিনি। ওয়েব কীভাবে কাজ করবে, কীভাবে বিভিন্ন ডকুমেন্টে প্রবেশ করা যাবে এবং নিজেদের সার্ভারে স্থাপন করা যাবে, তার নির্দেশনা ছিল এই ওয়েবসাইটে। 

১৯৯৪ সালে টিম বার্নার্স-লি ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে ডব্লিউ 3 সি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটিতে এমন বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে যা ওয়েবের মান উন্নত করতে মানদণ্ড এবং সুপারিশ তৈরি করতে ইচ্ছুক ছিল। টিম বার্নার্স-লি তাঁর ধারণা নিখরচায় উপলব্ধ করেছিলেন, কোনও পেটেন্ট এবং কোনও রয়্যালটি ছাড়াই। বর্তমানে তিনি এই world web consortium (W3C) ডিরেক্টর পদে অধিষ্ঠিত। 

স্যার বার্নার্স-লি ১৯৯০ সালে আমেরিকান কম্পিউটার প্রগ্রামার ন্যান্সি কার্লসনকে বিয়ে করেন। ২০১১ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হলে ২০১৪ সালে তিনি লন্ডনে রোজমেরি লেথের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়েতে আবদ্ধ হন। লেথ ছিলেন কানাডার ইন্টারনেট ও ব্যাংকিং উদ্যোক্তা। 

টিমোথি জন ২০০৮ সালে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং ২০১১ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট অব সায়েন্স সম্মাননা লাভ করেন। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে অর্ডার অব মেরিট, নাইট কমান্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার, ফেলো অব দ্য রয়েল সোসাইটি, ফেলো অব দ্য রয়েল একাডেমি অব ইঞ্জিনিয়ারিং, ফেলো অব দ্য রয়েল সোসাইটি অব আর্টস প্রভৃতি সম্মাননা লাভ করেন। 

তাঁর জীবনে কিছু গল্প জেনে নেওয়া যাক স্যার 'টিম বার্নার্স-লি' এর নিজের বর্ণনা থেকেই। 

আমার বাবা-মা দুজনেই ছিলেন গণিতবিদ। আমরা ছিলাম চার ভাই। আমি ছিলাম সবার বড়। আমরা সব জায়গায়ই গণিতের মজা খুঁজে ফিরতাম। একটা পুডিং বানাতে গেলেও গণিতের হিসাব-নিকাশ করতাম মজা করার জন্য। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময়কার কথা - অন্যরা যখন দৌড়ঝাঁপ করে বেড়াত, আমরা তিন বন্ধু তখন বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করতাম। চুম্বক নিয়ে মজার কাণ্ড ঘটাতে চাইতাম। সেই ছোট্ট বয়সেই আমরা ঠিক করে ফেলেছিলাম, আমরা বিজ্ঞান নিয়ে একটা বই লিখব। বইটা যেহেতু হবে গবেষণামূলক, তাই বিভিন্ন বিষয়ে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা করার জন্য আমাদের বাসার পেছনে মাটির নিচে একটা গবেষণাগার বানানোর চিন্তাও এসেছিল আমাদের মাথায়! 

অনেকে আমাকে বলে, আমি ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব ব্যবহার করে অনেক বড়লোক হতে পারতাম। আমি নিজেও সেটা জানি। আমি যদি আমার আবিষ্কার সবার জন্য উন্মুক্ত না করে অর্থের বিনিময়ে বিক্রি করতাম, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, আমি আজ অনেক পয়সা কামাতে পারতাম, রাজকীয় জীবন যাপন করতে পারতাম। কিন্তু তাহলে ওয়েব এভাবে দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে দিতে পারতাম না। আমি সব সময় চেয়েছি, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব যেন দুনিয়ার সব মানুষের কাজে আসে। আর তা আজ সত্যি হয়েছে।" 

(সংকলন তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন