ম্যাক্সিম গোর্কি - বিশ্ব সাহিত্যের বিপ্লবী চরিত্র

বিশ্বসাহিত্য নিয়ে সচেতন অথচ মাউপন্যাসটি পড়েননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। এহেন উপন্যাসটির লেখক ম্যাক্সিম গোর্কির আজ প্রয়াণ দিবস। প্রথাগত রচনার বাইরে বেরিয়ে সমাজের নিচুতলার মানুষের অত্যাচারিত হওয়ার আলেখ্য তুলে ধরা গোর্কিকে তাঁর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি ম্যাক্সিম গোর্কিনামের আড়ালের মানুষটিকে চেনার প্রয়াস হিসেবেই এই লেখা।

ম্যাক্সিম গোর্কি - বিশ্ব সাহিত্যের বিপ্লবী চরিত্র

দুই শব্দবিশিষ্ট যে ম্যাক্সিম গোর্কিকে আমরা চিনি, তাঁর পরিবার-পরিজন কখনো ওই নামে তাঁকে ডাকেনি। এটি তাঁর ছদ্মনাম। পরিবার থেকে নাম রাখা হয়েছিল আলেক্সেই ম্যাক্সিমভিচ পেশকভ। রাশিয়ান ভাষায় গোর্কিশব্দের অর্থ হলো তেতো। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ছেলেবেলার তিক্ত অভিজ্ঞতাই তাঁকে নিজের নামে গোর্কিশব্দটি রাখতে উৎসাহিত করে।

১৮৬৮ সালের ২৮-শে মার্চ রাশিয়ার এক ছোট্ট শহর নিঞ্জি নভগরদ-এ ম্যাক্সিম পেশকভ আর ভারভারা পেশকভা-র ঘর আলো করে জন্মায় তাঁদের প্রথম সন্তান আলেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভ। ১৮৭১ এর গ্রীষ্মে ম্যাক্সিম পেশকভ মারা গেলেন কলেরাতে। বাবা মারা যাওয়ার পর আলেক্সেই এসে ওঠেন ঠাকুর্দা, ঠাকুমার কাছে। ভর্তি হন স্থানীয় এক স্কুলে। মা ভারভারা পেশকভা দ্বিতীয় বিয়ে করেন তাঁর চেয়ে ১০ বছরের ছোট এক ব্যক্তিকে। পরের বিয়েটা মোটেও সুখের ছিল না। এর কিছুদিন পরেই ক্ষয়রোগে মারা গেলেন মা, আলেক্সেইর বয়স তখন মাত্র ১১ বছর।

১২ বছর বয়সে বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন আলেক্সেই। বছর পাঁচেক পরিযায়ী রূপে ঘুরে বেড়ান রুশ প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে, শুরু হয় তাঁর কঠিন জীবনের পথচলার সূচনা, সাধারণের মধ্যে অসাধারণ হয়ে ওঠার এক কাহিনী।

কাজান শহরে এসে কাজ নেন একটি শৌখিন জুতার দোকানে। এরপর কিশোর পেশকভ কাজ নেন কয়েদি বহনের জাহাজে। তাঁর কাজ ছিল জাহাজের কর্মচারীদের বাসনপত্র ধোয়া, সেখানে ভোর ছ'টা থেকে মাঝরাত পর্যন্ত তাঁকে পরিশ্রম করতে হত। পেটের দায়ে ভালো কাজের আশায় পেশা বদলাতে থাকেন পেশকভ। কিন্তু কোথাও স্থিরতা পাননি। অবশেষে পেশকভ শান্তি খুঁজে পান বইয়ের পাতায়। অচিরেই হয়ে ওঠেন বইয়ের পোকা। অভাব-অনটন, হাড়ভাঙা পরিশ্রম - এত কিছুর মধ্যেও থামেনি তাঁর বই পড়া। রুশ কবি পুশকিনের একটি কবিতার বই তাঁকে বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।

এরপরে কাজ নেন কাজানের একটি রুটি তৈরির কারখানায়। কাজানে থাকাকালীন তাঁর আশ্রয় জুটেছিলো পুরনো ভাঙ্গা এক বাগানবাড়িতে। এই পুরনো বাড়িতেই গোর্কির সাথে পরিচয় হয় প্লেৎনেভ নামের একটি ছেলের। প্লেৎনেভ কাজ করতো একটি ছাপাখানায় এবং তারই হাত ধরে গোর্কির পরিচয় হয় বিপ্লবী দলের সাথে। এই পরিচয় গোর্কির জীবনে দারুণ এক পরিবর্তন আনে। মার্ক্সের রচনাবলীর সাথে পরিচয় হয়েছিলো তখনই।

সেই রুটি তৈরির কারখানায় সন্ধ্যা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত একটানা কাজ করতে হত তাঁকে। দারিদ্র্যের কশাঘাত আর দিনের পর দিন ঘামঝরা শ্রমের ধকলে মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলেন তিনি, জীবন হয়ে পড়ে তাঁর কাছে অর্থহীন। তিক্ত জীবনের অবসান ঘটাতে পিস্তল কেনেন তিনি! সময়টা ১৮৮৭ সালের ১৪ই ডিসেম্বর। পেশকভের বয়স তখন মাত্র ২০ বছর। নদীর তীরে গিয়ে নিজের বুকেই গুলি করলেন পেশকভ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সহায়তায় বেঁচে যান তিনি। নিঃসন্দেহে এটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় জীবন।

নব উদ্যমে আরও একবার জীবনের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন আলেক্সেই। সেই থেকে লেখালেখির গোড়াপত্তন। ধারণ করেন নতুন নাম- ম্যাক্সিম গোর্কি। রুশ ভাষায় 'ম্যাক্সিম' অর্থ সর্বাধিক আর 'গোর্কি' অর্থ তেতো। এসময় হঠাৎ একদিন গোর্কির সাথে পরিচয় হয় আলেকজান্ডার কালুঝনি নামের এক সাহিত্যপ্রেমী বিপ্লবীর। কালুঝনি গোর্কির জীবন আর ভ্রমণের গল্প শুনে বিস্মিত হলেন; মূলত কালুঝনির অনুপ্রেরণাতেই গোর্কির প্রথম গল্প মাকার চু্দ্রাপ্রকাশিত হয়। দিনটি ছিলো ১৮৯২ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর। মাকার চুদ্রামূলত রোমান্টিসিজম নির্ভর গল্প।

এরপর গোর্কি বেশ কিছু ছোটগল্প লেখেন, যেগুলির মধ্যে জীবনের রূঢ় বাস্তবতার প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ইজেরগিল, চেলকাশ, ছাব্বিশজন পুরুষ এবং একটি বালিকা, মালভা ইত্যাদি তার এ সময়ের রচিত গল্পগুলোর মধ্যে বিখ্যাত। নিজের চোখে খুব কাছ থেকে দেখা সমাজের নিচুতলায় বসবাসকারী মানুষদেরই জীবন আখ্যান ফুটে উঠেছে এই গল্পগুলোতে। গোর্কির রচিত প্রথম সার্থক উপন্যাস হলো ফোমা গর্দেয়েভ। ১৯০০ সালে এই উপন্যাস প্রকাশিত হয়। সমগ্র রাশিয়াতে ফোমা গর্দেয়েভতৎকালীন সময়ে দারুণ আলোচনা-সমালোচনার ঝড় তুলেছিলো।

১৯০১ সালে সেন্ট পিটসবার্গের ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে নিহত ও আহত হন বেশ কয়েকজন ছাত্র। এই ঘটনায় গোর্কির মনে তীব্র ঘৃণার জন্ম দেয়। প্রতিবাদ জানাতে হাতে তুলে নিলেন কলম। প্রতিবাদে গোর্কি রচনা করলেন 'The Song Of The Stormy Petrel' নামের কবিতা। ওই কবিতা হয়ে ওঠে বিপ্লবের অগ্নিমন্ত্র। তাঁকে গ্রেফতার করা হল। ক্ষোভে ফেটে পড়লো সারাদেশ। প্রতিবাদে মুখর হলো রাজপথ। জার কর্তৃপক্ষ বাধ্য হলো গোর্কিকে ছেড়ে দিতে।

তাঁর অন্যতম বিখ্যাত নাটক লোয়ার ডেপথপ্রকাশিত হয় ১৯০১ সালে। এই নাটকে গোর্কি মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান। এবারে শুধু রাশিয়া নয়, গোর্কির নাম ছড়িয়ে পড়লো গোটা ইউরোপে।

লেখনীর কারণে জীবনে বহুবার জার শাসকের রোষানলে পড়েছিলেন গোর্কি। রাজদ্রোহিতার অপরাধে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছে। দেশ ত্যাগ ও করতে হয়েছে বারংবার, একসময় তিনি জার্মানি ও ফ্রান্স হয়ে পাড়ি যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানেই রচিত হয় তাঁর জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস মা’, যার মধ্য দিয়ে তিনি বলতে চেয়েছেন বিপ্লব ছাড়া শোষিত শ্রেণীর মুক্তি কখনোই সম্ভব নয়। প্রথমদিকে সরকারের রোষানলের ভয়ে বইটি ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে তা রাশিয়ান সহ বিশ্বের আরো বহু ভাষায় রূপান্তরিত হয়। এখনও মাকে বিশ্বসাহিত্যের সেরা উপন্যাসগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাছাড়াও গোর্কির লেখা উপন্যাসগুলোর মধ্যে তারা তিনজন, আমার ছেলেবেলা, আম্মা ইত্যাদি বেশ বিখ্যাত।

১৯১৩ সালে লেনিনের আগ্রহে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর গোর্কি দেশের সাহিত্য ও রাজনীতির ক্ষেত্রে গঠনমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করেন৷ কিন্ত্ত এই সময় থেকে শুরু করে অক্টোবর বিপ্লবের মাঝখানে রাশিয়ায় যে ঐতিহাসিক পরিবর্তন ঘটতে চলেছিল তার মূল্যায়ন নিয়ে বলশেভিকদের সঙ্গে গোর্কির বড়ো রকমের মতপার্থক্য দেখা দেয়৷ বিপ্লবের পর নতুন শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে৷

লেনিন তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনেছিলেন ঠিকই , কিন্ত্ত অবাধ্য গোর্কির জনপ্রিয়তা শাসকগোষ্ঠীর কাছে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াতে ১৯২১ সালে লেনিনের উদ্যোগেই আবার তাঁকে দেশ ছাড়তে হল-এ বারে স্বাস্থ্যোদ্ধারের অজুহাতে, ইতালিতে৷

এরপরে লেনিনের মৃত্যু হলেও দেশে ফিরলেন না গোর্কি। পরে ১৯২৮ সাল থেকে শুরু করে প্রায় প্রতি বছরই গ্রীষ্মকালে কিছু সময়ের জন্য রাশিয়া ঘুরে যেতেন৷ বিদেশে থেকেও দেশের নবীন লেখক গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলতেন৷ তিনি সোভিয়েত লেখক সংঘের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা৷ ১৯৩৩ সালে তাঁর উদ্যোগে নবীন লেখকদের প্রশিক্ষণের জন্য মস্কোর গোর্কি সাহিত্য ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়৷ আর্তামোনভ্ বৃত্তান্ত’ (১৯২৫ ) তাঁর এই পর্যায়ে লেখা উল্লেখযোগ্য উপন্যাস৷ বিপ্লব -পূর্ববর্তী রাশিয়ার কয়েক শতাব্দীব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যাপক চিত্র এই উপন্যাসে বিধৃত৷

১৯৩৩ সালে ইতালির পাট চুকিয়ে পাকাপাকিভাবে দেশে ফিরে আসেন৷ জীবনের শেষ তিন বছর তিনি সম্পাদনা, প্রকাশনা, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রচারপুস্তিকা রচনা, শান্তি গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের প্রচার ইত্যাদি কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন৷

১৯৩৬ সালের ১৮-ই জুন গোর্কি মারা যান। মৃত্যুর আগের বেশ কিছু সময় তাঁকে শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে হয়েছিলো। গোর্কির সাহিত্যকর্মের সংখ্যা খুব বেশী নয়। কিন্তু যতটুকু তিনি লিখে রেখে গেছেন তা চিরকাল অসহায়, নিপীড়িত মানুষকে জেগে ওঠার প্রেরণা জোগাবে, ছড়াবে সাম্যবাদের বাণী। কেননা গোর্কি শুধুই একজন সাহিত্যিক নন, বরং তিনি একজন মানবতাবাদী বিপ্লবী।

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন