হিটলারের নাৎসী বাহিনীর রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়া এক মেয়ের কাহিনী সাহসিকতার এক অনন্য নজির; আসুন চিনে নেওয়া যাক এই অসম সাহসী মেয়েটিকে যাঁর নাম এতদিনেও সেভাবে শোনেননি বলে আপনার আপসোস হবেই।
প্রথম সন্তান বলে বাবা আদর করে নাম রেখেছিল নূর। নূর-উন-নিসা ইনায়েত খান-এর জন্ম ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি মস্কোয়। বাবা হজরত এনায়েত খান সুফিবাদের শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন বরোদা রাজ্যের নামকরা সুফি সাধক এবং ধ্রুপদী সঙ্গীত শিল্পী; উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত গাওয়ার জন্য রাজ দরবারেও ছিলেন সমাদৃত। হায়দরাবাদের নিজামের কাছ থেকে ‘তানসেন’ উপাধি পাওয়া এই শিল্পী সুফিবাদ প্রচারের লক্ষ্যে গিয়েছিলেন পশ্চিমে। ইনায়েতের মা পিরানি আমিনা বেগম ছিলেন মার্কিন শিক্ষাবিদ পিয়ার বার্নার্ডের বোন। ইনায়েতের দিদিমা কাসিম বিবি ছিলেন টিপু সুলতানের নাতনি। অর্থাৎ তাঁদের ধমনীতে ছিলো সুলতান বংশের রক্ত।
নূর বেড়ে ওঠেন ফ্রান্সে। সোরবর্নে শিশু মনোবিজ্ঞান এবং
প্যারিস কনজারভেটরিতে সঙ্গীত শেখেন। পরবর্তীতে সুফিবাদ নিয়ে গবেষণাও করেছেন অসম
সাহসী এই নারী। বাবার সান্নিধ্যে নূরও হয়ে ওঠেন সঙ্গীতানুরাগী।
১৯১৪ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছু
আগে নূরের পরিবার রাশিয়া থেকে লন্ডনে চলে যায় এবং ব্লুমসবারিতে বসবাস করা শুরু
করে। নূর নটিং হিল নার্সারি-তে ভর্তি হ’ন। ১৯২০ সালে তাঁরা
ফ্রান্সে চলে আসেন এবং প্যারিসের নিকটে ‘সুরসনেস’-এ বসতি স্থাপন করেন।
তেরো বছর যখন বয়স হঠাৎই দুদিনের জ্বরে মারা যান বাবা, চার ভাই বোনকে নিয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া মা-কে সাহায্য করতে নূর গান
গাইতে শুরু করেন রেডিও প্যারিসে। সাথে সাথে শিশুদের জন্য শুরু করেন বই ও নাটক
লেখা। সংগীত ছিল রক্তে তাই অচিরেই বেশ নামডাক হয় তাঁর।
সোর্বোর্নে শিশু মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার পাশাপাশি প্যারিস
কন্সার্ভেটারিতে নাদিয়া বউলেঙ্গার-এর কাছে হার্প ও পিয়ানো-ও শিখতে থাকেন নূর। ১৯৩৯
সালে বৌদ্ধ ঐতিহ্যের জাতক কাহিনী দ্বারা অনুপ্রাণিত, “কুড়িটি জাতকের
গল্প” নামক একটি বই লন্ডনের জর্জ জি হারাপ এন্ড কোম্পানি
থেকে প্রকাশিত হয়।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার সময় তিনি
ফ্রান্সের রেডক্রসে সেবিকা হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধর শুরুতে যখন
জার্মান বাহিনী ফ্রান্স আক্রমণ করে, তখন নূর-এর পরিবার
দক্ষিণ পশ্চিম ফ্রান্সের শহর বর্ডক্স-এ পালিয়ে আসে এবং সেখান থেকে সমুদ্র পথে
ইংল্যান্ডের ফ্যালমাউথ শহরে ২২-শে জুন ১৯৪০ সালে এসে ওঠে এবং সাউথাম্পটন-এ থাকতে
শুরু করে।
১৯৪০ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে নূর এবং তাঁর ভাই
বেলায়েত মিত্রশক্তিকে সাহায্য করার সিদ্ধান্ত নেন। ফ্রান্স ছিল মিত্রশক্তির
অন্তর্ভুক্ত। নূর যোগ দেন উইমেন’স অক্সিলিয়ারি এয়ার ফোর্সে। সেখানে
ওয়্যারলেস অপারেটর হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় নূরকে। ১৯৪১ সালে তাঁকে Abingdon
বম্বার কম্যান্ডে নিয়ে আসা হয় এবং Special Operations
Executive (SOE) বাহিনীর সদস্য রূপে মারণাস্ত্র, বিস্ফোরক ও ধ্বংসাত্মক কাজের বিশেষ ট্রেণিং দেওয়া হয়। শেখানো হয় সাংকেতিক
যোগাযোগ ও বিনা অস্ত্রে হত্যার কৌশল। দেড় বছর পর তাঁকে একদিন রাতের অন্ধকারে ফরাসী
উপকূলে বিমান থেকে প্যারাশুটে নামিয়ে দেয়া হলো। নূর ইনায়েত খান ফ্রান্সের মাটিতে
পা রাখলো "নোরা ম্যাডেলিন" পরিচয়ে, SOE এর প্রথম
মহিলা এজেন্ট! স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিল ফ্রেঞ্চ রেজিস্ট্যান্স গ্রুপ।
তিনমাস ধরে নূর লাগাতার জার্মান সেনার অবস্থান নিখুঁত ভাবে
বেতার মাধ্যমে মিত্রবাহিনীর দপ্তরে জানাতে সক্ষম হয়। ক্রমাগত অবস্থান বদলানোয়
নাৎসী বাহিনী তাঁকে ছুঁতেও পারলো না। অনর্গল ফরাসী বলতে পারার জন্য পেয়ে গেল বাড়তি
সুবিধা। নাৎসী অধ্যুষিত প্যারিসে যখন সব ওয়্যারলেস অপারেটররা একের পর এক গ্রেফতার
হয়েছিলেন,
তখন নূরই ছিলেন একমাত্র যিনি জার্মানদের সাথে মিশে গিয়ে প্রতি
মুহূর্তে লন্ডনের সাথে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন এবং গুপ্তবার্তা প্রেরণ করেছেন।
অবশেষে এলো সেই কালো দিন, ১৯৪৩ সালের ১৩ই
অক্টোবর! এক ফরাসী ডবল এজেন্টের বিশ্বাসঘাতকতায় প্যারিসের উপকন্ঠ থেকে নূর ধরা পড়লো গেষ্টাপোর হাতে। গেস্টাপো তাঁকে
গ্রেফতারের জন্য বিশাল জাল ফেলে।
নাৎসী গোয়েন্দা বিভাগ বা এসডি বাহিনীর জেরার মুখে পড়তে হয়
তাঁকে। তৎকালীন এসডি প্রধান কিয়েফ পরে স্বীকার করেছিলেন জেরায় নূরের মুখ থেকে তাঁর
কাজ সংক্রান্ত কোনও কথা বলানো যায়নি। তিনি ক্রমাগত নিজের শৈশবের গল্প করে
গিয়েছিলেন। বিভ্রান্ত করেছিলেন নাৎসী গোয়েন্দাদের। লাগাতার অত্যাচার চালিয়েও মুখ
থেকে কোন কথা বের করতে পারলো না তারা।
গেস্টাপোদের কবল থেকে দু’বার পালানোর
চেষ্টা করেও যখন ব্যর্থ হলেন, তখন তাঁকে ‘অত্যন্ত "বিপজ্জনক বন্দী"র তকমা দিয়ে দেড়মাস পর পাঠিয়ে দেয়া
হলো জার্মানির Pforzheim কারাগারে।
কারাগারে একটি সেলে একা বন্দি ছিলেন তিনি। হাতে পায়ে ছিল
শিকল। রাতের অন্ধকারে শেকলে বাঁধা মেয়েটি চিৎকার করে কাঁদতো। সেই সময়কার অন্য
বন্দিদের কাছে এই তথ্য পেয়েছিলেন তাঁর জীবনীকাররা। সহ বন্দীদের বলে যেতে পেরেছিলেন
প্রকৃত পরিচয়। জানিয়ে গিয়েছিলেন লন্ডনে তাঁর মায়ের ঠিকানা। অকথ্য অত্যাচারে একসময়
দেখা দিলো মস্তিষ্ক বিকৃতি।
অবশেষে এলো সেই দিন। ১৩-ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৪। খুব ভোরে
হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বন্দী শিবিরের ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করানো হলো বছর
তিরিশের নূর-কে। জন্ম থেকে মুখচোরা মেয়েটি মুখ বন্ধ রেখেছিলেন গেস্টাপো বাহিনীর
অকথ্য অত্যাচারেও। ফায়ারিং স্কোয়াডের গুলিতে মৃত্যুর আগে অস্ফুট উচ্চারণে
বেরিয়েছিল শুধু, ‘লিবার্তে মানে ‘মুক্তি’!
রক্তাক্ত দেহে তারপরেই লুটিয়ে পড়লো সে। বয়স তখন মাত্র তিরিশ বছর।
অভূতপূর্ব এই সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের জন্য ফরাসী সরকার
তাঁকে মরণোত্তর Croix de Guerre এবং বৃটিশ সরকার George
Cross সম্মানে ভূষিত করে। ২০১২ সালে লন্ডনের গর্ডন স্কোয়ারে নূর
ইনায়েত খানের আবক্ষ মূর্তির আবরণ উন্মোচন করেন স্বয়ং রানী এলিজাবেথ। ২০২০ সালের
অগস্টে তাঁকে সম্মানিত করা হয় ব্রিটেনের ‘ব্লু প্লেক’
সম্মানে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত হিসেবে তিনিই এই সম্মানের প্রথম প্রাপক।
২০১৪ সালে নূর ইনায়েত খানের জীবনী নিয়ে তৈরি হয় হলিউডের
ছবি Enemy
of the Reich: The Noor Inayat Khan Story।
তবে কোন দেশকে তাঁর মাতৃভূমি বলে মনে করবেন? নিজেও কি জানতেন শিকড়হীন এই ভারতীয় রাজ পরিবারের উত্তরসূরি নূর? তাঁর বাবার সুফিবাদে অনুপ্রাণিত হয়ে বিশ্বমানবতাই ছিল তাঁর দেশ।
(তারিণী খুড়ো)
