১৯৬৪ সালে নোবেল কমিটি তাঁকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করলেও তিনি নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করেননি। নোবেল পুরস্কার গ্রহণ না করার কারণ হিসেবে তিনি বলেন- আমি সব সময়ই অফিশিয়াল সম্মান এড়িয়ে চলেছি কারণ লেখকের উচিত নয় নিজেকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে দেওয়া। নোবেল পুরষ্কার নিতে অস্বীকার করা এরকম মানুষ যে অনন্যদের মাঝেও ব্যতিক্রমী তা বলাই বাহুল্য; উনি জাঁ পল সার্ত্রে। আজ ওনার জন্মদিন, আসুন জন্মদিনে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাঁকে স্মরণ করার পাশাপাশি চিনে নেই এহেন মানসিক স্থৈর্য দেখানো অনন্য ব্যক্তিটিকে।
সার্ত্রের জন্ম ফ্রান্সের প্যারিস শহরে, ১৯০৫ সালের ২১ জুন। তাঁর পিতা ফরাসী নৌবাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা জ্যঁ ব্যাবিস্টে সার্ত্রে যখন মারা যান তখন সার্ত্রে’র বয়স মাত্র ১৫ মাস। ১৯৫২ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী আলবার্ট সোয়াইৎজারের ভাইয়ের মেয়ে আনেমারি তাঁর মা। শৈশবে একটি বড় সময় কেটেছে যাদের সঙ্গে সেই মা, এনি ম্যারি এবং দাদু চার্লস শোয়েটজারের প্রভাবকেই নিজের জীবনে মেনেছেন সার্ত্রে। যদিও সার্ত্রের বয়স যখন নয় বছর, তখন দ্বিতীয় বিয়ের কারণে মায়ের সঙ্গেও খানিকটা দূরত্ব বাড়ে তাঁর।
জাঁ পল সার্ত্রের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় প্যারিস শহরের ‘লিসে
দ্য ল’ রোসেইয়া’ এবং ‘লিসে লেগ্রাঁদ’ স্কুলে। তাঁর ছেলেবেলায় শিক্ষার
প্রথম পাঠ শুরু হয় দাদুর কাছ থেকে। তিনি সার্ত্রেকে গণিত পড়াতেন এবং ক্লাসিক
সাহিত্যের সঙ্গেও পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯২০-এর দশকে কিশোর বয়সে ফরাসী দার্শনিক হেনরি
বার্গসনের ‘টাইম অ্যান্ড ফ্রি উইল : অ্যান এসে অন দি
ইমিডিয়েট ডেটা অব কনশাসনেস’ পড়ে দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন
সার্ত্রে। দর্শনশাস্ত্র পড়ার জন্য ১৯২৫ সালে তিনি ভর্তি হন 'ফরাসি
বুদ্ধিজীবীদের সূতিকাগার' বলে কথিত 'ইকোলে
নরমাল সুপিরিয়র'-এ। পরীক্ষায় প্রথমবার অকৃতকার্য হলেও,
দ্বিতীয় বারে ১৯২৯ সালে কৃতকার্য হন। দর্শনশাস্ত্রে ডক্টরেট
ডিগ্রিও অর্জন করেন তিনি এখান থেকেই।
'ইকোলে নরমাল সুপিরিয়র'-এ পড়ার
সময়েই জাঁ পল সার্ত্রের কেন্ট, হেগেল এবং হেইডেগারের মতো
দার্শনিকদের তত্ত্ব অধ্যয়ন। এরই মাঝে ১৯২৯ সালে সার্ত্রের পরিচয় ঘটে সেই সময়কার
আরেক আলোচিত লেখিকা সিমন দ্য বোভোঁয়ার সঙ্গে, যার সাথে
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত একটি চমৎকার সম্পর্ক বজায় ছিল সার্ত্রে’র। ১৯২৯ থেকে ১৯৩৪ পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর মিসর, গ্রিস,
ইতালি ও জার্মানি ঘুরে বেড়ান। প্রাচীন সভ্যতার এইসব নগরী ঘুরে তিনি
দার্শনিক জিজ্ঞাসার বিভিন্ন তথ্য, উপাত্তের সন্ধানে ব্যাপৃত
থাকেন। ১৯৩১ সালে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে লা হার্ভেতে যোগ দেন সার্ত্রে। ১৯৩২ সালে
বৃত্তি নিয়ে জার্মানিতে দর্শনশাস্ত্রের ওপর উচ্চতর শিক্ষার জন্যে যান। দার্শনিকতা
ও জীবন জিজ্ঞাসা আরো ব্যাপক আকাঙ্ক্ষার জন্ম দেয়। ফলে একদিকে তিনি ১৯৩৫ সালে
প্যারিসের লিসে কঁদরসে শিক্ষকতা শুরু করেন, অন্যদিকে এডমুন্ড
হুসরল ও মার্টিন হাইত্তোগারের কাছে দর্শনশাস্ত্র পাঠ করতে থাকেন। এভাবেই চলতে থাকে
তাঁর দর্শনচর্চা।
এর মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ফরাসী
সেনাবাহিনীতে যোগ দেন একজন ‘মেটেরোলজিস্ট’ হিসেবে
এবং নাৎসি বাহিনীর হাতে বন্দীও হন। জার্মানদের কাছে যুদ্ধবন্দি থাকা অবস্থাতেই
রচনা করেন তাঁর প্রথম নাটক। যদিও অসুস্থতার কারণে বন্দি হবার বছরখানেকের মাথাতেই
সার্ত্রেকে মুক্তি দেয় নাজি বাহিনী।
প্যারিসে ফিরে স্বাধিকার আন্দোলনের সাথে যুক্ত একটি
আন্ডারগ্রাউন্ড গ্রুপে (নাৎসী বিরোধী দলে)র সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন সার্ত্রে।
সেইসঙ্গে চলে লেখালেখিও। ১৯৪৪ সালে প্যারিসে যুদ্ধাবসানের সময়কালে তিনি আমেরিকার
কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেন যা উচ্চ-প্রশংসিত হয় এবং সার্ত্রের সুনাম
ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই পাশ্চাত্য জগতের এই দার্শনিক চিন্তানায়ক সারা বিশ্বে
খ্যাতির শিখরে ওঠেন। মার্কসবাদ ঘেঁষা তাঁর দার্শনিক মতবাদ; তাঁর মনোভঙ্গিও তদানুরূপ। তাঁর নিজস্ব দার্শনিক মতবাদ ‘লেস্ শেমিনস্ দ্য লা লিবার্তে’ তিনখণ্ডে প্রকাশিত
হয় ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত। সার্ত্রের সমাজতান্ত্রিক মতবাদ ‘ক্রিতিক দ্য লা রেসঁ দিয়া লেক্তিক’ গ্রন্থাকারে
প্রকাশিত হয় ১৯৬০ সালে। ১৯৭১ সালে তাঁর আত্মজীবনী ‘ফ্লরেয়ার’
প্রকাশিত হলে সারা বিশ্বে বিস্ময়কর আলোড়নের সৃষ্টি হয়।
সার্ত্রের যে লেখনীগুলো তাঁকে বিশ্বদরবারে স্বতন্ত্র
পরিচিতি এনে দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে ‘লা নাজি’, ‘দ্য মুর’, ‘ব্যারিওনা’ (প্রথম
নাটক), ‘দ্য ফ্লাইজ’, ‘নো এক্সিট’,
‘দ্য এজ অব রিজন’, ‘দ্য রেসপেক্টফুল
প্রস্টিটিউট’, ‘দ্য ভিক্টরস’, প্রভৃতি।
এসবের বাইরে দার্শনিক যেসব প্রবন্ধ ও সমালোচনা দিয়ে সার্ত্রে বিশ্ববাসীর নজর কাড়েন,
তার মধ্যে রয়েছে ‘ইমাজিনেশন : এ সাইকোলজিক্যাল
ক্রিটিক’, ‘দ্য ট্রানসেন্ডেন্স অব দ্য ইগো’, ‘স্কেচ ফর এ থিওরি অব দ্য ইমোশন্স’, ‘দি ইমেজিনারি’,
‘বিয়িং অ্যান্ড নাথিংনেস’, ‘এক্সিসটেনসিয়ালিজম
ইজ এ হিউম্যানিজম’, ‘সার্চ ফর এ মেথড’, ‘ক্রিটিক অব ডায়ালেকটিক্যাল রিজন’, ‘এন্টি সেমাইট
অ্যান্ড জিউ’, ‘বদলেয়ার’, সিচুয়েশন
সিরিজ (ওয়ান টু টেন), ‘ব্ল্যাক অরফিউজ’, ‘দ্য হেনরি মার্টিন অ্যাফেয়ার’ প্রভৃতি। এ ছাড়া
সার্ত্রের লেখা আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘সার্ত্রে
বাই হিমসেল্ফ’, ‘দ্য ওয়ার্ডস’, ‘উইটনেস
টু মাই লাইফ কোয়াইট মোমেন্টস ইন এ ওয়ার’ এবং ‘ওয়ার ডায়েরিস’।
জাঁ পল সার্ত্রের ‘বিইং অ্যান্ড নাথিংনেস’
বইয়ে তিনি সকল ঘটনার পেছনে দুটি বাস্তবতা আছে বলে উল্লেখ করেন। একটি
হচ্ছে সত্তা এবং অন্যটি চেতনা। একদিকে থাকে আমাদের চেতনা তৈরি করার বস্তুগত সত্তা,
অন্যদিকে থাকে সেই সত্তা হতে সৃষ্ট চেতনা বা জ্ঞান। সার্ত্রে
এক্ষেত্রে দুটি নাম ব্যবহার করেছেন। ‘দ্য বিং ইন ইটসেলফ’
যা হচ্ছে সত্তা নিজে এবং ‘দ্য বিং ফর ইটসেলফ’
যা হচ্ছে সত্তার জন্য সৃষ্ট চেতনা। অর্থাৎ, মোটা
দাগে দুটি বিষয় পৃথিবীতে বিরাজমান। একটি হচ্ছে ‘থিং’ বা সত্তা/জীব/পদার্থ/বস্তু এবং অপরটি হচ্ছে ‘নো-থিং’
(Nothing = No thing) বা চেতনা, যা কোনো বস্তু
নয়।
সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ সম্পর্কে ‘একজিসটেনশিয়ালিজম’
বা অস্তিত্ববাদ সম্পর্কে দুচার কথা জানা আবশ্যিক। তবে অস্তিত্ববাদ
বিষয়ে জানার আগে ‘এসেনশিয়ালিজম’ সম্পর্কে
জানতে হবে। এসেনশিয়ালিজম শব্দটির কাছাকাছি বাংলা অর্থ হতে পারে সারবাদ বা
সারাংশবাদ। আপনি কখনো “জীবনের অর্থ কী” এ ধরনের প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন? জীবনের অর্থ বলতে
কেউ বলবে প্রেম, কেউ বলবে ঈশ্বর, আবার
কেউ বলবে মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে আসাটাই জীবনের অর্থ। পৃথিবীতে বিদ্যমান প্রতিটি
জীব/জড়ের একটি নির্দিষ্ট পরিচয় বা সত্ত্বা রয়েছে যা তার অস্তিত্বের অর্থ বহন করে।
এই ভাবনাকে বলা হয় এসেনশিয়ালিজম। একটি ছুড়ির হাতল কাঠের বা লোহার হতে পারে। কিন্তু
কেবল হাতলের সঙ্গে যদি কোনো ব্লেড না থাকে, তাহলে সেটিকে কেউ
ছুড়ির বলবে না। কারণ ব্লেড হচ্ছে ছুড়ির পরিচায়ক। আবার মানুষ বুদ্ধি, বিবেক নিয়ে পৃথিবীতে আসে বলে সে মানুষ। বুদ্ধি না থাকলে দর্শনের ভাষায়
বলাই যায় মানুষ হিসেবে তার ‘এসেন্স’ নেই।
আমরা সাধারণত বলে থাকি লোকটি অন্তঃসারশূন্য। আড়াই হাজার বছর পূর্বে এসেনশিয়ালিজম
নামক এই দার্শনিক মতবাদের প্রবর্তন করেন প্লেটো এবং তার শিষ্য অ্যারিস্টটল।
সুপ্রাচীন এসেনশিয়ালিজমের দিকে আঙ্গুল তোলেন জ্যঁ পল সার্ত্রে। তার মতে, আমাদের অস্তিত্ব আমাদের পরিচয়ের অগ্রবর্তী। অর্থাৎ, মানবীয়
গুণাবলীর মতো উপাদানগুলোর পূর্বে আমাদের অস্তিত্ব জরুরি। অস্তিত্ব লাভ করে তবেই
আমরা নিজেদের জীবনের অর্থ খুঁজি। তার এই ভাবনাই ‘একজিসটেনশিয়ালিজম’
বা অস্তিত্ববাদ নামক দর্শনের নতুন ধারার কাঠামো তৈরি করে।
সার্ত্রের এ ভাবনা খুব সহজ মনে হলেও সে সময় তা ছিল
বৈপ্লবিক। কারণ, এসেনশিয়ালিজমে বিশ্বাসী মানুষ বিশ্বাস করতো তারা
নিজেদের পরিচয় নিজেরা সৃষ্টি করে না, বরং সৃষ্টিকর্তা সব ঠিক
করে দেন। কিন্তু অস্তিত্ববাদ মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য মানুষের ইচ্ছার উপর ছেড়ে
দেয়।
প্রথাবিরোধী সার্ত্রে বিয়ে করেননি, বিখ্যাত ফরাসি নারীবাদী লেখিকা সিমন দ্য বোভোঁয়ারের সঙ্গে সহবাস করেছেন
আজীবন। সার্ত্রে ও বান্ধবী বোভোঁয়ার মিলে ‘লেস ভেজপস মোদারনেস’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের
করতেন। এ পত্রিকাটি সে সময় দারুণ জনপ্রিয়তা লাভ করে।
সার্ত্রের বহুমুখী সাহিত্য প্রতিভার জন্য ১৯৬৪ সালে তাঁকে
নোবেল পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পুরস্কারের প্রতি তাঁর
বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই জানিয়ে তিনি সেই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।
ফুসফুস সংক্রান্ত জটিলতা এবং শারীরিক নানা প্রতিবন্ধকতার
কারণে ১৯৮০ সালের ১৫-ই এপ্রিল ৭৪ বছর বয়সে জন্মস্থান প্যারিসেই শেষনিশ্বাস ত্যাগ
করেন এই মহান দার্শনিক ও চিন্তানায়ক।

দারুন
উত্তরমুছুন