সুরের আকাশের ভিন্ন এক ধ্রুবতারা তিনি। সারা দেশের গানের সুরে আজ পঞ্চমের উচ্ছ্বাস, কারণ আজ তাঁর ৮৩-তম জন্মদিন; হ্যাঁ আমি পঞ্চম নামে বিখ্যাত রাহুল দেব বর্মন-এর কথাই বলছি! শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার সাথে তাঁকে স্মরণ করার পাশাপাশি তাঁর সম্পর্কে রইল এমন কিছু অজানা গল্প ও তথ্য, যা আরও একটু ভালো করে চিনতে ও বুঝতে সাহায্য করবে ৭০ এর দশকের বলিউড ইন্ডাস্ট্রির স্বর্ণযুগের কান্ডারী আরডি বর্মন-কে।
কলকাতার হিন্দুস্তান পার্কের একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন শচীনদেব বর্মন। সেই বাড়িতেই ১৯৩৯ সালের ২৭-শে জুন রাহুলের জন্ম। ১৯৪৮ সালে শচীন কত্তা ৩৬/১ সাউথ এন্ড পার্ক, কলকাতা- ২৯ –এ বাড়ি করে চলে আসেন। বাবা-মা মুম্বই চলে গেলে কলকাতায় দিদিমাকে নিয়ে এই বাড়িতেই থাকতেন রাহুল। সেখান থেকে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল, তীর্থপতি ইন্সটিটিউটে পড়াশোনা।
তাঁর জন্মের পর তাঁকে দেখতে এসে অভিনেতা অশোক কুমার লক্ষ্য করলেন যে শিশুটি যেন অবিকল সরগমের পঞ্চম সুর ‘পা’ ধ্বনিতে শব্দ করে কাঁদছে। অশোককুমার-ই তাঁর নাম দিলেন ‘পঞ্চম’।
সুরের সম্রাট শচীন দেব বর্মণ এবং মীরা দেব বর্মণের হাত ধরেই সঙ্গীতের শিক্ষা শুরু। পরে উস্তাদ আলি আকরব খাঁ ও আশিষ খানের কাছে সরোদের এবং তবলার তালিম নেন সমতা প্রসাদের কাছে। এছাড়াও তিনি খুব ভালো মাউথ অর্গান বাজাতে পারতেন। শ্বাসের সমস্যা থাকায় ঠিকভাবে কথা বলতে পারতেন না ছোটবেলায়। গান গাওয়ার কোনও প্রশ্নই ছিল না। ডাক্তার সাফ মানা করেছিলেন। কারণ ফুসফুসের সেই ক্ষমতাই নেই। সাঁতার কেটে এই সমস্যাকে দূর করেছিলেন পঞ্চম, যাকে বাবা-মা-দিদা সহ পরিবারের লোকেরা টুবলু নামে ডাকতো।
পিতা সচিন দেব বর্মন ছোটবেলায় একবার জিজ্ঞাসা করেন “বড় হয়ে কি হবে ?” উত্তরে ছোট্ট পঞ্চম বলেছিলেন “আমি সাইকেল ভালো চালাই, তাই বড় হয়ে সাইকেল চালাবো।”
রাহুল দেব বর্মন প্রথম যে গানটায় সুর করেছিলেন, সেটি হল, 'অ্যায় মেরি টোপি পলটকে আ'। এই গানটি পরে তাঁর বাবা শচীন দেব বর্মন ব্যাবহার করেছিলেন ১৯৫৬ সালের 'মিস্টার ফান্টুস ফিল্মে'। মজার কথা এই গানের সুরটি রাহুল দেব বর্মন করেছিলেন যখন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৯ বছর! আরেকটি গান ‘সার জো তেরা চাক্রায়ে’ও রাহুলের সুর করা এবং এটিও শচীন দেব বর্মন ১৯৫৭ সালের চলচ্চিত্র 'পিয়াসা'-তে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন।
১৯৫৮ সালের চলচ্চিত্র 'সোলভা সাল' এ 'হ্যায় আপনা দিল তো আওয়ারা' গানটির সুর রাহুলই করেছিলেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় এর গাওয়া গানটি দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। এই গানে মাউথঅর্গ্যানও বাজিয়েছিলেন আর ডি বর্মন।
১৯৫৯ সালে রাহুল গুরু দত্তের সহকারী, নিরঞ্জন-এর পরিচালনায় একটি চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনার জন্য স্বাক্ষরিত হন কিন্তু ঐ চলচ্চিত্রটি শেষ অবধি মুক্তি পায়নি। রাহুল দেব বর্মন এককভাবে প্রথম কোনও ফিল্মে সুর দেন ১৯৬১ সালে, মেহমুদের ফিল্ম 'ছোটে নবাব'-এ। মেহমুদ অবশ্য চেয়েছিলেন এই ফিল্মের সুর করুন শচীন কর্তা। কিন্তু শচীন দেব বর্মন জানিয়ে দেন যে, তাঁর হাতে ফ্রি ডেট একেবারে নেই। সেই সময় রাহুল দেব বর্মনকে তবলা বাজাতে দেখে নিজের ছবির জন্য সুরকার হিসেবে সই করান রাহুলকে। ১৯৬৬ সালের চলচ্চিত্র ‘তিসরি মঞ্জিল’ ছিলো রাহুলের জীবনের প্রথম হিট চলচ্চিত্র।
শচীন দেব বর্মন মহাশয় নিজের সন্তান রাহুল দেব বর্মনের ব্যাপারে খানিকটা আক্ষেপ করে সলিল চৌধুরীকে চিঠি লিখেছিলেন। কারণ, রাহুল দেবের পাশ্চাত্য সঙ্গীতের প্রতি আকর্ষণ। তাঁর ছেলেকে যেন সলিলবাবু একটু বোঝান— রাহুল সলিলবাবুর কথা বেশি শোনে, তাঁর কথা শুনতে চায় না। শোনা যায়, সলিল উত্তরে বলেছিলেন যে, রাহুল তার নিজের রাস্তা খুঁজে বার করে নেবে। আরও বলেছিলেন যে, যদি এক জন মহান সুরকার অর্থাৎ শচীন দেব বর্মন নিজে ভাটিয়ালি গানের সুরে হিন্দি ফিল্মের জগৎকে তোলপাড় করতে পারেন, রাহুলও তার সুর দিয়ে চেষ্টা করবে।
রাহুল দেববর্মন যখন বালক, তখন বাবা বিখ্যাত সংগীতব্যক্তিত্ব। কত কত গান তাঁর সুরে বিখ্যাত হয়েছে। অথচ অনেকে জেনে অবাক হবেন, রাহুল কিনা গুরু মানতেন ওই সময়ে আরেক বিখ্যাত সুরকার সলিল চৌধুরীকে। সলিল ও রাহুল দুজনেরই কিন্তু সাঙ্গীতিক রসদের ভাঁড়ার লোকসঙ্গীত। দুজনের সঙ্গীতের মূল কিন্তু সেখানেই। তার সঙ্গে ছেলেবেলা থেকেই মিশেছে পশ্চিমি সঙ্গীতের শ্রবণাভ্যাস। সলিলের ক্ষেত্রে পশ্চিমি ধ্রূপদী সঙ্গীত, রাহুলের ক্ষেত্রে জ্যাজ, পপ ও পরে রক।
একদিনের ঘটনা, রোজের মতোই মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছিলেন শচীনকর্তা। বাড়ি ফিরে রাহুলকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। সে দিনের রাহুল তো অবাক। পরে বাবার মুখে শুনলেন, আজ রাস্তায় বেশ কিছু মানুষ তাঁকে রাহুল দেব বর্মনের বাবা বলে চিহ্নিত করায় তিনি বেজায় খুশি।
রাহুলের প্রথম স্ত্রী রিটা। রিটা প্যাটেল নামের এই তরুণীর
সঙ্গে রাহুলের দার্জিলিং-এ পরিচয় হয়েছিলো। রিটা তার বান্ধবীদেরকে বাজী
লাগিয়েছিলেন যে তিনি রাহুলের সঙ্গে ডেটিং এ যাবেন, হয়েওছিলো তাই। রাহুল রিটাকে ১৯৬৬ সালে বিয়ে করেন। রাহুলের সঙ্গে রিটার ১৯৭১ সালে
বিচ্ছেদ হয়ে যায় এবং রাহুল শোকে মুষড়ে পড়েন। ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ছবি ‘পরিচয়’
ছবির 'মুসাফির হুঁ ইয়ারো' গানটির সুর
রিটার সঙ্গে বিচ্ছেদের পরেই করেন রাহুল। কিশোর কুমারকে দিয়ে গাওয়ানো এই গানটি
দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে আছে আজও।
১৯৮০ সালে তাঁর থেকে ছয় বছরের বড়, গায়িকা আশা ভোঁসলেকে বিয়ে করেন রাহুল। প্রত্যেক সম্পর্কেই মান-অভিমান থাকে। আশা-রাহুলও তার ব্যতিক্রম নন। রাহুলের মৃত্যুর অনেক বছর পর এক সাক্ষাত্কারে আশা শেয়ার করেছিলেন তাঁদের ঝগড়ার টপিক। শুনলে অবাক হবেন, গান নিয়েই মান-অভিমান হত তাঁদের। আশার মনে হত, সব রোম্যান্টিক গান রাহুল লতা মঙ্গেশকরকে দিয়ে গাওয়াতেন। আর আশার জন্য থাকত সব হাই পিচের গান।
রাহুল দেব বর্মন সুরকার হিসাবে তো বটেই গায়ক হিসাবেও অনেক বড় অবদান রেখে গিয়েছেন। 'শোলে' ছবির 'মেহবুবা মেহবুবা' গানটি তাঁর কণ্ঠে অসামান্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল। জানা যায়, তিনি তাঁর গায়কীর ক্ষেত্রে বিখ্যাত মার্কিন জ্যাজ় গায়ক লুই আর্মস্ট্রং দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিলেন। প্রচলিত প্লেব্যাক আর্টিস্টদের মতো স্টেরিওটাইপ হতে চাননি। অভিনয়ও করেছিলেন আর ডি বর্মন। মেহমুদের ‘ভূত বাংলা’ ছবি দিয়ে তিনি অভিষেক করেন। তারপর ‘পেয়ার কা মৌসম’-এও অভিনয় করেছিলেন।
লতা মঙ্গেশকরের সাথে রাহুলের সম্পর্কটা ছিলো একদমই ভিন্ন রকমের। একদিন আচমকাই পঞ্চম এসে বলেছিল তার লতাদি কে, তোমাকে দিয়ে একেবারে অন্যরকম একটা গান রেকর্ড করতে চাই। এক্কেবারে অন্যধারার সেই গান যা পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে এক নতুন মাইলস্টোন হয়ে যাবে। ক্যারাভেন সিনেমার সেই আশ্চর্য গান, ‘দিলবর দিল সে প্যারে’। বস্তুত পঞ্চমের সেই হাফপ্যান্ট বেলা থেকেই তাঁর ভীষণ কাছের মানুষ ছিলেন লতা মঙ্গেশকার। শ্রদ্ধা-বিশ্বাস-ভালোবাসার একটা আশ্চর্য বাঁধন ছিল দুজনের মধ্যে। কিভাবে তাদের প্রথম দেখা সে কথা স্পষ্ট মনে আছে লতাজির। এস ডি বর্মনের সঙ্গে একটা গানের রেকর্ডিং-এ ব্যস্ত তখন তিনি। অটোগ্রাফের খাতা হাতে সেই রেকর্ডিং রুমে গুটিগুটি পায়ে এসেছিল এক সদ্য কিশোর; সেদিন কি লিখেছিলেন সেই অটোগ্রাফের খাতায় লতা মঙ্গেশকার আজও সে কথা মনে পড়লে হেসে ফেলেন সুর সম্রাজ্ঞী। সেদিন রাহুল দেবের অটোগ্রাফের খাতায় সই করার বদলে তিনি লিখে দিয়েছিলেন ‘পঞ্চম বদমাশি ছোড় দো’, যা দেখে হেসে পালিয়েছিল সেদিনের কিশোর পঞ্চম।
লতা মঙ্গেশকার কে বরাবর দিদি বলে ডাকতেন পঞ্চম। শুধু ভাই নয়, তাঁকে প্রায় নিজের সন্তানের মতো দেখতেন লতা। রাহুল দেব বর্মন বিয়ে করেন লতা মঙ্গেশকারের ছোটবোন আশা ভোঁসলেকে। বিয়ের সময় দিদি লতার কাছে পঞ্চম নাকি একটি চিঠির আবদার করেছিলেন। এমন একটা চিঠি যা তিনি আজীবন সযত্নে ব্যাংকের লকারে তুলে রাখবেন। সত্যি সত্যিই তিনি আজীবন নিজের কাছেই রেখেছিলেন তার দিদির লেখা সেই চিঠি। আর ডি বর্মনের জীবনে এতটাই মূল্যবান ছিলেন লতা।
ভারতীয় দর্শককে ইলেকট্রিক অরগানের সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিলেন ‘ও মেরে সোনা রে’ গান-এর মাধ্যমে। সঙ্গীত ক্যারিয়ারে মোট ২৯২-টি হিন্দি সিনেমা এবং ৩১-টি বাংলা ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেন রাহুল। কম্পোজিশনের এক অসাধারণ রেকর্ড রয়েছে রাহুলের। ১৯৭২ সালে মোট ১৯-টি ছবিতে সুরারোপের কাজ করেছিলেন তিনি, যা আজও এক রেকর্ড।
বৃষ্টির ফোঁটার শব্দের জন্য তিনি সারা রাত নিজের ব্যালকনিতে বসে থাকতেন। সঙ্গীত কিভাবে তাঁর জীবনধারায় ঢুকে ছিলো, তা জানতে হলে কয়েকটি মজার ঘটনা জানানো যাক। একদিন আশা ভোঁসলেকে নিয়ে শপিংয়ে বেরিয়েছেন আরডি, তার আগে লং ড্রাইভ। শপিংয়ের কথা মাথা থেকে বেমালুম উধাও। আশাজি মনে করানোর পর দুটো কাচের গ্লাস কিনে বাড়ি ফিরলেন। আর সেই কাচের গ্লাসে চামচ ঠুকেই সৃষ্টি হল সেই বিখ্যাত গান- 'চুরালিয়া হে তুমনে জো দিল কো'। আবার 'কিতাব' ছবিতে 'মাস্টারজি কি আগয়ি চিঠ্ঠি' গানে ডেস্ক বাজিয়ে রেকর্ডিং করেছিলেন পঞ্চম, স্কুল থেকে ডেস্ক আনিয়ে।
একবার একটি মোনোটোনাস শব্দ তৈরীর জন্য আরডি সারারাত ভাবলেন। পরের দিন সকালে গুলজারকে সঙ্গে নিয়ে গেলেন রেকর্ডিং রুমে। বাসু যিনি আরডি-র সাথে ডবল বেস বাজাতেন তাঁকে বললেন- "দু বোতল সোডা মাঙ্গা।" বাসু খুব অবাক হয়ে বললেন, "আজতো কোনো পার্টি হওয়ার কথা নয় তাহলে সোডা কী হবে?" তখন পঞ্চম বললেন, "লে কে আ না ইয়ার।" ক্যান্টিন থেকে সোডার বোতল এল এবং সাথে এল একটি বালতি। আরডি দুটো বোতল থেকে একটু একটু করে সোডা বালতিতে ঢেলে দেন, তারপর ফুঁ দিয়ে বাজান। বোতলের লেভেল আলাদা তাই দুটো কম্বিনেশনে দারুণ তৈরি হল ঘ্যানঘ্যানে মোনোটোনাস শব্দটি। এইভাবে তৈরি হল 'খুশবু' সিনেমার 'ও মাঝি রে' গানটি।
১৯৯৪ সালে তাঁর অকাল মৃত্যুর পর এতগুলো দিন কেটে গেলেও, আজকের এই সাউন্ড টেকনোলজির যুগে দাঁড়িয়েও এক বাক্যে বলা যায় ইন্ডিয়ান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে রাহুল দেব বর্মন এর কোন বিকল্প নেই। তিনি পরবর্তী প্রজন্মের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকিয়ে দিয়েছেন তার অমূল্য সব সৃষ্টি। যার জন্য প্রতিমুহুর্তেই অখণ্ড কৃতজ্ঞতায় আরডি-কে ভরিয়ে দেওয়া ছাড়া আমাদের হাতে আর কিছুই থাকে না। ইজাজাত ছবিতে গুলজার সাহেবের কথায় রাহুল দেব বর্মনের সুরে তাকেই যেন বারবার তাই বলতে হয়, “মেরা কুছ সামান তুমহারে পাস করা হয়”। তবে এক্ষেত্রে আমাদের সামান সামান্য নয়, আমাদের পুরো হৃদয়-টাই যেন বন্দক কাছে রাহুল দেব বর্মনের কাছে।
(তারিণী খুড়ো)
