রামেন্দ্রসুন্দর - বাংলা বিজ্ঞান সাহিত্যের জনক

কবিগুরু লিখছেনঃ হে মিত্র, পঞ্চাশৎবর্ষ পূর্ণ করিয়া তুমি তোমার জীবনের ও বঙ্গসাহিত্যের মধ্যগগনে আরোহণ করিয়াছ, আমি তোমাকে সাদর অভিবাদন করিতেছি। যখন নবীন ছিলে তখনই তোমার ললাটে জ্ঞানের শুভ্র মুকুট পরাইয়া বিধাতা তোমাকে বিদ্বৎসমাজে প্রবীণের অধিকার দান করিয়াছিলেন। আজ তুমি যশে ও বয়সে প্রৌঢ়, কিন্তু তোমার হৃদয়ের মধ্যে নবীনতার অমৃতরস চিরসঞ্চিত। অন্তরে তুমি অজয়, কীর্তিতে তুমি অমর, আমি তোমাকে সাদর অভিবাদন করিতেছি – যার সম্বন্ধে লিখেছেন, সেই রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর আজ প্রয়াণ দিবস। যার সম্বন্ধে এমন স্তুতি আপমর বাঙালির নয়নের মণি রবি ঠাকুরের, তাঁকে কতটা চেনে গড়পড়তা বাঙালি? তাঁর প্রয়াণ দিবসে তাই তাঁকে চেনার মধ্যে দিয়ে স্মরণ করা যাক।

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী

রামেন্দ্রসুন্দর মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দি মহকুমার ‘জেমো’ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম গোবিন্দসুন্দর এবং মা চন্দ্রকামিনী। বাংলা ভাষার চর্চার জন্য বিখ্যাত রামেন্দ্রসুন্দর কিন্তু জন্মসূত্রে বাঙালি ছিলেন না। তাঁর পূর্বপুরুষরা রামেন্দ্রসুন্দরের জন্মের দুশো বছর আগেই উত্তরপ্রদেশ থেকে মুর্শিদাবাদে এসে বসবাস করা শুরু করেন। 

শৈশবকাল থেকেই রামেন্দ্রসুন্দর মেধাবী ছিলেন। রামেন্দ্রসুন্দরের শিক্ষাজীবন ছিল অত্যন্ত কৃতিত্বপূর্ণ। তিনি ১৮৮১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এনট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং এর ফলে ২৫ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। ১৮৮৩ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে এফএ পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন এবং একটি স্বর্ণপদক ও বৃত্তি পান। একই কলেজ থেকে ১৮৮৬ সালে বিজ্ঞানে অনার্স সহ বি.এ পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। প্রকৃতপক্ষে একমাত্র এফ.এ পরীক্ষা ছাড়া জীবনের অন্য সকল পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে এম.এ. পরীক্ষায় বিজ্ঞানশাস্ত্রে স্বর্ণপদক ও পুরস্কারসহ প্রথম স্থান পান এবং ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে পদার্থবিদ্যা ও রসায়নে প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি পান। ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে রিপন কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান ও রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক হন। এই রিপন কলেজই ১৯৪৮-৪৯ বর্ষে নামান্তরিত হয়ে হয় সুরেন্দ্রনাথ কলেজ৷ প্রথমে ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী অধ্যক্ষ এবং ১৯০৩ সালে স্থায়ী অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন রামেন্দ্রসুন্দর। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি এ পদেই কর্মরত ছিলেন। 

বাড়িতে রামেন্দ্রসুন্দরের পিতা, পিতৃব্য, পিতামহ সকলেই বিদ্যানুরাগী ছিলেন। ফলে শৈশব থেকেই তিনি বঙ্গদর্শন, আর্য্যদর্শন, নবজীবন, ভারতী, সাধনা প্রভৃতি পত্রিকার দেখা পেয়েছেন। আর তাই লেখালেখির প্রতি তাঁর অনুরাগ প্রবল ছিল। নবজীবন পত্রিকায় মহাশক্তিনামে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশের মাধ্যমে তার লেখক জীবনের যাত্রা শুরু। ক্রমে সাধনা, ভারতী, সাহিত্য, প্রদীপ, ভারতবর্ষ প্রভৃতি পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে থাকেন। দর্শন, ধর্মতত্ত্ব, পরিভাষা এবং প্রধানত বৈজ্ঞানিক বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ রচনা ছিল তার প্রধান আগ্রহের বিষয়। 

যে সময় বিজ্ঞানশাস্ত্র ইংরেজি ভাষার বেড়াজালে আবদ্ধ ছিল, দুর্বোধ্য বিদেশি ভাষা আয়ত্ত করে বিজ্ঞান শিক্ষা দুরূহ ছিল, তখন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বিজ্ঞানের জটিল তথ্যগুলো সহজতর করার জন্য বাংলায় বক্তৃতা দিতেন। বিজ্ঞান বিষয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মাতৃভাষাতেই ব্যাখ্যা করতেন। সেসব বক্তৃতা শোনার জন্য বিভিন্ন কলেজের ছাত্র এসে ভিড় করত তার কাছে। 

বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকায় এর উন্নতির জন্য আজীবন কঠোর পরিশ্রম করেন। ১৯১৪ সালে কলকাতা টাউন হলে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের সপ্তম অধিবেশনে বিজ্ঞান শাখার সভাপতি ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেশকরূপে বাংলায় প্রবন্ধ পাঠ করতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমতি দিতে অসম্মতি প্রকাশ করে। তিনি এর প্রতিবাদস্বরূপ প্রবন্ধ পাঠ প্রত্যাখ্যান করেন। শেষে উপাচার্য স্যার দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারী বাংলাতেই তাকে প্রবন্ধ পাঠের অনুমতি দেন। বাংলা ভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধের এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। 

সেই সময় সমাজজীবনে কোঠরভাবে পালিত হওয়া জাতিভেদ প্রথা সহ নানা সামাজিক কুপ্রথা, জাতিগত বৈষম্যর মতন সব রকম অমানবিক প্রথার বিরোধিতা করেছেন আচার্য রামেন্দ্রসুন্দর। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের তিনি ঘোর বিরোধী ছিলেন। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায়  সে বছর তাঁর আহবানে একদিন সমগ্র বাংলাদেশে অরন্ধন দিবস পালিত হয়। বঙ্গভঙ্গের বিরোধী প্রতিক্রিয়ায় এ সময় তিনি রচনা করেন বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা (১৯০৬) গ্রন্থখানি। 

তাঁর রচনা মুক্তচিন্তার  আলোকে  দীপ্ত    সাহিত্যরসে সমৃদ্ধ। তাঁর  উল্লেখযোগ্য  সাহিত্যকর্মের  মধ্যে রয়েছে: প্রকৃতি (১৮৯৬), জিজ্ঞাসা (১৯০৩), কর্মকথা (১৯১৩), চরিতকথা  (১৯১৩), শব্দকথা  (১৯১৭), বিচিত্র জগৎ  (১৯২০), নানাকথা (১৯২৪) প্রভৃতি। প্রথমটি বিজ্ঞান বিষয়ক এবং দ্বিতীয়টি দর্শনবিষয়ক প্রবন্ধের সংকলন। 

বিজ্ঞান সম্পর্কিত লেখালেখির কালে রামেন্দ্রসুন্দর অক্ষয়কুমার দত্তকে গুরু বলে মান্য করেন৷ অক্ষয়কুমারকে বিজ্ঞান বিষয়ক লেখার স্রষ্টা বলা চলে বাংলা বিজ্ঞান লেখার ইতিহাসে৷ কিন্তু বিজ্ঞান সাহিত‍্য বলতে যা বোঝায় তার জন্য বাঙালিকে আরো কিছুকাল প্রতীক্ষা করতে হয়েছিল রামেন্দ্রসুন্দর এিবেদীর় লেখালেখির সময় পর্যন্ত৷ রামেন্দ্রসুন্দর অক্ষয়কুমারের উত্তরসূরি এবং বাংলা ভাষায় প্রকৃত বিজ্ঞান সাহিত্যের স্রষ্টা। 

রামেন্দ্রসুন্দরের পরের প্রজন্মের একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু রামেন্দ্রসুন্দরের বিজ্ঞানদর্শনের, বস্তুত তাঁর জীবনদর্শনের, প্রবল বিরোধিতা করেছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু নিজে ছিলেন রিয়্যালিস্ট’, মন-নিরপেক্ষ বাস্তব জগতের প্রকৃত অস্তিত্ব নিয়ে তাঁর মনে কোনও সংশয় ছিল না। চাঁদটা সত্যি সত্যিই ওই ওখানেআছে, এ বিশ্বাস যদি আমার না-ই থাকবে, তাহলে চাঁদ নিয়ে আমি মাথা ঘামাব কেন? তিনি জানতেন, কত কঠিন বিধিনিষেধের বেড়া পার হয়ে তবে বিজ্ঞান কোনও একটা ধারণাকে সাময়িকভাবে মান্যতা দেয়। সেই ধারণা বাস্তব জগত্‌কে অনুধাবন করার কাজে লাগে, এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না। অথচ রামেন্দ্রসুন্দর দর্শনগতভাবে বিজ্ঞানের সেই বাস্তব-জাগতিকতাকে অস্বীকার করছেন, বলছেন বিজ্ঞানের চর্চার জগত্‌ আসলে একটা ধরে-নেওয়া, কাল্পনিক জগত্‌! সত্যেন্দ্রনাথের মতে, এর মূলে ছিল ত্রিবেদী মশায়ের পসচাদমুখী পশ্চাদমুখি বেদপন্থী সমাজের স্বপ্ন। এতদস্ত্বেও বিজ্ঞানবিষয়ক বহু বই রচনা করে সাধারণের কাছে তিনি বিজ্ঞানকে সহজলভ্য করে তোলেন। দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার উন্নতি, বিজ্ঞানচর্চার প্রসারের জন্য তার অবদান অবিস্মরণীয়। 

১৮৯৯-এর ফলিত জ্যোতিষপ্রবন্ধে যখন তিনি জ্যোতিষীদের সম্মুখসমরে আহ্বান করে লেখেন, ‘চন্দ্রের আকর্ষণে জোয়ার-ভাঁটা হয়, অতএব রামবাবুর জজিয়তি হইবে না কেন, এরূপ যুক্তি চলিবে না 

বিশুদ্ধ বিজ্ঞান ছাড়াও তিনি দর্শন ও সংস্কৃত শাস্ত্রের দুর্বোধ্য বিষয়গুলো সহজ বাংলায় পাঠকের উপযোগী করে তুলে ধরেন। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী চিন্তায় ছিলেন দার্শনিক, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে ছিলেন বৈজ্ঞানিক আর এই দুইয়ের প্রকাশ ঘটাতেন সৌন্দর্যময় সাহিত্যশিল্পীর নিপুণ কারুকার্যে। তাঁর প্রতিটি রচনা প্রাঞ্জল ভাষায় কৌতুকরসে জারিত ও তাত্ত্বিক যুক্তিতে শাণিত। রচনার সৃজনশীলতা ও উপস্থাপনের মৌলিকত্বের কারণে তিনি সকল শ্রেণীর পাঠকের কাছে ছিলেন সমানভাবে সমাদৃত।

মাত্র ৫৪ বছর বয়সে ১৯১৯ সালের ৬-ই জুন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মশাই দেহত্যাগ করেন।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন