দিল্লির এইমস সংলগ্ন এলাকার একটি ঘরে শুয়ে আছেন ষাট না পেরনো এক অকালবৃদ্ধ মানুষ। কোনোক্রমে শ্বাসটুকু ধরে রেখেছেন। একটু ভালো ডাক্তারকে দেখাবেন, তেমন অবস্থাও নেই। দারিদ্রে আকণ্ঠ নিমজ্জিত অসহায় মানুষটি তাকিয়ে থাকেন পুরনো দিনগুলোর দিকে। এই সেই দিল্লি, যেখানে একদিন এসেছিলেন বিপ্লবীর বেশে। লক্ষ্য ছিল ইংরেজ শাসকদের দমন করা। এই মানুষটি আর কেউ নন, বাংলা তথা বর্ধমানের গর্ব, বীর বিপ্লবী বটুকেশ্বর দত্ত। ২০-শে জুলাই ছিল তাঁর প্রয়াণ দিবস। তাঁর জীবনের কাহিনী জানলে তাঁর উপরে আপনার শ্রদ্ধা আরো বাড়বে। আসুন জানার চেষ্টা করি এহেন বিপ্লবী মানুষটিকে।
![]() |
| বটুকেশ্বর দত্ত |
১৮ নভেম্বর ১৯১০ সালে খণ্ডঘোষ থানা এলাকার ওঁয়াড়ি গ্রামে জন্ম হয় বটুকেশ্বর দত্তের। বর্ধমানে জন্ম হলেও বটুকেশ্বর বেড়ে উঠেছিলেন উত্তরপ্রদেশের কানপুরে। রেলে চাকরি সূত্রে, বাবা গোষ্ঠবিহারী দত্ত কানপুরে বাস করায় তাঁর বাল্যশিক্ষা সেখানেই। কানপুরেই গণেশ শঙ্কর বিদ্যার্থীর জাতীয়তাবাদী পত্রিকা ‘প্রতাপ’-এর সঙ্গে যুক্ত হন ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত। তখন থেকেই ধীরে ধীরে দুজনের সহযোদ্ধা হয়ে ওঠা।
শৈশব বাংলায় কাটানোর পর উচ্চশিক্ষার জন্য কানপুরে যান। স্নাতক হন। ভগৎ সিং ও অজয় ঘোষের সঙ্গে তৎকালীন হিন্দুস্তান রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ গ্রহণ করেন বটুকেশ্বর দত্ত। পরে যুক্ত হন হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে। যতীন্দ্রনাথ দাসকে সংগঠনে এনেছিলেন বটুকেশ্বরই। বোমা বানানোয় দক্ষ ছিলেন যতীন দাস।
পাবলিক সেফটি ও ট্রেড ডিসপুট বিল পেশ হওয়ার কথা ছিল দিল্লির তৎকালীন কেন্দ্রীয় সংসদ ভবনে। ওই দুটি বিলের প্রতিবাদে সংসদে হামলা চালানোর পরিকল্পনা করা হয়। চয়ন করা হয় বটুকেশ্বর দত্ত ও ভগৎ সিংকে। ১৯২৯-এর ৮ এপ্রিল, তৎকালীন ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল। আচমকা জোড়া বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে উঠল গোটা হল। শুরু হল প্রাণ বাঁচানোর দৌড়। দর্শকাসন থেকে দুই অকুতোভয় যুবক তখন সোচ্চার, 'ইনকিলাব জিন্দাবাদ। সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক'। জোড়া বোমা ফাটানোর পরও দর্শকাসন থেকে নড়েননি দুই তরুণ। দেশমাতৃকার জন্য নিবেদিত দুই তরুণের মুখে তখন ইনকিলাব জিন্দাবাদ। ছুঁড়ছেন কাগজ। ইংরেজ পুলিস সামনে এলেও জায়গা থেকে নড়েননি দুই তরুণ। গ্রেফতার করা হয় তাঁদের।
এক যুবককে আমরা চিনি। তিনি ভগৎ সিং। কিন্তু আর একজন? তিনি হারিয়ে গিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আজীবন উৎসর্গ করে জুটেছে ছিটেফোঁটা স্বীকৃতি, ইতিহাস বইয়ে ঝাপসা হয়ে যায় বটুকেশ্বর দত্তর নাম। অবশ্য স্বাধীন ভারতে জীবিত থেকেও বঙ্গসন্তান, বাংলার গর্ব বটুকেশ্বর দত্ত কল্কে পাননি; বিষয়টা ইচ্ছাকৃত না অনিচ্ছাকৃত তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে।
কালাপানির সাজা হয় বটুকেশ্বরের। আন্দামান সেলুলার জেলে স্থানান্তরিত করা হয় তাঁকে। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পোক্ত প্রমাণ মেলেনি। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েই ভগৎ সিং-এর ফাঁসি হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আন্দামান-নিকোবরের সেলুলার জেল থেকে সসম্মানে মুক্তি পেয়ে বটুকেশ্বর দত্ত চলে যান পাটনায়; তখন তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত ৷ সেখানেই তিনি বিয়ে করেন অঞ্জলিকে। প্রথমে পাউরুটি বেচে, পরে পরিবহণের ব্যবসায় হাত পাকানোর চেষ্টায় অসফল হয়ে নিদারুণ অর্থ কষ্টে কাহিল বটুকেশ্বরের খবর করেন বিহারের এক সাংবাদিক, 'বটুকেশ্বর দত্তের মতো বিপ্লবী এদেশে জন্ম নেওয়াই বৃথা। ঈশ্বর ভুল করেছে'। সমালোচনার মুখে টনক নড়ে তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের। তাঁর সঙ্গে দেখা করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুলজারিলাল নন্দা। পাঞ্জাব সরকারও অর্থ সাহায্য করে। এরপর ধরা পড়ে ক্যানসার। দিল্লিতে নিয়ে আসা হয় বটুকেশ্বরকে। তখন তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে পরিশ্রান্ত। অতীত স্মৃতিচারণা করে বলেছিলেন, 'ভাবতেও পারিনি হুইল চেয়ারে বসে দিল্লিতে আসব।' ভগৎ সিংকে মানুষ মনে রেখেছে ঠিকই, কিন্তু তাঁর সঙ্গীকে ভুলে গেছে।
১৯৬৫ সালে ২০ জুলাই লোকচক্ষুর আড়ালে মৃত্যু হয় বটুকেশ্বর দত্তের। শেষ ইচ্ছা মেনে ফিরোজপুরে ভগৎ সিং, রাজগুরুর সমাধির পাশে সমাহিত করা হয় তাঁকে।
এই প্রাতঃস্মরণীয়কে সহস্র কুর্নিশ জানানোর পাশাপাশি আসুন সম্মিলিতভাবে প্রয়াস করি ওনার স্মৃতিরক্ষায় সদর্থক ভূমিকা নেওয়ার।
(তারিণী খুড়ো)
