সুরের মধুবাতাস নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

রবীন্দ্র-প্রতিভা পূর্ণশক্তিতে বিকাশ লাভ করে বাঙলা সাহিত্যে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে, এমন এক সময়ে যে কজন হাতে গোনা মানুষ সাহিত্যক্ষেত্রে সৃষ্টিশীলতার জন্য আজও সমাদৃত, যে কজন মুষ্টিমেয় মানুষ তাঁদের স্বকীয় আদর্শ উদ্ভাবনে রবীন্দ্র ভাবনার সাথেও নানা প্রসঙ্গে বিরোধে গিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে যার নাম সর্বাগ্রে নিতে হয়, সেই দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের আজ জন্মদিন। বাংলা সাহিত্য, নাটক, গান, ছড়া কিংবা কবিতা সব দিকেই অবাধ বিচরণ করা মানুষটিকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করার পাশাপাশি মানুষ দ্বিজেন্দ্রলাল রায়-কে জানার ও বোঝার প্রয়াস করা যাক। 

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের জন্ম ১৮৬৩ সালের ১৯ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার কৃষ্ণনগরে। তাঁর পিতা কৃষ্ণনগর রাজ দরবারের দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্র রায় ছিলেন ছিলেন একজন বিশিষ্ট খেয়াল গায়ক ও সাহিত্যিক। তাঁর রচিত গীতমঞ্জরী’, বাংলা-হিন্দি গান, ‘আত্মজীবন-চরিত প্রগাড় সঙ্গীত প্রেমের বার্তাই দেয়। তাঁর মা প্রসন্নময়ী দেবী অদ্বৈত আচার্যের বংশধর ছিলেন। দ্বিজেন্দ্রলালের দুই দাদা রাজেন্দ্রলাল ও হরেন্দ্রলাল এবং এক বৌদি মোহিনী দেবীও ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও পত্রিকার সম্পাদক। তাঁদের বাড়িতে বহু গুণীজনের নিত্য যাতায়াত ছিল, যাঁদের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ। দীনবন্ধুর সুরধনীকাব্যে দ্বিজেন্দ্রলালের বাবাকে অমাত্য-প্রধাননামে অভিহিত করা হয়েছে। 

পিতা ও পুত্র দ্বিজেন্দ্রলালকে নিয়ে প্রচলিত একটি ঘটনা সাহিত্য মহলে উল্লেখযোগ্য। দ্বিজেন্দ্রলালের বয়স যখন পাঁচ বছর, সেই সময়ে একদিন পিতা সুগায়ক কার্তিক চন্দ্র রায় একদিন হারমোনিয়াম বাজিয়ে খেয়াল গান গাইছিলেন, পাশে বসে দ্বিজেন্দ্রলাল একমনে শুনছিলেন। গাইতে গাইতে পিতা কি একটা কাজে হঠাত্ উঠে গেলেন। দ্বিজেন্দ্রলাল সেই অবসরে হারমোনিয়াম নিয়ে বসলো এবং চাবি টিপতে লাগলো।  কিছুক্ষণ পরে কার্তিক চন্দ্র ফিরে এসে শিশু পুত্রের কাণ্ড দেখে অবাক। ছেলে তার গাওয়া কঠিন গানটি ঠিক ভাবে শুরু করে গাইছে। 

পিতার কাছ থেকেই গানের দীক্ষা হয় দ্বিজেন্দ্রের। দ্বিজেন্দ্রলালের নিজের কথায়, “আমার পিতা একজন সুবিখ্যাত গায়ক ছিলেন। প্রতুষ্যে উঠিয়া তিনি যখন ভেঁরো, আশোয়ারি ইত্যাদির সুর ভাঁজতেন, আমি অন্তরালে থাকিয়া শুনিতাম। ’-সাত বছর বয়সে নিজের চেষ্টায় হারমোনিয়াম শিখে যাওয়া এবং ১২ বৎসর বয়ঃক্রম হইতে আমি গান রচনা করিতাম।” দাদার ফরমায়েশে নবছর বয়সেই তাঁর মৌলিক গান রচনায় হাতেখড়ি। এই গানগুলি তাঁর আর্য্যগাথা-র প্রথম ভাগে প্রকাশিত হয়েছিল পরে। 

১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কৃষ্ণনগরের অ্যাংলো ভার্নাকুলার স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাশ করেন এবং ১০ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। একই কলেজ থেকে তিনি এফ. এ. পাস করেন। এরপর হুগলি কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি বারবার ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। 

১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ আর্যগাঁথার প্রথমভাগ প্রকাশিত হয়। ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এম.এ. পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এই সময় তিনি আবার ম্যালেরিয়াতে আক্রান্ত হন। এই কারণে, বায়ু পরিবর্তনের জন্য তিনি কিছুদিন দেওঘরে বসবাস করেন। এরপর এখান থেকে তিনি ছাপরা জেলার রেভেলগঞ্জ মুখার্জ্জি সেমিনারী স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে হিসেবে যোগদান করেন। এরপর সরকারি বৃত্তি নিয়ে ইংল্যান্ডে যান কৃষিবিদ্যা শিক্ষার জন্য। 

রয়্যাল এগ্রিকালচারাল কলেজ ও এগ্রিকালচারাল সোসাইটি হতে কৃষিবিদ্যায় FRAS এবং MRAC MRAS ডিগ্রি অর্জন করেন। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর একমাত্র ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ Lyrics of Indপড়াশোনার পাশাপাশি কবিতা ও গান রচনা চলছিলই। এবং চলছিল মার্গসঙ্গীতে অবগাহন। প্রথম প্রথম বিলেতি সঙ্গীত তাঁকে সেভাবে আলোড়িত না করতে পারলেও পরে তা চর্চা করতে শুরু করলেন। পাশাপাশি তাঁর আগ্রহ তৈরি হল স্কট-আইরিশ গানেও। সে সব গান অনুবাদ করতে শুরু করলেন মাতৃভাষায়। এক অদ্ভুত রসায়ন তৈরি হল, যা রবীন্দ্রনাথেও ঘটেছিল। দুজনেই সংস্কৃতজ্ঞ, দুজনেই সে বয়সে ভারতীয় সঙ্গীতের মায়ায় আবদ্ধ। দুজনেরই টান মায়ের ভাষায়। আর দুজনেই বিদেশি গানের প্রতি অনুরক্ত হয়ে হয় অনুবাদ, নয়তো প্রভাবিত গান রচনায় মেতে উঠলেন। ফলে যে নতুন ধারার পত্তন হল, সেটাই পরবর্তী সময়ে বদলে দেবে বাংলা কাব্যগীতির কাঠামোকে। 

১৮৮৬-তে দেশে প্রত্যাবর্তন করে সরকারি কর্মে নিযুক্ত হন দ্বিজেন্দ্রলাল। তিন বছর বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে এলে,  তাঁর আত্মীয়-স্বজনেরা বিলেতে থাকার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য তাঁর উপর চাপ সৃষ্টি করেন। দ্বিজেন্দ্রলাল প্রায়শ্চিত্ত করতে অসম্মত হলে, তাঁকে নানা সামাজিক উৎপীড়ন সহ্য করতে হয়। ভারতবর্ষে ফিরে তিনি জরিপ ও কর মূল্যায়ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন এবং মধ্যপ্রদেশে সরকারি দপ্তরে যোগ দেন। পরে তিনি দিনাজপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিয়োগ পান। 

১৮৮৭-তে সেই সময়ের প্রখ্যাত হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক আন্দুলিয়া নিবাসী প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের কন্যা সুরবালা দেবীকে বিয়ে করলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। সে বিয়েতে যদিও কৃষ্ণনাগরিকেরা যোগ দেননি দ্বিজেন্দ্রলালের কালাপানি-অতিক্রমণের কারণে। কিন্তু দাম্পত্য দ্বিজেন্দ্রলালের কবি এবং সাঙ্গীতিক জীবনে নতুন দরজা খুলে দিল। সরকারি চাকরি তাঁকে বহু বদলির সম্মুখীন করেছে। গোটা বাংলা চষে বেড়িয়েছেন। এবং নতুন নতুন জায়গার প্রকৃতি এসে ধরা দিয়েছে তাঁর গানে। অন্য দিকে, সামাজিক প্রতিরোধ তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছে প্রহসনে, হাসির গানে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয়, পত্নীপ্রেম তাঁকে গানের প্রেমিক করে তুলেছে সর্বার্থে। এরই মধ্যে তাঁর সখ্য তৈরি হয় আত্মীয় সুরেন্দ্রনাথ মজুমদারের সঙ্গে। ডাকসাইটে গায়ক সুরেন্দ্রনাথ খেয়ালে লাগাতেন টপ্পার দানা। সেই টপখেয়াল মনে ধরল দ্বিজেন্দ্রলালের। তবে এ সবই রসায়নাগারের উপকরণ মাত্র। যেমন হয় রসায়নাগারে, তেমনই হল। উপকরণ মিলেমিশে তৈরি করল নতুন বস্তু, যা সে সময়ে দ্বিজুবাবুর গান, পরবর্তী সময়ের দ্বিজেন্দ্রগীতি 

দাম্পত্য জীবনের ১৬ বছরের মাথায় একদিন দ্বিজেন্দ্রলাল বাড়ি ছিলেন না। সন্তানসম্ভবা সুরবালা রক্তক্ষরণে দেহ রাখলেন। একাধিক সন্তানের মধ্যে বেঁচে ছেলে দিলীপকুমার, মেয়ে মায়া। তাঁদের জড়িয়ে বাঁচতে চাইলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। আগে বিলেতে থাকাকালীন এক ইংরেজ মেয়ের সঙ্গে প্রেম হয়েছিল দ্বিজেন্দ্রলালের। বিয়ে করতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু হয়নি। সে সব স্মৃতিপর্ব ভেসে গিয়েছিল সুরবালার সঙ্গে দাম্পত্যে। 

১৯০৩ সালে দাম্পত্য নিভে যাওয়ায় অন্য মানুষ হয়ে উঠলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। একই সঙ্গে চলছে কর্মক্ষেত্রে বিরুদ্ধতা। পানাসক্ত হয়ে পড়লেন দ্বিজুবাবু। আড্ডায় ভাসিয়ে দিলেন নিজেকে। এবং প্রেমের গানের বদলে নাটক তাঁর হাত ধরল শক্ত করে। সে নাটক মূলত ইতিহাসাশ্রিত, স্বদেশচেতনায় জারিত। এরই মধ্যে আরও একটি সংযোগ। বঙ্গভঙ্গ-রোধী আন্দোলন। এক দিকে রবীন্দ্রনাথ পথে নামছেন, স্বদেশি গান বাঁধছেন। অন্য দিকে, দ্বিজেন্দ্রলালের স্বদেশি নাটকে মানুষ খুঁজে পাচ্ছেন দেশাত্মবোধ। ১৯০৫ সালে যার শুরু প্রতাপদিয়ে। তাঁর নাটকে একের পর এক সংযোজিত হতে থাকল স্বদেশি গান। নাটক লিখেছেন ২১টি। ইতিহাসাশ্রিত, প্রহসন, সামাজিক, পুরাণাশ্রিত। একটি নাটকে লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত সংলাপ, ‘চন্দ্রগুপ্তনাটকের নাম বাঙালি ভুলে গেলেও মনে রেখেছে প্রবচনে পরিণত হয়ে যাওয়া সংলাপটিকে, রচয়িতার নাম না মনে রেখেই— ‘সত্য সেলুকাস! কী বিচিত্র এই দেশ! 

এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। যা তাঁকে বাঁচিয়েছে এবং মেরেওছে। বিলেত থেকে কৃষিবিদ্যার ডিগ্রি নিয়ে আসা দ্বিজেন্দ্রলাল হয়ে উঠলেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। সেখানে পদে পদে তাঁর স্বাধীনচেতা মন এমন এমন কাজ করতে শুরু করল যে, অচিরেই হয়ে উঠলেন কর্তৃপক্ষের চক্ষুশূল। মেদিনীপুরের সুজমুঠা পরগনার সেটলমেন্টের দায়িত্বে থাকাকালীন ঘটিয়ে বসলেন এক কাণ্ড। কৃষকদের খাজনা দিলেন কমিয়ে। রক্তচোখ দেখালেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল। আর উল্টো দিকে কৃষকেরা তাঁকে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বদলে ডাকতে শুরু করলেন দয়াল রায়নামে। বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা হল। ছোটলাট এলেন পরিদর্শনে। বাঙালি কবি ছোটলাটকে কী বলেছিলেন? তাঁর ভাষায়— ‘আইন বিষয়ে তাঁহার অনভিজ্ঞতা বুঝাইয়ে দেই। ফলে যা হওয়ার, তাই হল! বিষয় গড়াল আদালতে। কোনও ক্রমে চাকরি বাঁচলেও পদোন্নতি রুদ্ধ হল। আর দ্বিজেন্দ্রলাল খুশি রইলেন এই ভেবে যে, ‘নিজের পায়ে কুঠারাঘাত করিলেও সমস্ত বঙ্গদেশব্যাপী একটি উপকার সাধিতহয়েছে। ইংরেজের চাকরি তাঁর ভাষায় ছিল দাস্য। শেষ দিকে মাথায় চেপে বসেছিল স্বেচ্ছাবসরের ভাবনা। 

মেবার পাহাড়শুনে জগদীশচন্দ্র বসু অনুরোধ করলেন বাঙালির আবেগ নিয়েও কোনও গান লিখতে। মনে ধরল দ্বিজেন্দ্রলালের। কিছু দিনের মধ্যেই বঙ্গ আমার জননী আমার। তাঁর জীবনীকার দেবকুমারের ভাষায়, ‘তীব্র হতাশার জীবনেও তিনি... হাততালি দিতে-দিতে, সারাটা ঘরময় ঘুরিয়া ঘুরিয়া, নাচিয়া-নাচিয়া... গাহিতে লাগিলেনকীসের দুঃখ কীসের দৈন্য কীসের লজ্জা কীসের ক্লেশও গানটা গায়িতে গেলে আমার কেন জানি না, ভয়ানক মাথা গরম হয়ে উঠে।লিখছেন দ্বিজেন্দ্রলাল। এ গান গাইতে গিয়ে উচ্চ রক্তচাপে বহু বার অসুস্থও হয়েছেন তিনি। 

নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল সমসময়ে রবীন্দ্রনাথের চেয়েও বিখ্যাত। রবিবাবু নাটক লিখলেও দ্বিজুবাবুর নাটকে কাঁপছে রঙ্গমঞ্চ। রবীন্দ্রনাথের গোরাউপন্যাসের প্রশংসায় উদ্বেল হয়ে উঠে দ্বিজেন্দ্রলাল বলেছিলেন ধর্মগ্রন্থ। দ্বিজেন্দ্রলালের আর্য্যগাথার দ্বিতীয় ভাগ, ‘মন্দ্রকাব্য এবং আরও অনেক রচনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ রবীন্দ্রনাথ। কলকাতায় দ্বিজেন্দ্রলালের আবগারি বিভাগের বজরার আড্ডায় দ্বিজুবাবুর সঙ্গে গানে মগ্ন হতেন রবিবাবু। দুই বাড়ির মধ্যে সখ্য ছিল। দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর বিরহপ্রহসনটি উৎসর্গ করেন রবীন্দ্রনাথকে। 

কিন্তু পরের দিকে ছবিটা ঘুরে গেল। ঘুরে গেল কান-ভাঙানোয়। কারণ হিংসা বা প্রতিযোগিতার অবকাশ ছিল না। তখনও রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাননি। রঙ্গমঞ্চ তখন দ্বিজু-আশ্রয়ী। কিন্তু সোনার তরীকাব্যের সমালোচনা করে বসলেন দ্বিজেন্দ্রলাল, সে কাব্য প্রকাশের ১২ বছর পরে! আচমকাই যেন তাঁর কৃষিবিদ পরিচয়টি তাঁকে আচ্ছন্ন করল! কৃষক কেন বর্ষাকালে ধান রোপণ না করে কাটছেন, ক্ষেত্রখানি যদি দ্বীপ বা চর হয়, তবে তো সে জমিতে ধান চাষ হয় না। কারণ, শ্রাবণ-ভাদ্রে এ সব জমি ডুবে থাকে। 

কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কার্যত কোনও কথা বলছেন না। বরং দ্বিজেন্দ্রলালের ইংরেজি লেখাকে পাঠ্য করার অনুরোধ করছেন ক্ষিতিমোহন সেনকে। ১৯০৫ সালে দ্বিজেন্দ্রলাল প্রতিষ্ঠিত পূর্ণিমা মিলন’-এর প্রথম অধিবেশনে দ্বিজুবাবুরই ৫ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়িতে হাজির হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ। সে দিন বসন্তোৎসব। পকেট থেকে আবির বার করে রবিবাবুকে আচমকা মাখিয়ে দেন দ্বিজুবাবু। যে স্মৃতির রোমন্থন করেছেন দিলীপকুমার— ‘রবীন্দ্রনাথ সেদিন আমাদের সুকিয়া স্ট্রিটের বাসায় এসে সে যে আমার জননী রেগানটি গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন। গানের শেষে পিতৃদেব তাঁকে আবিরে রাঙিয়ে দেন। তখন কবিগুরু হেসে বলেছিলেন: আজ দ্বিজেন্দ্রবাবু শুধু আমাদের মনোরঞ্জন করেছেন, তাই নয়আমাদের সর্বাঙ্গ রঞ্জন করলেন।রবীন্দ্রনাথ সচেষ্ট ছিলেন সম্পর্ক ঠিক করে নেওয়ায়। 

‘ধনধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’, বঙ্গ আমার, জননী আমার, ধাত্রী আমার, আমার দেশ সহ প্রায় পাঁচ শতাধিক গান রচনা করলেও স্বরলিপি তৈরির আকর্ষণ বোধ না করায় দ্বিজেন্দ্রলালের সুর সমসময়ে সংরক্ষিত হয়নি, তাই দ্বিজেন্দ্রগীতির শুদ্ধ কাঠামো পাওয়া কঠিনই। প্রেমের, নাটকের, হাসির ও স্বদেশি গানই মুখ্য। এর মধ্যে সুর পাওয়া যায় মাত্র ১৩২টি গানের। তাঁর শেষজীবনে গ্রামোফোন কোম্পানি তাঁর গাওয়া গান রেকর্ড করেছিল। হাসির গান। তাঁর হাসির গান বললেই মনে পরে নন্দলালগানটির কথা। তিনি যখন এ-গানটি গাইতেন, লোকে হেসে মাটিতে লুটিয়ে পড়ত। 

অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের সঙ্গে ভারতবর্ষপত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে থাকা দ্বিজেন্দ্রলাল তাঁর স্বপ্নের পত্রিকাটিকে চোখে দেখে যেতে পারেননি। প্রথম ফর্মার প্রুফ দেখতে দেখতেই অচৈতন্য হয়ে যান। চার ঘণ্টা পরে প্রয়াণ। সেটা ছিল ১৯১৩ সালের ১৭ই মে। ভারতবর্ষপত্রিকার প্রথম সংখ্যার আখ্যাপত্রে ছাপা হয়েছিল দ্বিজেন্দ্রলাল রায় প্রতিষ্ঠিত। প্রথম সংখ্যার সূচনাআগেই লিখে গিয়েছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। 

দ্বিজেন্দ্রলালের জীবনী লেখেন তাঁর বন্ধু দেবকুমার রায়চৌধুরী। সে গ্রন্থের ভূমিকা লেখেন রবীন্দ্রনাথ। মাত্র ৫০ বছরের জীবনে যে অসাধারণত্বের ছাপ রেখে গিয়েছেন তা কিন্তু আজও সেভাবে মর্যাদা পায়নি; তবে কি আত্মবিস্মৃতির নাম বাঙালি? 

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন