১৯৬৯ থেকে ৭২-এর বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক চালচিত্র বদলে দিয়ে নতুনভাবে, নতুনরূপে পথচলার এক চরম পরীক্ষার কাণ্ডারি চারু মজুমদারের আজ (২৮-শে জুলাই) মৃত্যুদিন। নকশাল আন্দোলেনের সঙ্গে যাঁরা যু্ক্ত তাঁরা তো বটেই, এমনকি অন্য ধারার রাজনীতির অনেকেই মনে করেন, তাঁকে জেলে হত্যা করা হয়েছিল। ভারতবর্ষের মুক্তিকামী মানুষের পথপ্রদর্শক, সিপিআই(এম-এল) এর প্রতিষ্ঠাতা কমরেড চারু মজুমদারকে তাঁর শারীরিক মৃত্যুর দিনে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি জানার চেষ্টা করা যাক মানুষটিকে, যিনি মৃত্যুর ৪৯ বছর পরেও একটি চেতনার প্রতিভূ; যাকে মুছে ফেলতে, যার সৃষ্ট নকশালবাড়ির আন্দোলনকে ধ্বংস করতে ৪০ বছরের উপর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারতের শাসকশ্রেণী।
![]() |
| চারু মজুমদার |
সোভিয়েত রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লবের মত এক উত্তাল সময়ে জন্ম চারু মজুমদারের- ১৯১৯ সালের জ্যেষ্ঠ মাসে (মে-জুন), উত্তর প্রদেশের বেনারসে। তাঁর পিতা বীরেশ্বর মজুমদার ছিলেন একজন প্রবীণ কংগ্রেসী যিনি পরবর্তীকালে দার্জিলিং জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতিও হন। মা উমাশংকরি ছিলেন একজন প্রগতিশীল উদারচেতা মহিলা।
বেনারসে কিছুকাল কাটবার পর, অল্প বয়সে চারু মজুমদার পরিবারের সাথে শিলিগুড়ি চলে আসেন এবং শিলিগুড়ি বয়েজ হাইস্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই তিনি প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৩৭ সালে তিনি পাবনার (অধুনা বাংলাদেশে) এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন, কিন্তু ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার আগেই সাম্যবাদী ধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে ফাইন্যাল পরীক্ষা না দিয়েই আবার শিলিগুড়িতে ফিরে আসেন।
অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্বেও, পরীক্ষা না দেয়ায় তার কলেজের অধ্যক্ষ খুবই দুঃখিত হন এবং বুঝিয়ে তাঁকে পরীক্ষা দেয়ানোর চেষ্টাও করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কলেজের গণ্ডী আর উন্নতির মোহ তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি ব্যক্তি স্বার্থের ছোট বেড়ার মধ্যে; এই সময়ই বৃহত্তর সমাজের চলমান জীবনের মধ্যে নিজেকে সঁপে দিলেন তিনি।
১৯৩৮ সালে ১৯৩৮ সালে তিনি কংগ্রেস সোশ্যালিষ্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং তার যুব শাখার সম্পাদক নির্বাচিত হন। জলপাইগুড়ি জেলাতে ১৯৩৯ সালে কমিউনিস্ট পার্টির কাজকর্ম শুরু হয়। তৎকালীন ‘আধিয়া’ প্রথার বিরুদ্ধে কৃষকদের মধ্যেকার এতদিনের ক্রোধ ও ক্ষোভ প্রতিবাদ ও ক্রমে প্রতিরোধে পরিণত হওয়ার দিশা খুঁজছিল। ঠিক এরকমই এক সময়ে, একদিন তদানীন্তন জলপাইগুড়ির পার্টি সম্পাদক শচীন দাসগুপ্তর কছে এক যুবক এসে হাজির হলেন। উস্কোখুস্কো চুল, সুন্দর বড় বড় দুটো চোখ নিয়ে সপ্রতিভ এই যুবক শচীন দাসগুপ্তকে বললেন- 'আমার নাম চারু মজুমদার। আমি কৃষকদের মধ্যে পার্টির কাজ করতে চাই।' শচীনবাবু বললেন- 'সে তো খুব কষ্টকর জীবন; তুমি পারবে তা সহ্য করতে?' যুবকের একটিই বলিষ্ঠ উত্তর- 'হ্যাঁ পারব।'
তারপর শুরু হলো শচীন দাসগুপ্তের
সাথে চারু মজুমদারের কষ্টের জীবনের পরীক্ষা। কখনো কৃষকের গোয়াল ঘরে আধপেটা খেয়ে
থাকা, কখনো খোলা আকাশের নীচে- এইভাবে এক নাগাড়ে তিন মাস ডুয়ার্সের গ্রামে
গ্রামে জেলা সম্পাদকের সাথে দিন কাটালেন চারু মজুমদার। তাঁর এই অভিজ্ঞতাই সত্তর-এর
দশকে তাঁর সেই বিখ্যাত আহ্বানের পটভূমি রচনা করেছিল- 'কৃষককে
শ্রদ্ধা কর, তাদের জীবনের অংশীদার হও। শ্রমিক এবং দরিদ্র ও ভূমিহীন কৃষকের সাথে
একাত্ম হও, একাত্ম হও, একাত্ম হও।' ১৯৪২ সলে চারু মজুমদার পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন।
৪২-এর পর চা ও রেল শ্রমিকদের মধ্যে কাজ করেন। ১৯৪৩ সালে দেখা দিল মন্বন্তর। আধিয়া প্রথা তো ছিলই; একদিকে যখন কৃষকেরা না খেয়ে মরতে বসেছে, তখন জোতদাররা ধান মজুত করে রাখছে ভবিষ্যতের মুনাফার জন্য। পার্টি কৃষকদের মধ্যে শ্লোগান তুলল- 'না খেয়ে মরব না, মরতে হলে গুলিতে মরব।' গ্রামের জনগণের মধ্যে ভীষণ সাড়া পড়ে গেল। কৃষক জনগণ নতুন বলে বলিয়ান হয়ে জোতদারদের গোলা ভেঙ্গে ধান নিয়ে নিতে লাগলেন। কমিটির মাধ্যমে এই ধান ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করা হতো। চারু মজুমদার ছিলেন এই আন্দোলনের নেতৃত্বে।
১৯৪৫ সালে আরম্ভ হলো অবিভক্ত বাংলার কৃষকের 'তেভাগা আন্দোলন'। তেভাগা আন্দোলনের সময় তাঁকে পঞ্চগড় (বাংলাদেশের অন্তর্গত) এলাকার দায়িত্বে পাঠানো হয়। পঞ্চগড় ছিল তেভাগার কেন্দ্রস্থল। জলাপাইগুড়ি, দিনাজপুর ও রংপুর এই তিনটি জেলার নেতৃত্ব একসাথে বসে আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে স্থির করলেন গোলা থেকে ধান দখল করা হবে। উত্তাল হয়ে উঠলো আন্দোলন। চারু মজুমদার ছিলেন তেভাগার পুরোভাগে।
১১ নং ইউনিয়ন থেকে দেবীগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা প্রায় মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠেছিল। ঐ অঞ্চলে চারু মজুমদারকে দেখলেও থানার দারোগা তাঁকে ধরার সাহস করতো না। চারু মজুমদার সাধারণত একটি নিরাপদ নির্দিষ্ট রাস্তা ধরেই যাতায়াত করতেন। একদিন তিনি কয়েকজন কমরেডের সঙ্গে অন্য রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে জোতদাররা লোকজন নিয়ে তাঁদের ঘিরে ফেলে। চারু মজুমদার কিন্তু পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এই সময় থেকেই তাঁর সম্পর্কে রটে যায় যে তাঁকে দেখা গেলেও ধরা যায় না। তাঁকে কেন্দ্র করে এরকম অনেক কাহিনী তখন লোকের মুখে মুখে শোনা যেতো।
আন্দোলনকে ডুয়ার্সে ছড়িয়ে দিতে পার্টি চারু মজুমদারকে সেখানে পাঠালো। চারু মজুমদার সেখানে চা বাগানের কর্মীদের মধ্যেই পার্টির কাজে যুক্ত হন। শ্রমিকরাও কৃষকদের সাথে আন্দোলনে নামেন। ডুয়ার্সে জোতদাররা নিজেদের গোলায় ধান তুলে ফেলেছিল। শ্রমিক ও কৃষকেরা মিছিল করে গিয়ে সেই ধান দখল করে নেন। ডুয়ার্সের আন্দোলনের প্রভাব রেল শ্রমিকদের ওপরেও পড়ে। রেল শ্রমিকদের মধ্যে পার্টির কাজ প্রসারিত হয় ও ইউনিয়ন গড়ে ওঠে। বাংলা-ডুয়ার্স রেলওয়েতে সংগঠন খুবই শক্তিশালী রূপ নেয়।
শ্রমিক-কৃষকের এই মিলিত আন্দোলনকে রাষ্ট্রীয় দমনের মধ্য দিয়েও কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় এই প্রশ্ন যখন সামনে ওঠে এলো, পার্টির রাজ্য কমিটি আন্দোলন তুলে নেবার নির্দেশ দেয় এবং চারু মজুমদার সহ সমস্ত কমরেডদের চাপ দিয়ে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য করে। চারু মুজমদারের কাছে এটা ছিল বিরাট মানসিক ধাক্কা।
১৯৪৮-এ কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসের রিপোর্ট নিয়ে পার্টি অফিসে বৈঠক চলাকানীল সময়ে পুলিশ হানা দিয়ে সকলকে গ্রেপ্তার করে। চারু মজুমদারও ছিলেন তাঁদের মধ্যে। প্রথমে তাঁকে জলপাইগুড়ি জেলে ও পরে দমদম জেলে রাখা হয়। দমদম থেকে অবশেষে প্লেনে করে তাঁকে বক্সার জেলে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে ১৯৫১ সালে তিনি ছাড়া পান।
১৯৫২ সালের ৯ জানুয়ারি লীলা মজুমদারের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। লীলা মুজমদারও পার্টির সার্বক্ষণিক কর্মী ছিলেন। বিয়ের পর চারু মজুমাদর শিলিগুড়িতে চলে আসেন। তিনি ও লীলা মজুমদার দুজনেই পার্টির দার্জিলিং জেলা কমিটির সদস্য হন। এই সময় তিনি গ্রামে কাজ করতেন আবার চা বাগানে শ্রমিকদের নিয়ে ইউনিয়নও গড়ে তুলতেন; আবার শিলিগুড়ি শহরের রিক্সা চালক ইউনিয়নের তিনি ছিলেন সভাপতি। ১৯৫৬ সালে পালঘাটে পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেই সময় থেকেই পার্টি লাইনের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব খুব তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৫৭ সালে পার্টি নেতৃত্ব তাঁকে কলকাতায় এসে পার্টি অফিস থেকে পশ্চিমবঙ্গের কৃষক আন্দোলন পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব দিলে চারু মজুমদার তাতে রাজি হননি।
১৯৫৯ সালের পর থেকে ভারত চীন সম্পর্কের তিক্ততা শুর হওয়ার পর ঠিক হয় পার্টিকে সংহত করার কাজ শুরু করা হবে। দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলার দুটো অঞ্চল বেছে নিয়ে শুরু করা হবে মুক্তাঞ্চল গঠনের প্রচেষ্টা। চারু মজুমদারের ওপর মূল দায়িত্ব দিয়ে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বলা হয় চীনা পত্রপত্রিকা পড়ে যা বুঝবেন, তার ভিত্তিতে একটা দলিল তৈরি করতে। ১৯৬২ সালে চারু মজুমদারের লেখা দলিলটি রাজ্য কমিটির কাছে পাঠানো হয়। তদানীন্তন জেলা কমিটির সম্পাদক গণেশ ঘোষ এই দলিলকে সমর্থন করলে, রাজ্য কমিটির নেতা প্রমোদ দাশগুপ্ত বলেন- তিনি জেল থেকে বেরিয়ে এসে এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবেন। এই সময় ভারত-চীন যুদ্ধ পার্টিতে এক তীব্র রাজনৈতিক ঝড় ওঠে। এই সময় চারু মজুমদার দৃঢ়ভাবে সমাজতান্ত্রিক চীনের পক্ষ নেন এবং তত্ত্ব ও তথ্য সহযোগে ব্যাখ্যার ম্যধ দিয়ে ঘোষণা করেন, “ভারতই চীনকে আক্রমণ করেছে। তাই আমাদের উচিত এ যুদ্ধের বিরোধিতা করা।”
১৯৬২ সালের ১৭-ই নভেম্বর তাঁকে ভারত রক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। এই সময় থেকেই তিনি সংসদীয় রাজনীতির বিপক্ষে এবং সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবের সপক্ষে দৃঢ়ভাবে প্রচারণা চালাতে থাকেন। তাঁর সাথে পার্টি নেতৃত্বের মতবিরোধ তীব্র হতে থাকে, এর পরবর্তীতে পার্টি ভাগ হলে তিনি জ্যোতি বসুর নেতৃত্বাধীন নবগঠিত সিপিআই (এম) পার্টিতে যোগ দেন।
১৯৬৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। তাঁকে ভর্তি করা হয় কলকাতার নীলরতন সরকার হাসপাতালে। ডাক্তাররা তাঁকে শারীরিকভাবে অক্ষম বলে ঘোষণা করে পূর্ণ বিশ্রাম নিতে পরামর্শ দেন। কিন্তু চারু মজুমদারের মানসিক জোরের কাছে তার শারীরিক অক্ষমতা বাধা হয়ে উঠতে পারেনি। তাই অসুস্থ অবস্থাতেই সংশোধনবাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তত্ত্বগত সংগ্রাম শুরু করেন।
১৯৬৪ সালের শেষের দিক থেকেই চারু মজুমদার শুরু করেন তাঁর ঐতিহাসিক আট দলিল রচনা (প্রথম দলিল-২৮ জানুয়ারি, ১৯৬৫)। এই দলিল রচনাকালেই ১৯৬৫ সালে, ভারত-পাক যুদ্ধের সময় আবার তাঁকে ভারতরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করা হয়। অসুস্থতার জন্য জলপাইগুড়ি জেল থেকে তাঁকে কলকাতার পিজি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানকার ডাক্তাররা তাঁর বাঁচার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। এখানে একটু সুস্থ হবার পর তাঁকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ১৯৬৬ সালের মে মাসে তিনি ছাড়া পান। জেল থেকে ছাড়া পেয়েই তিনি আবার তাঁর আট দলিল রচনার কাজে মন দেন। বিখ্যাত 'আট দলিল' রচিত হয় ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সালের মধ্যে।
শোধনবাদী পার্টি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তত্ত্বগত সংগ্রাম শুরু করার পাশাপাশি তিনি নিজের হাতে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তুলতে থাকেন। নকশালবাড়ি, খড়িবাড়ি, ফাঁসিদেওয়া- এই অঞ্চলগুলোতে কর্মী পাঠিয়ে তিনি নতুন ধাঁচের সংগঠন গড়ে তুলবার জন্য সচেষ্ট হন। ১৯৬৭ সালের প্রথম দিক থেকেই উত্তর বাংলার এই সমস্ত অঞ্চলগুলোতে জোতদারদের সাথে কৃষকদের ছোটখাট সংঘর্ষ শুরু হয়। অবশেষে মে মাসে এই সংঘর্ষ বিস্ফোরণের রূপ নিলো। ১৯৬৭ সালের ২৫ মে নকশালবাড়িতে, ভূমি সংঘর্ষের পরিণতিতে, ডান-বামে গড়া যুক্তফ্রন্ট সরকারের পুলিশের গুলিতে শিশুসহ নিহত হলেন এগার জন কৃষক রমনী। ভারতের কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সংগ্রামের ইতিহাসে সংযোজিত হলো আর একটি নতুন নাম 'নকশালবাড়ির অভ্যুত্থান'। কমরেড মাও সেতুঙ-এর নেতৃত্বাধীন চীনা কমিউনিস্ট পার্টি, রেডিও পিকিং মারফত যাকে অভিহিত করলেন- 'ভারতের বুকে বসন্তের বজ্র নির্ঘোষ' বলে।
পশ্চিশবাংলার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভায় তখন জ্যোতি বসু স্বরাষ্ট্র ও উপমুখ্যমন্ত্রী। কৃষকসভার নেতা হরেকৃষ্ণ কোঙার ও প্রমোদ দাশগুপ্ত সহ বেশ কিছু নেতা নকশালবাড়ির সংগ্রামী নেতাদের সাথে বৈঠকের পর বললেন, 'এখন যুক্তফ্রন্ট-আমাদের সরকার; তাই সংগ্রাম তুলে নেয়া প্রয়োজন।' হরেকৃষ্ণ কোঙারের এই বক্তব্যে কৃষক কমরেডরা যথেষ্ট উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। প্রমোদ দাশগুপ্ত কলকাতায় ফিরে এসে চারু মজুমদারসহ সমস্ত বিপ্লবী কমরেডদের পার্টি থেকে বহিষ্কার করেন।
নকশালবাড়ির সংগ্রামের গুরুত্ব বুঝে এবং এই সাংগ্রামকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য চারু মজুমদার এই সময় অন্যান্য কমরেডদের নিয়ে গড়ে তোলেন 'নকশালবাড়ি সংগ্রাম সহায়ক কমিটি'। নকশালবাড়ির কৃষক আন্দোলনের সমর্থনে কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারববর্ষের শহরগুলিতেও ছাত্র-যুব-বুদ্ধিজীবীরা উত্তাল আন্দোলন গড়ে তুলতে থাকেন। চারু মজুমদারের নেতৃত্বে তৈরি হয়- সারা ভারতের বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি (All India Co-ordination committe of Communist Revolutionaries - AICCCR)।
এই সময় প্রত্যেকদিন অগ্নিগর্ভ ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রান্তে, বিপ্লবী পরিস্থিতি দ্রুত পরিণত হচ্ছিলো। এ অবস্থায় আর কোনো কো-অর্ডিনেশন কমিটির মতো আলগা সাংগঠনিক কাঠামোর পক্ষে এই আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেয়া সম্ভব হচ্ছিলো না। তাই ১৯৬৯ সালের ২২ এপ্রিল লেনিনের শততম জন্মদিনে গঠিত হলো ভারতের বুকে প্রথম বিপ্লবী পার্টি-ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) বা সিপিআই (এম-এল)। ১ মে শহীদ মিনার ময়দানের বিশাল ঐতিহাসিক জনসভায় প্রকাশ্যে ঘোষিত হলো বিপ্লবী পার্টির জন্মের কথা। চারু মজুমদার এই পার্টির প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হলেন।
সিপিআই (এম-এল) গঠিত হবার পর তা ভারতের শাসকশ্রেণী ও তার বিদেশী প্রভূদের সামনে মূর্তিমান ত্রাস হিসাবে উপস্থিত হলো। এরপর সিপিআই (এম-এল)-এর নেতৃত্বে সংগ্রাম ছড়িয়ে পড়লো ভারতবর্ষের প্রতিটি রাজ্যে; নকশালবাড়ি থেকে শ্রীকাকুলামে, ডেবরা- গোপীবল্লভপুর থেকে লভিমপুর- মুশাহারীতে, মুঙ্গের-ভাগলপুর থেকে খেরিতে। ভীত সন্তস্ত্র শাসক শ্রেণী পুলিশ-মিলিটারির মাধ্যমে শুরু করলো অবর্ণনীয় নিপীড়ন ও অত্যাচার। এমন কোনো বর্বর পদ্ধতি বাদ পড়লো না, যা তারা বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করেনি। তবুও সশস্ত্র কৃষিবিপ্লবের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল।
১৯৭০ সালের ১৫-১৬ মে চারু মজুমদারের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত হয় সিপিআই (এম-এল)-এর প্রথম কংগ্রেস। ১৯৭০ সালের অক্টোবর মাস থেকে পার্টিতে বিভিন্ন ইস্যুতে পার্টি লাইন নিয়ে বিভেদ আসতে শুরু হলো। প্রথমে সত্যনারায়ণ সিংহ ও তার অনুগামীদের তরফে, তারপরে সুশীতল রায়চৌধুরীর তরফ থেকে, এবং ১৯৭১ সালের মে-জুন মাসে অসীম চট্টোপাধ্যায়দের কাছ থেকে। এই সময় থেকে ক্রমবর্ধমান পুলিশ-মিলিটারির অত্যাচার এবং পার্টির মধ্যকার সংশোধনবাদীদের কার্যকলাপে ধাক্কা আসতে শুরু করে। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ১৯৭১ সালে ৫ আগষ্ট-যেদিন চারু মজুমদারের ঘনিষ্ঠতম সহযোদ্ধা, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি ও পার্টির মুখপত্র 'দেশব্রতী'র সম্পাদক কমরেড সরোজ দত্তকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে এবং ওই দিনই কোনো রকম ঝুঁকি না নিয়ে কয়েক ঘন্টার মধ্যে তাঁকে হত্যা করে। প্রকৃতপক্ষে এরপর থেকেই পার্টির বিপর্যয়ের দিন শুরু হয়। অধিকাংশ নেতাই ধরা পড়তে থাকেন। এই সময় চারু মজুমদার দৃঢ় প্রত্যয়ে ঘোষণা করেন, 'পার্টি বেঁচে থাকবে দরিদ্র-ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিকদের মধ্যে। পার্টি বেঁচে থাকবে রাজনীতিকে জনতার গভীরে পৌঁছে দিয়ে।'
১৯৭২ এর জনু মাসে তার শেষ লেখা 'জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ'-তে চারু মজুমদার কমরেডদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানান, 'জনগণের স্বার্থই আজ ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের দাবি জানাচ্ছে। জনগণের স্বার্থই পার্টির স্বার্থ।'
১৯৭২ সালের ১৬ জুলাই ভোর রাতে শিলিগুড়ির দীপক বিশ্বাসের বিশ্বাসঘাতকতায় চারু মজুমদার ভীষণ অসুস্থ অবস্তায় কলকাতার এন্টালী এলাকা থেকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। লালবাজারের পুলিশী হাজতে টানা বারো দিন পাশবিক অত্যাচার সহ্য করে ২৮ জুলাই শহীদের মৃত্যুবরণ করলেন আজীবন বিপ্লবী এই মানুষটি। তাঁর নৃশংস হত্যাকান্ড নিয়ে অনেক কথা ও কাহিনী চালু আছে।
কমরেড চারু মজুমদার আজ নেই। কিন্তু তিনি ভারতবর্ষের শোষিত জনগণের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন শোষণমুক্তির এক অমোঘ অস্ত্র মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত নকশালবাড়ির রাজনীতি। রোগা পাতলা চেহারার এই মানুষটি যে এক অদম্য বিপ্লবী বহ্নিশিখা জ্বেলে দিয়ে গেছেন তা আজও শাসকের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়ে চলেছে।
(তারিণী খুড়ো)

👌👌👌🙏🙏
উত্তরমুছুন