ভারতবর্ষকে তিনি ধর্ম আর সম্প্রদায়ের অন্ধ গলির বাইরে এক সীমাহীন পরিসরে দেখতে চেয়েছিলেন। তাঁর সকল লেখাতে একটাই কথা বার বার উঠে আসে, আর তা হল মানবিকতা। তিনি ধনপত রায়। চিনলেন না তো? গড়পড়তা পাঠকের নামটা অপরিচিত লাগাই স্বাভাবিক। কারণ তিনি তো মুন্সী প্রেমচাঁদ নামেই অধিক পরিচিত। আজ তাঁর জন্মদিন। এই উপলক্ষ্যে তাঁকে চেনার ও জানার মধ্যে দিয়েই শ্রদ্ধা জানাবো আমরা।
![]() |
| মুন্সী প্রেমচন্দ |
মুন্সী প্রেমচন্দের জন্ম ১৮৮০ সালের ৩১ শে জুলাই, উত্তর প্রদেশের বারানসীর নিকটবর্তী লমহী গ্রামে এক অতি সাধারণ পরিবারের চতুর্থ তথা কনিষ্ঠ সন্তান হিসেবে। বাবা আজায়ব রায় ছিলেন ডাক বিভাগের কর্মী। সামান্য বেতন পেতেন। মা, আনন্দী দেবী অসুস্থ ছিলেন। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ছিল ধনপত রায় শ্রীবাস্তব। মাত্র আট বছর বয়সে মা-কে হারালেন ধনপত। লালন পালনের ভার তুলে নেন ঠাকুমা। পরের বছরেই আরও একাকী হয়ে গেলেন ৮ বছরের বালক। চলে গেলেন ঠাকুমাও। মা-কে হারানোর শোক কাটতে না কাটতেই বাবা আবার বিয়ে করলেন। সৎ মায়ের সঙ্গে শিশু ধনপত-এর সম্পর্ক সুমধুর ছিল না। বিমাতার নির্লিপ্ত ভাবলেশহীন ব্যবহার বারবার উপজীব্য হয়েছে তাঁর কলমে। ধনপত-এর ডাক নাম ছিল নবাব; কাকা দিয়েছিলেন এই নামটি। সাহিত্যজীবনে তাঁর প্রথম ছদ্মনামও ছিল নবাব রাই।
সাত বছর বয়সে এক মৌলবীর পাঠশালায় ভর্তি হলেন প্রেমচন্দ, আরবি আর ফার্সি শিক্ষার শুরু এখানেই। কিছুদিন পর বাবা স্কুলে ভর্তি করে দিলেন প্রেমচন্দকে। নিঃসঙ্গ বালক আশ্রয় খুঁজে পেত বইয়ে। গল্প শুনত গ্রামের আড্ডায়। কাজ নিয়েছিল বই বিক্রির, যাতে আরও বই পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়।
বাবার কাজের সূত্রেই গোরক্ষপুরে শুরু বসবাস, সেখানকার মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন। মাত্র পনেরো বছর বয়সে বিমাতার বাবার আনা সম্বন্ধে বিয়ে হয়ে গেল বয়সে বড় কিশোরীর সঙ্গে। কিছুদিনের মধ্যে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বাড়িতে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী, অসুস্থ বাবা, দুই সৎ ভাই এবং সৎ মা। কারো কোনও রোজগার নেই। বাবাকে সুস্থ করা গেল না। তিনি মারা গেলেন। সংসারের সব গুরু দায়িত্ব এসে পড়ল তার উপর। বাবার মৃত্যুর জন্য সেই বছর পরীক্ষায় বসতে পারলেন না। পরের বছর দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করলেন। আর্থিক অনটন ও অঙ্কের পরীক্ষায় ফেল করার জন্য কোনও কলেজেই ভর্তি হতে পারলেন না। এক উকিলের বাড়িতে ছেলে পড়াবার কাজ পেলেন। মাইনে পাঁচ টাকা। নিজে দু’টাকা রেখে বাড়িতে তিন টাকা দিতেন। অর্ধেক দিন তার খাওয়া জুটত না। কিন্তু বই কেনার ও পড়ার আগ্রহে কমতি ছিল’না। উর্দু ভাষায় যেসব উপন্যাস প্রকাশিত হত তা পাবার সাথে সাথে পড়ে ফেলতেন।
পরে এক ছোটো স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি তাকে আঠারো টাকা বেতনের শিক্ষকের চাকরি নিজের স্কুলে দিলেন। স্কুলটি ছিল বারাণসী থেকে চল্লিশ মাইল দূরে চুনাৱে। কাজের জায়গায় যেতেন গ্রামের বাড়ি থেকে। মানসিক শান্তির বড়ই অভাব ছিল। কারণ বিমাতা আর স্ত্রীর তীব্র কলহ। ঝগড়ার চোটে স্ত্রী চেষ্টা করল গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হতে, এতে ধনপত প্রচণ্ড বকাবকি করেন। রাগের চোটে স্ত্রী চলে যান বাপের বাড়ি। ধনপত তাঁকে ফিরিয়ে আনার উৎসাহ বোধ করেননি আর কোনোদিন।
১৯০৬ সালে আবার বিয়ে করলেন ধনপত। গ্রামের জমিদারের বাল্যবিধবা কন্যা শিবরানি দেবীকে। এর জন্য তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয় তাঁকে। কুইনস কলেজের প্রিন্সিপাল মিঃ বেকনের সাহায্যে একটি সরকারী স্কুলে শিক্ষকতা পেয়ে গেলেন।
মুন্সী প্রেমচন্দের বিখ্যাত ছোটো গল্প সংকলন ‘মজ -ঈ – ও তান’ (মাতৃভূমির কথা) প্রকাশিত হয় এই সময়ে, যার মধ্যে ইংরেজ সরকারের অত্যাচার -অবিচারের বিরুদ্ধে তার সমস্ত অভিব্যক্তি মূর্ত হয়ে ফুটে ওঠে। এই বই প্রকাশের সাথে সাথে ইংরেজ সরকারের নজর পড়ল তাঁর এই বই – এর উপর। তার এই বইয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হল।
এরপরেই ইংরেজ সরকারের থেকে নিজের লেখাকে আড়ালে রাখতেই ১৯০৯ সালে গ্রহণ করলেন ছদ্মনাম মুন্সি প্রেমচাঁদ। ১৯১৪ সাল থেকে লিখতে থাকেন হিন্দিতে। এর আগে তাঁর সৃষ্টি ছিল উর্দু ভাষায়। প্রেমচাঁদের প্রথম প্রকাশিত গল্পটি ছিল “দুনিয়াকা সবসে আনমোল রতন”, যেটি ১৯০৭ সালে ‘জামানা’ নামক একটি উর্দু ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। একই বছর মেডিকেল হল প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় কৃষ্ণ নামে আরেকটি ছোট গল্প। তার লেখা দ্বিতীয় উপন্যাস হলো ‘হুমখুর্মা হুমসবাব’, যেটি পরবর্তীকালে ‘প্রেমা’ নামে হিন্দিতে প্রকাশিত হয়। এরপর তার লেখা ‘সেবা সদন’ উপন্যাসটি তাকে হিন্দি সাহিত্যের স্থায়ী আসন এনে দেয়।
১৯১৬ সালে গোরক্ষপুর-এর ‘নরমাল হাইস্কুল’-এ তিনি সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯১৯ সালে বি.এ পাশ করেন প্রেমচাঁদ। এই বছরেই প্রকাশিত হয় তাঁর চারটি উপ্ন্যাস। ১৯২১ সালে উপ-পরিদর্শক পদে পদোন্নতি পান। কিন্তু ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারীতে গোরক্ষপুর এর একটি সভায় মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে সবাইকে সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে বললে মুন্সি প্রেমচাঁদ সরকারি চাকরি থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন।
ভাগ্যান্বেষণে প্রেমচাঁদ ১৯৩৪ সালের ৩১-শে মে মুম্বাইতে যান। সেখানে অজন্তা সিনেটোন নামক একটি প্রোডাকশন হাউজে চিত্রনাট্য লেখার কাজ পেয়েছিলেন বাৎসরিক আট হাজার টাকা বেতনে। তিনি ভেবেছিলেন নতুন এই কাজটা তাঁর ভালো লাগবে। ‘মজদুর’ সিনেমার স্ক্রিপ্ট তিনি লিখেছিলেন, তবে বোম্বাই চলচ্চিত্রের শিল্প-সাহিত্যের বাণিজ্যিক পরিবেশের সঙ্গে তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। প্রোডাকশন হাউসের সঙ্গে এক বছরের চুক্তিতে আবদ্ধ থাকায় বেনারসে ফিরেও আসতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ১৯৩৩ সালের ৪-ঠা এপ্রিল মুম্বাই ছেড়ে চলে আসেন বেনারসে। ফিরে এসে তিনি একটি মুদ্রণ প্রেস এবং প্রকাশনা সংস্থার প্রতিষ্ঠা করেন, নাম ‘সরস্বতী প্রেস’।
প্রেমচাঁদ প্রথম হিন্দি লেখক যার লেখায় চরম বাস্তবতার ছাপ দেখা যায়। তাঁর উপন্যাস গুলিতে মধ্যবিত্তের সমস্যার কথা বর্ণিত হয়েছে। তিনি প্রায় ৩০০-টি গল্প এবং ১৪-টি উপন্যাস লিখেছিলেন। ১৯৩৬ সালে প্রগতিশীল লেখক সমিতির প্রথম সভাপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।
তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্য কীর্তি গুলি হল ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’, ‘নির্মলা’, ‘কর্মভূমি’, ‘ঈদগাহ’ প্রভৃতি। শ্রেষ্ঠ উপন্যাস গুলির মধ্যে শ্রেষ্ঠ নির্মলা উপন্যাসটি ভারতের যৌতুক প্রথার সাথে সম্পর্কিত একটি উপন্যাস যেটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২৫ সালের নভেম্বর মাসে। ১৯৭৭ সালে সত্যজিৎ রায় প্রেমচাঁদ লিখিত ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ নামক উপন্যাস নিয়ে ওই নামে একটি হিন্দি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যেটি হিন্দিতে সেরা ফিচার ফিল্ম-এর সম্মান পায়।
তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে আছে দেবস্থান রহস্য‚ প্রেমা‚ রুঠিরানি‚ রঙ্গভূমি‚ বরদান‚ প্রতিজ্ঞা এবং কায়াকল্প। ছোটগল্পের মধ্যে স্মরণীয় হল মা‚ বলিদান‚ বুড়ি কাকি‚ দুর্গা কা মন্দির‚ কফন‚ সদগতি-র মতো কালজয়ী সৃষ্টি।
আত্মজীবনীমূলক একটি উপন্যাস রচনার কাজে হাত দেন। এই উপন্যাসটি সমাপ্ত করে যেতে পারেন নি প্রেমচন্দ। তার পূর্বেই ১৯৩৬ সালে ৮-ই অক্টোবর ৫৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার মৃত্যুর পর অনেক উপন্যাস ইংরেজি এবং রুশ ভাষায় অনূদিত হলেও আরও অনেক লেখাই অনুবাদের অভাবে আজও পৌঁছয়নি বিশ্বের দরবারে।
বৃহত্তর সমাজের নির্যাতিত মানুষই তাঁর কাছে ছিল একান্ত আপন জন। সাধারণ মানুষের প্রতি তার গভীর ভালবাসাই তাকে করে তুলেছিল বাস্তববাদী। তার চিন্তা ভাবনায় সাম্যবাদী আদর্শের প্রকাশ দেখা যায়।
(তারিণী খুড়ো)
