বসন্ত কুমার শিবশঙ্কর পাড়ুকোন – অচেনা নাম চেনা মানুষ

চেনেন বসন্ত কুমার শিবশঙ্কর পাড়ুকোন-কে? চেনেন না নিশ্চয়ই? না চেনাই স্বাভাবিক।

আচ্ছা যদি বলি তিনি ছিলেন ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা; তাহলেও চিনতে পারছেন না নিশ্চয়ই?

হেঁয়ালি ছেড়ে, আসুন পরিচয় করা যাক 'প্যায়াসা', 'কাগজ কে ফুল', 'সাহিব বিবি অউর গুলাম' খ্যাত গুরু দত্ত-র সঙ্গে। আজ যে তাঁর জন্মদিন!

গুরু দত্ত

১৯২৫ সালের ৯-ই জুলাই বর্তমান কর্ণাটক রাজ্যের পাড়ুকোনে গুরু দত্তের জন্ম হয়৷ ছোটোবেলায় একটি দুর্ঘটনার পর তাঁর ধর্মভীরু পরিবার বসন্ত কুমার শিবশঙ্কর নামটি বদলে গুরুদত্ত পাড়ুকোন রাখেন, যা পরবর্তীতে শুধুমাত্র গুরু দত্ত হয়ে ওঠে।

গুরু-র বাবা শিবশংকর রাও পাড়ুকোন ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক আর মা বাসন্তী ছিলেন শিক্ষিকা এবং লেখিকা। সুদূর কারওয়ার থেকে তাঁদের পরিবার কলকাতায় এসে ওঠেন। গুরু দত্ত-এর ছোটোবেলা কলকাতার ভবানীপুরে কেটেছে। প্রাথমিক পড়াশুনাও এখানেই; ফলে খুব ভালো বাংলা বলতে পারতেন গুরু দত্ত। ১৯৪১ সালে 'উদয় শঙ্কর ভারত সংস্কৃতি কেন্দ্রে' যোগদান করেন যেখানে তিনি নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের অভিভাবকত্বে পারফর্মিং আর্টের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

গুরু দত্তর কর্মজীবন শুরু হয় লিভার ব্রাদার ফ্যাকটরিতে টেলিফোন অপারেটর হিসেবে৷ কিন্তু ১৯৪৪ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে মা বাবার কাছে বোম্বাইতে চলে যান৷ তাঁর কাকার সহায়তায় ওই বছরই তিনি প্রভাত ফিল্ম কোম্পানিতে তিন বছরের চুক্তিতে যোগ দেন৷ প্রভাত ফিল্ম কোম্পানিতেই গুরু দত্তর আলাপ হয় অভিনেতা দেব আনন্দের সঙ্গে যিনি পরবর্তীকালে তাঁর বিশেষ কাছের বন্ধু হয়ে ওঠেন৷

১৯৪৪ সালে গুরু দত্ত চাঁদচলচ্চিত্রে শ্রী কৃষ্ণের একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করেন। ১৯৪৬ সালে একটি সিনেমায় সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেন এবং পি এল সন্তোষির ছবি, ‘হাম এক হ্যায়’-এর জন্য নাচের পরিচালনাও করেন। ১৯৪৭ সালে প্রভাত ফিল্ম কোম্পানির সঙ্গে তাঁর চুক্তি শেষ হয়ে যায়৷ তারপর ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করলেও প্রায় দশ মাস কর্মহীন ছিলেন। আক্ষরিক অর্থে কর্মহীন থাকলেও, এই সময়ই তিনি সাপ্তাহিক ইংরেজি পত্রিকা 'The Illustrated Weekly of India' -তে ছোটো গল্প লেখা শুরু করেন৷

প্রভাত ফিল্ম কোম্পানিতে কাজ করার সময় সহকারী পরিচালকের ভূমিকায় তিনি অমীয় চক্রবর্তী এবং জ্ঞান মুখার্জীর মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজের সুযোগ পান। এরপর দেবানন্দ তাঁকে নিজস্ব কোম্পানি 'নবকেতন’-এ ডিরেক্টর হিসেবে নিযুক্ত করেন তাঁকে।

'নবকেতন' থেকে গুরু দত্তের প্রথম পরিচালিত সিনেমা বাজি১৯৫১ সালে মুক্তি পায়৷ দেবানন্দ ও গুরু দত্ত নিজেদের মধ্যে একটি চুক্তি করেছিলেন যে গুরু দত্ত যদি সিনেমা প্রযোজনা করেন তাহলে সেই ছবিতে দেবানন্দকে তাঁর নায়ক হিসাবে নিয়োগ করবেন এবং যদি দেবানন্দ কোনও ছবি প্রযোজনা করেন তবে তিনি গুরু দত্তকে পরিচালক হিসাবে নেবেন। পরবর্তীকালে গুরু দত্ত সি.আই.ডিসিনেমার পরিচালক হিসেবে কাজ করার সময়ে দেবানন্দকে নিয়েছিলেন৷ গুরু দত্ত ও দেবানন্দ একসঙ্গে দুটি সুপার-হিট ছবি তৈরি করেছিলেন বাজিএবং জাল

সালটা ১৯৫০। সেইসময়কার বিখ্যাত গায়িকা গীতা রায়চৌধুরীর প্রেমে পড়েন গুরু দত্ত। তার প্রথম ছবি 'বাজি'র নেপথ্য গায়িকা ছিলেন গীতা। সেখান থেকে প্রেমের শুরু। প্রেম থেকেই পরিবারের অমতে  ১৯৫৩ সালের ২৬ মে বিয়েও সেরেছিলেন গীতা ও গুরু।

বিয়ের তিন বছরের মাথাতেই ১৯৫৬ সালে গুরু দত্তর সঙ্গে পরিচয় হয় ওয়াহিদা রহমানের। ওয়াহিদাকে দেখেই তাঁর প্রতি চোখ পড়ে গুরু দত্তর। তেলেগু ছবিতে সদ্যই খ্যাতি অর্জন করেছেন ওয়াহিদা। সেই সময় তাঁকে মুম্বই নিয়ে চলে আসেন গুরু দত্ত। এরপরেই নিজের প্রযোজিত 'সিআইডি' ছবিতে খলচরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ দেন ওয়াহিদাকে। তারপর 'পিয়াসা' ছবিতে কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রে অভিনয় করেন ওয়াহিদা।

১৯৫৪ সালে গুরু দত্তের পরিচালিত সিনেমা আর পারব্লকবাস্টার সাফল্য লাভ করে। তারপর ১৯৫৫ সালে মিস্টার এন্ড মিসেস ৫৫’, ‘সি আই ডি’; ১৯৫৭ সালে শৈলব’, ‘পিয়াসা। এই পাঁচটি বক্সঅফিসে সফল সিনেমার তিনটিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন৷ ১৯৫৯ সালে কাগজ কা ফুলসিনেমায় পরিচালক এবং মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন গুরু দত্ত৷ সেই সময় এই সিনেমা বলিউডে অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছিল৷

এদিকে ওয়াহিদার সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানোর পর থেকে দাম্পত্য জীবনে ঝড় ওঠে গুরুর। গীতা দত্ত ত্যাগ করেন গুরুকে। বিবাহ বিচ্ছেদ না করেই তাঁরা আলাদা থাকতে শুরু করেন।

১৯৫৯ সালে গুরু দত্ত পরিচালিত ও অভিনিত সিনেমা কাগজ কে ফুলবানিজ্যিকভাবে ব্যর্থ হয়৷ তিনি এই ছবিতে প্রচুর অর্থ, শ্রম এবং শক্তি বিনিয়োগ করেছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনের প্রভাব পড়ে গুরুর কেরিয়ারে। অসামান্য কাহিনি, পরিচালনা, অভিনয় দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও গুরু-ওয়াহিদা জুটির 'কাগজ কে ফুল' ছবিটি বাণিজ্যিক সাফল্য পায় না। আসলে বিবাহিত পরিচালক এবং নায়িকার প্রেম তখনকার দর্শক সেভাবেও মেনে নিতে পারেননি। যা গুরুকে ভীষণভাবে আহত করেছিল। কাগজ কে ফুলব্যর্থ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুরু দত্ত বিধ্বস্ত হয়ে পরেন।

পরবর্তীতে তাঁর অভিনীত চৌধভিন কা চাঁদকেসিনেমাটি আবার সাফল্যের মুখ দেখে৷ এই সিনেমার একটি গান চৌধভিন কা চাঁদ হো…” তে বিশেষ কালার সিকোয়েন্স ব্যবহার করা হয়৷

তারপর থেকেই ওয়াহিদার সঙ্গে প্রেমে ভাটা পড়তে থাকে। ব্যক্তিগত জীবন ও ফিল্মি কেরিয়ারের ব্যর্থতার চরমে ওয়াহিদা গুরুকে পরিত্যাগ করেন। গুরু দত্তের বিবাহিত জীবনে যেন শান্তি ফিরে আসে, সেই ভেবেই সরে গিয়েছিলেন ওয়াহিদা। ১৯৬২ সালে 'সাহেব বিবি অউর গোলাম' ছবিতেই গুরু দও এবং ওয়াহিদাকে শেষবারের মতো দেখা গিয়েছিল। এই চলচ্চিত্রটি সর্বাধিক সমালোচিত হওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে দারুণ সফল হয় এবং ফিল্মফেয়ারে সেরা পরিচালকের পুরস্কার এনে দেয় তাঁকে।

গুরু দত্তের প্রযোজনায় শেষ চলচ্চিত্রটি হল বাহারে ফির ভী আয়েগীযেটি ১৯৬৬ সালে প্রকাশ পায়৷ ১৯৬৪ সালে সাঁঝ অর সভেরাতাঁর অভিনীত শেষ সিনেমা।

রিল লাইফের মতোই রিয়েল লাইফটাও ছিল তাঁর আড়ম্বর পূর্ণ। গীতা দত্তের সঙ্গে প্রেম থেকে বিবাহ, তারপরেই ওয়াহিদা রহমানের সঙ্গে প্রেম, সবটাই যেন রূপোলি পর্দার এক ফ্রেমে সাজানো। কিন্তু ওয়াহিদার সঙ্গে বিচ্ছেদের পরই সবটা যেন এক লহমায় বদলে গিয়েছিল। সত্যিই কি ওয়াহিদার বিচ্ছেদে আত্মহননের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন গুরু দও? যা আজও ধোঁয়াশা।

১৯৬৪ সালের ১০ অক্টোবর গুরু দত্তর মৃত্যু হয়৷ বোম্বাইয়ের পোদ্দার রোডের বাড়িতে বিছানায় তাঁর মৃত দেহ পাওয়া গেছিল৷ মদ্যপান করার সময় তিনি তাতে ইচ্ছে করে বেশী ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে আত্মহত্যা করেছিলেন না অসাবধানতাবশত বেশী ওষুধ খেয়ে ফেলেছিলেন তা জানা যায় নি৷

গুরু দত্তের প্রযোজনা বা অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৪ সালের ১১ অক্টোবর ভারতীয় ডাক বিভাগ তাঁর নামে ডাকটিকিট প্রকাশ করে।

অনুরাগ কশ্যপসহ একাধিক নির্মাতা গুরু দত্তের জীবনের ওপর বায়োপিক নির্মাণের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কেউই এ ক্ষেত্রে সফল হননি। সম্প্রতি গুরু দত্তকে নিয়ে ছবি বানানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছেন ভাবনা তলওয়ার। বলিউডের মেগাস্টার ‘শাহরুখ খান’ নিজে গুরু দত্ত-এর ভুমিকায় অভিনয়ের আগ্রহ প্রকাশ করা সত্বেও খুব সম্ভবত বলিউডের মিস্টার পারফেকশনিস্ট ‘আমির খান’ অভিনয় করবেন গুরু দত্ত-এর ভুমিকায়।

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন