ব্যারিস্টার থেকে কমরেড, কোর্ট চত্বরের যুক্তিবোধ থেকে মানবিক রাজনীতির লাল সেনানী হয়ে ওঠা মানুষটার আজ জন্মদিন। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বুঝেছেন, আমি ২৩ বছর ১৬৫ দিন ব্যাপী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকা কমরেড জ্যোতি বসুর কথাই বলছি, দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে বামপন্থী চেতনার বিকাশে যার অবদান ঐতিহাসিক। যাঁর জীবন কাহিনী লিখতে গেলে অমর গাঁথা লিখে যেতে হবে পাতার পর পাতা, সেই মানুষটিকে অন্তরের গভীরতম শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি তাঁর জীবনের কয়েকটি অজানা কাহিনীতে ঢুঁ মারা যাক আজ।
![]() |
| কমরেড জ্যোতি বসু |
০১) জ্যোতি বসুর পুরো নাম জ্যোতিরিন্দ্র বসু। সেই নাম ছেঁটে ফেলার পিছনে রয়েছে তাঁর বাবা নিশিকান্ত বসুর সিদ্ধান্ত। স্কুলে ভর্তির সময় তিনি ছেলের নাম লিখতে গিয়ে লেখেন 'জ্যোতি বসু'। সেই থেকে এই নামেই তিনি বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত।
০২) জ্যোতি বসুর আদি বাড়ি ছিল বাংলাদেশের ঢাকার পাশের নারায়ণগঞ্জের বারুদি গ্রামে। তাঁর শৈশব বারুদিতে কাটলেও পরবর্তী সময়ে তাঁদের পরিবার কলকাতায় চলে আসে। তবে বারুদিতে জ্যোতি বসুর পৈতৃক ভিটা ও বসতবাড়ি ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে এখনো রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার সেই বাড়ি অধিগ্রহণ করে এখন সেখানে একটি জাদুঘর তৈরি করেছেন।
০৩) জ্যোতি বসুর স্কুলের পাঠ শুরু ধর্মতলার লোরেটো স্কুলে। মূলত মেয়েদের এই স্কুলে ১৯২০ সালে তাঁকে ভর্তি করতে বাধ্য হন বাবা নিশিকান্ত বসু। তবে পরে ১৯২৫ সালে তাঁকে সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে ভর্তি করা হয়।
০৪) বাবা বিখ্যাত চিকিৎসক নিশিকান্ত বসু মা হেমলতা দেবী শ্রদ্ধা করতেন বিপ্ললবীদের। সেই ভাবাবেগ ছোটবেলায় স্পর্শ করেছিল জ্যোতি বসুকেও। স্কুল পালিয়ে অনশনে যোগ দিয়েছেন; কখনও আবার চলে গিয়েছেন সুভাষচন্দ্রের ভাষণ শুনতে। একবার কলকাতায় সুভাষ চন্দ্র বসুর সভায় গিয়ে তিনি পুলিশের লাঠি চার্জে আহত হয়েছিলেন।
০৫) ১৯৩৫ সালে ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে স্নাতক পাঠ শেষ করার পর আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে ব্রিটেনে পাড়ি দেন জ্যোতিবাবু। লন্ডনে থাকাকালীন প্রবাসী ভারতীয় ছাত্র সংগঠন 'লন্ডন মজলিশ'-এ তিনি যোগ দেন এবং পরে তার সাধারণ সম্পাদকও নির্বাচিত হন। জওহরলাল নেহেরু এবং সুভাষচন্দ্র বসুর ব্রিটেন সফরে তাঁদের সভা আয়োজন করার দায়িত্ব সফল ভাবে পালন করেন জ্যোতিবাবু।
০৬) লন্ডনে পড়াশুনার সময়েই মার্কসবাদে দীক্ষিত হন জ্যোতি বসু। তাঁর এই মার্কসবাদে দীক্ষার পিছনে গ্রেট বৃটেনের কমিউনিস্ট পার্টির হ্যারি পাল্টি, রজনীপাম দত্ত, বেন ব্রেডলি প্রমুখের বিশিষ্ট অবদান রয়েছে। উচ্চবিত্ত ঘরের সন্তান ব্যারিস্টার জ্যোতি বসু দেশে ফিরে এলেন কমিউনিস্ট হয়ে। কমরেড মোজাফফর আহমদ তাঁকে একজন কমিউনিস্ট রূপে কাজ করার পথ দেখান।
০৭) কমিউনিস্ট হয়ে যাওয়া ব্যারিস্টার জ্যোতি বসু ট্রামে বাসে রাস্তায় পার্টির পত্রিকা বিক্রি করেছেন, রেলওয়ে শ্রমিকদের সংগঠিত করতে নানা জায়গায় ঘুরেছেন, শ্রমিক বস্তিতে থেকেছেন নিজেকে শ্রেণীচ্যুত করতে।
০৮) ১৯৪৬ সালে রেলওয়ে শ্রমিক কর্মচারীদের জন্য নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা থেকে তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর এই বিজয়টি তখন বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছিল। কারণ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কংগ্রেসের নেতা হুমায়ুন কবীর যার নাম ডাক তখন ছিল ব্যাপক। সেই তুলনায় জ্যোতি বসু তখনো স্বল্প পরিচিত।
০৯) জ্যোতি বসুর ঠিক আগে যিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী
ছিলেন,
সেই সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের সঙ্গে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব থাকলেও দুজনের
মধ্যে ব্যক্তিগত সখ্যতাও ছিলো।
একবার চন্দননগর থেকে কলকাতায় আসছিলেন দুজনে। আসার সময়ে জ্যোতি বসু আর সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়কে কয়েকজন অল্পবয়সী মেয়ে ঘিরে ধরেছিল। জ্যোতি বাবু সেই সময়ে রীতিমতো স্টার নেতা। তাই অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছিল। মেয়েরা চেয়েছিলো জ্যোতি বাবু অটোগ্রাফ দেওয়ার পাশাপাশি যেন কয়েকটা লাইনও লিখে দেন। জ্যোতি বসু আর কিছু লিখতে চান নি, শুধু সই করে দিয়েছিলেন। গাড়িতে ফিরে আসার পরে সিদ্ধার্থ শঙ্কর মজা করে বলেছিলেন -- "এত সুন্দরী মেয়েগুলোকে তুমি এক কথায় মানা করে দিলে? রবীন্দ্রনাথের কোনও লেখা থেকে একটা দুটো লাইন লিখে দিতে পারতে"।জ্যোতি বসু রসিকতার সুরে জবাব দিয়েছিলেন -- "জানলে তো লিখবো!"
১০) একবার জ্যোতি বসু পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতাকে ডেকে বললেন -- "বিধানসভার ভেতরে কিছু ইস্যু তুলে ধরতে পারো না যাতে সরকার একটু বিব্রত হয়? একটু কড়া কড়া ভাষায় বলবে ইস্যুগুলো।"এই কথা বলে তিনি কাগজ কলমে লিখে দিলেন যে পরের দিন বিধানসভায় কোন কোন ইস্যুতে সরকারকে আক্রমণ করতে পারে কংগ্রেস।
১১) ১৯৯৩ সালে জ্যোতি বসুকে কিউবায় যান। একদিন রাতে যখন ঘুমোতে যাবেন, সেই সময়ে খবর আসে যে ফিদেল কাস্ত্রো দেখা করতে চান জ্যোতি বসুর সঙ্গে। সীতারাম ইয়েচুরিকে সঙ্গে নিয়ে জ্যোতিবাবু মাঝরাতে ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে দেখা করতে পৌঁছলেন।প্রায় দেড় ঘন্টা চলেছিল ওই বৈঠক। জ্যোতিবাবুকে ফিদেল একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছিলেন। যেমন ভারতে কয়লার উৎপাদন কত, কোথায় কীরকম লোহা পাওয়া যায়, ইত্যাদি। একটা সময়ে জ্যোতিবাবু বাংলায় ইয়েচুরিকে জিজ্ঞাসা করলেন -- "এ কি আমার ইন্টারভিউ নিচ্ছে না কি?" পরের দিন জ্যোতি বসু যখন হাভানা বিমানবন্দরে পৌঁছেছেন ফেরার বিমান ধরার জন্য, তখন জানা ফিদেল কাস্ত্রো তাঁকে বিদায় জানাতে সেখানে এসে উপস্থিত হন।
১২) সীতারাম ইয়েচুরি জ্যোতি বসুর সঙ্গে প্রথম বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন ১৯৮৯ সালে, নেপালে, নেপাল সরকারের রাষ্ট্রীয় অতিথি হয়ে। জ্যোতি বসুর সফরসূচীতে পশুপতিনাথ মন্দির দর্শনও রাখা হয়েছিল।ইয়েচুরি জ্যোতি বসুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যে মন্দিরে যাওয়ার ব্যাপারে মানা করে দিলেন না কেন? তিনি জবাব দিয়েছিলেন -- "ভারতে আসা প্রত্যেক বিদেশী অতিথিকে রাজঘাটে (গান্ধীজির স্মারকস্থল) নিয়ে যাওয়া হয় - সেই অতিথির গান্ধীর মতাদর্শে বিশ্বাস থাক বা না থাক। সেই একই ভাবে নাস্তিক হওয়া স্বত্ত্বেও আমাদের পশুপতিনাথ মন্দিরে যাওয়া উচিত।"
১৩) একবার চেন্নাইয়ের লায়োলা কলেজের একটা অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে ভাষণ দিতে গিয়ে জ্যোতি বসু একটা মজার ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। কলকাতার ধর্মতলার লরেটো স্কুলে যখন পড়তেন তিনি, সেই সময়ে গোটা ক্লাসভর্তি মেয়েদের মধ্যে একমাত্র তিনিই ছিলেন ছেলে। এই কথা শুনে লায়োলা কলেজের অনুষ্ঠানে খুব হাততালি পড়েছিল। কয়েকজন সিটিও বাজিয়েছিল এটা শুনে। অনেক সাহস করে একটি ছেলে উঠে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল -- "স্যার, ক্লাসের এতগুলো মেয়ের সঙ্গে আপনি কী করেছিলেন?" জ্যোতি বসুর মুখে হাসি দেখতে পাওয়াটা খুবই দুর্লভ ছিল। লায়োলা কলেজের অনুষ্ঠানে ওই প্রশ্ন শুনে সেই দুর্লভ হাসিটা মুখে খেলে গিয়েছিল তাঁর। বলেছিলেন -- "ওই বয়সে কী-ই বা করতে পারে কেউ!"
১৪) যে কোনও বৈঠক - তা সে জনাপাঁচেক লোকের বৈঠক হোক বা বিধানসভায় কোনও গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ - একটা কাগজে বক্তব্যের মূল পয়েন্টগুলো লেখা থাকত, যাতে কোনও পয়েন্ট তিনি ভুলে না যান। কিন্তু সেই সব পয়েন্টগুলো ইংরেজীতে লেখা থাকত। জ্যোতি বসুর মন্ত্রীসভার সদস্য ছিলেন অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র। নিজের আত্মকথায়, ডঃ মিত্র লিখেছেন "একবার আমি জ্যোতি বাবুর কাছে জানতে চেয়েছিলাম বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো ইংরেজীতে কেন লেখেন? তিনি হেসে জবাব দিয়েছিলেন, "কী করব? আমি শুধু ইংরেজীতেই লিখতে পারি। তোমার মতো আমার শিক্ষা তো সম্পূর্ণ হয়নি।"
১৫) বিরোধী দল মানেই সৌজন্যেকর সীমা লঙ্খন করে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি নয়! বরং রাজনৈতিক বিরোধিতা হোক, নিজস্ব গন্ডিতেই। একথা বারবার মনে করিয়েছেন জ্যোতি বসু। তাই ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একাধিক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও, কলকাতায় এলে মিসেস গান্ধী কখনও ‘বন্ধু’-র বাড়ি যেতে ভুলতেন না। বিরোধিতায় শালীনতার কথা বাঙালিকে বারবার শিখিয়েছেন জ্যোতি বাবু!
১৬) জ্যোতি বসুর পুত্রবধূ ডলি বসুর কাছ থেকে জানা যায়, বিয়ের একদিন পরেই তিনি জ্বরে পড়লে, অসুস্থ পুত্রবধূর জন্য নিজেই চা বানিয়ে এনেছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে জ্যোতি বসু ২১ বছর বয়সে জীবনে প্রথমবার চা খেয়েছিলেন! তাঁর বাবা চা খেতে মানা করেছিলেন।
১৭) ১৯৭১-এর যে নির্বাচনে, একমাত্র যে নির্বাচনে জ্যোতি বাবু বরানগর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে হেরে যান, সেই নির্বাচনে আজকের স্টার আনদ-এর সুমন ভট্টাচার্য-র ওনার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহুর্তে উনি নির্বাচনে দাঁড়াবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কংগ্রেস জোটসঙ্গী সিপিআই কে আসনটি ছেড়ে দেয়। সিপিআই এর শিবপদ ভট্টাচার্য দাঁড়ান এবং জেতেন।
জ্যোতি বসু নিজের স্বভাবগত দক্ষতায় নিজের দলের চেয়ে বিরোধীদের বেশি খবর রাখতেন,তাই এই তথ্যটি জানতেন। প্রায় তিরিশ বছরের ব্যবধানে কোনো একটা ট্যুরে সুমন ভট্টাচার্যের মতো সেই সময়কার অকিঞ্চিতকর সাংবাদিক কে আলাদা করে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “সকালে ঠিকঠাক খেয়েছেন তো? আপনার বাবা তো এত ঠিকঠাক ডিসিশন নিতেন, আপনি ঠিকঠাক ডিসিশন নিতে ভাবেন কেন?
১৮) জ্যোতি বসু যখনই হিন্দী বলতেন তার মধ্যে প্রায় সবসময়েই কয়েকটা উর্দু শব্দও ব্যবহার করতেন। যার মধ্যে 'নুমায়েন্দা' তাঁর বিশেষ প্রিয় শব্দ ছিল। কিন্তু তাঁর ভাষণের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল অসম্পূর্ণ বাক্য।
১৯) ২০০৩ সালের ৪-ঠা এপ্রিল জ্যোতি বসুর সঙ্গে একই মঞ্চে মরণোত্তর দেহদানের অঙ্গীকারপত্রে সই করেছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়৷ ২০১০ সালের ২০ জানুয়ারি নবতিপর কমিউনিস্ট নেতার দেহ এসএসকেএম হাসপাতালের অ্যানাটমি বিভাগে ঠাঁই পেলেও, পরিবারের আপত্তিতে ২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর বদলে যায় নিথর নীললোহিতের পূর্বনির্ধারিত মরণোত্তর ঠিকানা; জ্যোতিবাবুর ‘পড়শি’ হওয়ার সাধ অপূর্ণই থেকে যায় কবি ও সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর।
২০) ২৩ বছর বাংলাকে শাসন করেছে যে মস্তিষ্ক তা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। বেঙ্গালুরুর NIMHANS-এ সংরক্ষিত আছে জ্যোতি বসুর মস্তিষ্ক।
(তারিণী খুড়ো)
