পাওলো ফ্রেইরির শিক্ষা ভাবনা

পাওলো ফ্রেইরি তাঁর অতি বিখ্যাত বই, “পেডাগজি অফ দ্য অপ্রেসড” বইটিতে প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতি-কে শোষকের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে দেখানোর পাশাপাশি এটিকে শোষকের স্বার্থরক্ষিত হওয়ার কথা বলেছেন। 

পাওলো ফ্রেইরি

প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে অর্জিত জ্ঞান মুখস্থ করে মেমোরিতে জমা রাখে, যেভাবে ব্যাংকে অর্থ ডিপোজিট করা হয়। মেটাফর হিসেবে ব্যবহার করা এই ধারণায় ডিপোজিটার (শিক্ষক) হলেন এক্টিভ এজেন্ট এবং রিসিভার (শিক্ষার্থী) হলেন প্যাসিভ এজেন্ট যেখানে লেনদেনের ডেবিট ক্রেডিট হিসাব। ফ্রেইরি বলছেন, এই শিক্ষা পদ্ধতি মানুষের চেতনা, বিচার বুদ্ধির বিকাশকে ও তার সৃজনশীলতাকে ক্রমশ মেরে ফেলে, ফলে শিক্ষার্থী ক্রমশ এক যান্ত্রিক বস্তুতে পরিণত হয়। ফ্রেইরি বলেছেন- ব্যাঙ্কিং পদ্ধতির মানবতাবাদের মুখোশের আড়ালে প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টা রয়েছে মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করার 

এর পাল্টা হিসেবে মূল সমস্যা গুলি সনাক্ত করে ফ্রেইরি দেখানোর চেষ্টা করেছেন এক বিকল্প শিক্ষাপদ্ধতির যা মূলত শিক্ষার্থী - শিক্ষক "ডায়লগ" ভিত্তিক। যে শিক্ষায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই দাতা ও গ্রহীতা। একপাক্ষিক না। উভয়ের মধ্যেকার জ্ঞানগত দ্বন্দ্ব বিরাজমান থাকবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সকলের অংশগ্রহণ থাকবে। জ্ঞানের চর্চা অনেক বেশি ফ্লেক্সিবেল হবে। ফ্রেইরির মতে, "ব্যাঙ্কিং শিক্ষা পদ্ধতি সৃজন ক্ষমতাকে অসার করে, বাধাগ্রস্ত করে। অপরপক্ষে, সমস্যা শনাক্তকারী শিক্ষা প্রতিনিয়ত বাস্তবতা উন্মোচন করে। ব্যাঙ্কিং শিক্ষা, চেতনাকে ঘুম পারিয়ে রাখে, আর সমস্যা শনাক্তকারী শিক্ষা চেতনার উদ্ভব ঘটায় এবং বাস্তবতাকে বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। এই রকম শিক্ষা মানুষকে বিপ্লবী করে, অন্যায়ের প্রতি প্রতিবাদ করতে শেখায়, ফলে এই শিক্ষা শোষকের স্বার্থ রক্ষা করে না। 

ফ্রেইরির মতে শিক্ষা মানুষের এমন এক ক্ষেত্র যা মানুষ নিজের সচেতনায়নের মাধ্যমে বৈষম্যহীন নতুন পৃথিবীর জন্ম দিতে সক্ষম। কিন্তু জ্ঞান সবসময় একটি বিশেষ শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় জ্ঞানের প্রয়োগ, জ্ঞান অর্জনে মানুষের প্রবেশাধিকার এবং বিস্তৃত করার ক্ষেত্রে তুলনামূলক নিপীড়িত ও শোষিত মানুষেরা বঞ্চিত। পাওলো ফ্রেইরি তার পেডাগজি অফ দ্য অপ্রেসড বইতে বিশ্বজুড়ে এই ব্যাঙ্কিং শিক্ষানীতির মাধ্যমে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিস্তারের স্বরূপ উন্মোচন করেন। 

ফ্রেইরির শিক্ষণ পদ্ধতির মূল কথাঃ

০১) ছাত্রদের সাথে বন্ধুর মতন মতের আদানপ্রদানের মাধ্যমে তাদের মধ্যে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে হবে, যাতে করে সে আগ্রহী হয় বিষয়টি জানতে।

০২) সাধারণ বা সাবেকি পঠনপাঠন পদ্ধতিতে যেখানে পাঠ দানকরা হয়, সেখানে "সিঞ্চন" প্রকল্পে ছাত্রদের জ্ঞান আহরণ করতে শেখানো হয়, যাতে করে ছাত্রদের মধ্যে বিশ্লেষণী ক্ষমতার উন্মেষ ঘটে।

০৩) মুখস্থ করা নয়, আত্মস্থ করার উপরে জোর দেওয়ার কথাই বলা হয়।

০৪) কোনো বিষয় শেখানোর আগে বিষয়টিকে একটি সমস্যার আকারে (প্রবলেমের আকারে) ছাত্রদের সামনে উপস্থিত করার কথা বলা হয়। 

এই পরিসরে পাওলো ফ্রেইরির শিক্ষা বিষয়ক একটি উক্তি তুলে ধরলাম, যেটি থেকে তাঁর শিক্ষণ পদ্ধতি সম্বন্ধে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারেঃ শিক্ষাকে হতে হবে মানুষের ক্ষমতায়নের চাবিকাঠি, যার দ্বারা সে নিজেকে এবং সমাজকে পরিবর্তন করার মধ্য দিয়ে কল্যাণধর্মী ও মানবিক পর্যায়ে উন্নীত করতে সমর্থ হবে।

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন