বাংলা হাস্যরসাত্মক গল্পের শিরোমণি শিবরাম চক্রবর্তী

বাউণ্ডুলেপনা ছিল তাঁর রক্তে। নইলে রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী হয়ে কেউ সব ছেড়েছুড়ে এমন ভবঘুরে জীবন কাটায়? খবরের কাগজ ফেরি করে করতে হয় জীবনের প্রথম রোজগার? এহেন এক মানুষের প্রয়াণ দিবসে তাঁর জীবন কাহিনী তুলে ধরার মধ্যে দিয়ে প্রয়াস করবো তাঁকে চিনতে। 

শিবরাম চক্রবর্তী

“মুক্তারামে বসে তক্তারামে শুয়ে শুক্তারাম খেয়ে”, জীবনের বেশীরভাগ-টাই কাটিয়ে দেওয়া শিবরাম চক্রবর্তীর কথাই বলছি, যার কাছে বাংলা পাঠকরা ঋণী, অফুরান হাস্যরসাত্মক গল্প সৃষ্টির জন্য। 

শিবরামের জন্ম পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায়, ১৯০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর। যদিও তার শৈশব ও কৈশোরের অধিকাংশ সময়ই কেটেছে পাহাড়পুর আর চাঁচলে। শিবরামের মা শিবরাণী দেবী মালদহের চাঁচলের জমিদার পরিবারের মেয়ে ছিলেন। বাবা শিবপ্রসাদ চক্রবর্তী ছিলেন কিছুটা সন্ন্যাসী প্রকৃতির, ভবঘুরের মতো নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন প্রায়ই। পার্থিব জীবনের প্রতি আকর্ষণ শিবরামের মা-বাবা কারোরই তেমন ছিলো না। তাই ছোটবেলা থেকেই বন্ধনহীন মুক্ত পরিবেশে বড় হয়েছিলেন শিবরাম। 

শিবরাম ছোটবেলা থেকেই দেখতেন বাড়িতে তার বাবা এবং মা, এই দুজনের কেউই যেন লৌকিক জগতে থেকেও নেই। ফলে শিবরামেরও তাই হল। সংসারের প্রতি মায়া জন্মাল না। একেবারে অল্প বয়স থেকেই বাড়ি ছেড়ে বারবার পালাত কিশোর শিবরাম। কখনও পাহাড়, কখনও সমুদ্র, যখন যেখানে খুশি। পকেটে এক পয়সাও নেই। ট্রেনে চেপে বসে, যা হোক তা হোক করে, যেখানে খুশি যত দিন খুশি কাটিয়ে আবার সে ফিরে আসত বাড়ি। এসে দেখত এই অল্পবয়েসে কাউকে কিছু না জানিয়ে এত দিন বাইরে থাকার পরেও বাবা-মা দুজনেই নির্বিকার। একবার তাঁরা জিজ্ঞাসাও করতেন না, ‘এত দিন কোথায় ছিলিস?’ আর মায়ের তো বিশ্বাস ছিল মা দুর্গা সবসময় শিবরামকে রক্ষা করেন! এমন পরিবেশে বড় হওয়ার জন্যই হয়তো রাজসম্পত্তি, সংসার কোনও কিছুতেই মায়া জন্মাল না কোনও দিন। 

প্রাথমিক স্কুলে পড়ার সময়েই স্বাধীনতা আন্দোলনের জোয়ার প্রভাবিত করে শিবরামকে। ইস্কুলে মাস্টারমশাই প্রবন্ধ লিখতে দিলেনবড় হয়ে কী হতে চাও? শিবরাম লিখল, দেশপ্রেমিক হতে চাই। 

ইস্কুল শেষে এক বন্ধু আড়ালে টেনে নিয়ে বলল, ‘‘তুই দেশপ্রেমিক হতে চাইলে আমাদের দলে নাম লেখা। আমিও বিপ্লবী, আমার মতো দেশের কাজ করবি।’’ শিবরাম যোগ দিল ওই বিপ্লবীদের দলে। দলে ছোটদের কাজ হল গোপনে চিঠি আর অস্ত্র দেওয়া নেওয়া করা, যাতে পুলিশ সন্দেহ না করে। 

একদিন শিবরামের ওপর দায়িত্ব পড়ল এক সাহেবকে গুলি করে হত্যা করার। তাও আবার এক বিশাল সভার মাঝে। পিস্তল এসে গেল। পকেটে পিস্তল নিয়ে দুরুদুরু বুকে শিবরাম পৌঁছলেন সেই সভায়। সাহেবকে গুলি করার পরেই যে নিজেকেও মরতে হবে তাও অজানা নয়। দেশের জন্য মরতেও প্রস্তুত। 

মঞ্চে সেই সাহেব যেই উঠেছেন অমনি দর্শকের আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন শিবরাম। গুলি ছোড়ার জন্য সবে পকেট থেকে পিস্তল বার করতে যাবেন অমনই মাইকে ঘোষণা, ‘‘শিবরাম চক্রবর্তী মঞ্চে এসো।’’ কেন? উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইতে হবে। সবার চোখ তখন শিবরামের দিকে। আর উপায় নেই Gun এর বদলে গানই ব্যবহার করতে হল মঞ্চে। পকেটের পিস্তল পকেটেই রয়ে গেল! 

১৯১৯ সালে মালদহের সিদ্ধেশ্বরী ইনস্টিটিউট থেকে মেট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়ে ওঠেনি। কারণ ওই সময়ে তার দেখা হয় চাঁচলে স্বদেশী আন্দোলনের সভা করতে আসা বিপ্লবী দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে। এতটাই প্রভাবিত হলেন যে চিত্তরঞ্জন দাশের সাথে ফিরতি ট্রেনে চেপে বসলেন, স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দেবেন বলে। কলকাতায় আসার পর বিপ্লবী বিপিনবিহারী গাঙ্গুলির পরামর্শে শিবরাম কলকাতার ন্যাশনাল কাউন্সিল অব এডুকেশন এর অধীনস্থ গৌড়ীয় সর্ববিদ্যায়তনে ভর্তি হন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সে সময় সেই বিদ্যায়তনের প্রিন্সিপাল ছিলেন। দেশবন্ধুর সহযোগিতায়  শিবরামের ফরবেস ম্যানসনে বিনে পয়সায় থাকা-খাওয়ার এবং নিয়মিত কিছু মাসোহারার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। প্রথম বেশ কিছুদিন ভালো কাটলেও শিবরামের বাউণ্ডুলে স্বভাবের কারণে এই অবস্থা আর বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই পড়াশোনা আর মেসের পাট চুকিয়ে ফেলেন। যদিও পরে দেশবন্ধুর প্রচেষ্টায় এই বিদ্যায়তন থেকেই এন্ট্রান্স পাশ করেন তিনি। 

কিন্তু ম্যাট্রিক পাশ দিয়েই আবার পুরোদমে স্বদেশী আন্দোলনে। তখন হাজারে হাজারে ছেলে জেলে যাচ্ছে বন্দেমাতরমবলে। শিবরামেরও খুব শখ জেলে যাওয়ার। কিন্তু অমন ল্যাকপেকে চেহারা দেখে পুলিশ কিছুতেই আর ধরে না। 

একদিন ধরল। বলা যায় নিজেই একপ্রকার ধরা দিলেন। সেই জেলে গিয়েও অবাক শিবরাম। গ্রামে তার কিশোরী প্রেমিকা রিনি, যে কলকাতায় চলে এসেছিল সেও রয়েছে ওই জেলেই। জেলের মধ্যেই আবার প্রেমিকার সঙ্গে পুনর্মিলন। কিন্তু বেশি দিনের সুখ তো শিবরামের কপালে নেই। কয়েক দিন পরেই অন্য জেলে বদলি হয়ে গেল শিবরাম। আবার বিচ্ছেদ। 

তখন মুক্তারামের মেসে পাকাপাকি চলে এসেছেন। একদিন রাতে কুখ্যাত টেগার্ট সাহেব স্বয়ং এসে হাজির শিবরামের মেসে। চারদিক পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। পাকা খবর, শিবরামের মেসে প্রায়ই নাকি বিপ্লবীরা এসে রাতে থাকে। টেগার্ট এসে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তোমার মেসে আর কেউ আসে?’’ 

‘‘আজ্ঞে হ্যাঁ, যার যখন খুশি চলে আসে। চলে যায়, আবার আসে।’’ 

‘‘এর মধ্যে কে এসেছিল?’’ 

‘‘আজ্ঞে, তারক এসেছিল।’’ 

‘‘কেমন দেখতে?’’ 

শিবরামের বর্ণনা শুনে টেগার্ট বলে উঠলেন, ‘‘ইয়া দ্যাটস দ্য ম্যান। হি ইজ্ সিয়োরলি আ টেররিস্ট।’’ 

‘‘টেররিস্ট কি না জানি না স্যার তবে হি ইজ এ নভেলিস্ট।’’ 

‘‘নাউ হি ইজ আ রাইটার? নট এ টেররিস্ট ইউ মিন?’’ 

শিবরামের জবাব, ‘‘বাট টু লিসন টু হিজ রাইটিংস নট লেস এ টেরর স্যার। আই ডোন্ট লাইক, কিন্তু কী করব? জোর করে সে শোনাবেই।’’ 

এবার টেগার্ট কী বলবেন বুঝে পেলেন না। শিবরামের ঘর সার্চ হল। কিছুই পাওয়া গেল না। কিন্তু তার পর দিন থেকে শিবরাম পেলেন অনেক কিছু। এলাকায় বিশাল নাম হয়ে গেল তাঁর। কেউ ভাবল পুলিশের চর, তো কেউ ভাবল বড় বিপ্লবী। 

যারা পাত্তাই দিত না তারাই দুইবেলা খাতির করত। সব থেকে বড় পাওনা সাধনবাবুর সন্দেশের দোকানে ধারে রাবড়ি পাওয়ার ব্যবস্থা। 

এক ধূপকাঠিওলার ছদ্মবেশে দিনদুপুরে এক চোর ঢুকল শিবরামের ঘরে। ঘর মানে, যেখানে মুক্তারামের তক্তারামে শুক্তারাম খেয়ে শিবরাম থাকেন সেই মেসের ঘরে। বাইরে গেলে কোনও কালেই ঘরে তালা দেন না, তালা দিয়ে লাভ কী? কিছুই তো নেই ঘরে। শুধু চার দেওয়ালে অজস্র নাম-ঠিকানা আর ফোন নম্বর লেখা। শিবরামের অকাট্য যুক্তি, ‘খাতা হারিয়ে গেলেও দেওয়াল হারানোর কোনও সুযোগ নেই। 

চোর ঢুকে গোটা ঘরে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও কিছুই পেল না। ফিরে গেল। 

সন্ধেবেলা শিবরাম ঘরে ঢুকে দেখে জামাকাপড়, লেখার কাগজপত্র, কম্বল-বালিশ সব তছনছ। আর তক্তপোশের ওপর রাখা একটি দশটাকার নোট এবং এক প্যাকেট ধূপকাঠি আর একটি চিঠি। 

চিঠিতে লেখা, ‘ভাই তোমার ঘরে চুরি করতে এসে দেখলাম তোমার অবস্থা আমার থেকেও খারাপ। কাজকম্ম বোধহয় কিছুই করো না। এই দশটা টাকা রেখে গেলাম। এই টাকায় এই কোম্পানির ধূপকাঠি কিনে ফেরি কোরো। এইভাবে কত দিন চলবে? আমার পরামর্শ মানলে জীবনে উন্নতি করবে। 

ধূপকাঠি ফেরি না করলেও জীবনের প্রথম রোজগার শুরু করেছিলেন কিন্তু ফেরিওলা হয়েই। খবরের কাগজ ফেরি। গ্রামের বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতায় আসার কিছুদিন পরে শিবরাম কোথায় থাকবে, কী করে পেট চলবে জানা নেই। সুতরাং দুই বেলা কখনও ভিখিরিদের সঙ্গে পঙ‌্ক্তিভোজ আর রাত্রে ওই ভিখিরিদের সঙ্গেই ফুটপাতে বা মন্দিরের গায়ে লাইন দিয়ে শোয়ার ব্যবস্থা। একদিন হঠাৎই পরিচয় হল তারই বয়েসি একটি ছেলের সঙ্গে। 

‘‘আরে তুমি তো ভদ্রলোকের ছেলে, এই ভাবে ভিখিরিদের সঙ্গে বেশি দিন থাকতে পারবে না। এক কাজ করো।’’ 

‘‘কী করব তাহলে?’’ শিবরামের প্রশ্ন। 

‘‘তুমি আমার মতো খবরের কাগজ ফেরি করো। আমি যোগাযোগ করিয়ে দেব।’’ 

ব্যস, শুরু হয়ে গেল পরদিন থেকেই। কখনও হেদুয়া তো কখনও শ্যামবাজার, কখনও বউবাজার তো কখনও গোলদিঘি। কিন্তু কাগজ বেচাও অত সহজ নয়। পুরনো ফেরিওয়ালারা নতুনকে ঢুকতে দেবে কেন? তাই বার বার জায়গা বদল। সারাদিন কাগজ বেচে যা কমিশন হাতে আসে তাই দিয়ে আগেই রাবড়ি, রসগোল্লা, চপ-কাটলেট এবং অবশ্যই সিনেমা। 

রোজের রোজগার রোজই শেষ। 

টাকা নিয়ে টানাটানি আর যায় না। হবে নাই বা কেন? লিখে কিছু টাকা এলেই তো সঙ্গে সঙ্গে চপ কাটলেট, রসগোল্লা, বাবড়ি আর সিনেমা। তাও আবার একা নয়। সঙ্গে কেউ থাকলে তাকেও পাকড়াও করে নিয়ে যেতেন দোকানে। পেটপুরে খাওয়া, যতক্ষণ না শেষ পয়সাটাও নিঃশেষ হচ্ছে। আর কোনও নেশা নেই। নেশা করলে রাবড়ির নেশা করাই ভাল’— এই হল শিবরামের সিদ্ধান্ত। 

একবার তো বন্ধু কার্টুনিস্ট চণ্ডী লাহিড়ীর সঙ্গে গিয়ে ঘুগনিওলাকে বললেন ‘‘তিন প্লেট ঘুগনি দাও।’’ 

ঘুগনিওয়ালা জিজ্ঞাসা করল, ‘‘আপনারা তো দুইজন, আরেকটা কাকে দেব?’’ 

‘‘আরেকটা তুমি খাবে। কোনও দিন নিজের ঘুগনি খেয়ে দেখেছ? আজ খাও। আমি খাওয়াব।’’ 

ঘুগনিওয়ালা এমন খদ্দের পেয়ে হাঁ। শিবরামের সামনেই নিজের বানানো ঘুঘনি খেয়ে তারপর তার নিস্তার। 

সে বার বেজায় টানাটানি চলছে। খবর কানে গেল দেশবন্ধুর। শিবরাম চিরকালই তাঁর বড় প্রিয়, বারবার বলতেন, শিবরাম আলাদা জাতের। অনেক প্রতিভা। দেশবন্ধু চিঠি লিখলেন সুভাষ বোসকে।— ‘শিবরামকে আত্মশক্তি কাগজে নিয়ে নাও। ভালো লেখে ও। 

গুরুদেবের আদেশে শিবরামকে চাকরিতে নিলেন নেতাজি। কিন্তু মানুষটি যে শিবরাম! নিয়মকানুনের ধারে কাছে নেই। কোনও দিন অফিস যান তো কোনও দিন টিকিটি নেই। কখন আসেন আর কখন বেরিয়ে যান তাও কেউ জানে না। সুভাষ বোসের কানে গেল সেকথা। এমন আচরণ নিয়মনিষ্ঠ নেতাজির কোনও মতেই পছন্দ নয়। শিবরামকে ওয়ার্নিং তিনি দিলেন ঠিক সময়ে রোজ দপ্তরে আসার জন্য। কিন্তু শিবরাম কোনও দিনই বা কার কথা শুনে চলেছেন? ফলে যা হওয়ার তাই হল। একদিন হাতে একটি খাম পেলেন। তার মধ্যে একশো টাকার একটি নোট আর সুভাষচন্দ্রের একটি একলাইনের চিরকুট। তাতে লেখা।— ‘আপনাকে আর দরকার নেই।চাকরি নেই। হাতে বরখাস্ত হওয়ার চিঠি পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন! 

একবার আস্ত একটা খবরের কাগজেরই মালিক হয়ে গিয়েছিলেন শিবরাম। যুগান্তর সেবার দেউলিয়া। বন্ধই হয়ে যাবে এমন অবস্থা। মাত্র ৫০০ টাকা দিয়ে শিবরাম কিনে ফেললেন যুগান্তর-এর স্বত্ত্ব। সম্পাদক হলেন। তখন অনেক কাগজেরই ইংরেজ সরকারের কোপে পড়ে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। যুগান্তর-এ ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে লেখা ছেপে শিবরামও পড়লেন রাজরোষে। 

একদিন দফতরের কাজ সেরে মেসের দিকে ফিরছেন, রাস্তাতেই খবর পেলেন পুলিশ এসেছে। তাঁকে খুঁজছে। শিবরাম বুঝে গেলেন। আগেই ঢুকে পড়লেন সামনে একটা মিষ্টির দোকানে, যদি জেল হয় তাহলে কত দিন মিষ্টি খাওয়া হবে না, কে জানে! আর আজ নিশ্চয়ই অনেকক্ষণ না খেয়ে থাকতে হবে পুলিশি জেরায়। সুতরাং কুড়িটা বড় সাইজের রসগোল্লার অর্ডার। ধরা যখন পড়তেই হবে, তখন রসগোল্লা খেয়ে ধরা পড়াই ভাল। টপাটপ কুড়িটা রসগোল্লা আত্মসাৎ করার পর পকেটে হাত দিয়ে বুঝলেন একটা টাকাও নেই। এবার? 

দোকানের মালিক সঙ্গে লোক দিয়ে দিলেন, যে শিবরামের সঙ্গে ওর মেস পর্যন্ত গিয়ে টাকা নিয়ে আসবে। বাড়িতে ঢোকার মুখেই গ্রেপ্তার হলেন শিবরাম। পুলিশকে বোঝালেন একজনকে টাকা মেটাতে হবে, একবার ঘরে ঢোকা দরকার। বলে পিছনে তাকাতেই অবাক! সেই কর্মচারী বিপদ বুঝে কখন পালিয়েছে! পাছে স্বদেশীকে মিষ্টি খাওয়ানোর অভিযোগে তাকেও জেলের ঘানি ঘোরাতে হয়! 

জেল হল। ছাড়াও পেলেন। জেলমুক্ত শিবরাম কিছু পয়সা জুটিয়ে আগে গেলেন সেই মিষ্টির দোকানে। ধারের টাকা মেটাতে হবে যে! কিন্তু ঢুকতেই দোকানের মালিক হাতজোড় করে উঠে দাঁড়ালেন।— ‘‘দয়া করে বোমা মারবেন না। যা টাকা লাগবে বলুন দিয়ে দিচ্ছি।’’ 

আসলে তত দিনে স্বদেশী নামে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে শিবরাম। জেলে যাওয়া মানেই সন্ত্রাসবাদী। 

‘‘না না আমি টাকা নিতে আসিনি।’’ 

‘‘আজ্ঞে যা আছে দিয়ে দিচ্ছি। স্বদেশের কাজ করেন, আমাদেরও তো সেবা করা উচিত।’’ বলে কাঁপা হাতে ক্যাশবক্সে হাত দেন দোকানদার। 

‘‘আরে কী মুশকিল, আমি এসেছি আপনার ধার মেটাতে।’’ 

শিবরামের কাছে সব শুনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন দোকানদার। টাকা তো নিলেনই না, উপরন্তু একজন মানুষ এক সিটিং-এ বসে কুড়িটা রাজভোগ খেতে পারেন শুনে, আবার কুড়িটা রাজভোগ শিবরামকে খাইয়ে নিজের চোখ আর কানকে বিশ্বাস করালেন। এবং আরও কুড়িটা হাঁড়িতে ভরে দিলেন। বললেন, ‘‘বাড়িতে খাবেন আর দোকানে যখন খুশি এসে খেয়ে যাবেন। পয়সা লাগবে না।’’ 

না, দ্বিতীয় দিন থেকে আর ওই দোকানের ধারেকাছে যাননি শিবরাম। ধারের ধার বেশি না ধরাই ভাল, এই ছিল শিবরামীয় যুক্তি। 

ছোটদের জন্য লিখতেন, নিজের মনটাও ছিল একেবারে শিশুর মতো। নিজের খেয়াল খুশির রাজা। খুদে পাঠকরাই ছিল তাঁর বন্ধু। বেজায় ভালবাসতেন ছোটদের। জীবনে কোনও দিন কারও নিন্দা করেননি, শুনতেও চাইতেন না। 

কেউ যদি কখনও এসে বলতেন, শিবরামদা আপনার নামে অমুকে খারাপ কথা বলে বেড়াচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গে শিবরামের উত্তর, ‘‘হতেই পারে না। আপনিই ভুল শুনেছেন।’’ বলেই তার হাত ধরে নিয়ে যেতেন খাওয়াতে। নিজেকে সাহিত্যিক পরিচয় দিতেও সংকোচ। বলতেন, ‘‘ধুর ধুর আমি আবার সাহিত্যিক হলাম কবে? প্রেমেন, অচিন্ত্য, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভুষণ এরা হলেন সাহিত্যিক। কত ভাল ভাল লেখেন! তাদের পাশে আমি!’’ 

নিজের সম্পর্কে বলতেন, ‘‘সার্কাসের ক্লাউন যেমন। সব খেলাই সে পারে, কিন্তু পারতে গিয়ে কোথায় যে কী হয়ে যায় খেলাটা হাসিল হয় না। হাসির হয়ে ওঠে। আর হাসির হলেই তার খেলা হাসিল হয়।’’ 

ক্লাউন’-এর দর্শনটাই আলাদা! শিবরামীয় দেখাটাই ছিল অন্য রকম। আকাশের দিকে তো আমরা সবাই তাকাই কিন্তু শিবরামের মতো তাকাতে পারি কি? 

বলি গল্পটা। 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন আনন্দবাজার-এ চাকরি করেন। একদিন বেলার দিকে এক সাহিত্যিক এসে খবর দিলেন শিবরামবাবুকে দেখলাম, অফিসের কাছেই ফুটপাথে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। মনে হয় শরীরটরির...!’’ 

সর্বনাশ! সে কী কথা! সুনীল সদলবলে ছুটলেন। গিয়ে দেখেন, সিল্কের পাঞ্জাবি আর ধুতি পরে শিবরাম টানটান শুয়ে রয়েছেন ফুটপাতে। 

‘‘কী হল? শরীর খারাপ লাগছে?’’ 

‘‘না না, ফার্স্টক্লাস আছি। আসলে যেতে যেতে হঠাৎ মনে হল ফুটপাতে শুয়ে আকাশটাকে কেমন দেখতে লাগে একবার দেখাই যাক।’’ 

শরীরটা কিন্তু সত্যিই ঠিক যাচ্ছিল না। স্মৃতি কমে আসছিল। কথাবার্তা অসংলগ্ন। শেষ জীবনে প্রায় কপর্দকহীন। প্রায়ই বলতেন, ‘‘জিনিসপত্র সব বাঁধা হয়ে গেছে এবার একটা ট্যাক্সি পেলেই চলে যাব।’’ 

চিরকাল লোককে বিশ্বাস করেছেন আর বারবার ঠকেছেন। অনেক প্রকাশক ঠকিয়েছে। এমনকী শেষদিকে সেই সময়ের রাজ্য সরকার এবং কয়েকটি সংস্থা মিলে তাঁর চিকিৎসা ও ভরণপোষণের জন্য যে মাসিক ছশো টাকা তারই এক পাড়াতুতো পরিচিতের কাছে পাঠাত, সেই টাকারও সঠিক ব্যবহার হত না। 

শুকনো-রিক্ত চেহারা। অথচ কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করলেই উত্তর ‘‘খাসা আছি। ফাইন আছি।’’ কোনও দিন কোনও অভিযোগ নেই কারও কাছে। তারমধ্যে আবার একদিন ঘরে চোর ঢুকে শেষ পাঞ্জাবিটাও নিয়ে গেছিল, গেঞ্জি পরেই থাকতেন। 

মুখে বলতেন, ‘‘দরকার কী? এই তো দিব্বি চলে যাচ্ছে গেঞ্জিতে।’’ 

হঠাৎ কয়েক দিনের প্রবল জ্বর। দুর্বল শরীরে টলতে টলতে বাথরুমে ঢুকেই সংজ্ঞা হারালেন। সারারাত পড়ে রইলেন ওখানেই। পরদিন বেলায় খবর জানাজানি হতে ভর্তি করা হল হাসপাতালে। 

১৯৮০ সালের ২৮ অগস্ট সকাল। হাসপাতালের বেডে আচ্ছন্ন বাড়ি থেকে পালিয়ের নায়ক। 

ডাক্তারবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘শিবরামবাবু, এখন কেমন লাগছে শরীর?’’ 

‘‘ফার্স্টক্লাস।’’ 

জড়ানো গলায় তখনও একই উত্তর। 

তার ঠিক পাঁচ মিনিট পরেই সেই অপেক্ষার অচেনা ট্যাক্সিতে চেপে বসলেন শিবরাম। 

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন