বহুকালের
পোষিত শিক্ষাভাবনার মূলে আঘাত করে যিনি প্রথম বলেছিলেন, “প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিতে
আদপে শোষকের স্বার্থ সূরক্ষিত হয়”, সেই ব্রাজিলীয় বংশোদ্ভূত, মানবতাবাদী শিক্ষক পাওলো ফ্রেইরির জন্মদিন ছিলো ১৯-শে সেপ্টেম্বর। মার্ক্স-অনুপ্রাণিত
পাওলো-কে ভালো করে চিনতে ও চেনাতেই, এই লেখার অবতারণা।
![]() |
| পাওলো ফ্রেইরি |
সম্পূর্ণ
নাম পাওলো হায়াগ্লুস ন্যাভিস ফ্রেইরি। জন্ম ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের ১৯-শে সেপ্টেম্বর
ব্রাজিলের উত্তর-পূর্ব রাজ্য পারনামবুকোর রাজধানী শহর রেসিফের এক মধ্যবিত্ত
পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্য ও ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই করতে করতেই বড় হয়েছেন
পাওলো। অভাব ছিল তাঁদের পরিবারের নিত্যসঙ্গী। অভাবের জন্যই ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে
রেসিফের পশ্চিমে অবস্থিত ছোটো শহর জাবোয়াটো ডস গুয়ারারাপস –এ চলে যান পাওলোর পরিবার। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের ৩১-শে অক্টোবর পিতার মৃত্যু
তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে আরো সমস্যার মুখে ফেলে;
ব্যাহত হয় পড়াশোনা।
দারিদ্রতার
ফলে ফ্রেইরি, তাঁর শৈশব এবং কৈশোরে চার গ্রেড
পিছিয়ে পড়েন। সেই সময়ে তাঁর সামাজিক জীবন অন্যান্য দরিদ্র শিশুদের সঙ্গে বস্তির
অলিগলিতে ফুটবল খেলার মধ্যেই আবর্তিত ছিল,
যা তাঁকে অনেক কিছু
শিখিয়েছিল বলেই দাবি করেছিলেন তিনি। জীবনের এই অংশের কথা বলতে গিয়ে পরবর্তীতে
পাওলো বলেছেন, “ক্ষুধার কারণে কোনো পড়াশোনাই
আমার মাথায় ঢুকতো না। এমন না যে আমি বোকা ছিলাম,
অথবা আমার আগ্রহের
কোনো অভাব ছিল। আমার সামাজিক অবস্থা আমাকে শিক্ষা নিতে দেয়নি।"
তবে তার
শেখার ক্ষমতা ছিল প্রবল। দারিদ্র্য আর ক্ষুধা তার শেখার ক্ষমতাকে যেন আরো গভীরভাবে
ক্ষুরধার করে তুলেছিল। চূড়ান্ত অভাবের ওই দিনগুলোই পরবর্তীতে তাঁকে দরিদ্র ও
শোষিতদের জন্য কাজ করতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।
১৯৪৩
খ্রিস্টাব্দে পাওলো ফ্রেইরি রেসিফে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল'স্কুলে পড়ার সুযোগ পান। আইনের
পাশাপাশি সেখানে তিনি দর্শন, আরও বিশেষভাবে ফেনোমোলজি এবং
ভাষার মনোবিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন। অবশ্য আইনের পাঠ সম্পন্ন করেও, আইন ব্যবসায় যুক্ত না হয়ে এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে শুরু করেন।
১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি সহকর্মী শিক্ষয়িত্রী 'এলজা মৈয়া কোস্টা ডি অলিভেরা'কে বিয়ে করেন এবং দুজনেই শিক্ষার কাজে লিপ্ত থাকেন।
১৯৪৬ সালে, ফ্রেইরি পার্নাম্বুকো ডিপার্টমেন্ট অফ এডুকেশন এন্ড কালচার-এর ডিরেক্টর পদে
নিযুক্ত হোন। অশিক্ষিত, দরিদ্রদের মধ্যে প্রাথমিকভাবে
কাজ করে, ফ্রেইরি একটি ভিন্নধারার শিক্ষামূলক অনুশীলন-এর
চর্চা শুরু করেন। এই পদে থাকাকালিন-ই, ১৯৪৭ সালে ফ্রেইরি ব্রাজিলিয়ান
শ্রমিক শ্রেণীর জন্য স্বাস্থ্য, বাসস্থান, শিক্ষা এবং অবসর ক্ষেত্রে সামাজিক সেবা প্রদানের জন্য একটি সরকারি সংস্থা Serviço Social da Indústria (SESI) এ কাজ শুরু করেন। SESI
-তে, কাজের সময়েই ব্রাজিলীয় শ্রমিক শ্রেণীর জীবন এবং ব্রাজিলিয়ান স্কুল
ব্যবস্থার শিক্ষণ পদ্ধতির বিভিন্ন দিকসমুহ কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার যে সুযোগ পান, তার উপরে ভিত্তি করেই তিনি পরবর্তীকালে একজন শিক্ষক এবং রাজনৈতিক চিন্তাবিদ
হিসেবে নিজেকে বিকশিত করেন। এরপরে ফ্রেইরি গবেষণা ও পরিকল্পনা বিভাগের পরামর্শদাতা
হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
ফ্রেইরি
শিক্ষাকে নিছক একাডেমিক স্বীকৃতি হিসেবে বা কর্মসংস্থানের মাধ্যম বা পেশাদারী
সাফল্যের প্রয়োজনীয় পথ হিসেবে দেখেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শিক্ষার্থীদের নিজেদের সামাজিক সমস্যাগুলি বোঝা উচিত এবং নিজেকে সৃজনশীল
প্রতিনিধি হিসাবে আবিষ্কার করা উচিত। প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষায় তাঁর গবেষণা-সমগ্র
দেশজুড়ে খুব দ্রুত প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে এবং তিনি শীঘ্রই নিজেকে একজন
প্রগতিশীল শিক্ষাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
১৯৬১ সালে, রেসিফের মেয়র ফ্রেইরিকে শহরের জন্য স্বাক্ষরতা কর্মসূচী বিকাশে সাহায্য
করতে অনুরোধ করেন। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল মূলত শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে
স্বাক্ষরতাকে ছড়িয়ে দেওয়া যার উপর ভিত্তি করে গণতান্ত্রিক আবহাওয়া গড়ে তোলার
পাশাপাশি দেশীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ করা যায়। 'নিরক্ষর' শব্দের নেতিবাচক অর্থের কারণে স্বাক্ষরতার ক্লাসের পরিবর্তে 'সাংস্কৃতিক বৃত্ত' শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করেন
ফ্রেইরি। এই সাংস্কৃতিক বৃত্ত-এর শিক্ষকদের ইচ্ছাকৃতভাবে শিক্ষক না বলে, ‘সমন্বয়কারী’ এবং ছাত্রদের ‘অংশগ্রহণকারী’ বলা হ’ত। পরম্পরাগত বক্তৃতার পরিবর্তে, দ্বিপাক্ষিক সংলাপে উৎসাহিত করা
হ’ত। এছাড়াও চিরাচরিত পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু প্রায়ই
কৃষক ও শ্রমিকদের বাস্তব জীবনে সাংস্কৃতিক অবস্থানের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার
কারণে ফ্রেইরি সেগুলি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকেন।
১৯৬২ সালে
ফ্রেইরি-র এই পদ্ধতিতে ৩০০ জন নিরক্ষর আখ খামার শ্রমিক মাত্র ৪৫ দিনে লেখাপড়া
শিখতে সক্ষম হয়। শীঘ্রই, ফ্রেইরির ধারণা বাস্তবায়নের
জন্য সমগ্র ব্রাজিল জুড়ে হাজার হাজার 'সাংস্কৃতিক চক্র' গড়ে ওঠে। পাওলো কাজ করেছিলেন এই ভাবে—
একটি শব্দ, ‘ফ্লাভেলা’ (বস্তি) একটি সঙ্কেত বা কোড।
কথোপকথনের ভিতর দিয়ে সঙ্কেত ভেঙে বেরিয়ে এল: বস্তির ঘর,
তার উপাদান, বস্তির মানুষের জীবনযাপন— নতুন নতুন শব্দ ধরে চলে আলোচনা, আর এইভাবেই তৈরি হয়ে যায় পাঠক্রম। শব্দ এখানে নিরর্থক বর্ণসমষ্টি নয়; অর্থপূর্ণ একটি বস্তু বা ভাবের সঙ্কেত।
১৯৬৪-র
সামরিক অভ্যুত্থান (সিআইএ দ্বারা সমর্থিত) –এর ফলে তার কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
তিনি বিশ্বাসঘাতক হিসাবে বন্দী হোন এবং ৭০ দিন কারাবাস করেন। ধরা যাক, ‘ইট’ শব্দটা নিয়ে কথোপকথন চলছে। ইট থেকে ইটভাটা, তা থেকে শ্রমিক নারীপুরুষ, তারপর তাঁদের কাজের পরিস্থিতি, তা থেকে মজুরির হার। কথোপকথন এমন জায়গায় চলে যাচ্ছে যেখানে অন্যায্য মজুরি, মালিকের শোষণ, শ্রমিক-বঞ্চনা ইত্যাদি বিষয় ধাপে
ধাপে এসে যাবেই। এমন শিক্ষাপদ্ধতি কোনও শাসকেরই পছন্দ হওয়ার কথা নয়।
ফ্রেইরি
এবং তার পরিবার ১৯৬৪ থেকে ১৯৮০ পর্যন্ত নির্বাসিত জীবনযাপন করেন প্রথমে বলিভিয়ায়
এবং পরে চিলিতে। চিলির সরকারের বদান্যতায়,
ফ্রেইরি চিলির কৃষকদের
মধ্যে তাঁর স্বাক্ষরতা প্রকল্প চালিয়ে নিয়ে যান। এই প্রকল্প তাঁর মধ্যে এই চেতনার
সঞ্চার করে যে, স্বাক্ষর হয়েও এই কৃষকেরা
নিজেদেরকে স্বাধীন ভাবার মতো মানসিক জায়গায় উত্তরণ ঘটাতে পারেনি। তাঁর ছাত্রেরা
যাতে নিজেদের প্রকৃত স্বাধীন মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করতে পারে, সেই প্রয়াসে ফ্রেইরির পরবর্তী লক্ষ্য হয়ে ওঠে তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সেই
পরিস্থিতি তৈরি করা।
শিক্ষাকে আরও অর্থবহ এবং প্রাসঙ্গিক করে তোলার জন্য তার পূর্ববর্তী কাজের থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ‘৬০-এর দশকে, ফ্রেইরি তার ভাবনা দুটি বই-এর মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করেন: ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়, “এডুকেশন অ্যাস দি প্র্যাকটিস অফ ফ্রিডম” (স্বাধীনতার অনুশীলনে শিক্ষা) এবং ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হয় “পেডাগোজি অফ দি অপ্রেসড” (নিপীড়িতের শিক্ষাতত্ত্ব)।
পেডাগজি
অফ দ্য অপ্রেসড, নিপীড়িতের শিক্ষাতত্ত্ব, বইটিকে একসময় নিষিদ্ধও করা হয়েছিল;
কারণ এর ভাবনায় ছিলো
বিপ্লবের রসদ। বইটিতে প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিকে শোষকের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে
চিহ্নিত করে দেখানো হয়েছিল; দেখানো হয়েছিল এতে শোষকের
স্বার্থরক্ষিত হয়। সেই প্রাচীন যুগ থেকে শিক্ষাকে মনে করা হয়েছে দানের বিষয়।
শিক্ষক উঁচু বেদি থেকে শিক্ষা বা জ্ঞান প্রদান করবেন,
আর শিক্ষার্থী নত হয়ে
বিনা প্রশ্নে সেই জ্ঞানের খণ্ড দিয়ে মনের শূন্যপাত্র ভরে নেবে। আমাদের দেশে যেমন
গুরুবাক্য ছিল আপ্তবাক্য। বেদ অপৌরুষেয়,
স্মৃতিশাস্ত্র
অবশ্যমান্য। ইউরোপের আঠারো শতকের জ্ঞানদীপ্তির পরেও মানুষের মনকে ফাঁকা স্লেটের
মতো ভাবতে চাইতেন জন লক প্রমুখ দার্শনিক।
পাওলো এই
ধারণাকে উল্টে দিয়ে বললেন, শিক্ষা জিনিসটা দান করা বা পুঁজি
করে রাখার মতো বস্তু নয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কথালাপ আর প্রশ্ন-প্রতিপ্রশ্নের ভিতর
থেকেই প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে নতুন নতুন জ্ঞানের শিখা। প্রচলিত ভাবনার শিক্ষাকে তিনি
বললেন আমানতি (ব্যাঙ্কিং) ব্যবস্থা, আর তার বিপরীতে নিয়ে এলেন কথালাপী পদ্ধতি বা ‘ডায়ালজিকাল মেথড’। ফ্রেইরি দেখালেন, এই শিক্ষা পদ্ধতি মানুষের চেতনা, বিচারবুদ্ধির বিকাশকে ও তার
সৃজনশীলতাকে ক্রমশ মেরে ফেলে; ফলে শিক্ষার্থী ক্রমশ এক যন্ত্রে
পরিণত হয়। ফ্রেইরি বলেছেন- “ব্যাঙ্কিং পদ্ধতির মানবতাবাদের
মুখোশের আড়ালে প্রচ্ছন্ন প্রচেষ্টা রয়েছে মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করার”।
এর
প্রতিকল্প হিসেবে মূল সমস্যাগুলি সনাক্ত করে ফ্রেইরি দেখানোর চেষ্টা করেছেন এক
বিকল্প শিক্ষাপদ্ধতির যা মূলত শিক্ষার্থী - শিক্ষক "ডায়লগ" ভিত্তিক। যে
শিক্ষায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই দাতা ও গ্রহীতা। একপাক্ষিক না। উভয়ের মধ্যেকার
জ্ঞানগত দ্বন্দ্ব বিরাজমান থাকবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সকলের অংশগ্রহণ থাকবে। জ্ঞানের
চর্চা অনেক বেশি ফ্লেক্সিবেল হবে। ফ্রেইরির মতে,
"ব্যাঙ্কিং
শিক্ষা পদ্ধতি সৃজন ক্ষমতাকে অসার করে, বাধাগ্রস্ত করে। অপরপক্ষে, সমস্যা শনাক্তকারী শিক্ষা প্রতিনিয়ত বাস্তবকে তুলে ধরে। ব্যাঙ্কিং শিক্ষাচেতনাকে
ঘুম পারিয়ে রাখে; আর সমস্যা শনাক্তকারী শিক্ষা
চেতনার উদ্ভব ঘটায় এবং বাস্তবকে বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে”। এই রকম শিক্ষা মানুষকে বিপ্লবী করে,
অন্যায়ের প্রতি
প্রতিবাদ করতে শেখায়; ফলে এই শিক্ষা শোষকের স্বার্থ
রক্ষা করে না। ফ্রেইরির মতে শিক্ষা মানুষের এমন এক ক্ষেত্র যা মানুষ নিজের
সচেতনতার মাধ্যমে বৈষম্যহীন নতুন পৃথিবীর জন্ম দিতে সক্ষম।
পনেরো
বছরের নির্বাসন কালে ফ্রেইরি লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে শহরে-গ্রামে দরিদ্রদের
নিয়ে কাজ করেছেন। নির্বাসন পর্বে পাওলো ফ্রেইরি ভারতে এসেছিলেন। তাঁর চিন্তায়
অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন গান্ধীবাদী শিক্ষাবিদ জে. পি. নায়েক। মার্ক্স-অনুপ্রাণিত
পাওলো একাধিক রচনায় বলেছেন, শিক্ষা মানে ‘বিবেকের উন্মেষ’— দরিদ্র মানুষ শিক্ষার ভিতর দিয়ে
খুঁজে বার করবে তাঁদের বঞ্চনার কারণ এবং তা থেকে মুক্তির উপায়। তাঁর আর একটি
বিখ্যাত বই, এডুকেশন: দ্য প্র্যাকটিস অব ফ্রিডম প্রকাশিত হয়
১৯৭৬ সালে। প্রতিটি শব্দের ভিতর দিয়ে এই বিশ্ব সম্বন্ধে চেতনার উন্মেষ ঘটাতে, ১৯৮৭
সালে প্রকাশিত হয়, স্বাক্ষরতা: শব্দপাঠ ও বিশ্বপাঠ (লিটারেসি: রিডিং দ্য ওয়র্ড
অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড)।
১৯৭২ সালে
পেঙ্গুইন থেকে পেডাগজি-র ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তা সাড়া ফেলে
দিয়েছিল। ১৯৮২ পর্যন্ত প্রতি বছরই নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে
পাওলোর কাছে আমন্ত্রণ আসে। ইউরোপ, আমেরিকার কয়েকটি দেশেও পাওলো
ফ্রেইরির পদ্ধতি অনুসৃত হয়েছে। পাওলোর শিক্ষা চিন্তায় ‘ডায়ালগ’ বা কথোপকথনের গুরুত্ব সর্বাধিক। ডায়ালগের ভিতর দিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, দু’জনেই নিজেদের বদলাতে পারে।
পরবর্তীকালে
ফ্রেইরি পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব সাও পাওলোতে অধ্যাপনায় যুক্ত হন।
তিনি আন্তর্জাতিক জুরি বোর্ডেরও সদস্য ছিলেন। সেন্টার ফর দি স্টাডি অব ডেভেলপমেন্ট
অ্যান্ড সোসাল চেঞ্জ-এর ফেলো এবং ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে হার্ভার্ড সেন্টার ফর স্টাডিজ
ইন এডুকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর অতিথি অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি
জেনেভার অফিস অব দি ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চেস-এর উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ
করেছেন। চিলির ইউনেস্কোর ইনস্টিটিউট অব রিচার্স অ্যান্ড ট্রেনিং ইন এগ্রোরিয়ান
রিফর্ম-এর উপদেষ্টা ছিলেন পাঁচ বৎসর এবং চিলি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবেও
দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া ব্রাজিলে বয়স্ক শিক্ষার জাতীয় পরিকল্পনার সাধারণ
সমন্বয়কও ছিলেন ফ্রেইরি।
এক দশকেরও
বেশি নির্বাসনের পরে ১৯৭৯ সালে ফ্রেইরি আবার ব্রাজিলের মাটিতে পা রাখেন এবং অবশেষে
১৯৮০ সালে স্থায়ীভাবে স্বদেশে ফিরে যান। সাও পাওলোতে ফিরে তিনি “ওয়ার্কার্স পার্টি”-তে যোগদান করেন এবং ১৯৮০ থেকে
১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পার্টির প্রাপ্তবয়স্ক স্বাক্ষরতা প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক
হিসেবে কাজ করেন। যখন ওয়ার্কার্স পার্টি ১৯৮৮ সালে সাও পাওলোর মেয়র নির্বাচনে
জয়ী হয়; তখন ফ্রেইরিকে শিক্ষা বিষয়ক পৌরসচিব নিযুক্ত করা
হয়।
ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার ২৯টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক
ডিগ্রি লাভ করা মানুষটি, ১৯৯৭ সালের ২-রা মে সাওপাওলোতে ৭৫ বছর বয়সে হৃদরোগে
আক্রান্ত হয়ে মৃত্যবরণ করেন।
ফ্রেইরির যে শিক্ষাতত্ব অনুযায়ী, শিক্ষা মানুষের ক্ষমতায়নের চাবিকাঠি হয়ে উঠে নিজেকে এবং সমাজকে পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কল্যাণধর্মী ও মানবিক পর্যায়ে উন্নীত করতে সমর্থ হবে, সেই দর্শন-ই আগামীদিনে নতুন দিশা দেখাবে সমগ্র মানবজাতিকে -- এই প্রত্যাশা রাখতেই হচ্ছে; কারণ, সমগ্র দুনিয়া জুড়ে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে চলেছে এই তত্ত্ব।
(তারিণী খুড়ো)
