ভারতবর্ষে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পথিকৃৎ মুজফ্ফর আহমদ

ভারতবর্ষে সাম্যবাদী আন্দোলন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বাংলার সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাসে যার অসামান্য অবদান চিরস্মরণীয়, সেই কাকাবাবু, ওরফে মুজাফ্ফর আহমেদের আজ জন্মদিন। অনন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ত্ব, মানবিক রাজনীতির অমর মানুষ মুজফ্ফর আহমদ-এর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর জীবনের নানা দিক জানার প্রয়াস করা যাক। 

মুজফ্ফর আহমদ

১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট মুজফ্ফর আহমদ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপের মুসাপুর গ্রামে এক দরিদ্র কিন্তু অভিজাত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম মনসুর আলি এবং মা'র নাম চুনাবিবি। চুনাবিবি তার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন। মনসুর আলি সন্দ্বীপের এক স্বল্প আয়ের মোক্তার ছিলেন। 

বর্ণমালার হাতেখড়ি বাবার কাছে। ১৮৯৭ সালে তিনি গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৯৯ সালে প্রাইমারি পড়াশুনা সমাপ্ত করে হরিশপুর মডেল ইংলিশ স্কুলে ভর্তি হলেও দুবছরের বেশি পড়া হয়নি এখানে, কারণ স্কুলের বেতন বকেয়া পড়ায় থাকায় নাম কাটা যায়। এ সময়ে কিছুদিন কোরান পাঠ শেখেন। সে সময় মাদ্রাসা শিক্ষা অবৈতনিক হওয়ায় তিনি মাদ্রাসায় লেখাপড়া শুরু করেন, ভর্তি হ’ন নোয়াখালীর বামনী মাদ্রাসায়। পারিবারিকভাবে তিনি ফার্সি ভাষা জানতেন। ১৯০৫ সালে তাঁর বাবা মারা যেতে সংসারের অভাব অনটনের মধ্যে তার পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পালা। এই সময় একদিন ডেপুটি স্কুল ইন্সপেক্টর উমেশ চন্দ্র দাশগুপ্ত মুজফফর আহমদকে ইংরেজি পড়াশুনা করার জন্য উৎসাহ দিলেন। তার পরামর্শে তিনি বরিশালের বুড়িরচর গ্রামে এক কৃষক পরিবারে শিশুদের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত হন; উদ্দেশ্য, কিছু টাকাকড়ি সঞ্চয় করে বরিশালের কোন স্কুলে ভর্তি হওয়া। ইতোমধ্যে বড় ভাই মকবুল আলি খোঁজ-খবর নিয়ে বুড়িরচরে গিয়ে মুজফফর আহমদকে সন্দ্বীপে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন এবং সন্দ্বীপের স্কুলে ভর্তি করে দেন। 

মুজফফর আহমদের ভাষায়, “১৯০৬ সালের মার্চ মাসে আমি সন্দ্বীপের কার্গিল হাইস্কুলে নীচের ক্লাশে ভর্তি হলাম। আমার তখন ষোল-সতের বছর বয়স। ক্লাসের ছোট ছোট ছেলেরা তা সত্বেও আমাকে ক্লাশে বসতে দিল, তার কারণ আমি তাদের তুলনায় বাংলা অনেক ভালো জানতাম।” 

পড়াশুনার পাশাপাশি তিনি লেখালেখি করার চেষ্টা করতেন। ১৯০৭ সালে কলকাতার সাপ্তাহিক সুলতান’-এ তাঁর প্রথম একটা লেখা প্রকাশিত হয়। তিনি সন্দ্বীপ থাকাকালীন সময়ে ওই পত্রিকায় স্থানীয় খবর পাঠাতেন। সম্পাদক মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী তাঁকে লেখালেখি করার জন্য উৎসাহ দিতেন। 

১৯১০ সালে তিনি নোয়াখালি জেলা স্কুলে ভর্তি হন। ১৯১৩ সালে ২৩ বছর বয়সে তিনি এই স্কুল থেকে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। এরপর তিনি হুগলি কলেজে আইএ ভর্তি হন। ছাত্র পড়িয়ে নিজের খরচ ও পড়াশুনার খরচ যোগাতেন। এ ছাড়া তার বড় ভাই কিছু টাকা দিতেন। হুগলিতে পড়াশুনাকলীন সময়ে তিনি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কলকাতা চলে যান। তারপর তিনি কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হন। এ কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। আইএ পড়াশুনাকালে তিনি কলকাতায় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সভ্য হন। ১৯১৫ সালে সমিতির সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯১৬ সালে এক বছর এখানে ওখানে চাকরি করেন। 

১৯১৭ সালে যোগ দেন বেঙ্গল গভর্নমেন্ট প্রেসের সহকারী স্টোর কিপার পদে। এ কাজে তিনি এক বছর ছিলেন। মাসিক বেতন ছিল ত্রিশ টাকা। এরপর তিনি মাসিক পঞ্চাশ টাকা বেতনে গভর্নমেন্টের হোম ডিপার্টমেন্টে উর্দু থেকে বাংলা অনুবাদকের কাজ করেন। এখানে তিনি মাত্র একমাস কাজ করেছিলেন। এরপর একমাস তিনি কলকাতায় স্কুল পরিদর্শকের অফিসে কাজ করেন। ১৯১৮ সালে তিনি বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সার্বক্ষণিক কর্মী হন এবং উদ্যোগী হয়ে ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে ষাট টাকা ভাড়ায় সমিতির কার্যালয় স্থাপন করেন। এই সময়ে ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকাবের হত। পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক হিসাবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের নাম ছাপা হলেও সম্পাদকীয়র সব কাজ মুজফফর আহমদই করতেন। 

এই সময়েই বাঙালি রেজিমেন্টে থাকা কাজী নজরুল ইসলামের সাথে পত্র যোগাযোগের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলামের সাথে মুজফফর আহমদ-এর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৯২০ সালে কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতায় চলে আসেন এবং ওই সমিতিরি বাড়িতে ওঠেন। এসময় মুজফফর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন একসাথে বসবাস করেন। 

ওই সময়ে কংগ্রেসে ও খেলাফতের অন্যতম নেতা এ. কে. ফজলুল হক-কে মুজফফর আহমদ একটি পত্রিকা প্রকাশের প্রস্তাব দেন। তিনি সম্মতি প্রদান করেন। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯২০ সালের ১২ জুলাই এ কে ফজলুল হক প্রতিষ্ঠিত সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ’-এর যুগ্ম সম্পাদক হন মুজফ্ফর আহমদ ও কাজী নজরুল ইসলাম। এই পত্রিকায় মুজফ্ফর আহমদ শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার সমস্যা নিয়ে প্রবন্ধ লিখতেন। ব্রিটিশ বিরোধী লেখা প্রকাশের জন্য ব্রিটিশ সরকার নবযুগ পত্রিকার এক হাজার টাকা জামানত বাজেয়াপ্ত করে। মুজফফর আহমদ ফজলুল হকের কাছে দুহাজার টাকা নিয়ে জামানত দাখিল করেন। শুরুতে নবযুগচারহাজার কপি ছাপা হত। কাজী নজরুল ইসলামের অগ্নিবীণার জাগরণমূলক কবিতাগুলো এ পত্রিকাতেই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। নবযুগকৃষক-মজুরের অধিকার আদায়ের দাবি সমর্থন করত। ফলে সম্পাদকীয় নীতিমালা বেঁধে দিতে উদ্যত হন ফজলুল হক। যার কারণে ১৯২১ সারের জানুয়ারি মাসে প্রথমে কাজী নজরুল ইসলাম ও পরে মুজফফর আহমদ নবযুগ’- তিনি নবপুগছেড়ে দেন। কিছুদিন পর পত্রিকাটিও বন্ধ হয়ে যায়। 

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় যে বিপ্লব হয়, সেই সম্বন্ধীয় কিছু কিছু তথ্য প্রচারমূলক বই ও মার্কসবাদী সাহিত্য গোপন পথে এদেশে আসতে শুরু করে। মুজফফর আহমদ তা পাঠ করে মার্কসবাদের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করার মতাদর্শের সন্ধান পেয়ে তিনি সেই পথের অভিযাত্রী হয়ে যান। 

১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবরে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পর্টির প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। উদ্যোক্তা ছিলেন এম. এন. রায়। এই সময়েই মুজফফর আহমদের যোগাযোগ হয় আন্তর্জাতিক কিমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে। ১৯২১ সালে এ পার্টি কমিউনিস্ট ইন্টান্যাশনাল এর অনুমোদন পায়। ১৯২১ সালের শেষ দিকে কমিউনিস্ট সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়। একই সময়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন এলাকায় আরো কয়েকজন মার্কসবাদে আকৃষ্ট হন। তাঁদের সাথেও মুজফফর আহমদের যোগাযোগ হয়। ১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম মুদ্রিত ইশতেহার প্রচার করা হয়। আমেদাবাদে অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনের প্রতিনিধিদের সম্বোধন করে পূর্ণ স্বাধীনতার ডাক দিয়ে এই ইশতেহার রচিত হয়। 

১৯২২ সালের শেষের দিকে আব্দুল হালিমের সঙ্গে মুজফ্ফর আহমদের দেখা হয়। দুজনে মিলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজ শুরু করেন। প্রথম যুগে এঁদের সঙ্গে ছিলেন আব্দুর রেজ্জাক খান। ১৯২২ সালের ১৫ মে পার্টির প্রথম পত্রিকা প্রকাশিত হয়। নাম ছিল দি ভ্যানগার্ড অব দি ইন্ডয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স। পুলিশের নজর পড়ায় নাম বদলে হয় অ্যাডভান্স গার্ড। তারপর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র হিসেবে দি ভ্যানগার্ডপ্রকাশিত হয়। এই সময়কালেই নজরুল ইসলাম সম্পাদিত ধুমকেতুপত্রিকায় দ্বৈপায়ন ছদ্মনামে দেশের রাজনৈতিক সমস্যা এবং কৃষক ও শ্রমিকদের সমস্যা নিয়ে মুজফ্ফর আহমদ বিশ্লেষণাত্মক রচনা লেখেন। 

১৯২৩ সাল থেকে মুজফ্ফর আহমদ ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত হন এবং বিভিন্ন স্থানে শ্রমিক আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করেন। তখন থেকেই গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা তাঁর গতিবিধির উপর নজর রাখতে শুরু করে। ১৯২৩ সালের ১৭-ই মে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে রাজবন্দি হিসেবে কারাগার আটকে রাখে। ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে কানপুর কমিউনিস্ট (বলশেভিক) ষড়যন্ত্র মামলার মুজফফর আহমদ, শ্রীপদ আমৃত ডাঙ্গে, শওকত ওসমানি ও নলিনী গুপ্তের চার বছর করে সাজা দেয়া হয়। যক্ষ্ম রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ১৯২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। 

মুক্তি পাওয়ার পর তিনি কৃষকদের মাঝে কাজ শুরু করেন। সংগঠিত করেন কৃষকদের। ১৯২৫ সালের পয়লা নভেম্বর কলকাতায় লেবার স্বরাজ পার্টিগঠিত হয়। ১৯২৬ সালে কৃষ্ণনগরে অনুষ্ঠিত কৃষক সম্মেলন তার উদ্যোগে হয়েছিল। ওই সন্মেলনে মজুর-কৃষকপার্টিগঠিত হয়। প্রথমে লাঙলনামে মজুর-কৃষকপার্টির পক্ষ থেকে পত্রিকা প্রকাশিত হয়। পরে ১৯২৬ সালের ১২-ই আগস্ট থেকে গণবাণীসাপ্তাহিক প্রকাশিত হতে থাকে। এই পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব পড়ে মুজফ্ফর আহমদের ওপর। 

১৯২৭ সালে কলকাতায় ডক-মজুর ধর্মঘট, ইত্যাদিতে মেথর ধর্মঘট, চটকল মজুর ধর্মঘট ইত্যাদিতে তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। ১৯২৮ সালের ২২-২৩ ডিসেম্বর কলকাতায় সর্বভারতীয় ওয়ার্কর্স অ্যান্ড পেজান্টস পার্টির সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। এর তিন দিন আগে ঝরিয়ায় অনুষ্ঠিত এআইটিইউসির অধিবেশনে প্রতিনিধিদের ভোটে মুজফ্ফর আহমদ সহ তিনজন সভাপতি নির্বাচিত হন। 

১৯২৯ সালের ২০ মার্চ ব্রিটিশ সরকার বিভিন্ন এলাকা থেকে কমিউনিস্ট নেতাদের গ্রেফতার করে। এসময় মুজফফর আহমদকেও প্রেফতার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে মীরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলাদায়ের করা হয়। এই মামলায় অভিযুক্ত ৩১ জন। ৪ বছর ধরে চলে এ মামলা। ১৯৩৩ সালে ৯ জানুয়ারি মামলার রায় বের হয়। মুজফফর আহমদকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। পরে আপিলে এ সাজা কমিয়ে ৩ বছর করা হয়। জেল থেকে মুক্ত হবার পর তাকে নজরবন্দিতে রাখা হয়। প্রথমে ফরিদপুর, পরে নিজের গ্রামের বাড়ি সন্দ্বীপে ও মেদিনীপুরের এক গ্রামে তাঁকে অন্তরীণ রাখা হয়। ব্রিটিশ সরকার সশস্ত্র বিপ্লববাদীদের দমনের জন্য বেঙ্গল অর্ডিনান্সআইন চালু করেছিল, সে আইনে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৩৬ সালের ২৫ জুন তিনি মুক্তি পান। 

মুক্তি পাওয়ার পর পার্টিকে সংগঠিত করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে যুক্তবঙ্গের ২৮টি জেলাতেই কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ সরকার আবারও কমিউনিস্টদের প্রতি সন্দেহ পোষণ করে। কলকাতায় শ্রমিকদের মাঝে মুজফফর আহমদের প্রভাবের কারণে সরকার ওই বছর ফেব্রুয়ারী মাসে তাঁকে কলকাতা ছেড়ে যাবার আদেশ দেয়। আদেশ অমান্য করায় তার এক মাসের জেল হয়। মুক্তি লাভরে পর আবারও তাকে কলকাতা ছাড়ার আদেশ দেওয়া হয়। এবার তিনি প্রকাশ্যে কলকাতা ত্যাগ করে চলে যান। কিন্তু ২৩-শে জুন ১৯৪০ গোপনে কলকাতায় ফিরে আসেন। তখন থেকে ১৯৪২ সালের ২৩ আগস্ট পর্যন্ত গোপনে পার্টির কাজ চালিয়ে যান। 

১৯৪৫ সালে ময়মনসিংহের নেত্রোকোণা নিখিল ভারত কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে মুজফফর আহমদ সভাপতিত্ব করেন। ১৯৪৮ সালে কলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একক কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়; এই কংগ্রেস ছাড়া প্রত্যেকটি পার্টি কংগ্রেসে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটিতে নির্বাচিত হন। দেশ ভাগের পূর্বে তিনি বঙ্গীয় পার্টির সম্পাদক ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। 

১৯৪৮ সালের ২৫-শে মার্চ কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে ভারত সরকার এই আইনে মুজফফর আহমদকে গ্রেপ্তার করে। ১৯৫১ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি মুক্তি পান। ওই বছর তিনি রাজ্য পার্টির সম্পাদক হন। ১৯৫৭ সালে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণে পার্টির সম্পাদক পদ ছেড়ে দেন। তখন জ্যোতি বসু সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

ওই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মতভেদ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির উপর প্রভাব পড়ে। যার ফলে ১৯৬৮ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। মুজফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন অংশের নাম দেওয়া হয় সিপিআই (এম) বা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)। এরা ছিল সোভিয়েত পন্থী। ১৯৬৯ সালে সশস্ত্র কৃষক অভূত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের ঘোষণা দিয়ে গঠিত হয় সিপিই (এম-এল) বা ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)। এরা প্রধানত মাও সে তুং (মাও জে ডং) ও চীনের লাইনের অনুসারী। মুজফফর আহমদ এই সময়েও মস্কো ও পিকিং-এর অন্ধ অনুসরণের বিরোধীতা করেন। 

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে পার্টি মুখপত্র গণশক্তির দৈনন্দিন সংবাদ সমালোচনা ও সম্পাদকীয়তে মুজাফফর আহমদ লিখেছিলেন, “আমি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমি একজন অক্ষম অসমর্থ বৃদ্ধ, যদি আমার শরীরে শক্তি থাকত, তা হলে আমিও বাংলাদেশের মুক্তি ফৌজে যোগ দিতাম 

১৯২১ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৫২ বছর মুজফ্ফর আহমদ কর্মীদের মার্কসবাদী সাহিত্য অধ্যয়ন, প্রকাশ ও প্রচারের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। কাকাবাবু' নামে কর্মী ও নেতাদের কাছে জনপ্রিয় মুজফ্ফর আহমদ ন্যাশনাল বুক এজেন্সির একজন প্রধান সংগঠক ছাড়াও গণশক্তি প্রিন্টার্স প্রেস গড়ে তলেন। 

মুজফফর আহমদের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে পার্টি অফিসে, কারাগারে কিংবা গোপন আস্তানায়। এ ছাড়া পার্টি কর্তৃক ভাড়া করা ঘরে অথবা কর্মস্থলে। নিজের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে কিছু তিনি করেন নি। জীবনের শেষ দিনগুলোতে পার্টি কতৃক নিয়োজিত একজন কর্মী তাঁর দেখাশুনা করতেন। মৃত্যুর আগে প্রায় সাত মাস তিনি কলকাতায় একটি নার্সিং হোমে ভর্তি ছিলেন। ১৯৭৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর তিনি মার যান। 

বাংলার সামাজিক জীবনে হিন্দু- মুসলমানের সম্মিলিত স্রোত যে ব্রিটিশ ও ঔপনিবেশিকতার কড়াল গ্রাস থেকে দেশকে মুক্ত করে আলোর পথে গোটা ভারতবর্ষকে টেনে নিয়ে যেতে পেরেছিল, তার ভিত্তি নির্মাণে মুজাফ্ফর আহমেদের কৃতিত্ব অনস্বিকার্য। 

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন