১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। জাপানের হিরোশিমায় স্থানীয় সময় সকাল ৮-টা। ভোরের আলো অনেক আগেই ফুটেছে সূর্যোদয়ের দেশে। আর পাঁচটা দিনের মতো কাজে বেরিয়েছেন মানুষ। কারখানার ভোঁয়ে তড়িঘড়ি দৌড় দিচ্ছেন কেউ কেউ।
![]() |
| পরমাণু বিস্ফোরণ পরবর্তী হিরোশিমা |
সাধারণ মানুষের কাছে কোনও অশনি সঙ্কেত না পৌঁছলেও, জাপানি সেনা টের পেয়েছিল ৫ অগস্টের রাতেই। জাপানের দক্ষিণ প্রান্তে মার্কিন বিমানের আনাগোনা তাদের রাডারে ধরা পড়ে। হিরোশিমা-সহ একাধিক শহরে সতর্কতা জারি করা হয়েছিল। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল রেডিয়ো সম্প্রচারও। মধ্যরাতে ১২.০৫ নাগাদ জানানো হয় আর কোনও বিপদ নেই। ফের সকাল ৭ নাগাদ রাডারে ধরা পড়ে অশনি বার্তা। এবার বোয়িং বি-২৯ সুপারফর্ট্রেস বোমারু বিমান ‘ইনোলা গে’-র থেকে। তারপর কিছুক্ষণ নিস্তবদ্ধতা।
‘দ্য ইনোলা গে’ বিমানের নামকরণ হয় ওই বিমানেরই পাইলট পল ওয়ারফিল্ড টিবেটসের মায়ের নামে। এ দিনের টাস্কে পল যে ‘ইনোলা গে’ বিমানের সওয়ারি হবেন, ২৪ ঘণ্টা আগেও তাঁর কাছে কোনও খবর ছিল না। ওই বিমান সাধারণত কম্যান্ডার রবার্ট এ লুইসের তত্ত্বাবধানে চালিত হয়। কিন্তু এ দিন পল দায়িত্ব পাওয়ায় ভীষণ অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন রবার্ট লুইস। তাঁকে কো-পাইলটের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৪৫ সালে ৬ অগস্ট ‘ইনোলা গে’-কে নিয়ে মোট ৭-টি বিমান হিরোশিমার আকাশে চক্কর কেটেছিল। প্রথম তিনটি হিরোশিমা, কোকুরা এবং নাগাসিকার আবহাওয়া মেপে যায়। তারপর ‘ইনোলা গে’ সকাল ৮.০৯ নাগাদ হিরোশিমার আকাশে ‘লিটল বয়’ ফেলার তৎপরতা শুরু করে।
৮.১৫ নাগাদ ‘ইনোলা গে’ ৩১ হাজার ফুট থেকে নিক্ষেপ করে ‘লিটল বয়’ নামের একটি আণবিক বা অ্যাটম বোমাকে। ক্রসউইন্ডের জেরে লক্ষ্যভেদ হয় ‘ইনোলা গে’-র। বোমা ফেলার অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে নেভিগেটর ভ্যান কির্ক পরে বলেন, “প্রথমে মনে হয়েছিল আর পাঁচটা মিশনের মতো এটি একটি। কিন্তু ১০ হাজার পাউন্ডের ‘লিটল ব্য’ নামের বোমা ফেলার জন্য এক ধাক্কায় বিমান জাম্প করে। পাইলট টিবেট সঙ্গে সঙ্গে ১৮০ ডিগ্রি বিমানকে ঘুরিয়ে নেন। আর ঘুরতেই ২ হাজার ফুট নীচে নেমে যায় বিমানটি। যত দ্রুত সম্ভব সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করি আমরা।”
পড়তে সময় লেগেছিল মাত্র ৪৪.৪ সেকেন্ড। ভ্যানের কথায়, ‘চোখের পলক পড়তে না পড়তে আলোর ঝলক দেখা গেল। বিস্ফোরণের তীব্রতা আমাদের বিমানকেও আঘাত করে।’ এরপর টিনিয়ান দ্বীপে ফিরে যায় ‘ইনোলা গে’।
মুহূর্তেই গোটা শহরজুড়ে তৈরি হলো নীল, সাদা রঙের আলো। বিস্ফোরণের দেড় কিলোমিটারের মধ্যে যা যা ছিল সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল। হাজার হাজার মানুষ পুড়ে মিশে গেল মাটির সঙ্গে।
আমেরিকা কিন্তু শুধু হিরোশিমাতে হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি, অকল্পনীয় এক বিস্ফোরণের তাণ্ডবে জাপান জ্ঞানশূন্য হয়ে পরলেও আমেরিকা কিন্তু তখন অন্যকিছুই ভাবছিল! সেই সময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন ট্রুমান। জাপানের আরেকটি শহর নাগাসাকি শহরও তিনি ধ্বংস করতে চাইলেন। ট্রুমানের নির্দেশেই মাত্র ৩ দিন পর অর্থাৎ ৯ই আগস্ট বি-২৯ বক্সকার নামের একটি যুদ্ধবিমান নাগাসাকিতে উড়ে এল। ওই বিমানে ‘ফ্যাট ম্যান’ নামে শক্তিশালী একটি বোমা ছিল। ‘ফ্যাট ম্যান’-এর ধ্বংস ক্ষমতা ছিল ‘লিটল বয়’-এর চেয়ে কিছুটা কম। ওই দিন বেলা ১২-টা ২ মিনিটে ‘ফ্যাট ম্যান’ নাগাসাকির আকাশে বিস্ফোরিত হলো। শহরের ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে সঙ্গে সঙ্গে মারা গেলেন প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে হামলায় বেঁচে যাওয়া আহতদের বলা হয় ‘হিবাকুশা’ (Hibakusha)। অনুমান করা হয় যে ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বোমা বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমাতে প্রায় ১৪০,০০০ লোক মারা যান। নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪,০০০ লোক মারা যান এবং পরবর্তীতে এই দুই শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও ২১৪,০০০ লোক মারা যান। বেসরকারি হিসেব মতে এই সংখ্যা প্রায় ৪০০,০০০!
জাপানের আত্মসমর্পণের পিছনে পারমাণবিক বোমা হামলাকে অনেক বড় ভূমিকা মনে করা হলেও অনেকেই মনে করেন পারমাণবিক হামলার অনেক আগেই জাপান কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল, যেখানে কিছুদিন পরে জাপান হয়তো স্বেচ্ছায়ই আত্মসমর্পণ করত, সেখানে পারমাণবিক বোমা ছুঁড়ে দিয়ে নৃশংস উপায়ে মানুষ মারার কোন প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রুমান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিতরের অধিকাংশেরই কখনো কোন অনুশোচনা করতে দেখা যায়নি। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, নিজেদের শক্তিমত্তার প্রদর্শন ও বিশ্ববাসীকে অভাবনীয় কিছু করে দেখানো ছাড়া আর কিছু নয় বলে মনে করেন অনেক বিষেশজ্ঞরাই!
বোমাবিধ্বস্ত হিরোশিমাকে ১৯৫০ সাল থেকে আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয়। হিরোশিমা এখন জাপানের অন্যতম প্রধান শিল্পকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। হিরোশিমার মতই নাগাসাকিও অনেক আগেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। নিশ্চিহ্ন ও ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়ে যাওয়া শহরটাকে পরিশ্রমী জাপানীরা আবারও রাস্তা-ঘাট, ঘরবাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল দিয়ে ঢেলে সাজিয়েছে। ধ্বংস ও অকেজো হয়ে যাওয়া নাগাসাকিতে অবস্থিত ‘মিৎসুবিশি পাওয়ার প্ল্যান্ট' আবারও চালু করা হয়েছে যার উৎপাদিত পাওয়ার প্ল্যান্ট, মোটর সহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র এখন সারা বিশ্বে পরিচিত।
হিরোশিমার যে জায়গাটির উপরে ‘লিটল বয়’ বিস্ফোরিত হয়েছিল সেখানে নির্মিত হয়েছে ‘পিস মেমোরিয়াল পার্ক’। ১৯৫৫ সাল থেকে প্রতি বছরই এখানে একটি বার্ষিক শান্তির ঘোষণা পাঠ করা হয় এবং শান্তি সংস্কৃতির শহর হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র থেকে মুক্তির একটি বিশ্বসম্মেলন নিয়মিতভাবে হয়ে আসছে। নাগাসাকিতেও এমনই এক জাদুঘর নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে যুদ্ধের ভয়াবহতা, পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি এবং বিশ্বশান্তির গুরুত্ব সম্পর্কে সবাইকে অবগত করা হয়। জাপানবাসী তাঁদের সেই ভয়ানক অভিজ্ঞতাকে ভুলে না গিয়ে এভাবেই স্মরণ করতে চান আর প্রার্থনা করেন যেন পৃথিবীতে এমন ধ্বংসযজ্ঞের পুনরাবৃত্তি আর না হয়।
জাপানের এমন চাওয়াকে আমরা সকলেই বুকের ভিতরে ধারণ ও সমর্থন করি। ইতিহাসের নারকীয় সেই পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার ও মৃত্যুর শহর পৃথিবীর কোথাও আমরা আর দেখতে চাই না!
(তারিণী খুড়ো)