আধুনিক ভারত নির্মানের কারিগর বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা

জুলাই ৪, ১৯৫২। মন্ত্রকের স্থায়ী কমিটি অবলুপ্ত করা হবে কি না, সে বিষয়ে বিতর্ক সংসদে। বলতে উঠলেন কলকাতা উত্তর-পশ্চিম কেন্দ্র থেকে বেলচা-কোদাল প্রতীক নিয়ে জয়ী, বাম সমর্থিত নির্দল সাংসদবিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহা। শুরুতেই তীব্র আক্রমণ সরকারপক্ষকে। আক্রমণের লক্ষ্য, তৎকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রকের মন্ত্রী গুলজারিলাল নন্দ। ১৫ মার্চ, ১৯৫০-এ প্ল্যানিং কমিশন তৈরি হয়। ৫১-য় মন্ত্রকের দায়িত্ব নেওয়ার পরে গুলজারিলাল কমিশনের কাজ সুষ্ঠু ভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিরোধীদের আহ্বান জানালেন। কটাক্ষ করে মেঘনাদ বললেন, ‘‘কমিশনে তো কংগ্রেসের লোকজনই আমন্ত্রিত। কখনওই বিরোধীরা ডাক পাননি। শিক্ষা, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, পারমাণবিক শক্তি ও দেশের নদী-বাঁধ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকা সত্বেও কেন আহ্বান জানানো হল’না”? ছুড়লেন মোক্ষম বাণ, ‘‘বর্তমান কার্যক্রমই বলে দিচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল ফ্যাসিবাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।’’ 

মেঘনাদ সাহা

ফ্যাসিবাদশব্দটিই যেন বিতর্কের আগুনে ঘি ঢালল। বলতে উঠলেন তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু— ‘‘ডক্টর সাহা ফ্যাসিবাদ শব্দটির অর্থ জানেন না।... উনি বিজ্ঞানকেও অসম্মান করেছেন।’’ পিছু হঠার পাত্র নন মেঘনাদও। ১১ জুলাই, মেঘনাদের এ বার লক্ষ্য স্বয়ং নেহরু। জানালেন, ১৯২৭-এ বিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো ভোল্টা-র মৃত্যু শতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান কংগ্রেসেযোগ দিতে তিনি ইটালি গিয়েছিলেন। সেই সময়ে ফ্যাসিবাদ নিয়ে কিঞ্চিৎ পড়াশোনা ও এই মতবাদটিকে কাছ থেকে জানার সুযোগ তাঁর হয়েছিল। এমনকি, সেই সময়ে বেনিটো মুসোলিনির আমন্ত্রণে এক ভোজসভায় গিয়ে দেখেছিলেন, কী ভাবে দেশের সাধারণ মানুষ থেকে নামী বিজ্ঞানী, গুণী লোকজন শাসকের ইয়েস ম্যান’-এ পরিণত হয়েছে। পরে কৌটিল্য-শ্লোকের উদ্ধৃতি দিয়ে এই প্রবণতাটিকেই ফ্যাসিবাদ হিসেবে চিহ্নিত করলেন মেঘনাদ। এ বার বললেন, ‘‘আমি বলিনি সরকার ফ্যাসিবাদী হয়ে গিয়েছে। বলেছি, ফ্যাসিবাদী প্রবণতার দিকে চালিত হচ্ছে।’’

তুমুল হট্টগোল। স্পিকার কোনও মতে থামালেন। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী সম্পর্কে নেহরুর মন্তব্যকেও ছেড়ে কথা বললেন না মেঘনাদ। জানালেন, এখনও বিজ্ঞানের সঙ্গে তাঁর ভাল যোগাযোগ। বিশ্বের বিজ্ঞানমহল তাঁকে বিজ্ঞানজগতের পিছনের সারির সদস্যবলে মনে করে না।

এ বার নেহরু বলতে উঠে মেঘনাদকে সম্মাননীয় বন্ধুবলে উল্লেখ করলেন। জানালেন, বিজ্ঞানী হিসেবে মেঘনাদ সাহার কাজ দেশের জন্য গর্বের। বিজ্ঞানের জগতে তাঁকে চ্যালেঞ্জ ছোড়ার কোনও অর্থই হয় না”।

বেশ কয়েকবার সাহা-নেহরু বৌদ্ধিক দ্বৈরথের সাক্ষী থেকেছে ভারতীয় সংসদ। নেহরু কিছু ক্ষেত্রে মেঘনাদকে ব্যক্তিগত কটাক্ষও করেছেন। ১৯৫৪-র সংসদের ডিসেম্বর অধিবেশনে কেন্দ্রীয় সরকারকে তুলোধোনা করলেন মেঘনাদ। ভারত সরকারের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে চিয়াং কাই-শেকের নেতৃত্বাধীন চিনের মিল রয়েছে বললেন তিনি। নেহরু মেঘনাদকে ইউজ়ড টু বি এ গ্রেট সায়েন্টিস্টবলে কটাক্ষ করলেন। প্রত্যুত্তরে মেঘনাদ বলেন, ‘‘বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে খুব অল্পই কিছু করেছি। কিন্তু একশো বছর পরেও আমার নাম স্মরণে থাকবে। তবে কিছু রাজনীতিবিদ কয়েক বছরের মধ্যেই বিস্মৃতির অতলে চলে যাবেন।’’

এহেন মানুষটির জন্মদিনে তাঁকে আর একটু ভালো করে চেনার প্রয়াস করতেই এই লেখার অবতারনা। কৃষ্ণ নক্ষত্রের রহস্য সন্ধান থেকে শুরু করে নদীমাতৃক ভারতবর্ষের সেচ পরিকল্পনা করা ভারতীয় বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার জন্ম ১৮৯৩ সালের আজকের দিনটিতে (৬-ই অক্টোবর), বাংলাদেশের অন্তর্গত ঢাকা জেলার শেওড়াতলি গ্রামে।

মা ভুবনেশ্বরী ও বাবা জগন্নাথ সাহা; বাবা ছিলেন দোকানদার, ছেলেকে পড়াশোনা করানোর ক্ষমতা একেবারেই নেই। তার ওপর বড় ভাই পরীক্ষায় খুব খারাপ ফলাফল খুব খারাপ ফলাফল করায় বাবা সিদ্ধান্ত নেন ছেলেদের পড়াশোনা বাদ দিয়ে দোকানের কাজে লাগিয়ে দেবেন, কিন্তু মেঘনাদ যে পড়াশোনা করতে চায়। কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটি পাড়ার ডাক্তার কাকার কাছে গিয়ে হাজির হয়। তিনি ছেলেটিকে  স্নেহ করতেন। তার পড়াশোনার আগ্রহের কথা জানতে পেরে তিনি তাকে সাহায্য করতে রাজি হন। তবে ডাক্তারখানার টুকটাক কাজ করার বিনিময়ে তিনি পড়াশোনার খরচ বহন করবেন। মনের আনন্দেই করত সে। কারণ, তার বদলে মিলত পড়াশোনার সুযোগ। ডাঃ দাশকে আদর্শ রেখে, পরবর্তীতে মেঘনাদ সাহা নিজের বাড়িতেও অনেক পড়ুয়াকে ঠাঁই দিয়েছিলেন।

মন দিয়ে লেখাপড়ার স্বীকৃতিস্বরূপ মেঘনাদ সরকারি কলেজিয়েট স্কুলে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ পেল। কিন্তু সময়টা বাংলাদেশের পক্ষে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে তখন গোটা বাংলা তোলপাড়। ছেলেটি সেই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে কারণে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়, বিনা বেতনে পড়ার সুযোগও হাতছাড়া হয়। তবে বড় ভাইয়ের সাহায্যে ঢাকা জুবিলী স্কুলে ভরতি হয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করে ১৯০৯ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম হয়ে ভর্তি হলেন ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে। বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা শুরু করলেন। এরপর কলকাতায় এসে ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। এখানে সহপাঠী হিসেবে পেয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষ এবং জ্ঞানেন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায় এর মত বিজ্ঞানীদের।

কলকাতার বিখ্যাত প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হয়েও নিজের বর্ণগত পরিচয়ের কারণে এখানে সে বেশ অসুবিধায় পড়ল। দুপুরবেলায় প্রেসিডেন্সি কলেজের ইডেন হিন্দু হোস্টেলের ক্লান্ত মেঘনাদ সাহা যখন পেছনের টেবিলে গিয়ে খেতে বসল, ঠিক তখনই ঘটলো বিপত্তি। একে একে অন্য ছাত্ররা ভোজনশালার দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। কোনো ছাত্র এই নতুন তরুণের সঙ্গে বসে খেতে রাজি নয়। তরুণটির বুঝতে বেশি সময় লাগল না। তাঁর সেই সময়কার দেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বর্ণবাদের শেকড় যে মাটির কত গভীরে চলে গিয়েছে তা তরুণটি খুব ভাল করেই বুঝতে পারল। হোস্টেলের নতুন ছাত্রটি যে বর্ণে শূদ্র। সমাজের সবচেয়ে নিচু স্তরের মানুষ। তাই নিজের ধর্ম, জাত রক্ষার দোহাই দিয়ে সেদিন হোস্টেলের ছেলেরা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। ওই বৈষম্য কেবল খাবার ঘরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কিছুদিন পর দেখা গেল, ব্রাহ্মণ ছাত্ররা তাকে সরস্বতীর পুজোতে অংশ নিতেও নিষেধ করল। সেদিন তরুণ ছাত্রটি পরাজিত সৈনিকের মতো একা একা নিজের ঘরে বন্দি থেকে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদেছিল। কিন্তু সেদিনের প্রেসিডেন্সি কলেজের কোনো উচ্চবর্ণের ছাত্র ভুলেও কল্পনা করতে পারেনি, ওই শূদ্র তরুন ছাত্র মেঘনাদ সাহা একদিন তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে অনেক উঁচুতে উঠে যাবে।

১৯১৩ সালে গণিতে সম্মানসহ বিএসসি করেন এবং ১৯১৫ সালে ফলিত গণিতে মাস্টার্স করেন। উভয় পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয় এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রথম হন। মেঘনাদ আলোর চাপের ওপর তাঁর সমস্ত গবেষণার ফলাফল গুলো একত্র করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রির জন্য আবেদন করেন। তার সব গবেষণা বিবেচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে ১৯১৯ সালে ডক্টর অব সায়েন্স ডিগ্রি প্রদান করে। একই বছর মেঘনাদ সাহা, প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তি লাভ করেন। যার ফলে তিনি ইংল্যান্ড ও জার্মানীতে গবেষণার সুযোগ পান।

১৯১৬ সালে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বিজ্ঞান কলেজ চালু করার পর সত্যেন্দ্রনাথ ও মেঘনাদ উভয়কেই গণিত বিভাগের যোগ দিতে বলেন। যদিও পরবর্তী কালে দুজনেই পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে চলে যান। সেখানে চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রামন পালিত অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

এরপর ১৯১৯ সালে তিনি প্রথম পাঁচ মাস লণ্ডনে বিজ্ঞানী আলফ্রেড ফাউলারের পরীক্ষাগারে এবং পরবর্তীতে বার্লিনে ওয়াস্টার নার্নস্টের সাথে কাজ করেন। দুইবছর ধরে দেশের বাইরে গবেষণা করার পর মেঘমাদ সাহা ১৯২১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে খয়রা অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন।

১৯২০ সালে নভোবস্তু বিজ্ঞান সংক্রান্ত তাঁর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। এই গবেষণা পত্রটি বিজ্ঞান মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ১৯২০ সালেই, লন্ডনের ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে মেঘনাদের কয়েকটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হল তারকা সংক্রান্ত গবেষণার বারোটি আবিষ্কারের বিষয়ে গবেষণা পত্র। এই গবেষণাপত্র গুলিকে বিজ্ঞানের যুগান্তকারী অবদান স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে।

কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য কোনো পদ বরাদ্দ সে সময় না থাকায় তিনি ১৯২৩ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। তিনি ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি গণিতবিদ অমীয় চরন ব্যানার্জি এর সান্নিধ্য লাভ করেন। ১৫ বছর ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি বিভাগটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেন। এরপর তিনি মারা যাবার আগে অব্দি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর বিজ্ঞান বিভাগের ডিন হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেছেন।

বিজ্ঞানী হিসেবে মেঘনাদ সাহার সবথেকে বড় কৃতিত্ব সূর্যের বর্ণালী বিশ্লেষণ করা। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে পার্থিব সব জিনিস গুলি আছে সূর্যদেহে। সর্বসমক্ষে হিসাব কষে দেখিয়ে ছিলেন সূর্য দেহের প্রতি ১০০ ভাগের মধ্যে হাইড্রোজেন আছে ৮১ ভাগ, বাকি ১৮ ভাগ হিলিয়াম, ০.৭ ভাগ কার্বন, অবশিষ্ট ০.৩ ভাগ নাইট্রোজেন, সোডিয়াম, ক্যালসিয়াম, সিলিকন, সিসা, লোহা, অক্সিজেন ইত্যাদি। পরীক্ষার সাহায্যে আরো প্রমাণ করলেন শুধু সূর্য নয়, যে কোন নক্ষত্রপৃষ্ঠে এ ধরনের তাপ থাকলে সব কটি মৌলিক পদার্থ গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে।

ব্রহ্মাণ্ডে যে কোনও অজানা নক্ষত্রকে জানা বা অচেনা তারাকে চেনা-বোঝার রাস্তাটা খুলে দিলেন মেঘনাদ। ১৯২০ সালে। প্রকাশিত হল কিংবদন্তী বাঙালি বিজ্ঞানী মেঘনাদ সাহার সেই বিখ্যাত সমীকরণ। যার নাম- সাহা আয়োনাইজেশন ইক্যুয়েশনবা সাহা আয়নীভবন তত্ত্ব। এখনও ভিনগ্রহের ভিন মুলুকে পৃথিবীর মতোই জল রয়েছে কি না, সেই জল তরল নাকি কঠিন বা গ্যাসীয় অবস্থায় রয়েছে, তা জানতে এখনও আমাদের দ্বারস্থ হতে হয় সেই মেঘনাদের সমীকরণের কাছেই। কোন কোন মৌল দিয়ে গড়া সেই সব নক্ষত্রের শরীর আর তা রয়েছে কতটা পরিমাণে তা জানতে সেই লাইন এমিশনের উপরেই নজর রাখতে হয়। যেমনটি বলেছিলেন মেঘনাদ সাহা। সভ্যতা যত দিন টিঁকে থাকবে, তত দিনই ভিনগ্রহের ভিন মুলুকে প্রাণ বা প্রাণ সৃষ্টির বীজমৌলগুলির খোঁজ করতে আমাদের বার বার দ্বারস্থ হতে হবে সেই মেঘনাদের কাছেই।

মেঘনাদের ওই সমীকরণ নিয়ে তখন তোলপাড় হয়ে গেল গোটা বিশ্ব। দাবি উঠল তাঁকে নোবেল পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করার। নোবেল পুরস্কার কমিটির কাছে মেঘনাদ সাহার নাম প্রথম বার মনোনয়ন করে পাঠালেন আর্থার হোলি কম্পটনের মতো বিখ্যাত বিজ্ঞানী। সেটা ১৯৩৭ সাল। কিন্তু শেষ বিচারে মেঘনাদকে হিসেবের মধ্যেই রাখল না নোবেল কমিটি।

১৯৩৯ সালে ভারতীয় পদার্থবিজ্ঞানী দেবেন্দ্র মোহন বসু এবং শিশির কুমার মিত্র মেঘনাদ সাহাকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরষ্কারের জন্য মনোনীত করেন। নোবেল কমিটি মেঘনাদ সাহার কাজকে পদার্থবিজ্ঞানের একটি উল্ল্যেখযোগ্য প্রয়োগ হিসেবে বিবেচনা করলেও এটি আবিষ্কারনয় বলে তিনি নোবেল পুরস্কার পান নি। ১৯৪০ সালে আর্থার কম্পটন আবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মেঘনাদকে মনোনয়ন দিলেন কম্পটন। না, সে বারও মেঘের আড়ালেই থেকে গেলেন মেঘনাদ। ১৯৫১ ও ১৯৫৫ সালে শিশির কুমার মিত্র আবারো মনোনীত করলেও, নোবেল কমিটি তাদের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে৷

এই জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী পদার্থবিজ্ঞানে তাপীয় আয়নীকরণ তত্ত্বের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে খ্যাত। তাঁর আবিষ্কৃত সাহা আয়নীভবন সমীকরণ নক্ষত্রের রাসায়নিক ও ভৌত ধর্মাবলি ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়।

১৯৩৪ সালে ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেসের মূল সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন মেঘনাদ সাহা। ১৯৩৮ সালে কলকাতায় এসে তিনি গঠন করলেন "ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স"। এখানেই প্রথম সাইক্লোট্রন যন্ত্র স্থাপন করলেন।

গবেষণার পাশাপাশি মেঘনাদ সাহা কে আমরা মনে রাখবো একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবে। ১৯১৪ সালে বন্যাত্রানে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দেন। ১৯২৩ সালে বেঙ্গল রিলিফ কমিটিতে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের সহযোগী ছিলেন। স্বাধীনতার পর মানুষের দুঃখ দারিদ্রের আন্দোলনে নিজেকে সামিল করেছিলেন তিনি।

আমরা বলতে পারি মেঘনাদ সাহা গবেষকের পাশাপাশি একজন উন্নত মানের লেখক ছিলেন। ১৯৪৫ সালে রাশিয়া ভ্রমণ করে তিনি এই সংক্রান্ত একটি বই লিখেছিলেন "রাশিয়ায় আমার অভিজ্ঞতা" নামে। তাঁর লেখা অপবিজ্ঞানের বই উচ্চ শিক্ষাস্তরে দীর্ঘকাল ধরে সমাদৃত হয়ে আসছে। তাঁর লেখা অন্যান্য বই গুলির মধ্যে আছে "দি প্রিন্সিপাল অফ রিলেটিভিটি" (The Principle of Relativity), "ট্রিটিজ অন হিট" (Treatise on Heat) , "ট্রিটিজ অন মডার্ন ফিজিক্স" (Treatise on Modern Physics)

১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি তাঁর কর্মস্থল ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভবনের পরিকল্পনা কমিশনের দিকে যাচ্ছিলেন, এমন সময় পড়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান।

ভারতের বিজ্ঞানের অগ্রগতির ক্ষেত্রে ড: মেঘনাদ সাহার অবদান কে আমরা কখনোই ভুলতে পারবো না; বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে ড: মেঘনাদ সাহা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁর মৃত্যুর এতগুলো বছর পরেও সংরক্ষিত হয়নি গাজীপুরের শেওড়াতলী গ্রামের তার ভিটেমাটি ও শেষ স্মৃতিচিহ্নটুকু।

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন