মানবতাবাদী দর্শনের পথিকৃৎ লালন সাঁই

মেঘের আঁচল জুড়ে মন-কেমন-করা বৃষ্টির শব্দের মতো বাচনিক রহস্যময়তার সাথে প্রতীক্ষার দীর্ঘায়িত শব্দাবলির উদাসী সুরের নিটোল আলিঙ্গনে যিনি ‘বাউল- সঙ্গীত-কে বিশ্বমানবের প্রশস্ত আধারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেই লালন সাঁই-কে (ফকির লালন, লালন শাহ, মহাত্মা লালন নামেও পরিচিত) নিয়েই এই লেখার অবতারণা।

লালন সাঁই
লালনের জীবন সম্পর্কে বিশদ কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। তাঁর জন্ম কোথায়, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। লালন নিজে কখনো তা প্রকাশ করেননি। কিছু সূত্রে পাওয়া যায়, লালন ১৭৭৪ সালের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশের) যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহাকুমার হরিণাকুন্ডু থানার হারিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। অবশ্য কোনো কোনো লালন গবেষক মনে করেন, লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার ভাড়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এ দুই তথ্যের সাথেও অনেকে দ্বিমত পোষণ করেন।

তাঁর পিতার নাম দরিবুল্লাহ দেওয়ান ও মায়ের নাম আমেনা খাতুনে। এঁদের চার পুত্রসন্তানের ভিতর লালন ছিলেন তৃতীয়। শৈশবেই তাঁর মাতৃবিয়োগ ঘটে। অর্থকষ্টে তেমন শিক্ষা গ্রহণও হয়নি। চাপড়ার ভৌমিক পরিবার ছিল তাঁর মামার বাড়ি। কিন্তু ক্রমে মামার বাড়ি দুঃসহ হয়ে ওঠে। দুঃখ ভুলতে সারাদিন একা একা সে টইটই ঘোরে মাঠে-প্রান্তরে-গাঙের ধারে। কখনও উদাস হয়ে চেয়ে থাকে বন-প্রকৃতির দিকে। কখনও সুরেলা পাখির পিছনে ছুটতে ছুটতে তার দিন যায়। কোনও ফকির মেঠো পথে সুরের সারিন্দা নিয়ে হেঁটে গেলে, খেলা ছেড়ে লালন তার পিছু নেয়।

একটু বড় হওয়ার পর, স্থানীয় জারিগান, কবি গান, বিভিন্ন বয়াতিদের গান শুনে শুনে, গানের প্রতি তাঁর আসক্তি জন্মে। একদিন ফকিরের হাত থেকে একতারা নিয়ে সত্যি সত্যিই সে শিখে নেয় সুর-সাধন। আনমনে গায়, ‘কার বা আমি কেবা আমার/ আসল বস্তু ঠিক নাহি তার। পরবর্তী সময়ে এই সব লোকশিল্পীদের ছন্নছাড়া জীবনের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মে। ভবঘুরে লালনকে ঘরমুখী করার জন্য, তাঁর ভাইয়েরা হরিষপুর নিবাসী গোলাব শাহের কন্যা বিসখা বেগম এর সংগে তাঁর বিবাহ দেন।

সে বার গাঁ থেকে অনেকে গঙ্গাস্নানে চলল মুর্শিদাবাদের বহরমপুরে। লালনও ঝোলা নিয়ে সঙ্গী হল দাসপাড়ার পড়শিদের। কদিন বেশ কাটল তার। কত নতুন মানুষ, কত কথার ভিড়। স্নান তো হল, এ বার ফেরা। ফেরার পথেই লালনের গা গরম হল। ধুম জ্বর!

বসন্ত হয়েছে লালুর! গুটিবসন্ত! গুটিবসন্ত! জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকতে বকতে লালন একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। কে দেখবে তাকে এই বিদেশ-বিভুঁইয়ে!‌ রাত্তিরে জ্বর বাড়ল প্রবল। কোনও সাড় নেই শরীরে। সঙ্গীরা রোগের সংক্রমণের ভয়ে দেহ ফেলে রেখেই চলল। কারা যেন ভাসিয়ে দিল তার শরীর! গাঁ-ঘরে রটল লালনের মৃত্যু সংবাদ। পুত্রশোকে কান্নায় ভেঙে পড়লেন লালনের মা। কেঁদে কেঁদে চোখের জল শুকিয়ে গেল বৌয়ের।

কলার ভেলায় লালনের দেহ ভেসে চলল গাঙের ঢেউয়ে ঢেউয়ে। কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা মুমূর্ষু লালনকে উদ্ধার করেন মলম শাহ। তিনি ও তাঁর স্ত্রী মতিজান তাঁকে বাড়িতে নিয়ে সেবা-শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। পরে লালন পরে নিজ গ্রামে গেলে, মুসলমানের ঘরে কাটিয়েছে বলে, স্থানীয় হিন্দু সমাজ তাঁকে জাতিচ্যুত করে। ফলে লালন পুনরায় ছেউড়িয়া গ্রামে ফিরে আসেন। এখানে তিনি মতিজান বিবিবকে বিবাহ করেন এবং ছেউড়িয়াতে সস্ত্রীক বসবাস শুরু করেন।

গুটিবসন্ত রোগে একটি চোখ হারান লালন। ছেউড়িয়াতে দার্শনিক গায়ক সিরাজ সাঁইয়ের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর কাছে দীক্ষা নেন।

হিন্দু ও ইসলাম ধর্ম-এর বিভিন্ন অনুশাসন সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত হয়েও কোনো ধর্মই নিষ্ঠার সাথে পালন না করে তিনি একটি একটি ভিন্ন ধারার দর্শন-এর চর্চা শুরু করেন। তাঁর ধর্মীয় দর্শন বৌদ্ধ দর্শন, সুফিবাদ, বৈষ্ণব সহজিয়া মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত ছিল; কিন্তু সেক্ষেত্রেও এই সকল ধর্মের সাথে সম্পূর্ণ সহমত ছিলেন না। লালন শাহ সিরাজ সাঁইয়ের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেও সংস্কারসাধনে চৈতন্য-অনুসারী আর সাধনমার্গের ক্ষেত্রনির্মাণে তিনি গ্রহণ করেছিলেন সুফিধর্মের রীতি-প্রকরণ। বৌদ্ধ সহজিয়াদের দেহকেন্দ্রিক সাধনা, সনাতন ধর্মের ঐকান্তিক বিশ্বাস, ত্যাগ ও ঔদার্যের মেলবন্ধনে ধর্ম-বর্ণের প্রাকার অতিক্রম করে সমন্বয়বাদের সংজ্ঞাকে ভিন্ন মাত্রা দান করেছে লালন-প্রভাবিত বাউলনামক লোকধর্ম।

তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালি উপজেলার ছেঁউড়িয়াতে একটি আখড়া তৈরি করেন, যেখানে তিনি তাঁর নিজের দর্শন অনুসারে শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। কথিত আছে লালন শাহের কাছে ধর্ম তত্ত্বে পরাজিত হয়ে, দুদ্দু শাহ লালনের শিষ্য হন। তাঁর শিষ্যরা তাকে "সাঁই" বলে সম্বোধন করতেন। তিনি প্রতি শীতকালে আখড়ায় একটি ভান্ডারা বা মহোত্‍সব এর আয়োজন করতেন। সেখানে সহস্রাধিক শিষ্য ও সম্প্রদায়ের লোক জড়ো হতেন এবং সেখানে সংগীত ও আলোচনা হতো। চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর এবং পশ্চিমে অনেক দূর পর্যন্ত বাংলার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক লোক লালন ফকিরের শিষ্য ছিলেন। শোনা যায় তাঁর শিষ্যের সংখ্যা দশ হাজারেরও বেশি ছিল।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায় কলকাতার জোড়া সাঁকোর ঠাকুর পরিবারের অনেকের সঙ্গে লালনের পরিচয় ছিল। বিরাহিমপুর পরগনায় ঠাকুর পরিবারের জমিদারিতে ছিল তাঁর বসবাস এবং ঠাকুর-জমিদারদের প্রজা ছিলেন তিনি। ঊনিশ শতকের শিক্ষিত সমাজে লালন শাহের প্রচার ও গ্রহণযোগ্যতার পেছনে ঠাকুর পরিবার বড় ভূমিকা রাখে। কিন্তু এই ঠাকুরদের সঙ্গে লালনের একবার সংঘর্ষও ঘটে। কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালির কাঙাল হরিনাথ মজুমদার গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এরই একটি সংখ্যায় তখন ঠাকুর-জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ ও তথ্য প্রকাশের সূত্র ধরে উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তারা বিষয়টির প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানে আসেন। এতে করে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ওপর বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ঠাকুর-জমিদারেরা। তাঁকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে লাঠিয়াল পাঠালে শিষ্যদের নিয়ে লালন শাহ সশরীরে তা মোকাবিলা করেন এবং লাঠিয়াল বাহিনী পালিয়ে যায়।

লালনের জীবদ্দশায় তাঁর একমাত্র স্কেচটি তৈরি করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাতা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। লালনের মৃত্যুর বছরখানেক আগে ৫ মে ১৮৮৯ সালে পদ্মায় তাঁর বোটে বসিয়ে তিনি এই পেন্সিল স্কেচটি করেন- যা ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। যদিও কারো কারো দাবী এই স্কেচটিতে লালনের আসল চেহারা ফুটে ওঠেনি।

১৮৯১ সালে রবীন্দ্রনাথ যান শিলাইদহে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে লালন ফকিরের দেখা হয়নি। অন্যদের কন্ঠে তিনি লালনের গান শুনেছেন। ছেঁউরিয়ার লালন মাজারের ধারেপাশে এখনও একটি গুঞ্জন শোনা যায়, ‘রবীন্দ্রনাথ নাকি লালন সাঁই-এর গান লেখা মূল খাতাটি এনেছিলেন। কিন্তু আর ফেরত দেননি। যদিও এ অভিযোগের যথার্থ উত্তর দিয়েছেন উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। তিনি স্পষ্ট ভাবেই জানিয়েছেন, জমিদারি এস্টেটের কর্মী বামাচরণ ভট্টাচার্য ওই খাতাটির গানগুলি নকল করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী কালে রবীন্দ্রনাথ তার থেকেই কুড়িটি বেছে ১৩৩২ বঙ্গাব্দের প্রবাসীতে প্রকাশ করেন। এর পরেই সুধী জনের নজরে আসে বাউল এবং বাউলগান।

১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর (১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১লা কার্তিক) লালন ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার কুমারখালির ছেউড়িয়াতে নিজ আখড়ায় মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর প্রায় একমাস আগে থেকে তিনি পেটের সমস্যা ও হাত পায়ের গ্রন্থির সমস্যায় ভুগছিলেন। অসুস্থ অবস্থায় তখন তিনি দুধ ছাড়া অন্য কিছু খেতেন না। এ সময়ে তিনি মাছ খেতে চাইতেন। মৃত্যুর দিন ভোর ৫-টা পর্যন্ত তিনি গান-বাজনা করেন এবং এক সময় তাঁর শিষ্যদের বলেন, 'আমি চলিলাম' এবং এর কিছু সময় পরই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর নির্দেশ বা ইচ্ছা না থাকায় তাঁর মৃত্যুর পর হিন্দু বা মুসলমান কোন ধর্মেরই রীতিনীতি পালন করা হয়নি। তাঁরই উপদেশ অনুসারে ছেউড়িয়ায় তাঁর আখড়ার মধ্যে একটি ঘরের ভিতর তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর মৃত্যুর ১২ দিন পর তত্‍কালীন পাক্ষিক পত্রিকা মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত হিতকরী-তে প্রকাশিত একটি রচনায় সর্বপ্রথম তাঁকে 'মহাত্মা' হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

লালনের গানে মানুষ ও তাঁর সমাজই ছিল মুখ্য। লালন বিশ্বাস করতেন সকল মানুষের মাঝে বাস করে এক মনের মানুষ। আর সেই মনের মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় আত্মসাধনার মাধ্যমে। দেহের ভেতরেই মনের মানুষ থাকে, যাকে তিনি অচিন পাখি বলেছেন। সেই অচিন পাখির সন্ধান মেলে পার্থিব দেহ সাধনার ভেতর দিয়ে দেহোত্তর জগতে পৌঁছানোর মাধ্যমে। এটাই বাউলতত্ত্বে 'নির্বাণ' বা 'মোক্ষ' বা 'মহামুক্তি' লাভ বলে। তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানবতাবাদকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন। তাঁর বহু গানে এই মনের মানুষের প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন মনের মানুষ এর কোন ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিঙ্গ, কূল নেই। মানুষের দৃশ্যমান শরীর এবং অদৃশ্য মনের মানুষ পরস্পর বিচ্ছিন্ন, কিন্তু শরীরেই মনের বাস। সকল মানুষের মনে ঈশ্বর বাস করেন। লালনের এই দর্শনকে কোন ধর্মীয় আদর্শের অন্তর্গত করা যায় না। তিনি মানব আত্মাকে বিবেচনা করেছেন এক রহস্যময়, অজানা এবং অস্পৃশ্য সত্তা রূপে। খাঁচার ভিতর অচিন পাখি গানে তিনি মনের অভ্যন্তরের সত্তাকে তুলনা করেছেন এমন এক পাখির সাথে, যা সহজেই খাঁচারূপী দেহের মাঝে আসা যাওয়া করে কিন্তু তবুও একে বন্দি করে রাখা যায় না।

লালনের তার গান ও দর্শন যুগে যুগে প্রভাবিত করেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুলের মতো বহু খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবীসহ অসংখ্য মানুষকে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ লালনের মৃত্যুর ২ বছর পর তার আখড়া বাড়িতে যান এবং লালনের দর্শনে প্রভাবিত হয়ে ১৫০টি গান রচনা করেন। তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতা ও রচনায় তিনি লালনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। এছাড়া আমেরিকান কবি এলেন গিন্সবার্গ লালনের দর্শনে প্রভাবিত হন এবং তাঁর রচনাবলিতেও লালনের রচনাশৈলীর অনুকরণ দেখা যায়। তিনি আফটার লালন (After Lalon) নামে একটি কবিতাও রচনা করেন। লালনের সংগীত ও ধর্ম-দর্শন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে। তার গানগুলো মূলত বাউল গান হলেও বাউল সম্প্রদায় ছাড়াও যুগে যুগে বহু সঙ্গীতশিল্পীর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে। গান্ধীরও ২৫ বছর আগে, ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম, তাকেই 'মহাত্মা' উপাধি দেওয়া হয়েছিল।

তার লালনগীতিবা কখনো লালন সংগীতহিসেবে প্রসিদ্ধ। লালন মুখে মুখে গান রচনা করতেন এবং সুর করে পরিবেশন করতেন। এভাবেই তার বিশাল গান রচনার ভান্ডার গড়ে ওঠে। কিন্তু তিনি নিজে তা লিপিবদ্ধ করেন নি। তার শিষ্যরা গান মনে রাখত আর পরবর্তীকালে লিপিকায় তা লিপিবদ্ধ করতেন। আর এতে করে তার অনেক গানই লিপিবদ্ধ করা হয় নি বলে ধারণা করা হয়। বাউলদের জন্য তিনি যেসব গান রচনা করেন, তা কালে কালে এত জনপ্রিয়তা লাভ করে যে মানুষ এর মুখে মুখে তা পুরো বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে।

অধুনা বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার ছেউড়িয়ায় লালন শাহের মাজারকে কেন্দ্র করে ১৯৭৬-এ লালন একাডেমিতৈরি হয়েছে। সঙ্গে আয়নামহল, লালন জাদুঘর, লালন আশ্রম গড়ে উঠেছে। দেশি-বিদেশি লালন-ভক্তদের ভজন-সাধন যেমন এখানে চলে, তেমনই একাডেমির প্রাজ্ঞ লালন-সঙ্গীত শিল্পী ও সাঁইজির বাণী-প্রচারক কাঙালিনী সুফিয়া, হিরু শাহ, বাবু শাহ, নাদিম শাহ, রাখি শবনম, শিরিন আখতার প্রমুখ নিয়মিত বিনা পারিশ্রমিকে সঙ্গীত শিক্ষা দিয়ে চলেছেন। সেখানে বিদেশিদের সংখ্যাও কম নয়।

কদমখালির রাজ্য লালন মেলা, কেঁদুলির জয়দেবের মেলা, শান্তিনিকেতনের পৌষমেলা, কল্যাণীর সতীমায়ের মেলার মতো অসংখ্য বাউল মেলায় প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা না হলেও দেশি-বিদেশির এক সুগভীর মেলবন্ধন গড়ে ওঠে। ধর্ম-বর্ণের ছোঁয়াকে পিছনে ফেলে। লোকায়ত ভাবনার সমান্তরাল বৃত্তগুলি গভীর ভাবে সম্পৃক্ত হয় সহজাত অনুষঙ্গকে কেন্দ্রে রেখে। প্রতিষ্ঠিত হয় বার্তা— ‘নানান বরণ গাভী রে ভাই একই বরণ দুধ/ জগৎ ভরমিয়া দেখি একই মায়ের পুত।

প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মভাবনার পাশ কাটিয়ে মানবতাবাদের প্রশান্ত পথে সমাজের প্রত্যন্ত শ্রেণির মানুষের নিশ্চিন্তে জিরিয়ে নেওয়ার ভিত্তিভূমি সূচিত হয়েছিল যার হাতেই, আসুন সেই মানুষটিকে জানাই আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালবাসা।

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন