চিন-ভারত মৈত্রী-র প্রতীক ডাঃ কোটনিস

তিনি ভারতীয় চিকিৎসক। চিনের মানুষ আজও তাঁকে একজন নায়ক হিসেবে দেখেন। কিন্তু কজন ভারতবাসী জানে তাঁর নাম? আসুন পরিচয় করা যাক এহেন মানুষটির সাথে যার মৃত্যর পর আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মাও সে তুং বলেছিলেনঃ "THE ARMY HAS LOST A HELPING HAND. AND THE NATION HAS LOST A BEST FRIEND"

দ্বারকানাথ শান্তারাম কোটনিস
তিনি দ্বারকানাথ শান্তারাম কোটনিস। জন্ম মহারাষ্ট্রের সোলাপুরে এক নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে। দুই ভাই আর পাঁচ বোনের সাথে বেড়ে ওঠা। বম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেঠ গোবর্ধনদাস সুন্দরদাস মেডিক্যাল কলেজ থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করে চিকিৎসক-এর পেশায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। আকাশের মত হৃদয় ছিল কোটনিশের। মানুষ অসুস্থ হলে রাত-বিরেত মানতেন না। ছুটে যেতেন ডাক্তারের ব্যাগ হাতে নিয়ে। গরীবদের কাছ থেকে এক পয়সা ফিস নিতেন না। উল্টে ওষুধ কেনার টাকা দিতেন।

সালটা ১৯৩৮। চিন থেকে অনুরোধ এল, “আমাদের এখনই কিছু ডাক্তার পাঠান জরুরী ভিত্তিতে”। তখন কংগ্রেস সভাপতি নেতাজি। নেতাজি, জহরলাল নেহরু সহ কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করলেন।

বিষয়টা হল, জাপান তখন চীনকে আক্রমণ করেছে। লড়ছে মাও সে তুং -এর লাল ফৌজ৷ প্রতিদিন প্রচুর সৈনিক মারা যাচ্ছেন। গুরুতর আহতও হচ্ছেন অনেকে। তাই সৈনিকদের সুস্থ করে তুলতে এখনই অনেক ডাক্তারের প্রয়োজন।

নেতাজি তখন ভারতবর্ষ থেকে পাঁচজন ডাক্তারের একটি মেডিকেল টিম পাঠালেন। টিমের নেতৃত্বের ভার দিলেন আঠাশ বছরের যুবক, ডাক্তার দ্বারকানাথ কোটনিশকে। শোনা যায়, নেতাজির কাছে সব খবর ছিল  কোটনিশের বিষয়ে। তাই নেতাজি ডাক্তার কোটনিশকে দলনেতা করে চিনে পাঠান।

১৯৩৮-এর সেপ্টেম্বর মাসে পাঁচজনের এই চিকিৎসক দল চীনের ঊহান শহরের হানকো বন্দরে পদার্পণ করলে তাদের ইয়েনান পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে তাদের অভ্যর্থনা জানান মাও সে তুং, চু তে ও চীনের অন্যান্য কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতারা।

সোজা যুদ্ধক্ষেত্রে চলে গেলেন যেখানে আহত সৈনিকরা যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ডাক্তার কোটনিশ চান খাওয়া ভুলে গেলেন। একের পর এক আহত সৈনিককে ঔষধ আর অপারেশনের মাধ্যমে সুস্থ করে তুলছেন।

মাও জে দং সব খবর পাচ্ছেন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে। ইতিমধ্যে কয়েক হাজার সৈনিককে সুস্থ করে তুলেছেন কোটনিশ। ভীষণ খুশী মাও সে তুং। দূর থেকে জানাচ্ছেন অভিনন্দন।

চীন যাওয়ার পরে কোটনিস পিতার মৃত্যুসংবাদ পান কিন্তু কোটনিস সেবার ব্রত পরিত্যাগ করে দেশে ফিরে আসেননি।

কোটনিশ একটানা চান - খাওয়া ভুলে একটার পর একটা অপারেশন করে চলেছেন সৈনিকদের। অসংখ্য সৈনিক জীবন ফিরে পাচ্ছে দেখে তিনি সর্বস্ব ভুলে গেলেন!

১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি উটাই পর্বতের নিকটে জিন-চা-জি সীমান্তে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে থাকা অষ্টম রুট বাহিনীতে যোগদান করেন। যুদ্ধ চলাকালীন অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে প্রায় ৮০০ আহত সৈন্যের চিকিৎসা করেন কোটনিস। এই সময়ে কিছুদিন জিন-চা-জি সৈন্য বিভাগে ডঃ বেথুন স্বাস্থ্যবিধি বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্য বিষয়ক ভাষণ দিতেন। পরে তাকে ইয়েনানের ডঃ বেথুন আন্তর্জাতিক শান্তি হাসপাতালের প্রথম অধিকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। পাঁচজনের এই দলের বাকি সদস্যরা মিশন শেষে ভারতে ফিরে যান কিন্তু দ্বারকানাথ কোটনিস আর ফেরেননি। চীনা ভাষা শিখে নেন এবং সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে কোটনিস ডঃ বেথুন আন্তর্জাতিক শান্তি হাসপাতালের এক সেবিকা গুয়ো কুইংলানকে বিবাহ করেন। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩-শে আগস্ট তাদের এক ছেলের জন্ম হয়, তার নাম রাখা হয় ইনহুয়া। ইনহুয়াও চিকিৎসক ছিলেন। কিন্তু মাত্র ২৪ বছর বয়সে প্রাণ হারান তিনি।

প্রতিকূল যুদ্ধকালীন পরিবেশে প্রতিনিয়ত কাজের দরুন কোটনিসের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। ইনহুয়ার জন্মের মাত্র তিন মাস পরেই কোটনিস মৃগীরোগে আক্রান্ত হন। পরপর একটানা খিঁচুনির ফলে ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর কোটনিসের মৃত্যু হয়। চিনের নানকান প্রদেশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

চিনের পাঠ্যবইয়ে রয়েছে তাঁর কথা। প্রায় প্রতি বছরই কোনও না কোনও চিনা নেতা ভারতে এসে দেখা করেন এই ভারতীয় চিকিৎসকের পরিবারের সঙ্গে।

তাঁর নামে চিনে ও ভারতে ডাকটিকিটও রয়েছে।

২০০৯ সালে চিনে ইন্টারনেটের একটি সমীক্ষায় সেরা ১০ ব্যক্তিত্বের তালিকায় ছিলেন কোটনিস। তিনি ভারত ও চীন দুই দেশের সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে দুই দেশের মানুষের কাছে দারুণভাবে সম্মানিত।

(সংকলন - তারিণী খুড়ো)

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন