সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের শহিদ অনাথবন্ধু

১৯৩৩ সাল। মেদিনীপুর পুলিশ গ্রাউন্ড লোকে লোকারণ্য। ময়দানে উপস্থিত মহামেডান ফুটবল ক্লাব। উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে টাউন ক্লাব। হাড্ডাহড্ডি লড়াইয়ের অপেক্ষায় মেদিনীপুরবাসী। শুরু হবে ফুটবল খেলা৷ ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা৷ বল পায়ে মাঠে নেমেছিলেন মেদিনীপুরের জেলাশাসক বার্জ৷ সামনে থেকে চলল গুলি৷ মাটিতে পড়ে গেলেন অত্যাচারী শাসক৷ তাঁর বুকের উপর চড়ে বসলেন দুই যুবক৷ হাতে থাকা পিস্তল খালি করে দিলেন শাসকের বুকে৷ দ্রাম দ্রাম দ্রাম৷ রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ৷ চারদিকে তখন ছুটোছুটি৷ চিৎকার৷ মাঠ ছেড়ে পালাচ্ছে দর্শক৷ তখনই আরও কয়েকটা গুলি ছুটে এল দূর থেকে৷ অত্যাচারী জেলাশাসকের বুকের উপর বসে থাকা দুই যুবকের শরীরে লাগল সেই গুলি৷ তাঁরাও মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন৷ একজন ঘটনাস্থানেই মারা যান৷ অন্যজনকে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে৷ প্রথমজন অনাথবন্ধু পাঁজা, দ্বিতীয়জন মৃগেন্দ্রনাথ দত্ত৷ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে সশস্ত্র সংগ্রামে শহিদ বিপ্লবীদের মধ্যে অন্যতম অনাথবন্ধু পাঁজা-কে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করার পাশাপাশি আসুন জেনে নেওয়া যাক এই অসম সাহসী মানুষটির জীবন কাহিনী।

অনাথবন্ধু
ইতিহাসের চাকা ঘুরিয়ে চলে যাওয়া যাক ১৯১১ সালে। মাত্র তিন বছর আগে ফাঁসির দড়িতে প্রাণ দিয়েছেন মেদিনীপুরের বীর সন্তান ক্ষুদিরাম বসু। সেই বলিদানের কাহিনি তখনও ফিকে হয়নি। মেদিনীপুরের যুবক, তরুণরা ক্ষুদিরামকে আদর্শ মেনেই বেরিয়ে এসেছে রাস্তায়। একটু একটু করে গর্জে উঠছে এখানকার মাটি। আর এমন পরিস্থিতিতেই সবং থানার সাধারণ একটি গ্রাম ‘জলবিন্দু’-তে সুরেন্দ্রনাথ পাঁজা ও কুমুদিনী দেবীর অভাবের সংসারে জন্ম নিলেন অনাথবন্ধু পাঁজা। নুন আনতে পান্তা ফুরায় দশা তাঁদের।

তখন ছোট্ট অনাথবন্ধু বয়স বছর তিনেক। মারা গেলেন সংসারের একমাত্র আশ্রয়, খুঁটিবাবা। আর তো কিছুই রইল না! কুমুদিনী দেবী পড়লেন অথৈ জলে। দারিদ্র নিজের দাঁড়া আরও শক্ত করল। আর এর মধ্যেই পড়াশোনা শুরু হল অনাথবন্ধুর। গ্রামের পাঠশালায় প্রাথমিক বিদ্যাটুকু শিখতে শুরু করেছিলেন। এমন সময় পরিবার নিয়ে কুমুদিনী দেবী পাড়ি দিলেন মেদিনীপুর শহরে। যদি সেখানে কোনো আশ্রয় জোটে, ছেলের পড়াশোনা ঠিকঠাক হয়। সেই সূত্রেই মেদিনীপুর টাউন স্কুলে ভর্তি হন অনাথবন্ধু। শুরু হয় পড়াশোনা। এবং এই টাউন স্কুলই তাঁর জীবনকে অন্য খাতে নিয়ে যায়।

টাউন স্কুলে পড়তে পড়তেই তিনি শোনেন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের কথা। মেদিনীপুরের এই বিপ্লবী দলটির নাম সমস্ত তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। স্বাভাবিকভাবে সেই ঢেউ ছড়িয়ে পড়ল অনাথবন্ধুর মধ্যেও। গোটা ভারতেই বিপ্লবের আগুন তীব্র হচ্ছে ক্রমশ। কংগ্রেসের নরমপন্থী নীতির উল্টোদিকে দাঁড়িয়েছিলেন বিপ্লবীরা। যে কোনো মূল্যেই হোক, ব্রিটিশদের তাড়াতে হবে। স্বাধীন করতে হবে দেশ। উপরন্তু, বাংলায় তখনও বঙ্গভঙ্গের ঘা শোঁকায়নি। আর সেই বিপ্লবের সারণিতেই উঠে এসেছিল মেদিনীপুর। অনেক তরুণ নিজের প্রাণ তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন আগুনে। হাতে তুলে নিয়েছিলেন রিভলভার। মেদিনীপুরের মাটি তখন স্বাধীনতার মন্ত্রে ফুটছে টগবগিয়ে। 

প্রথমে জেলাশাসক পেডি, তারপর আবারও আরেক জেলাশাসক ডগলাস। দুজনেই মারা গেলেন বিপ্লবীদের হাতে। মেদিনীপুর তখন ব্রিটিশ পুলিশের ত্রাস। জেলাশাসক হিসেবে কেউ আর যেতে চাইছেনা মেদনীপুর। প্রত্যেকের মনেই ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল মেদিনীপুরের বিপ্লবীরা। সব জায়গায় যেতে রাজি, কিন্তু মেদিনীপুরে নয়। এমন সময় রক্ষাকর্তা হয়ে হাজির হলেন বার্জ। ধুরন্ধর, বুদ্ধিমান এবং সাহসী এই জেলাশাসককে যে এত সহজে কবজা করা যাবে না, সেটা বুঝতে পেরেছিলেন বিপ্লবীরা। রুটিন বলতে সেরকম কিছুই ছিল না বার্জের। তিনি নিজেই ইচ্ছা করে রাখেননি; যাতে কেউ তাঁর গতিবিধি মেপে নিতে না পারে। এদিকে বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সও চেষ্টা করছে জেলাশাসক বার্জকে দমন করতে। তাঁর পদক্ষেপ যে বিপ্লবীদের পথে বাধা তৈরি করছে। 

ততদিনে বিপ্লবী দলটির সঙ্গে জড়িয়ে গেছেন অনাথবন্ধু পাঁজা। খুঁজে পেয়েছেন আরেক বন্ধু, মৃগেন্দ্রনাথ দত্তকে। বয়সে চার বছরের ছোটো মৃগেন্দ্রও টাউন স্কুলের ছাত্র, এবং বিপ্লবী আদর্শে দীক্ষিত। দেশের জন্য সবকিছু করতে রাজি। এদিকে দলের আলাদা খরচও তো আছে। অনাথবন্ধুর পারিবারিক অবস্থা তখনও সেই তিমিরেই; তারই মধ্যে টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করতে লাগলেন তিনি। খড়গপুরের জমিতে যা ধান চাষ করা হত, তা বিক্রি করেই সংসার চলত কোনক্রমে। একবার এক বছরের ধান বিক্রির অর্থ বাবদ কিছু টাকা হাতে এল অনাথবন্ধুর। কিন্তু এবার মায়ের হাতে নয়; বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের কাছে পুরো টাকাটাই দিয়ে দিলেন তিনি। বাড়িতে ঢুকেছেন খালি হাতে। মা কুমুদিনী দেবী তো অবাক! টাকা কোথায়? অনাথবন্ধুর অকপট জবাব, ‘পকেটমার হয়ে গেছে। দেশের স্বাধীনতার জন্য এই মিথ্যেটুকু বলতে একবারও গলা কাঁপেনি তাঁর। ভারতমাতা যে শেকলে বাঁধা পড়ে আছেন, তাঁকে রক্ষা করতে এটুকু পারবে না মানুষ! অনাথবন্ধুর দৃপ্ত চোখ সেই কথাই বলে যায় বারবার।

একজন মানুষের কোনো না কোনো দুর্বল জায়গা থাকেই। বার্জেরও ছিলফুটবল। এই খেলা দেখলে নিজেকে সামলে রাখতে পারতেন না। আর এই ব্যাপারটাই চোখে পড়ল বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের। ব্যস, এখান দিয়েই আঘাত হানতে হবে। কলকাতায় অস্ত্রশিক্ষা দিতে পাঠানো হল অনাথবন্ধু ও মৃগেন্দ্রনাথকে। ভালো করে শিখে রিভলভার নিয়ে ফিরেও এলেন। এরপর আসল দিন। ১৯৩৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস। মেদিনীপুর পুলিশ গ্রাউন্ডে ফুটবল খেলা দেখতে হাজির হয়েছেন বার্জ। হাজির হয়েছেন অনাথবন্ধু পাঁজা এবং মৃগেন্দ্রনাথ দত্তও। মিশে আছেন ভিড়ের মধ্যে। বার্জ গাড়ি থেকে নেমে এগোলেন ময়দানের দিকে। জেলখানা, অস্ত্রাগার মাঠের পাশেই; উপরন্তু সশস্ত্র পাহারা। একপ্রকার নিশ্চিত হয়েই ছিলেন বার্জ। আর এখানেই সবচেয়ে বড়ো ভুলটা করলেন।

হঠাৎই দর্শকাসন থেকে শোনা গেল বন্দুকের আওয়াজ। ঘাবড়ে গেল সবাই। অবশ্য ঘাবড়ানোর সুযোগটুকুও পাননি জেলাশাসক বার্জ। ততক্ষণে পরনের পোশাক ভিজে গেছে রক্তে। মোক্ষম নিশানায় বিঁধেছে গুলি। গাড়ির ভেতরেই লুটিয়ে পড়লেন মৃত বার্জ। আর পুলিশরা দেখল, দর্শকাসন থেকে এগিয়ে আসছে দুই তরুণ। হাতে উদ্যত রিভলভার।

ততক্ষণে মাঠে শুরু হয়েছে ছুটোছুটি৷ যে যেদিকে পারছে পালাচ্ছে৷ অনাথবন্ধু ও মৃগেন্দ্রনাথ সেই সুযোগে পালাতে পারতেন৷ কিন্তু, পালাননি ৷ শোনা যায়, দুজনেই চড়ে বসেছিলেন বার্জের বুকে৷ সবকটা গুলি উজাড় করে দিয়েছিলেন অত্যাচারী শাসকের বুকে৷ পুলিশ গুলি চালায় দুই বিপ্লবীকে লক্ষ্য করে৷ ঘটনাস্থানেই শহিদ হন অনাথবন্ধু৷ বাড়িতে জন্মদাত্রী মা'কে রেখে দেশমায়ের জন্য শহিদ হন মাত্র ২০ বছর বয়সে৷

1 মন্তব্যসমূহ

  1. শহীদের মৃত্যু হয় না, কর্মের মাধ্যমে তাঁরা অমরত্বের অধিকারী হন ।
    অমর শহীদের স্মরণে জানাই রক্তিম শ্রদ্ধা ।

    উত্তরমুছুন
নবীনতর পূর্বতন