ক্ষণজন্মা সুকুমার রায়

ক্ষণজন্মা। শব্দটা আমরা বেশ আলগোছেই বলে থাকি। বেশি না ভেবে অনেকের সম্পর্কেই প্রয়োগ করে ফেলি। কিন্তু সত্যিই কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের দেখলে-জানলে ওই শব্দটার অর্থোদ্ধার করা যায়। তাঁরা যেন শব্দখানাকে সংজ্ঞায়িত করেন। বাঙালি সমাজে তেমন মানুষ সুকুমার রায়। স্বল্প দৈর্ঘ্যের জীবন এবং বিপুল ও বৈচিত্রময় কর্মভাণ্ডার। সামান্য সময়ে প্রতিভার শতপুষ্প বিকশিত।

সুকুমার রায়
সুকুমার রায়ের জন্ম ১৮৮৭ সালের ৩০-শে অক্টোবর, কলকাতার এক ব্রাহ্ম পরিবারে। সুকুমার ছিলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের উজ্বল রত্ন উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ছেলে। সুকুমারের মা বিধুমুখী দেবী ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মেয়ে। ১৮৮৭ সালে সুকুমার রায়ের জন্ম। সুবিনয় রায় ও সুবিমল রায় তাঁর দুই ভাই। এ ছাড়াও তাঁর ছিল তিন বোন।

উপেন্দ্রকিশোরের সব ছেলেমেয়ের মধ্যেই আশ্চর্য সাহিত্যপ্রতিভা বিকশিত হয়েছিল। তবে বলতেই হয়, এঁদের সকলের চেয়ে প্রতিভায় আলাদা ছিলেন সুকুমার। প্রবল চঞ্চল, ফুর্তিবাজ। সব কিছুতে উৎসাহ, খেলাধুলোর পাণ্ডা। কলের খেলনা ঠুকে ঠুকে দেখত সে, কী করে চলে। বাজনা ভেঙে দেখত, কোথা থেকে আওয়াজ বেরোয়। অসীম কৌতূহল যে! বিশাল তিনতলার ছাদের উঁচুতে একটা গোল ফুটো ছিল, এক বার সেটা গলে কার্নিসে নামার চেষ্টা করেছিল! সেই বয়সেই চমৎকার গল্প বলতে পারত তাতা (সুকুমারের ডাক নাম)

উপেন্দ্রকিশোরের প্রকাণ্ড একটি বই থেকে জীবজন্তুর ছবি দেখিয়ে ভাইবোনেদের আশ্চর্য মজার গল্প বলত। বই শেষ হয়ে গেলে জীবজন্তুর গল্প বানাতমোটা ভবন্দোলা কেমন দুলে থপথপিয়ে চলে, ‘মন্তু পাইনতার সরু গলাটা কেমন গিঁট পাকিয়ে রাখে, গোলমুখে ভ্যাবাচোখ কম্পু অন্ধকার বারান্দার কোণে দেওয়ালের পেরেকে বাদুড়ের মতো ঝুলে থাকে ইত্যাদি।

হেমন্তকুমার আঢ্য লিখছেন, “অসূয়াশূন্য, আঘাতশূন্য, উজ্জ্বল হাস্যরস সৃষ্টিতে আপামর বাঙালীকে যিনি মুগ্ধ করেছেন বাল্যকালের একটি নির্দোষ ক্রীড়া-কৌতুকের মধ্যে তাঁর ভাবী পরিচয় ফুটে ওঠে। রাগ বানাইবলে একটা খেলা ছিল তাতার। তার নিজেরই তৈরি। হয়তো কারও উপরে রাগ হয়েছে, কিন্তু শোধ নেওয়ারও উপায় নেই। তখন সে আয়, রাগ বানাইবলে সেই লোকটার সম্পর্কে অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প বানিয়ে বলতে থাকত। তার মধ্যে বিদ্বেষ বা হিংস্রভাব থাকত না, অনিষ্ট করার কথাও থাকত না, কেবল মজার কথা। তার মধ্য দিয়েই রাগটাগ জল হয়ে যেত। হ য ব র লর হিজিবিজবিজের কথা মনে পড়তে পারে। উদ্ভট সব কল্পনা করে নিজেই হেসে গড়িয়ে পড়ত হিজিবিজবিজ!

মজা করতে যেমন পারত, তেমনই নানা বিষয়েরবিশেষত ভাষার উপরে অসামান্য দখল ছিল ছোটবেলা থেকেই। কবিতায় গল্প বলানামে এক খেলা চলত তাদের বাড়িতে। বড়রাও যোগ দিতেন। কোনও একটা জানা গল্প কেউ কবিতায় বলবে, শুধু প্রথম লাইনটা। পরের জন দ্বিতীয় লাইন। এ রকম ভাবে চলতে থাকবে। না পারলে পাসএক দিন হচ্ছে বাঘ ও বক-এর গল্প’— “একদা এক বাঘের গলায় ফুটিয়াছিল অস্থি।/ যন্ত্রণায় কিছুতেই নাহি তার স্বস্তি।/ তিনদিন তিন রাত নাহি তার নিদ্রা।/ সেঁক দেয় তেল মাখে লাগায় হরিদ্রা।কিন্তু সুন্দরকাকা মুক্তিদারঞ্জন রায় যেই বললেন ভিতরে ঢুকায়ে দিল দীর্ঘ তার চঞ্চু’, অমনি সবাই চুপ। চঞ্চুর সঙ্গে মিল দিয়ে কী শব্দ হয়? ‘পাসহতে হতে তাতার পালা আসতেই সে বলল, “বক সে চালাক অতি চিকিৎসক চুঞ্চু।ভাইবোনরা রাগারাগি করল, ভাবল তাতা শব্দ বানাচ্ছে। কাকা ওর পিঠ চাপড়ে বললেন, “চুঞ্চু মানে ওস্তাদ, এক্সপার্ট।

মাত্র আট বছর বয়সে শিবনাথ শাস্ত্রীর মুকুলপত্রিকায় তাতার নদীকবিতা প্রকাশিত হয়। পরের বছর দ্বিতীয় কবিতা টিক্ টিক্ টং’ (মুকুল, জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৪)। শিবনাথ শাস্ত্রীর পরিকল্পনা করা ব্রাহ্ম বালিকা শিক্ষালয়ে ১২ বছর বয়স অবধি পড়তে পারত ছেলেরাও। সব ভাইবোনের মতো তাতাও ওখানেই পড়ত।

১৮৯৫-এ উপেন্দ্রকিশোরেরা সপরিবার বাড়ি বদল করে ৩৮/১ শিবনারায়ণ দাস লেনের বাড়িতে চলে এলে তাতা ভর্তি হল সিটি কলেজিয়েট স্কুলে। তাতা বড় হল, ‘সুকুমারনামটা পরিচিত হতে শুরু করল। এ সময় থেকেই সুচিন্তিত মতামত তৈরি হল সুকুমারের। তাঁর এক মাস্টারমশাই ছিলেন বড় ভাল মানুষ, কিন্তু কড়া বায়োস্কোপ-বিরোধী। একদিনের ক্লাসে সে বিষয়ে নিজের যুক্তি সাজানোর পরে প্রিয় ছাত্র সুকুমারকেও কিছু বলতে বলেন মাস্টারমশাই। সুকুমার বলেন, কিছু ছবি খারাপ, সেগুলো না দেখাই ভাল, কিন্তু ভাল ছবিও আছে, আর সে সব দেখলে অনেক কিছু শেখা যায়। মাস্টারমশাই মনঃক্ষুণ্ণ হন। সুকুমার জানতে চান, আপনি বায়োস্কোপ দেখেছেন? “আমি ওসব দেখি না”— কড়া জবাব। জোর করে মাস্টারমশাইকে নিয়ে একটা ভাল ছবি দেখতে যান সুকুমার। ছবিশেষে মাস্টারমশাই জানান, “তুমি আমার একটা মস্ত বড় ভুল ভাঙিয়ে দিলে।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুকুমারের নাটকের শখ বাড়ে। ছেলেবেলায় অন্যের লেখা কবিতা বা গল্পের নাট্যরূপ দিয়ে ভাইবোন, আত্মীয়, বন্ধুদের নিয়ে অভিনয় করা হত, এ বার নিজে নাটিকা লেখা ধরলেন। শেখাতে লাগলেন অভিনয়ও। ঘরোয়া জিনিসপত্র দিয়েই দিব্যি তৈরি হয়ে গেল প্রপকম্বলের ধারের ঝালর, ছেঁড়া মোজা, ধোপার পুঁটলি, খড়ি, গোমাটি, চুনকালি ইত্যাদি। আর নাটিকার বিষয়? কৈশোরে রচিত রামধন-বধনাটকের বিষয় ছিল স্বাধীনতা সংগ্রাম। নেটিভ নিগারদেখলেই নাক সিঁটকানো র‌্যাম্‌প্‌ডেন সাহেবকে কী করে পাড়ার ছেলেরা জব্দ করল, সে গল্পই হল রামধন-বধতাকে দেখলেই ছেলেরা বন্দে মাতরমধ্বনি দেয়, আর সাহেব তেড়ে মারতে আসে, বিদ্‌ঘুটে গালি দেয়, পুলিশ ডাকে। আবার স্বদেশি জিনিস নিয়ে বাড়াবাড়িতেও ঠাট্টা করতে ছাড়েননি সুকুমার। ভাই সুবিনয় যখন অলিগলি, বাজার খুঁজে জাপানি বা বিলিতি দ্রব্যের চেয়ে বেশি দাম দিয়ে দেশি জিনিস কিনছে, তখন দাদা গান বাঁধলেন— “আমরা দিশি পাগলার দল,/ দেশের জন্য ভেবে ভেবে হয়েছি পাগল!/ (যদিও) দেখতে খারাপ, টিকবে কম, দামটা একটু বেশি,/ (তা হক না) তাতে দেশের-ই মঙ্গল!

ছাত্রাবস্থাতেই লিখছেন ঝালাপালা’, ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেলঅভিনয়ের লোক জোগাড় করতে হবে, অতএব বন্ধুবান্ধব নিয়ে তৈরি হয়ে গেল ননসেন্স ক্লাবসাদাসিধে অনাড়ম্বর ভাবে আয়োজিত নাটকগুলি স্রেফ নাটকের গুণেই উতরে যেত। প্রায় প্রত্যেকটি নাটকেরই কেন্দ্রে থাকত কিঞ্চিৎ হাঁদা-প্রকৃতির একটি চরিত্র, যে আসলে নাটকের খুঁটি। ওই ভূমিকায় সুকুমার নিজেই অভিনয় করতেন। তত্ত্বকৌমুদী পত্রিকার বিমলাংশুপ্রকাশ রায়ের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, “তাঁর দল গড়ে উঠেছিল অতি সহজ, স্বাভাবিকভাবে, যেমন জলাশয়ের মধ্যেকার একটা খুঁটিকে আশ্রয় করে ভাসমান পানার দল গিয়ে জমাট বাঁধে। সত্যই তিনি খুঁটিস্বরূপ, আমাদের অনেকের আশ্রয়।

ক্লাবের একটি হাতে লেখা পত্রিকাও বার করেছিলেন সুকুমার: সাড়ে-বত্রিশ ভাজাবত্রিশ রকমের ভাজাভুজি আর তার উপরে আধখানা লঙ্কা বসানো, তাই সাড়ে বত্রিশ। অতি উপাদেয়। সম্পাদক সুকুমার, মলাট ও অধিকাংশ অলঙ্করণ তাঁর, বেশির ভাগ লেখাও। সম্পাদকের পাতা পঞ্চতিক্তপাঁচনবড়রাও আগ্রহ নিয়ে পড়তেন। ঠাট্টা থাকত, তবে খোঁচা নয়। মজা আর নির্মল আনন্দ।

ও দিকে, সিটি স্কুল পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হলেন সুকুমার। গম্ভীর লেখাতেও হাত দিলেন। বাঁধলেন দেশপ্রেমের গান: টুটিল কি আজি ঘুমের ঘোর১৯১০ সালে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্ম যুবসমিতির মুখপত্র আলোকপ্রকাশ করলেন। কিন্তু বেশি দূর এগোনোর আগেই জীবন অন্য দিকে বাঁক নিয়ে নিল। ফিজ়িক্স ও কেমিস্ট্রিতে ডাবল অনার্স নিয়ে বি এ পাশ করার পরের বছর গুরুপ্রসন্ন বৃত্তি পেলেন সুকুমার। ফোটোগ্রাফি ও ছাপাখানার প্রযুক্তিবিদ্যায় উচ্চশিক্ষার জন্য বিলেতযাত্রা করলেন। ১৯১১ সালের অক্টোবর মাসে এরেবিয়াস্টিমারে চড়ে ইংল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হলেন সুকুমার।

লন্ডন থেকে নিয়মিত চিঠি লিখতেন সুকুমার। বোঝা যায়, তাঁর ভাবনাচিন্তার ধারা তখনও পাল্টায়নি। দু’-একটি চিঠির দিকে চোখ রাখতে হয়। মাকে লিখছেন— “এখানে মাঘোৎসব হয়ে গেল। শুক্রবার ওয়ালডর্ফ হোটেলে মস্ত পার্টি হল। প্রায় ২৫০ লোক হয়েছিল। আমি চোগা চাপকান পরে গিয়েছিলাম। তাই দেখে অনেকে আমাকে পাদ্রি মনে করেছিল।দিদি সুখলতাকে লিখছেন— “গত দুবার মেলভেতে আর্ট গ্যালারি আর মিউজিয়ম দেখতে বেরিয়েছিলাম।... খ্রীস্টমাসের ছুটিতে খুব ফুর্তি করা গেল।আরও অনেককে লিখছেন কাজের কথা, পড়াশোনার কথা, কলেজের কথা, নতুন কাজ শেখার কথা। বাড়ির সকলের কুশল নিচ্ছেন।

বিলেতে গিয়ে ছাপার প্রযুক্তি বিষয়ে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন সুকুমার। ১৯১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ফেলো অব দ্য রয়্যাল ফোটোগ্রাফিক সোসাইটিউপাধি নিয়ে দেশে ফেরেন। এমনই চেয়েছিলেন বাবা উপেন্দ্রকিশোর। এ বার গুরুদায়িত্ব— ‘ইউ রায় অ্যান্ড সন্সও সন্দেশ পত্রিকার ভার; সেই সঙ্গে ব্রাহ্ম সমাজের ব্যস্ততা। ইতিমধ্যে বার তিনেক বাড়ি পাল্টেছেন তাঁরা, উপেন্দ্রকিশোরের ফোটোগ্রাফি আর ছাপাখানার কাজকর্মের জন্য। প্রথমে শিবনারায়ণ লেন, তার পর সুকিয়া স্ট্রিট, শেষে গড়পার রোড। কিন্তু সুকুমারের ক্রিয়াকলাপ, সবাইকে নিয়ে নানা উদ্যোগ কখনও থেমে থাকেনি। এমনকি শেষ দুবছর রোগশয্যাতেও অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছেন। সুকুমার বাংলা সাহিত্য জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন, সে আমরা জানি। কিন্তু বাংলা মুদ্রণ জগৎকেও অনেকখানি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বিলেত থেকে তাঁর অর্জিত পাঠ।

বিলেত থেকে ফেরার পরে ১৯১৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর ঢাকানিবাসী সুপ্রভা দেবীর সঙ্গে বিয়ে হয় সুকুমারের। ১০০ নং গড়পার রোডে জমে ওঠে আড্ডার ঠেক। কখনও রসের আলাপ, কখনও গম্ভীর কথাবার্তা। তবে বাধ্যতামূলক ছিল ভাল খাওয়াদাওয়া। সোমবারে আসর বসত তাই নাম মান্ডে ক্লাব। খাওয়ার বাহার দেখে কেউ একটু বেঁকিয়ে বলতেন মণ্ডা ক্লাব। কামাক্ষীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের লেখায় পাওয়া যায়— “Monday Club নামে তিনি এক সাহিত্য-আসর প্রতিষ্ঠা করেন। বহু গণ্যমান্য লোক এই ক্লাবের সভ্য ছিলেন। যেমন: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, নির্মলকুমার সিদ্ধান্ত, অতুলপ্রসাদ সেন, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, কালিদাস নাগ, অজিতকুমার চক্রবর্তী, সুবিনয় রায়, জীবনময় রায়, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, কিরণশঙ্কর রায়, ইত্যাদি।মান্ডে ক্লাব নিয়ে লীলা মজুমদার লিখছেন, “একটা প্রবাদ আছে যে যারা সবচাইতে বেশি কাজ করে, তাদেরই হাতে বাড়তি ফালতু কাজ করার সবচাইতে বেশি সময়ও থাকে। এ-কথাটি যে কত সত্যি, সুকুমারের জীবনই তার প্রমাণ।

এ বার শেষের কথা বলতেই হয়। বিলেত থেকে ফেরার পরে আর মাত্র দশ বছর বেঁচেছিলেন সুকুমার। তার মধ্যেই কত কাজ করে গিয়েছেন, হিসেব রাখা মুশকিল। ১৯১৪-য় সন্দেশ’, ‘প্রবাসীতত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় লেখালিখির শুরু। পরের বছর ২০ ডিসেম্বর ডায়াবিটিসে উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যু। সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হলেন সুকুমার। সঙ্গে কাঁধে তুলে নিলেন ইউ রায় অ্যান্ড সন্স, প্রিন্টার্স অ্যান্ড ব্লক মেকার্স’-এর সমস্ত দায়িত্ব; ‘সন্দেশসম্পাদনার দায়িত্বও।

এর পরের কয়েক বছর প্রাথমিক ভাবে ব্রাহ্ম সমাজের বিপুল ব্যস্ততা নিয়ে কাটে। কয়েকটি ঘটনা আলাদা করে উল্লেখ্য। ১৯১৭ সালের ৯-ই এপ্রিল ব্রাহ্ম যুবকমণ্ডলীর উৎসব উপলক্ষে উপাসনায় যুবকের জগৎনামে একটি ভাষণ দেন সুকুমার। পরের বছর দুটি ব্রহ্মসঙ্গীত লেখেন— ‘প্রেমের মন্দিরে তাঁর আরতি বাজেএবং নিখিলের আনন্দ গান। ১৯১৯-এ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুদিবসে মহর্ষির জীবন ও সাধন নিয়ে একটি বক্তৃতা দেন। অন্য দিকে চলতে থাকে সাহিত্যসৃষ্টি। সেই সব অমর সাহিত্যকীর্তি, যা আজও বাঙালি পাঠক সমাজকে আলোড়িত করে। হ য ব র ল’, ‘হেশোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরী’, ‘আবোল তাবোল’-এর লেখাগুলি জীবনের শেষ পর্যায়েই তৈরি। এই সব লেখায় গভীর অন্তর্দৃষ্টির ছাপ, পরিণত শিল্পীর ছোঁয়া।

চলতি সমাজের মূল্যগুলিকে ভাঙতে, ছোটোদের মন থেকে ভুল সংস্কারগুলিকে সরিয়ে দিয়ে তার সামনে জীবনযাপনের একটা স্বাস্থ্যময় ছবি সাজিয়ে দিতে সুকুমার রায় যেভাবে, যে মুন্সিয়ানার সাথে হাসির আর খেয়ালখুশির হালকা মেজাজে তার কলমের ছোঁয়ায় অমর সৃষ্টি তৈরি করেছেন তার জুড়ি মেলা ভার। কথাটা চমৎকার ভাবে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ— “তাঁর স্বভাবের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির গাম্ভীর্য ছিল।

শেষ দুবছর রোগশয্যাতেও সন্দেশ’-এর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন সুকুমার। এ সময়েই লেখেন আকাশবাণীর দলপ্রবন্ধটি। প্রথম প্রকাশিতব্য বই আবোল তাবোল’-এর অলঙ্করণ এবং পুরনো ছবিগুলির সংস্কারও তখনই। মাঘোৎসবে ছোটদের জন্য লেখেন বৃহৎ কাব্য অতীতের ছবি

১৯২১ সালের ২-রা মে পুত্র সত্যজিতের জন্ম হয়। সেই মাসের শেষের দিকেই অসুস্থ হন সুকুমার। কালাজ্বর। চিকিৎসার্থে নিয়ে যাওয়া হয় দার্জিলিংয়ের লুইস জুবিলি স্যানাটোরিয়ামে। কিন্তু এই দুরারোগ্য অসুখের ওষুধ তখনও আবিষ্কৃত হয়নি। ক্রমশ স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। সত্যজিতের যখন ছোট ছিলামবইয়ে সে সময়ের কথা কিছু পাওয়া যায়। আড়াই বছর বয়স অবধি অসুস্থ বাবাকে নিয়ে যেটুকু কথা তাঁর মনে ছিল, তা-ই লিখেছেন সত্যজিৎ। ১৯২৩ সালের ২৯-শে অগস্ট খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন সুকুমার। গান শুনতে ভালবাসতেন। সেদিন-ই রবীন্দ্রনাথ এসে তাঁকে নটি গান শোনান। তবে শরীর দ্রুত খারাপ হচ্ছিল। কয়েক দিন পর ১০-ই সেপ্টেম্বর চিরঘুমের দেশে চলে যান তিনি।

মাত্র ৩৬ বছরের জীবনে যে অমিত প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন, তাতে করে তাঁর জন্য ‘ক্ষণজন্মা’ শব্দ-টিই সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক নয় কি?

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন