সময়টা ১৯৩০ সাল, বাংলায় সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম তখন তুঙ্গে। ঢাকায় গোয়েন্দা পুলিশের এক কনস্টেবল ভীষণ বাড়াবাড়ি শুরু করলো। অবস্থাটা এমন জায়গায় পৌঁছাল যে ওকে থামাতে না পারলে যুগান্তর দলের নেতৃস্থানীয় কয়েকজন বিশিষ্ট কর্মীর জীবননাশ অনিবার্য হয়ে পড়বে। সন্দেহ এড়াতে ধুরন্ধর ঐ গোয়েন্দাকে ওর বাড়ির সামনেই খতম করার সিদ্ধান্ত নিলেন বিপ্লবীরা। সেইমতো সাজানো হলো পরিকল্পনা।
| নেপাল নাগ |
অপারেশন শেষ,
এবার সরে যাবার পালা। যে যার মতো করে গা ঢাকা দিলেন। নেপাল
নাগ, রমণী রায় ও বঙ্গেশ্বর রায়কে যেতে হবে প্রায় আড়াই মাইল
দূরে গেন্ডারিয়ায়। সবারই খালি পা, জামা কোমরে বাঁধা,
যেন ওপাড়ারই ছেলে। উয়াড়ি এলাকার মধ্য এসে পথচারিদের বিভ্রান্ত
করার জন্য দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু করলেন তারা। নেপাল নাগ প্রথম দৌড় শুরু করলেন উঁচু
গলায় এই বলে, ‘আচ্ছা কে দৌড়ে আগে যেতে পারে’। পথচলতি লোকজন ভাবলো, পাড়ার ছেলেরা হয়তো নিজেদের
মধ্যে দৌড়ঝাঁপ করছে। কেউ কিছু বোঝার আগেই তারা সরে পড়লেন অকুস্থল থেকে অনেক দূরে।
ঐ বছরই আরো একটি অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন নেপাল নাগমশাই। সেবার ঢাকার সারস্বত সমাজের তিন-চারশ শিক্ষক পণ্ডিতের জমায়েত থেকে সরকারী টাকা ছিনিয়ে নেন। সহযোদ্ধা ছিলেন বিনয়,অসিত ও বঙ্গেশ্বর রায়। তৎকালীন গভর্নর বাহাদুর বছরে একবার পণ্ডিত শিক্ষকদের দশ বিশ টাকা করে উপহার দিতেন। পরেশ রায় ওই খবর এনে দেন যুগান্তর দলের বিপ্লবীদের কাছে। তখন বিপ্লবীদের অস্ত্র কেনার জন্য টাকার খুব প্রয়োজন ছিল। গভর্নরের বাড়িটি দোতলা। নিচে প্রায় তিনশ ও ওপরের তলায় প্রায় একশ’র মতো শিক্ষক সেদিন জমায়েত হয়েছেন। টাকাটা আছে ওপরতলায়। বাড়ির গেট, সিঁড়ি, একতলা এবং দোতলায় ছ’জন সশস্ত্র পুলিশ ডিউটিতে রয়েছে।
প্ল্যানমতো বিনয় পিস্তলের আওয়াজ করতেই ঘর ভরতি লোকজন বাইরের বারান্দার দিকে সরে গেল। নেপাল নাগ ও বঙ্গেশ্বর রায় সেই ফাঁকে টাকাটা দখল করেন। ভীড় ও ধাক্কাধাক্কির মাঝে পুলিশ গুলি চালাতে ও পারে না। চলে যাবার সময় নেপাল নাগ জোরগলায় বললেন, "এই টাকা স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য ব্যয় হবে। যদি সরকার আপনাদের প্রাপ্য টাকা না দেয় তবে নিশ্চিত থাকুন দেশ স্বাধীন হলে পর কড়ায় গণ্ডায় এ টাকা আমরা আপনাদের ফেরত দেব।"
কুসুমকুমারী এবং সুরেশচন্দ্র নাগের কনিষ্ঠ পুত্র নেপাল নাগের জন্ম ঢাকায় ১৯০৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। দীর্ঘ পাতলা গড়নের সুপুরুষ চেহারার নেপাল নাগ ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের। তাঁর ভাল নাম ছিল শৈলেশ। স্কুলের লেখাপড়ার প্রতি নেপাল নাগের আকর্ষণ ছিল কম। পাঠ্য বই নয়, বাইরের বই পড়ার প্রতি তাঁর অধিক মনোযোগ ছিল। যে কারণে সহপাঠীদের চেয়ে যেকোন বিষয়ে তাঁর জানাশোনা ছিল অনেক বেশি। স্কুলে পড়ার সময় তিনি অনিল রায়ের নেতৃত্বাধীন ঢাকার গোপন বিপ্লবী দল ‘শ্রীসংঘে’র সাথে যুক্ত হন। নেতৃত্ব দেবার সহজাত ক্ষমতা থাকার সুবাদের তাঁকে বাছাই করা হয়েছিল গোপন বিপ্লবী দলের চরম সাহসী কাজের জন্য।
বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। তিনি মধ্যপ্রদেশে ঠিকাদারি করতেন। ছোট বয়সেই উপার্জনের জন্য নেপাল নাগের বড় ভাই চলে গেলেন বাবার কাজে সাহায্য করতে। বাবার দেয়া সামান্য টাকায় সংসার চালাতেন মা। অস্বচ্ছল সংসারের অভাব অনটনের মধ্যে কঠিন বাস্তবতার মাঝে বেড়ে ওঠেন তিনি। অনেকেই জানেন না নিজের পৌঢ়া মা’কেও নেপাল নাগ টেনে এনেছিলেন গোপন বিপ্লবী কাজে। দাদাও বাদ যাননি সহায়ক হতে। ১৯৩১ সালের একেবারে শেষ দিকে বেশ কয়েকটি কর্মকাণ্ডে হয় সংগঠক হিসেবে নয় নিজে অংশগ্রহণ করে ঢাকা শহরে এক গোপন আস্তানায় জনৈক সহকর্মীর বিশ্বাসঘাতকতার ফলে নেপাল নাগ ধরা পড়ে যান।
সাক্ষীর অভাবে কোন অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও সাতবছরের জন্য তাঁকে রাজস্থানের দেউলি জেলে বন্দি করে রাখা হয়। কারাগারে বসেই তিনি মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে জীবনাদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩৮ সালে দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে মুক্তি লাভ করে সে সময়কার অন্যান্য তরুণ কমিউনিস্টদের মতই নেপাল নাগ বাড়িতে না ফিরে কলকাতায় যে ঘরে কমরেড মুজফফর আহমদ, প্রমোদ দাশ গুপ্ত, আবদুল হালিম থাকতেন সেখানে এসে ওঠেন। কমরেড মুজফফর আহমদ তাকে বিহারে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন তৈরি করার জন্যে পাঠিয়ে দেন। সেখানে সাফল্যের সঙ্গে কাজ সেরে ফিরে এলে মুজফফর আহমদ তাকে ঢাকায় সুতাকল শ্রমিকদের সংগঠন তৈরি করার পরামর্শ দেন। নেপাল নাগের জীবনের প্রায় ১০ বছর জেল অথবা অন্তরীণ অবস্থায় কেটেছে, আর ১৪ বছর অজ্ঞাতবাসে।
১৯৩৯-৪০ সালে কমিউনিস্ট পার্টির বেআইনী যুগে ঢাকার জোড়পুল
লেনের গোপন ডেরা থেকে জ্ঞান চক্রবর্তী, সুধীন কর প্রমুখের সঙ্গে
নারায়ণগঞ্জ জেলার আশপাশের সুতাকল অঞ্চলের শ্রমিক সংগঠন গড়ার কাজে সকাল ৮টা থেকে
রাত ১০টা পর্যন্ত সদাব্যস্ত থাকতেন।
১৯৪০ সালের এপ্রিল মাসে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ঢাকার কমিউনিস্ট কর্মীরা সারা উপমহাদেশের কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ঢাকার গেন্ডারিয়ায় কংগ্রেস কর্মী সম্মেলনের আয়োজন করেন। ব্রিটিশ সরকার এই কংগ্রেস কর্মী সম্মেলনের উপর ১৪৪ ধারা জারি করে। সেদিন কমিউনিস্ট নেতা ও কর্মীরা ১৪৪ ধারা অগ্রাহ্য করে সম্মেলন অনুষ্ঠিত করে। নেপাল নাগ ও নরেশ গুহ, বঙ্গেশ্বর, ফণী গুহ, প্রমথ নন্দী, প্রফুল্ল চক্রবর্তী, জ্ঞান চক্রবর্তী, সুশীল সরকার, জিতেন ঘোষ প্রমুখ এই সম্মেলনের নেতৃত্ব দেন। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন অগ্নিযুগের বিভিন্ন বিপ্লবী দলের সক্রিয় সদস্য।
ফলে ১৯৪০ সালের জুনে ব্রিটিশ পুলিশ নেপাল নাগ সহ ঢাকা জেলার ১৫/১৬ জন প্রধান কমিউনিস্ট নেতা ও কর্মীকে গ্রেফতার করে। এই কংগ্রেস কর্মী সম্মেলন বেআইনী বলে বিচারের নামে এক প্রহসনের নাটক শুরু হয়। নেপাল নাগকে প্রথমে এক বছর, পরে কমিয়ে ছ’মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। ১৯৪০ সালের ডিসেম্বরে তিনি মুক্তি পান। এরপর পুলিশ তাঁকে নিজগৃহে অন্তরীণ করে রাখে। নেপাল নাগ দু’চার দিনের মধ্যেই অন্তরীণের বেড়াজাল ডিঙ্গিয়ে চলে যান তাঁর পুরনো ঘাঁটি নারায়ণগঞ্জের সুতা ও বস্ত্রকল এলাকায়। সেখানে বিভিন্ন শ্রমিক পরিবারের আশ্রয়ে ১৯৪১-৪২ সাল পর্যন্ত দেড় বছরের বেশি সময় ধরে আত্মগোপনে থেকে শ্রমিক ও কমিউনিস্ট পার্টির জন্য কাজ করেন।
১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকার সূত্রাপুরে ফ্যাসিস্ট বিরোধী সম্মেলনে যোগদানের সময় যখন তরুণ সাহিত্যিক ও রেল শ্রমিক ইউনিয়নের সংগঠক সোমেন চন্দ-কে উগ্রজাতীয়তাবাদী এবং কমিউনিস্টবিরোধী শক্তি হত্যা করে। সে সময় নেপাল নাগ নারায়ণগঞ্জ জেলার সুতাকল অঞ্চলে আত্মগোপন করেছিলেন গলায় কষ্ঠিধারী প্রবীণ পুরোহিত সেজে। ঢাকার সংবাদ পেয়েই মাথায় ফেজটুপি চাপিয়ে দাড়িওয়ালা মৌলবী সেজে হাজির হন এবং ঢাকা শহরে কমরেডদের নিরাপত্তার ব্যবস্থায় সক্রিয় হন।
ঢাকেশ্বরী কটন মিলের মালিকেরা জেলা শাসকের মাধ্যমে নেপাল নাগের ওপর মিল এলাকায় প্রবেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করেও তাঁর শ্রমিক সংগঠন গড়ার কাজকে ঠেকাতে পারেনি। তিনি ডিঙি নৌকা ভাড়া করে শীতলক্ষ্যা নদী দিয়ে গিয়ে ঢাকেশ্বরী ২নং ও ১নং কটন মিলের খেয়া পারাপারের স্থানে জলে ঝাঁপিয়ে পড়তেন এবং শীতলক্ষ্যা নদীর মাঝদরিয়ায় একটি লগিপুঁতে নিতেন। দুই মিলের শ্রমিকরা খেয়া পারাপার হতেন। সেখানে তিনি দিনে ৬-৭ ঘণ্টা জলের মধ্যে লগি ধরে বক্তৃতা করতেন। রাজনৈতিক শিক্ষা দিতেন। একদিন দু’দিন নয়, মাসের পর মাস জলে সাঁতার কাটতে কাটতে ঢাকেশ্বরী কটন মিলের শ্রমিকদের মধ্যে শক্তিশালী ইউনিয়ন গড়ে তুলেছিলেন সাংগঠনিক ক্ষমতায় দক্ষ নেপাল নাগ।
১৯৪২ সালের শেষের দিকে নিবেদিতা নাগের সঙ্গে কমরেড নেপাল নাগের পরিচয় হয়। পরবর্তীতে তাঁরা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। নিবেদিতা নাগ ছিলেন ঢাকার বিশিষ্ট কমিউনিস্ট কর্মী। তিনি ছিলেন নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ। বিয়ের কিছুদিন পর নিবেদিতা নাগ সব ছেড়ে দিয়ে সার্বক্ষণিক কর্মী হিসেবে পার্টিতে যুক্ত হন। নেপাল নাগ ও নিবেদিতা নাগের বিয়ের রেজিস্ট্রি হওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন- মুজফ্ফর আহমদ, ভবানী সেন, আব্দুল হালিম, আব্দুল্লা রসুল, গোপেন চক্রবর্তী, সৈয়দ হাবিবুল্লা প্রমুখ।
দেশ বিভাগের পর তিনি পূর্ব-পাকিস্তানকেই নিজের কর্মক্ষেত্র বেছে নেন। ১৯৪৯-৬২ সাল পর্যন্ত তিনি ‘রহমান ভাই’ নাম গ্রহণ করে দীর্ঘকাল আত্মগোপন অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিউনিস্ট পার্টির কাজ করেন। এই ১৪ বছরে তিনি প্রকাশ্য আসতে পারেননি। এ ছাড়াও তিনি কোনো সময় রহমান ভাই, কোনো সময় পরেশ দা, কোনো সময় দাসু দা নামে পরিচিত ছিলেন।
১৯৪৪-৪৭ সাল পর্যন্ত প্রচণ্ড কাজের চাপ মাথায় নিয়েও দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, দেশভাগের চক্রান্ত, অবশেষে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা, এ সমস্ত দুর্দৈবের বিরুদ্ধে পার্টি তার সীমিত শক্তি নিয়ে প্রাণপণে লড়াই করেছিল। সেই লড়াইয়ে নেপাল নাগ ছিলেন অন্যতম। এছাড়াও তিনি এই দিনগুলোতে হাওড়া, হুগলী, চব্বিশ পরগণায় শ্রমিক সংগঠনের কাজে অত্যন্ত ব্যস্ত ছিলেন।
অগ্নিবর্ষী বক্তা ছিলেন নেপাল নাগ। বর্ষীয়ান জননেতা মুজফফর আহমদ একবার বলেছিলেন, “নেপাল নাগ বক্তৃতা দিতে উঠলে মরা মানুষও লাফ দিয়ে উঠত”।
১৯৬১ সালে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বাবিংশ কংগ্রেসে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিনিধিত্ব করেন এবং হো চি মিন, মিকোয়ান, চৌ এন লাই এবং আইদিতের সঙ্গে পূর্ব বাংলার মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করেন। ফেরার পথে তিনি লন্ডনে নেমে রজনী পাম দত্তের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে দেশে আসেন ১৯৬২ সালে। এরপরেই ডায়াবেটিস রোগের কারণে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে অবসর নেন।
অবস্থার অবনতি হলে সেখানকার পার্টির নেতারা গোপন পথে তাকে ভারতে পাঠান। ১৯৭৮ সালের ৫ই অক্টোবর কলকাতাতেই মারা যান আমজনতার কাছে অচেনা এই বিপ্লবী নায়ক।
(সংকলন - তারিণী খুড়ো)
মহান কমিউনিস্ট নেতা কমরেড নেপাল নাগ সম্পর্কে অজানা তথ্য জানতে পারলাম , খুব ভালো লাগলো।
উত্তরমুছুনশ্রদ্ধেয় কমরেড নেপাল নাগ লাল সেলাম।