অজিতেশ - বাংলা নাটকের বৈশাখী ঝড়

ঝড়ের মত এলেন, দেখলেন, জয় করলেন, আবার বড় তাড়াতাড়ি চলে গেলেন – তিনি আসানসোলের অজিত, বাংলার অজিতেশ। প্রখ্যাত নাট্য পরিচালক-অভিনেতা শম্ভু মিত্র  তাঁর "মঞ্জরী আমের মঞ্জরী" - নাটক দেখে বলেছিলেন, “বাংলা নাটক শাসন করার লোক এসে গেছে”।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়
অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে বাংলা নাট্যজগতে পরিচিত হলেও তাঁর প্রকৃত নাম অজিত। ১৯৩৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন মানভূম, বর্তমান পুরুলিয়া জেলার জয়পুর ব্লকের রোপো গ্রামের মামার বাড়িতে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবার বাড়ি ছিল অধুনা পশ্চিম বর্ধমান জেলার রানিগঞ্জ অঞ্চলের অন্তর্গত কেন্দা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম ভুবনমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মায়ের নাম লক্ষ্মীরানি। পাঁচ বছর বয়সে পুরুলিয়ার মধুবন স্কুলে ভর্তি হলেও পরে ঝালদার সত্যভামা হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সেখানে পড়াশোনা করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলেন কুলটি উচ্চ বিদ্যালয়ে। এর পরে আসানসোল কলেজে (বর্তমানের বিবি কলেজ) ভর্তি হলেও পরে সুযোগ পেয়ে চলে যান কলকাতার মণীন্দ্র কলেজে। সেখান থেকে ইংরেজিতে স্নাতক।

ছোটবেলা থেকেই থিয়েটারের সঙ্গে যেন একটা অদ্ভুত আত্মীয়তা ছিল অজিতেশের। তাই আসানসোলের ছোটঘরের চৌকিকে মঞ্চ বানিয়ে বন্ধু, ভাই-বোনেদের সঙ্গে নাটকের মহড়া দিতেন। ১৯৪৭ সালে মে মাসে শিক্ষক ধীরেন ঘটক অজিতেশকে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের খ্যাতির বিড়ম্বনা’-য় নকড়ি চরিত্রে অভিনয় করান। এ ছাড়া শিক্ষক আদিত্য মুখোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় রামের সুমতিনাটকে অভিনয় করেন। আসানসোল কলেজে পড়ার সময়ে তিনি কলেজের সংস্কৃতি বিভাগের সম্পাদক হন। এখানেই তাঁর সংস্কৃতি চেতনা ও অভিনয় ক্ষমতার প্রথম প্রকাশ ঘটে।

কলকাতার কলেজে পড়ার সময় থেকে অজিতেশ জড়িয়ে পড়েন পাতিপুকুর শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে। মূলত কংগ্রেস মনোভাবাপন্ন পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। এখান থেকেই তাঁর নাটকের সঙ্গে রাজনৈতিক চেতনার সম্মিলন ঘটে। যদিও তিনি কোনও দিনই সে ভাবে মিটিং, মিছিলে অংশ নিয়ে পার্টির আদর্শ প্রচার করেননি তবে মনে প্রাণে তিনি ছিলেন আদ্যন্ত এক কমিউনিস্ট

স্কুলে শিক্ষকতার চাকুরীতে জয়েনও করলেন। কিন্তু নাটক ডাকছে তখন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। যোগ দিলেন গণনাট্য সংঘে। একই সঙ্গে নাটক লেখা ও অভিনয় চলতে লাগল পুরোমাত্রায়। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির দমদম লোকাল কমিটির সদস্যও হয়েছিলেন।

অজিতেশ রাজনীতি আর সংস্কৃতিকে কোনও দিনই একাসনে বসাতে পারেননি। বা ইচ্ছা করেই এ দুয়ের মধ্যে সচেতন একটি দূরত্ব রেখে চলতে চেয়েছিলেন। তিনি থিয়েটারে রাজনৈতিক উপাদান প্রয়োগ করেছেন খুবই সচেতন ভাবে। উচ্চকিত রাজনৈতিক শ্লোগানে দিয়ে তাই অজিতেশের নাটকের পরিসমাপ্তি ঘটে না। বরং তাঁর নাটক এক স্থিরতর রাজনৈতিক এবং মানবিক মূল্যবোধের সামনে দর্শককে দাঁড় করায়। এই কারণেই গণনাট্য সম্পর্কে অজিতেশে অনুৎসাহিত হয়েছিলেন। গণনাট্যের প্রতিটি ধ্যান ধারণাকে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা তাঁর মতো সৃষ্টিশীল মানুষের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা থাকা সত্ত্বেও সব বিষয়ে সহমত হতে না পারার জেরে অনেকে তাঁকে দক্ষিণপন্থীধ্যান ধারণার মানুষ বলে ভাবতে শুরু করেছিলেন।

এর জেরে এমন এক অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয় যে অজিতেশকে বাধ্য হয়ে চলে যেতে হয়। বহুরূপীপত্রিকায় ব্রেখটের সঙ্গে পরিচয়ের আদিপর্বপ্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘আমি লক্ষ করেছি যাঁরা পার্টির সদস্যপদ নেন তাঁরা পার্টির সুবিধাগুলো ভোগ করেন, কষ্টগুলো নয়। এর থেকে বোঝা যায় কিছুটা আক্ষেপ তার মধ্যে কাজ করছিল। অজিতেশ মনে করতেন পার্টিকে ভালবাসলে তার সমালোচনা করতে হবে। প্রয়োজনে নির্ভীক হয়ে সমালোচনা করতে হবে। কিন্তু সমালোচনা করলেই একাংশের কাছে সুবিধাবাদী, বুর্জোয়া ইত্যাদি অভিধা পেতে হয়। পার্টির শৃঙ্খল ছেড়ে অজিতেশ স্বতন্ত্র ভাবে নাট্যচর্চা করলেও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পার্টিকে অন্তর থেকে ভালবেসেছিলেন।

১৯৬০-এ অসিত বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন মিত্র, অজয় গঙ্গোপাধ্যায়, মহেশ সিংহ, রাধারমণ তপাদার, চিন্ময় রায়দের নিয়ে নান্দীকার। পরের বছর যোগ দিলেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত। অজিতেশের সঙ্গে রুদ্রপ্রসাদের বন্ধুত্ব সেই মণীন্দ্রচন্দ্র কলেজের কমন রুম থেকে। বাংলা নাটকে নিয়ে এলেন চেকভ, ব্রেশট, টলস্টয়, পিরানদেল্লোর প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত লেখকদের সৃষ্টিকে।

১৯৬১ সালের ১২ নভেম্বর অভিনীত হল নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র। এই নাটক বাংলা থিয়েটারে নান্দীকার-এর নাম দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। মূল নাটক লুইজি পিরানদেল্লো-র সিক্স ক্যারেক্টার্স ইন সার্চ অফ অ্যান অথর। বঙ্গীয়করণ করেন রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত।

এর পর একের পর বাংলা নাট্যমঞ্চে তাঁর রচনা, নির্দেশনা ও অভিনয়ে মঞ্চসফল নাটক অভিনীত হতে লাগল। মানুষ মুগ্ধ হয়ে দেখল, "মঞ্জরী আমের মঞ্জরী" (আন্তন চেখভের চেরি অর্চার্ড’-এর বাংলা নাট্যরূপ), "তিন পয়সার পালা", "শের আফগান", " ভাল মানুষ", "আন্তিগোনে", "পাপপুণ্য", "সওদাগরের নৌকা", প্রভৃতি নাটক।

বাংলা সিনেমাতেও তিনি উজ্জ্বল স্বাক্ষর রাখলেন। তিনি অভিনয় করেছিলেন, তপন সিংহ, মৃণাল সেন, তরুণ মজুমদার, নবেন্দু ঘোষ প্রমুখ বিশিষ্ট চিত্র পরিচালকদের ফিল্মে। "আরোহী", "হাটেবাজারে", "গণদেবতা", ""কপালকুন্ডলা", "পদ্মগোলাপ", এরকম আরো কত সিনেমা।

কপালকুন্ডলা সিনেমায় ভয়ংকর সেই কাপালিকের ভূমিকায়, তিনি যখন অট্টহাসি হেসে ডাক ছাড়তেন, "কপালকুন্ডলে!" সেই ডাক শুনলে আজও দর্শকের ভয় জেগে ওঠে!

আবার "গণদেবতা" সিনেমায়, গ্রামের অত্যাচারী লম্পট জমিদারের ভূমিকায় অজিতেশ বন্দ্যেপাধ্যায়ের অভিনয়  দেখলে শরীর রাগে জ্বলে ওঠে।

বাংলা ও হিন্দি মিলিয়ে মোট ৬৩টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন অজিতেশ। রেডিও নাটকেও তাঁর অভিনয় ভোলার নয়। যাত্রার জগতেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন অনন্য।

বিশাল দেহ, 'ফুটের ওপর লম্বা, ঝাঁকড়া চুলের বাজখাঁই গলার মানুষটির দুটি বড় বড় চোখে ছিল এক স্বপ্নের জাদু। তাঁর সঙ্গে যারাই কথা বলেছেন সকলেই একটা কথা বলেছেন, তাঁর কথায় ছিল এক মায়াময় জাদু। মানুষ যখন কথা বলত তাঁর সঙ্গে, মনে হত যেন কোন নাটক দেখছে। তিনি হাস্যপ্রিয় ও খাদ্যরসিক মানুষ ছিলেন।

১৯৮৩-র ১৪ই অক্টোবরের মধ্যরাত। দুর্গাষ্টমীর উৎসবমুখর কলকাতা। সপ্তমীর সন্ধেয় সুজাতা সদনে এই অরণ্যে’-র দুটো শো করে বাড়ি ফিরে নৈশভোজ সেরেছিলেন। বুকের যন্ত্রণার পর কয়েকটা মিনিট। অকালবোধনের অষ্টমীর রাত বড় অকালেই যেন টেনে নিয়েছিল সদ্য পঞ্চাশ-অতিক্রান্ত তাঁকে। ওই বোধহয় একবারই থেমেছিলেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়।

মাত্র পঞ্চাশ বছরে জীবন নাটকের যবনিকা পড়ে গেল! অকালে চলে গেলেন বাংলা নাটকের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

(সংকলন – তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন