১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে সিপাহি বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। এই বিদ্রোহ ভারতে ইংরেজ শাসনের ভিতকে কাঁপিয়ে দেয়। এই সিপাহি বিদ্রোহের প্রধান কেন্দ্র ছিল দিল্লি, কানপুর, লখনৌ, বেরেইলি, ঝাঁসি এবং বিহারের আরা। বিদ্রোহী সিপাইরা দিল্লির গদিচ্যুত মোঘল বাদশাহ দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে মহা বিদ্রোহের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেছিল। তার নামেই বিদ্রোহ পরিচালিত হয়। মুক্তির স্বপ্নে বিভোর উপমহাদেশের আপামর মানুষ নেতা হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন তাকে। বৃদ্ধ সম্রাট বয়সের কারণে প্রথমে দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কিন্তু, ভারতবর্ষে তখন তার চেয়ে সর্বজনবিদিত কিংবা গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব পাওয়া সম্ভব ছিল না। সিপাহীদের অনুরোধে অবশেষে রাজি হন তিনি। বাহাদুর শাহ জাফরই ছিলেন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো শেষ মুঘল সম্রাট।
| বাহাদুর শাহ জাফর |
২০-শে সেপ্টেম্বর ১৮৫৭ সাল। ইংরেজ বাহিনী দিল্লি পুরোপুরি কবজা করে নিল। পর্যুদস্ত হলো অল্প কয়েক দিনের ভারতীয় শাসন। সমাপ্ত হলো বিদ্রোহ। ১৮৫৭ সালে সিপাহি যুদ্ধের পর বাহাদুর শাহ জাফরের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। সেই দুর্ভোগ কালো ছায়া ফেলে তাঁর ছেলেমেয়ের জীবনেও। তাঁর মেয়ে কুলসুম যামানির স্মৃতিকথার তার কিছু বিবরণ পাওয়া যায়।
লালকেল্লা ছেড়ে বাদশাহ বাহাদুর শাহ জাফরের বের হয়ে যাওয়ার
পরদিনই তিনি ইংরেজদের হাতে ধরা পড়েন। শেষ সম্রাটের এই শেষ দুই দিন নিয়ে বেশ কিছু
বৃত্তান্ত লেখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নিখুঁত হচ্ছে খাজা হাসান নিজামির লেখা ‘বেগমাত কি
আঁসু’। মানে বেগমদের অশ্রু। লেখা হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শুরুর
দিকে। তখনো ১৮৫৭ সালের ঘটনা দেখেছেন নিজ চোখে, এমন বহু লোক সে সময়ও বেঁচে ছিলেন।
তাঁদের মুখ থেকে শুনে খাজা হাসান নিজামি এগারো খণ্ড লিখেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন ‘দাস্তানে গদর’। মানে ‘বিদ্রোহের কাহিনী’। এই ‘বেগমাত কি
আঁসু’ সেই এগারো খণ্ডের একটি। কুলসুম যামানির বয়ান সেই খণ্ডে তুলে ধরা
বয়ানগুলোর একটি। তিনি ছিলেন বাহাদুর শাহ জাফরের প্রিয় কন্যাদের একজন।
বাহাদুর শাহ জাফরের মেয়ের উর্দুতে লেখা স্মৃতিকথার কিছু
অংশের বঙ্গানুবাদ অনেকটা এই রকম -
"যে রাতে আমার বাবাজান তাঁর সাম্রাজ্য হারালেন, লালকেল্লায় এক
দুর্যোগ নেমে এল। মনে হচ্ছিল যেন কেল্লার প্রতিটি দেয়াল কাঁদছে। চার মাস ধরে
চারদিকে বন্দুক আর কামান চলছে। সেই ধোঁয়া আর কালিতে মুক্তোর মতো শুভ্র মর্মর
প্রাসাদ কালো হয়ে গেছে। গত দেড় দিন আমাদের কোনো খাবার জোগাড় হয়নি। আমার মেয়ে
জয়নাবের বয়স দেড় বছর। সে দুধের জন্য কাঁদছে। মাঝরাত, সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর আমাদের
ডেকে পাঠালেন চারদিকে পিনপতন নীরবতা। একটু পরপর সেই নীরবতা ভেঙে দিচ্ছে কামান
দাগার শব্দ।"
"আমরা দেরি না করে সম্রাটের সামনে গিয়ে হাজির হলাম।
আমি তাঁর সামনে প্রথামতো তিনবার কুর্নিশ করলাম। তিনি মমতা ভরে আমাকে কাছে ডেকে
নিলেন। বললেন, ‘কুলসুম, তোমাকে খোদার হাতে সঁপে দিচ্ছি। যদি ভাগ্যে থাকে, আবার দেখা
হবে। দেরি না করে তোমার স্বামীসহ এখনই বের হয়ে পড়ো। আমিও বের হচ্ছি। এই অবস্থায়
নিজের সন্তানদের কাছ থেকে আলাদা হতে মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু আমার সমস্যায় তোমাকে
জড়াতে চাই না। আমার সঙ্গে থাকলে তোমাদের বিনাশ নিশ্চিত। একা হলে, খোদা তোমাদের
সামনে বাঁচার কোনো পথ খুলে দিতেও পারেন।’
"কাঁপা কাঁপা হাত তাঁর প্রার্থনায় মেলে ধরে তিনি বলে
উঠলেন, ‘হে খোদা, এই এতিম মেয়েটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। অপূর্ব প্রাসাদে
বড় হয়ে এখন তারা অন্ধকার অরণ্যের পথে চলেছে। কোনো বন্ধু নেই, নেই কোনো
রক্ষক। তৈমুরি বংশের এই রাজকন্যাদের সম্মান রক্ষা কোরো, হে খোদা।
হিন্দুস্তানের হিন্দু-মুসলমান সবাই আমার সন্তান। বিপদ তাদের ঘিরে ধরেছে। আমার
কাজের জন্য তাদের যেন কষ্ট পেতে না হয়। সব বিপদ থেকে তাঁদের বাঁচিয়ে রেখো।’
ব্যক্তিগতভাবে বাহাদুর শাহ জাফর একজন গুণী মানুষ হিসেবে
পরিচিতি পেয়েছিলেন। তিনি একজন দক্ষ ক্যালিগ্রাফার, আধ্যাত্মিক কবি ও ধর্মীয় সাধক
হিসেবে সকলের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন।
তখন মুঘল সাম্রাজ্যের শোচনীয় অবস্থা। তার পিতামহের সময়
থেকেই মুঘল সম্রাটরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পেনশনভোগী হয়ে পড়েছিল। মুঘল কর্তৃত্ব
তখন লাল কেল্লার চার দেয়ালে বন্দী। প্রচণ্ড প্রতাপশালী মুঘল সাম্রাজ্য তখন
ইংরেজদের পদানত। ইংরেজরা ধীরে ধীরে তাদের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করেই চলছিল। মুদ্রা থেকে
সম্রাটের নাম বাদ দেওয়া, দিল্লীর নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে করায়ত্ত করা সহ ধীরে ধীরে
মুঘলদের নাম সমূলে উৎখাত, সবই ইংরেজদের কর্তৃত্ব বৃদ্ধির পরিকল্পিত প্রয়াস। সম্রাট
হওয়ার পর বাহাদুর শাহ জাফর জানতেন তার সীমাবদ্ধতা। কিছুই করতে না পারার হতাশা আর
হাহাকার ভুলে থাকতে তিনি কাব্যচর্চায় সময় কাটাতেন। তিনি ছিলেন একজন উচ্চমানের কবি।
তার অনেক কবিতা এখনো উচ্চারিত হয় মুখে মুখে।
বাহাদুর শাহ জাফর হয়তো শেষ কয়েকজন মুঘল সম্রাটদের মতো
ইতিহাসের পাতায় বেতনভোগী শাসক হিসেবেই হারিয়ে যেতেন। কিন্তু ইতিহাসের
যুগসন্ধিক্ষণে সিপাহী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসায় ইতিহাসে তিনি জায়গা করে
নিলেন অনন্য মর্যাদায়। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে
ভারতবর্ষের অগণিত মানুষের মনে জায়গা করে নিলেন স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে। যদিও এর
জন্য তাকে ভোগ করতে হয়েছে সীমাহীন দুর্ভোগ,
নির্যাতন; হারাতে হয়েছে সন্তান, সম্পতি, রাজ্য-
সবকিছু।
এ বিদ্রোহে তিনি সর্বতোভাবে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।
সিপাহীদের খরচ মেটাতে তিনি তার সকল সম্পদ বিক্রয় করে দেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত
আসবাব-তৈজসপত্রও তিনি বিক্রি করে দিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বরের প্রথমদিকে তার পুত্র
মির্জা মুঘল সিপাহীদের জন্য কিছু অর্থ চেয়ে লিখেছিলেন, তখন বাহাদুর
শাহ জাফর অসহায় হয়ে বলেছিলেন, “মির্জা মুঘলের কাছে আমার ঘোড়ার সাজ, রূপার হাওদা, কুর্সিগুলো
পাঠাও, যাতে মির্জা মুঘল সেগুলো বিক্রয় করে খরচ চালিয়ে নিতে পারে। আমার কাছে
এছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।”
বিভিন্ন কারনে সিপাহী বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়। বিভিন্ন জায়গায়
নৃশংসভাবে, নির্বিচারে হত্যা-লুণ্ঠন চালায় ইংরেজবাহিনী। বাহাদুর শাহ জাফর প্রথমে
নিজামুদ্দিন আওলিয়ার মাজারে অবস্থান নেন এবং পরে পরিবারের সদস্য ও প্রায়
হাজারখানেক সিপাহীদের সাথে আশ্রয় গ্রহণ করেন পূর্বপুরুষ সম্রাট হুমায়ুনের সমাধিতে।
অবশেষে ২১-শে সেপ্টেম্বর ইংরেজ সেনাপতি হডসনের নেতৃত্বে
একদল ইংরেজ সৈন্য বাহাদুর শাহ জাফর ও তার পরিবারের সদস্যসহ গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারের আগে যদিও বন্দী সবাইকে সম্মান ও নিরাপত্তার
প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন হডসন, কিন্তু বিজয়ী বাহিনী হিসেবে তাদের এই প্রতিশ্রুতি পালন
করার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। ইংরেজরা বাহাদুর শাহ জাফরের দুই পুত্র মীর্জা মুঘল
ও মীর্জা খিজির সুলতান, তার নাতি মীর্জা আবু বকর সহ অসংখ্য মুঘল বংশধর, জাফরের
দরবারের লোকজন এবং বিদ্রোহের পক্ষে থাকা সৈন্যদের নির্মমভাবে নির্বিচারে হত্যা
করে। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি তারা,
বরং তার দুই পুত্রের ছিন্ন-মস্তক
সম্রাটের কাছে পাঠিয়ে দিয়ে নিষ্ঠুরতার নজির স্থাপন করে তারা।
বৃটিশ ফৌজি কমিশনের দ্বারা ১৮৫৮ সালের জানুয়ারিতে সম্রাট
বাহাদুর শাহ জাফরের বিচারের নামে এক প্রহসন অনুষ্ঠিত হয়। ৯ মার্চ কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সম্রাটকে
ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, হত্যা ইত্যাদির অভিযোগে অভিযুক্ত করে রেঙ্গুনে নির্বাসনে
পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়। বয়স বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি বলে কমিশনের
সিদ্ধান্তে জানানো হয়।
অবশেষে সপরিবারে সম্রাটকে জাহাজে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় রেঙ্গুনে।
ব্রিটিশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন নেলসন ডেভিসের বাসভবনের ছোট এক গ্যারেজে সম্রাট ও তার
পরিবার-পরিজনের বন্দিজীবন শুরু হয়। সম্রাটকে শুতে দেয়া হয় একটা পাটের দড়ির
খাটিয়ায়। ভারতের প্রিয় মাতৃভূমি থেকে বহু দূরে রেঙ্গুনের মাটিতে সম্রাটের
জীবনের বাকি দিনগুলো চরম দু:খ ও অভাব অনটনের মধ্যে কেটেছিল। সম্রাট পক্ষাঘাতে
আক্রান্ত হন। আয়েশি জীবনযাপনে অভ্যস্ত বাহাদুর শাহের শেষ দিনগুলো কাটতে থাকে
নিঃসঙ্গতা, কষ্ট আর মানসিক যন্ত্রণায়। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে হতভাগ্য মুঘল সম্রাট
দৈনিক ১১ টাকা বরাদ্দে দিনাতিপাত করতে লাগলেন সেই পরিত্যক্ত কাঠের ঘরটিতে।
শেষ জীবনে বাহাদুর শাহ নিজের সকল ব্যথা ভুলে থাকতে অধিকাংশ
সময় আল্লার ধ্যানে কাটাতেন। ১৮৬২ সালের ২৬ অক্টোবর তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন।
অবশেষে ১৮৬২ সালের ৭ নভেম্বর শুক্রবার ভোর ৫-টায় তিনি পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নেন।
সম্রাটকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে দাফন করা হয়। কবরটি
বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য, যাতে করে তা একসময় নষ্ট হয়ে যায়, ঘাসগুলো গোটা
জায়গা আচ্ছাদিত করে ফেলে। কোথায় সর্বশেষ মুঘল সম্রাট শায়িত আছেন, তার চিহ্নও যেন
কেউ খুঁজে না পায়।
নিজের আসন্ন মৃত্যু সম্পর্কে বাহাদুর শাহ লিখেছিলেনঃ
“আমার কোনো
বন্ধু আসেনি, যখন সময় এল।
মৃত্যুকে প্রশংসা করতেই হয়,
কারণ সে একাই যথাসময়ে এল,
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।"
শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর মৃত্যুর আগে সূদুর
রেঙ্গুনে নির্বাসিত অবস্থায় বেদনার্ত হয়ে আরও লিখেছিলেন
"কিৎনা বদনসিব হ্যাঁয় জাফর...দাফনকে লিয়ে দোগজ জামিন
ভি মিলানা চুকি ক্যোয়ি ইয়ার মে।"
অর্থাৎ,
“কী দুর্ভাগ্য
জাফরের, স্বজনদের ভূমিতে তার দাফনের জন্য দু'গজ মাটি, তাও মিলল না”।
শত বছর পর ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী
মায়ানমার সফরে গিয়ে তার সমাধি সৌধ পরিদর্শন করে পরিদর্শক বইতে লিখেছিলেনঃ "হিন্দুস্তানে
হয়তো তুমি দু' গজ মাটি পাওনি। কিন্তু তোমার আত্মত্যাগ থেকেই আমাদের স্বাধীনতার আওয়াজ
উঠেছিল। দুর্ভাগ্য তোমার নয় জাফর, স্বাধীনতার বার্তার মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষের সুনাম ও গৌরবের
সঙ্গে তোমার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে"।
রাজীব গান্ধীর মন্তব্যে এক বিন্দুও অতিরঞ্জন ছিল না।
মুঘলরা যেখান থেকে যেভাবেই আসুক, ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে মানুষের জেগে উঠার, আশা-আকাঙ্ক্ষা
আর মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর।
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)