সালটা ১৯১১। ঘোষিত হয়েছে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম। এগিয়ে আসছে প্রাইজ দেওয়ার অনুষ্ঠান। এ দিকে সংগঠকরা মহা ফ্যাসাদে। নিজেদের সম্মান বাঁচাতে তাঁরা চাইছেন, পুরস্কার বিজেতাদের বিশেষ এক জন যেন না আসেন ওই অনুষ্ঠানে।
| মেরী কুরি |
কে তিনি? তিনি মারি স্ক্লোদাওস্কা কুরি। মাদাম
কুরি বা মেরী কুরি। মেরী কুরির নাম শুনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর।
বিজ্ঞানজগৎ তাঁকে জানায় কুর্নিশ। সে তো তাঁর গবেষণার জন্য। তার বাইরেও তিনি এক
প্রতীক। দুঃসহ বাধা ডিঙিয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছনোর। কট্টর পুরুষতান্ত্রিক সমাজে
নারীর বিদ্রোহ ঘোষণার। নাঃ, ভুল হল। বলা উচিত ছিল, সমাজ-সংসারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমি-আমার-মতো স্টাইলে বেঁচে থাকার।
আশ্চর্য জীবন বটে! জন্ম পোল্যান্ডের ওয়ারশ’ শহরে। ১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর। পরিবারে তাকে 'মানিয়া'
বলে ডাকা হতো। তার বাবা ব্লাদিস্লাভ শক্লোদোভস্কি একটি নামকরা
কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। তার মা ওয়ার্স শহরের একটি নামকরা ওয়ার্স বোর্ডিং স্কুল ফর
গার্লস এর প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।
পোলিশ চেতনা লালনের জন্য চাকরি খুইয়ে বাবা অচিরে বেকার হলেন। তিন বোন আর এক ভাইয়ের
সংসারে অনটন। অগত্যা বাবা বাড়িকে বানিয়ে ফেললেন ছাত্রদের বোর্ডিং। স্কুলপড়ুয়া
ছাত্রদের বাড়িতে রেখে কিছুটা রোজগার। সংসারে দারিদ্র, কিন্তু
বাবা-মায়ের শিক্ষায় ছেলেমেয়ে সবাই ব্রিলিয়ান্ট। মেরী তো ক্লাসে ফার্স্ট।
কয়েক বছর বাদে, এক বোন মারা গেল
টাইফয়েডে। মা যক্ষ্মা রোগে। সংসারের হাল ধরতে হল মেরীকে। কিন্তু লেখাপড়া চালিয়ে
যেতেই হবে। ওয়ারশ’তে সে সুযোগ নেই। আছে প্যারিসে। খরচ?
প্ল্যান আঁটলেন মারি। ডাক্তারি পড়তে বোন যাবে প্যারিস। খরচ জোগাতে
রোজগারে নামবেন মেরী। ডাক্তার হয়ে নিজে রোজগার শুরু করলে পড়াশুনো করতে দিদিকে
প্যারিস নিয়ে যাবে বোন।
অষ্টাদশী মারি ওয়ারশ’ থেকে দূরে ধনী জোরাওস্কি
পরিবারে গভর্নেস। দিনে ও-বাড়ির মেয়েদের পড়ানো, রাতে নিজের
বইপত্র নিয়ে বসা। মন কেড়ে নিচ্ছে দুই বিষয়। গণিত। পদার্থবিদ্যা। ক্রমে মন কাড়ল
এক যুবকও। জোরাওস্কি পরিবারের বড় ছেলে। বাদ সাধলেন পরিবারের কর্তা। বুঝিয়ে-সুঝিয়ে
বাবাকে রাজি করাতে সময় চাইলেন ছেলেটি। পাঁচ বছর অপেক্ষা করলেন মেরী। ধনী বাবার
বাধ্য ছেলে ভঙ্গে দিলেন রণে। মেরী চিনলেন সমাজ।
তত দিনে বোন প্যারিসে ডাক্তার। বিয়ে করেছেন এক ডাক্তারকে।
সচ্ছল পরিবার। পূর্বশর্ত অনুযায়ী এবার মেরি তার বোনের আর্থিক সহায়তায় বিজ্ঞানের
উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথমে অস্ট্রিয়ার শাসনাধীনে ক্রাকো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান।
কিন্তু সেখানে বিজ্ঞান ক্লাসে যোগ দিতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সচিব অসম্মতি জ্ঞাপন
করে মেরীকে জানিয়ে দেন যে, বিজ্ঞান মেয়েদের জন্য নয়, তিনি যেন রন্ধন শিক্ষা ক্লাসে যোগ দেন। তবে এসব বাধা মেরিকে তার বিজ্ঞানর
প্রতি আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
১৮৯১ এর শেষের দিকে মেরী পোল্যান্ড থেকে ফ্রান্সের
উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান এবং প্যারিসের সোরবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে
পদার্থবিজ্ঞানে, রসায়নে এবং গণিত অধ্যয়ন করতে থাকেন। তার আগে অবশ্য
কিছুদিন বোনের কাছেও ছিলেন। বোনের বর মানুষটা ছিলেন বড় আমুদে। হইহুল্লোড় লেগেই
থাকে। পড়াশুনোয় ডিসটার্ব হয়। বোনের বিলাসবহুল পরিবার ছেড়ে মেরী গিয়ে উঠলেন
কলেজের কাছে এক বাড়ির একখানা খুপরি ঘরে। সে-ঘর গ্রীষ্মে বয়লার, শীতে ফ্রিজ। রোজগার বলতে ল্যাবরেটরিতে কাচের পাত্র ধোয়ামোছার কাজ।
পড়াশুনোয় মনপ্রাণ। মেরী দিনে পড়তেন, সন্ধ্যায় পড়াতেন এবং
পড়িয়ে যা আয় করতেন, তা ছিল খুবই সামান্য। পেট ভরাতে খেতেন
পাউরুটি আর শুকনো ফল বা পাউরুটি আর এক টুকরো চকলেট। কষ্টের সেই দিনগুলো সম্পর্কে
পরে স্মৃতিকথায় মেরী-র মন্তব্য: ‘এ জীবন, কোনও কোনও দৃষ্টিকোণে বেদনাদায়ক হলেও, আমার কাছে
প্রকৃত আনন্দের। আমি পেলাম মুক্তি আর স্বাধীনতার স্বাদ, যা
দারুণ মূল্যবান। প্যারিসে আমি অজানা-অচেনা, হারিয়ে গেলাম
বিশাল শহরে। কিন্তু সেখানে একা থাকার, অন্যের সাহায্য ছাড়া
বেঁচে থাকার, অনুভূতি মোটেই হতোদ্যম করল না আমাকে, বরং এক প্রশান্তি আর তৃপ্তি ছেয়ে রাখল মন।’ ফল মিলল
একাগ্র পড়াশুনোর। ১৯৮৩ সালে মেরী ফিজিক্সের ডিগ্রিতে প্রথম। প্রথম ম্যাথমেটিক্সের
ডিগ্রিতেও।
এরপর তিনি গ্যাব্রিয়েল লিপম্যানের শিল্পভিত্তিক গবেষণাগারে
কাজ শরু করেন। এরই মধ্যে তিনি আরেকটি ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে ফেলোশিপ পেয়ে যান।
এরপর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালোভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যান। এই সময়েই এক অধ্যাপক মেরীর
সাথে আলাপ করালেন বিশেষ এক জনের সঙ্গে। পিয়ের কুরি। অধ্যাপক। গবেষণা করেন চাপের
প্রভাবে ক্রিস্টালের তড়িৎ উৎপাদন এবং চুম্বকত্বের ওপর উষ্ণতার প্রভাব নিয়ে।
চিন্তায় ঘোর প্রতিষ্ঠানবিরোধী। পড়াশুনো বেশির ভাগ বাড়িতে। পিএইচ ডি-র পিছনে ছোটেননি।
মেরীর বয়স ২৬। পিয়ের ৩৫।
মেরিকে দেখেই পিয়েরে তার প্রেমে পড়ে গেলেন। মেরিরও
পিয়েরেকে দেখে ভালো লেগেছিল, কিন্তু কাজিমিয়েরেজের সাথে ভালোবাসার
তিক্ত অভিজ্ঞতা ভুলতে পারেননি। তাই প্রথমদিকে বিষয়টা এড়িয়ে চলতেন। যা-ই হোক,
দুজনে মিলে চুম্বক গবেষণায় নিয়োজিত হন। গবেষণা চলার সময়ে তাদের মাঝে
তীব্র ভালোলাগা ও ভালোবাসার জন্ম নেয়। পিয়েরই বেশি আগ্রহী ছিলেন। মেরীর পিয়ের-এর
চোখমুখের সারল্য, কিঞ্চিৎ উদাসীন দৃষ্টি, আর ভরসা জোগানো হাসিটা ভালো লাগলেও, আগের অভিজ্ঞতায়
তিনি তখন ঘোর বাস্তববাদী। একদিন পিয়েরে সাহস করে মেরিকে প্রস্তাব দিয়ে বসেন। মেরি
সরাসরি না করেননি, বেশ কিছু অজুহাতে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
অবশেষে, ১৮৯৫ সালের ২৬ জুলাই দুই পরিবারের সম্মতিতে তাদের
বিয়ে হলো।
মধুচন্দ্রিমা? যৌতুকের অর্থ দিয়ে কেনা
হল দুটো সাইকেল। তাতে চড়ে যুগলে দেশভ্রমণ। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রথম কন্যা
আইরিনের জন্ম হয়। এই সময় তিনি প্যারিসের মূল ধারার শিক্ষা পদ্ধতিরে বাইরের
শিক্ষাপদ্ধতি হিসাবে প্রচলিত École normale
supérieure -তে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে এঁর দ্বিতীয় সন্তান ইভা কুরির
জন্ম হয়। মেরী সহকর্মীদের নিন্দার শিকার। তিনি বাচ্চাদের চেয়ে বেশি সময় দিচ্ছেন
ল্যাবরেটরিতে।
গবেষণার সময় বটে সেটা! পদার্থবিজ্ঞানে চলেছে ধুন্ধুমার
কাণ্ড। জার্মান বিজ্ঞানী উইলহেল্ম রন্টজেন আবিষ্কার করেছেন এক বিচিত্র আলো, যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ভেদ করে যায় অনেক কিছু।
জামাকাপড় কোন ছার! মহিলারা সন্ত্রস্ত। খুঁজছেন এমন অন্তর্বাস, যা আটকাবে সে আলো। সে কেমনধারা আলো, তা অজানা,
তাই রন্টজেন নাম দিয়েছেন ‘এক্স-রে’। সে আবিষ্কারের কয়েক মাসের মধ্যে ফরাসি বিজ্ঞানী অঁরি বেকারেল পেয়েছেন আর
এক খোঁজ। ইউরেনিয়াম মৌল, যা আলো ছড়ায়। আপনাআপনি। কেন?
জানা নেই। কী সেই আলো? জানা নেই। আলো তো
এনার্জি। বিজ্ঞানের অমোঘ নিয়মে তার জমাখরচ সমান হওয়ার কথা। কিন্তু এ তো কেবলই খরচ!
বিজ্ঞান বুঝি রসাতলে।
১৬ ডিসেম্বর, ১৮৯৭। রহস্যভেদে নামলেন
মারি। সঙ্গী হলেন পিয়ের। ইউরেনিয়ামের আলো বিকিরণের নাম দিলেন ওঁরা।
রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি। আলো কেন? মারি বললেন, ওটা পরমাণুর ভেতরের খেলা। মারি-পিয়ের জানতে চান, শুধু
ইউরেনিয়ামই কি আলো ছড়ায়? না কি তেমন মৌল আছে আরও? এটা-সেটা নিয়ে পরীক্ষা। শেষে এক পদার্থ। পিচব্লেন্ডি। যা থেকে ইউরেনিয়াম
নিষ্কাশন করা হয়। কুরি দম্পতি দেখলেন, পিচব্লেন্ডি-র
রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি ইউরেনিয়ামের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ, ওই
জিনিসে লুকিয়ে আছে ইউরেনিয়াম ছাড়া অন্য কোনও মৌল, যা ছড়ায়
রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি। কী সেই মৌল? খোঁজ পেতে চলল মরিয়া
চেষ্টা। আগুন জ্বালিয়ে পেল্লায় কড়াইতে মানুষ-সমান খুন্তি নেড়ে টন-টন পিচব্লেন্ডি
গলিয়ে মৌল খোঁজা। দিন-রাত লাগাতার। পরিত্যক্ত এক ছাউনি ঘর ধোঁয়াধুলোয় অন্ধকার।
অবশেষে মিলল সেই মৌল। মারি-র মাতৃভূমির স্মরণে কুরি দম্পতি তার নাম দিলেন
পোলোনিয়াম। কয়েক মাস পরে ও-রকম আরও এক মৌল। রেডিয়াম।
১৯০৩। রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি আবিষ্কার, তার ব্যাখ্যা এবং প্রবল গবেষণার জন্য ফিজিক্সে নোবেল প্রাইজ তিন জনকে।
প্রথমে কমিটি শুধুমাত্র পিয়েরে কুরি ও অঁরি বেকেরেল (তিনিও এ গবেষণায় সাহায্য
করেছিলেন) মনোনয়ন করেছিলেন। পরে অবশ্য পিয়েরে নোবেল কমিটির কাছে জানান এর কৃতিত্ব
তার একার নয়, মেরী না থাকলে তিনি রেডিয়ামের দেখা পেতেন না।
পরে নোবেল কমিটি মেরী কুরির নাম ঘোষণা
করেন; বেকারেল, পিয়ের এবং মেরী।
পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে নোবেল কমিটির প্রেসিডেন্ট উদ্ধৃতি দিলেন বাইবেল থেকে।
সেই যে ঈশ্বর বলছেন, পুরুষের একা থাকা ভাল নয়। আমি বানিয়ে
দেব তার এক সাহায্যকারিণী। যেন সাফল্যে মারির ভূমিকা ছিল পিয়েরের সাহায্যকারিণীর,
তার বেশি নয়; ক্রুব্ধ হলেন মেরী।
১৯০৫-এর শেষ দিক থেকে পিয়ের অসুস্থ। হাড়ে হাড়ে ব্যথা।
বেশি ক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। হাতে ঘা। মেরী-ও অসুস্থ। তাঁরও অসুখ প্রায় একই
রকম। আসলে দুজনেই রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি বা তেজস্ক্রিয়তার বিষে আক্রান্ত। ওঁরা না
জেনে সমানে ঘাঁটাঘাঁটি করেছেন ইউরেনিয়াম পোলোনিয়াম রেডিয়াম। পিয়ের, যিনি বলতেন রেডিয়ামের তেজস্ক্রিয়তা ইউরেনিয়ামের চেয়ে লক্ষ গুণ বেশি,
তিনি বন্ধুদের দেখাতে রেডিয়াম বুকপকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। আর মারি?
ঘুমনোর সময় বিছানার পাশে কিছুটা রেডিয়াম-সমন্বিত যৌগ রাখতেন। যাতে
তা অন্ধকার ঘরে আলো ছড়ায়। ১৮৯৭-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত কুরি দম্পতির
তিনটে ল্যাবরেটরি নোটবুক এখনও যত্নে রাখা প্যারিসের ‘বিবলিয়োথেক
ন্যাশনাল’-এ। ওগুলো থেকে এখনও ছড়াচ্ছে তেজস্ক্রিয়তা। এতটাই
যে, আজ যদি কোনও গবেষক ওগুলো ঘাঁটতে চান, তা হলে তাঁকে মুচলেকা দিয়ে ঘোষণা করতে হয় তিনি বিপদ বুঝে কাজে নামছেন। তাই
এখন গবেষকদের ধারণা শুধু তেজস্ক্রিয়তার বিষে মারা যেতে পারতেন পিয়ের এবং মারি।
অবশ্য পরোক্ষে তাতেই মারা গেলেন পিয়ের। হাঁটছিলেন
খুঁড়িয়ে। ১৯০৬-এর ১৯-শে এপ্রিল রাস্তা পেরোতে গাড়ি চাপা। তক্ষুনি মৃত্যু। খবর
পেয়ে মেরী শোকে পাগলিনী। ডায়রিতে লিখলেন, ‘আমি ঘরে ঢুকলাম। এক জন
বলল, ও মারা গেছে। কথাটার মানে কী? পিয়ের
নেই। সেই যাকে সকালে বেরোতে দেখলাম। সে, যে সন্ধেয় ফিরে আমার
হাতটা ধরত। তার মৃতদেহ দেখব? সব শেষ হয়ে গেল? তোমার নাম ধরে বার বার ডাকছি। পিয়ের, পিয়ের, আমার পিয়ের। হায়, ডাকে তুমি সাড়া দেবে না।
...একাকিত্ব আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া যে আর কিছু রইল না আমার।’
পিয়েরের মৃত্যুর কিছুদিন পর, ১৩ মে, সাবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিয়ের-এর জন্য নির্ধারিত অধ্যাপকের চেয়ার মেরিকে
দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মেরি এই চেয়ার গ্রহণ করেন এবং তাঁর এবং তাঁর স্বপ্নের
গবেষণাগার তৈরির উদ্যোগ নেন। কিন্তু তিনি এই গবেষণাগার তৈরির কাজ শেষ করতে পারেন
নি। এই সময় প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাস্তুর ইনস্টিটিউট মেরির জন্য
তেজস্ক্রিয়তার গবেষণার জন্য রেডিয়াম ইন্সটিটিউট তৈরি করে। মেরিকে এই ইন্সটিটউটের
প্রধান করা হয়।
১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিশুদ্ধ রেডিয়াম জনসমক্ষে উপস্থাপন
করতে সক্ষম হন।
১৯১১। নোবেল কমিটির বৈঠক। মনোনীত হবে রসায়নে পুরস্কার
প্রাপক। উঠে এল মেরীর নাম। কারও কারও আপত্তি। মাত্র আট বছরের মধ্যে দু’বার
নোবেল? আপত্তি টিকল না। যুক্তি জোরদার। ব্যক্তি নয়, নোবেল দেওয়া হয় কাজকে। আগের বার পেয়েছিলেন রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি ব্যাপারটা
নিয়ে গবেষণার জন্য, এ বার দুই নতুন মৌল— পোলোনিয়াম ও রেডিয়াম আবিষ্কারের জন্য মারি পাবেন প্রাইজ।
আর ঠিক তার পরেই হইচই স্ক্যান্ডাল। কাগজে খবরে ছয়লাপ।
বিধবা মেরী কুরির প্রেমকাহিনি সবিস্তার। প্রেমিক? পিয়ের কুরির
প্রিয় ছাত্র পল লঁজভ্যাঁ। বয়সে মেরীর পাঁচ বছরের ছোট এই পুরুষটি বড় বিজ্ঞানীও
বটেন। বিবাহিত এবং চার সন্তানের বাবা লঁজভ্যাঁ দাম্পত্য জীবনে চরম অসুখী। স্ত্রী
বিশাল ধনী পরিবারের মেয়ে। উদ্ধত, কটুভাষিণী। তিনি ও মেরী
নিজেদের দুঃখ নিয়ে আলোচনা করেন। তা থেকে ঘনিষ্ঠতা। প্রেম। নিভৃতে সময় কাটাতে দুজনে
প্যারিসে এক অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া করলেন। সেখানে ঘন ঘন সাক্ষাৎ।
খবর পেয়ে পুরুষটির স্ত্রী অগ্নিশর্মা। রাস্তায় মেরীকে দেখে
হুমকি দিলেন তাঁকে খুন করবেন। আর স্বামীকে বলে দিলেন, মেরীর সংস্রব ত্যাগ না করলে প্রেমকাহিনি কাগজে ফাঁস করবেন। লোকলজ্জার ভয়ে
লঁজভ্যাঁ মেনে নিলেন স্ত্রীর নির্দেশ। নিভৃত সাক্ষাৎ বন্ধ।
তখন শুরু হল প্রেমপত্র লেখা। ১৯১০-এর জুন মাসে দুই মেয়েকে
নিয়ে এক সমুদ্রসৈকতে ছুটি কাটানোর ফাঁকে মেরী লিখলেন, ‘প্রিয় পল, গতকাল সন্ধে এবং রাত শুধু তোমার কথা
ভেবেছি। মনে পড়েছে আমাদের এক সঙ্গে সময়যাপনের স্মৃতি। যা আমার কাছে ছিল নিতান্ত
সুখের। আমি এখনও দেখতে পাচ্ছি তোমার সুন্দর এবং নরম চোখ দুটি। কেবলই ভাবছি কবে
আবার তোমার উপস্থিতির মিষ্টি মুহূর্তগুলো পাব।’ অথবা
সেপ্টেম্বর মাসে: ‘আমরা একে অন্যের প্রতি গভীর ভাবে আকৃষ্ট।
প্রয়োজন শুধু একটা সুন্দর জীবনের পরিবেশ।’ তাঁকে লেখা মেরীর
সব প্রেমপত্র লঁজভ্যাঁ রাখলেন ওই ভাড়া করা অ্যাপার্টমেন্টে। এ দিকে বেলজিয়ামের
ব্রাসেলস শহরে কনফারেন্সে আমন্ত্রিত হয়ে গেলেন মেরী এবং পল। পলের স্ত্রী গুন্ডা ভাড়া
করে তাঁদের অ্যাপার্টমেন্টের দরজা ভাঙালেন। পাওয়া গেল চিঠিগুলো। পলের স্ত্রী
ডিভোর্সের মামলা রুজু তো করলেনই, চিঠিগুলো তুলে দিলেন
মিডিয়ার হাতে। সুখাদ্য পেয়ে ট্যাবলয়েডদের জিভে জল।
শুরু হল প্রচার। বিদেশিনি দুশ্চরিত্রা এক বিধবা কিনা চার
সন্তানের জননী নিষ্পাপ এক ফরাসি রমণীর ঘর ভাঙছেন! দেশের মানুষ দেখুক, নামী ল্যাবরেটরিগুলো কেমন পরিণত হয়েছে লাম্পট্যের আখড়ায়। মেরীর বিরুদ্ধে
বিষোদ্গারে সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন জার্নালিস্ট গুস্তাভ টেরি। চরিত্রহীন বিধবার
খপ্পরে পড়া লঁজভ্যাঁ যে ফেঁসে গিয়েছেন, তা জানাতে টেরি
লিখলেন, ‘মারি আর পারবেন না স্কার্টের আড়ালে তাঁর প্রেমিককে
লুকিয়ে রাখতে।’
সহ্যের বাঁধ ভাঙল লঁজভ্যাঁর। নিতে হবে অপমানের বদলা।
ডুয়েল! পিস্তল নিয়ে দুজনে হাজির মাঠে। চার দিকে রুদ্ধশ্বাস জনতা। প্রাণ যাবে কার? গেল না কারও। প্রথমে টেরি। লঁজভ্যাঁর বুকের বদলে তিনি পিস্তল তাক করলেন
মাটির দিকে। তা দেখে বিজ্ঞানীও পিস্তল নামিয়ে রাখলেন। পর দিন টেরি কাগজে লিখলেন,
‘ফরাসি বিজ্ঞানকে এক মূল্যবান মস্তিষ্কের সেবা থেকে বঞ্চিত করতে
আমার বিবেকে বাধছিল।’ আর লঁজভ্যাঁ? তিনি
প্রাণে বাঁচায় মেরী চাইলেন যেন তাঁর ডিভোর্স তাড়াতাড়ি হয়। লঁজভ্যাঁ অরাজি।
জানালেন, নিজের সন্তানদের মাকে ছাড়তে পারবেন না তিনি। মেরী
সংস্রব ত্যাগ করলেন লঁজভ্যাঁর।
এ রকম সময় স্টকহল্ম থেকে চিঠি। লিখেছেন নোবেল কমিটির
প্রভাবশালী সদস্য সেই রসায়নবিদ, যিনি কমিটির মিটিং-এ জোর সওয়াল
করেছিলেন মেরীকে দ্বিতীয় নোবেল দেওয়ার পক্ষে। বলেছিলেন, ব্যক্তি
নয়, নোবেল দেওয়া হয় সাফল্যকে। কাগজে কাগজে প্রকাশিত লেখা
পড়ে তিনিই এ বার বিরূপ। লিখলেন, আগে সব জানলে কমিটি প্রাইজ
দিত না মেরীকে। এখন তিনি যেন প্রাইজ নিতে স্টকহল্ম না আসেন। মেরী ক্ষুব্ধ। জবাবে
লিখলেন, ‘প্রাইজ তো দেওয়া হয়েছে পোলোনিয়াম এবং রেডিয়াম আবিষ্কারকে।
আমি মনে করি আমার গবেষণা ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে কোনও সম্পর্ক থাকতে পারে না। কারও
বিরুদ্ধে কুৎসা তার গবেষণার মূল্যায়নে ছায়া ফেলুক, এ আমি
নীতিগত ভাবে মানি না।’ প্রাইজ নিতে মেরী গেলেন স্টকহল্ম। আর
হ্যাঁ, তা নেওয়ার পর বক্তৃতায় স্পষ্ট ব্যাখ্যা করলেন যে-কাজের
পুরস্কার, তার কতটা করেছেন তিনি, আর
কতটা তাঁর স্বামী।
লঁজভ্যাঁ-কিস্সায় যে কালি লাগানোর চেষ্টা হয়েছিল মেরীর
ভাবমূর্তিতে, তা মুছল কয়েক বছর পরে, যখন লাগল
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আহত ফরাসি সেনাদের চিকিৎসায় ১৮-টা ভ্যানে এক্স-রে মেশিন নিয়ে
মেরী ছুটে বেড়ালেন লড়াইয়ের ময়দানে ময়দানে। ১৯৩৪-এর ৪ জুলাই মৃত্যুর আগে মারি
দেশে-বিদেশে সেলেব্রিটি। মৃত্যু হ’ল লিউকিমিয়ায়। তেজস্ক্রিয়
পদার্থ ঘাঁটাঘাঁটির পরিণাম। এত বছর যে বেঁচে ছিলেন সেটাই বিস্ময়ের। চলে গেলেন ৬৬
বছর বয়সে। আর একটা বছর বাঁচলে দেখতে পেতেন মেয়ে আইরিন এবং জামাই ফ্রেডেরিখ পাচ্ছেন
নোবেল প্রাইজ। সেই রেডিয়োঅ্যাক্টিভিটি গবেষণারই সূত্রে!
(সংকলন – তারিণী খুড়ো)