বিপ্লবী অগ্নিকন্যা ননীবালা দেবী

দেশের স্বাধীনতা আনতে গিয়ে বহু নিঃস্বার্থ স্বাধীনতা সংগ্রামী স্বাধীনতার পরেও যোগ্য সম্মান পাননি। ইতিহাসের পাতায় স্থান হয়নি বহু সত্য ঘটনার। বহু সত্য ঘটনা চাপা পড়ে গেছে কালের অন্ধকারে। স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বহু সংগ্রামী উপেক্ষিত ও বঞ্চিত। নারীদের ক্ষেত্রে অত্যাচারের মাত্রা ছিল অন্যরকম। নির্মম অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন বহু নারী। কিন্তু সেই ইতিহাস রয়ে গেছে আড়ালে। ইতিহাসের পাতায় তাদের ঠাঁই হয়নি। এমনই এক নির্মম ও নৃশংস অত্যাচারের শিকার হয়েছিলেন বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দী ননীবালা দেবী। কিন্তু কজন জানি এই বীরাঙ্গনার কথা?

ননীবালা দেবী

১৮৮৮ সালে হাওড়ার বালিতে এক মধ্যবিত্ত ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন ননীবালা দেবী। পিতার নাম- সূর্যকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতার নাম গিরিবালা দেবী। ১৮৯৯ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে দেওয়া হয়; কিন্তু ১৯০৪ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি বিধবা হন। স্বামী মারা যাওয়ার পর তিনি পিতৃগৃহেই ফিরে আসেন। নিজের চেষ্টায় পড়াশোনা করতে চাইলে তৎকালীন পুরুষ তান্ত্রিক সমাজ বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। তবুও ননীবালা দেবী হার স্বীকার না করে লেখাপড়া করার জন্য বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নেন আড়িয়াদহ মিশনে।

বাপের বাড়ীতে ভাইপো অমরেন্দ্র চ্যাটার্জি ছিলেন নামকরা বিপ্লবী, চরমপন্থী যুগান্তর পার্টির নেতা। তিনিই তাঁকে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষা দিলেন। শুরু হল ননীবালার জীবনের এক নতুন অধ্যায়। কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠলেন বিপ্লবী গুপ্ত সমিতির একজন নির্ভরযোগ্য সক্রিয় সহযোগী। দেশকে ভালোবেসে বিপ্লবীদের হয়ে তিনি নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিতেন। নিপুণ দক্ষতায় সে কাজ সম্পন্নও করতেন। অনেক কাছের মানুষও টের পেত না যে তিনি বিপ্লবী দলের সক্রিয় সদস্য। এক জায়গার নেতাদের নির্দেশ ও নানা দরকারী খবর অন্য জায়গায় বিপ্লবীদের কাছে পৌঁছে দিয়ে বিপ্লবীদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করতেন তিনি। এমনকি সংগৃহীত অস্ত্রশস্ত্র ও গোপনে বিপ্লবীদের কাছে পৌঁছে দিতেন। সেসময় থাকতেন রিষড়ায় এক ভাড়াবাড়িতে।

১৯১৮ সালে ঘটে গেছে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভারত-জার্মান অস্ত্র ষড়যন্ত্রের ঘটনা। চারদিকে শুরু হয়েছে ব্যাপক ধরপাকড়। যুগান্তর দলের প্রধান বিপ্লবী বাঘা যতীন কাপ্তিপদায় পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা গেছেন। কলকাতাতে পুলিশি ধরপাকড়ের সময় অমরেন্দ্র চ্যাটার্জি পালিয়ে গেলেও ধরা পড়ে যান রামচন্দ্র মজুমদার। তাঁর হাতে একটি মাউজার পিস্তল এসেছিল কিন্তু তিনি সেটি কোথায় লুকিয়ে রেখেছিলেন তা কেউ জানতো না। বিপ্লবীরা পড়লেন সমস্যায়, কীভাবে সেটার খোঁজ পাওয়া যাবে? জেলে ঢুকে রামচন্দ্রের সঙ্গে দেখা করে পিস্তলের খোঁজ আনতে চললেন দুঃসাহসী সেই মহিলা। সেদিনের সমাজে যা কেউ কল্পনাও করতে পারত না তাই করলেন তিনি। হিন্দু ঘরের বিধবা মহিলা শাঁখা সিঁদুর পড়ে একগলা ঘোমটা দিয়ে রামচন্দ্রের স্ত্রী সেজে স্বামীর সঙ্গে দেখা চললেন জেলে। সবার চোখে ধুলো দিয়ে পিস্তলের সন্ধান জেনে তা জানিয়ে দিলেন বিপ্লবীদের।

পরে তৎকালীন পুলিশ জানতে পারে ননীবালা দেবী রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী নয়। পুলিশ তাঁর খোঁজ শুরু করলে চন্দননগরে বাড়ি ভাড়া করে আত্মগোপন করেন ননীবালা। নিজের বড় পিসিমাকেও নিয়ে আসেন, এবং ২-টি বাড়ি ভাড়া করে স্বদেশীদের গোপনে আশ্রয় দিয়ে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু যখন পুলিশ তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগলো তখন ননীবালা দেবী তাঁর বাল্যবন্ধুর দাদা প্রবোধ মিত্রের সাথে পেশোয়ার চলে গেলেন আত্মগোপন করতে।

প্রায় ১৫-১৬ দিন পর পুলিশ যখন ননীবালা দেবীর সন্ধান পায়, তখন ননীবালা দেবী ৩ দিনের কলেরা আক্রান্ত রোগী। ১ দিন নজরবন্দী করে রাখার পর তাঁকে স্ট্রেচারে করে পেশোয়ার জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছুদিন পরে একটু সুস্থ হলে তাঁকে স্থানান্তরিত করা হয় কাশীর জেলে।

কাশীতে আসার কয়েকদিন পরে, প্রতিদিন তাঁকে জেলগেটের অফিসে এনে কাশীর ডেপুটি পুলিস-সুপারিনটেন্ডেন্ট জিতেন ব্যানার্জী জেরা করত। ননীবালা দেবী সবই অস্বীকার করতেনবলতেন কাউকেই চেনেন না, কিছুই জানেন না। তারপর জিতেন ব্যানাজীর তুই-তুকারির অসভ্য ভাষা। ননীবালা দেবী তখনও চুপচাপ থাকতেন। একদিন দুইজন জমাদারনী (Wardress) ননীবালা দেবীকে একটা আলাদা সেলে (cell) নিয়ে গেল। দুজনে মিলে তাকে জোর করে ধরে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর সমস্ত কাপড় খুলে নিয়ে দু-বাটি লঙ্কাবাটা ওঁর শরীরের গোপনাঙ্গের ভেতরে ভরে দিলো। ননীবালা দেবী চীৎকার করে লাথি মারতে লাগলেন সমস্ত শক্তি দিয়ে। ঐ অসহ্য জ্বালা, যন্ত্রণা তিনি অসুস্থ্য শরীরে সহ্য করেছিলেন। তবুও তাঁর কাছ থেকে কোনও খবর পায়নি পুলিশ।

কাশীর জেলে মাটির নীচে একটা খুবই ছোট পানিশমেন্ট সেল ছিল। তাতে দরজা ছিল একটাই, কিন্তু আলো বাতাস প্রবেশ করবার জন্য কোনো জানালা বা সমান্য ঘুলঘুলিও ছিল না। জিতেন ব্যানার্জী তিন দিন প্রায় আধঘণ্টা সময় ধরে ননীবালা দেবীকে ওই আলো-বাতাসহীন অন্ধকার সেলে তালাবন্ধ করে আটকে রাখত। কবরের মতো সেলে আধঘণ্টা পরে দেখা যেতো ননীবালা দেবীর অর্ধমৃত অবস্থা, তবু মুখ দিয়ে স্বীকারোক্তি বের করতে পারল না। তৃতীয় দিনে বন্ধ রাখল আধঘণ্টারও বেশি, প্রায় ৪৫ মিনিট। স্নায়ুর শক্তিকে চূর্ণ করে দেবার চূড়ান্ত প্রচেষ্টা। সেদিন তালা খুলে দেখা গেল ননীবালা দেবী পড়ে আছেন মাটিতে, জ্ঞানশূন্য।

হাল ছেড়ে দিয়ে পুলিস ননীবালা দেবীকে কাশী থেকে নিয়ে এল কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেলে। ১৮১৮ সালের তিন নম্বর রেগুলেশনের ধারা প্রয়োগ হল তাঁর বিরুদ্ধে, ভারতের প্রথম মহিলা রাজবন্দিনী হিসাবে প্রেসিডেন্সি জেলে এলেন তিনি। সেখানে গিয়ে তিনি খাওয়া বন্ধ করে দিলেন। জেল-কর্তৃপক্ষ, এমনকি জেলা-ম্যাজিস্ট্রেটও তাঁকে অনুরোধ করে খাওয়াতে পারলেন না। ননীবালা দেবী বললেন, বাইরে গেলে খাবেন। প্রতিদিন সকাল ৯টায় নিয়ে যেত তাঁকে গোয়েন্দা-আফিসে, সেখানে আই.বি. পুলিসের স্পেশাল সুপারিনটেন্ডেন্ট গোল্ডি (Goldie) তাঁকে জেরা করত।

একদিন এভাবেই জেরার সময়, গোল্ডি তাঁকে বললেন, “আপনাকে এখানেই থাকতে হবে, সুতরাং বলুন কি করলে খাবে?

- যা চাইবো তাই করবেন ?

- হ্যাঁ।

- আমাকে বাগবাজারে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের স্ত্রী সারদা মায়ের কাছে রেখে দিন, তাহলে খাবো।

- আপনি দরখাস্ত লিখে দিন।

ননীবালা দেবী তৎক্ষণাৎ দরখাস্ত লিখে দিলে, গোল্ডি সাহেব সেটা ছিঁড়ে কাগজ ছেঁড়ার ঝুড়িতে ফেলে দেয়। আহত বাঘিনীর মত লাফিয়ে উঠে ননীবালা দেবী এক চড় কষালেন গোল্ডির মুখে। ক্ষিপ্ত সিংহীর মত গর্জে উঠে বললেন- আমাদের দেশের মানুষের কি মান-সম্মান থাকতে নেই? ছিঁড়েই যদি ফেলবে, তাহলে আমায় দরখাস্ত লিখতে বলেছিলে কেনো” ? পরের চড়টি বসানোর আগেই অন্য পুলিশরা তাঁকে আটকে দেয়।

জেলের মধ্যেও তিনি অনেকের উপকার করেছেন। এরকমই একদিন তিনি জানতে পারলেন আরও এক বিপ্লবী অগ্নিকন্যা দুকড়িবালা দেবীর প্রতি পুলিশের অত্যাচারের কথা। সেকালের ভারতের অস্ত্র আইনে সাজা প্রাপ্ত প্রথম মহিলা বন্দীছিলেন সিউড়ির দুকড়িবালা দেবী। ননীবালা দেবী বুদ্ধি করে তাঁকে বাঁচালেন ।

ননীবালা দেবীর অনশনের ১৯-২০ দিনের মাথায় ম্যাজিস্ট্রেট এসে তাঁকে অনশন প্রত্যাহারের কথা বলতেই তিনি বললেন, “আমার ইচ্ছেমতো ব্যবস্থা হবে?

- হ্যাঁ, হবে। কথা দিচ্ছি ।

- তাহলে আমার রান্না করবার জন্য ১ জন ব্রাহ্মণ কন্যা ও ২ জন ঝি চাই ।

- ব্রাহ্মণ কন্যা কেউ আছেন নাকি এখানে ?

- আছেন, দুকড়িবালা দেবী ।

- তাই হবে ।

এরপর নতুন বাসনপত্র এনে রান্না হলে, ২১ দিনের পর ভাত খেয়েছিলেন সেকালের বাল্য বিধবা অসাধারণ দৃঢ়চেতা নারী ননীবালা দেবী, সাথে দুকড়িবালা দেবীকেও বাঁচিয়েছিলেন অমানুষিক পরিশ্রমের হাত থেকে ।

দুই বছর এইভাবে বন্দীজীবন কাটিয়ে দিলেন তিনি। ১৯১৯ সালের এক দিন ননীবালা দেবীর মুক্তির আদেশ এলো। জেল থেকে ফিরে এসে বালিতে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে তিনি ঠাই পেলেন না। তখন উত্তর কলকাতার এক বস্তিতে তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়। সুতো কেটে, রান্নার কাজ করে কোনমতে আধপেটা খেয়ে তাঁর দিন কাটতে থাকে। সমাজ এবং নিজের আত্মীয়-স্বজনদের ওপর রাগে, দুঃখে, অপমানে তিনি সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। নিজেকে একপ্রকার লুকিয়ে রাখলেন, এমনকি পরবর্তীকালের কোনও দেশনেতাদের কাছেও গেলেন না।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ২০ বছর পর ১৯৬৭ সালের মে মাসে তাঁর মৃত্যু হয়। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, দেশের স্বাধীনতার জন্য যিনি এভাবে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন, না, ইতিহাসের পাতা এমন মানুষের জন্মদিন বা মৃত্যুদিন মনে রাখেনি। কেউ মনে রাখেনি তাঁর আত্মত্যাগের কথা।

(তারিণী খুড়ো)

1 মন্তব্যসমূহ

নবীনতর পূর্বতন