ভুলে যাওয়া অগ্নিযুগের অগ্নিকন্যা বীণা দাস

সময়টা ১৯৮৬ সালের ২৬-শে ডিসেম্বর। হরিদ্বারে গঙ্গার ঘাটে এক নির্জন স্থানে এক বেওয়ারিশ লাশ দেখা যায়। লোক্যাল মানুষেরা কেউ তাকে চেনে না। পুলিশ গিয়ে সেই লাশ উদ্ধার করলো। পুলিশ দেখলো লাশটি এক মহিলার। বয়েস আনুমানিক সত্তর। তাঁর কাপড় পরার ধরণ দেখে পুলিশের মনে হল মহিলা সম্ভবত বাঙালি। শরীরে কোন অলংকার নেই। লোক্যাল পেপারে মহিলার মুখের ছবি ছাপা হল। পেপারের খবরটা নজরে এলো যাদবপুরের প্রাক্তন ভিসি ডঃ ত্রিগুণা সেনের। তিনি তখন কনখলে আনন্দময়ী মায়ের আশ্রম রয়েছেন। ডঃ ত্রিগুণা সেন ফোন করলেন তাঁর এক ছাত্রকে হৃষীকেশে। সেই ছাত্রের কাছে সংবাদের সত্যতা যাচাই করে ছুটে এলেন নিজে, হৃষীকেশে। পুলিশ মর্গে গিয়ে দেখলেন কীভাবে নিশ্চিন্তে 'ঘুমের দেশে' চলে গেছেন এক বীরাঙ্গনা যিনি একদিন বাংলার ছোটলাটকে সেনেট হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে গুলি চালিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। যিনি ছিলেন বাঙালির শ্রেষ্ঠ বীর ও দেশপ্রেমিক সুভাষচন্দ্রের জীবনে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে পরিচিত বেণীমাধব দাসের কন্যা। যিনি কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন নীতিগত কারণে। অথচ যিনি বহু চেষ্টা করেও আইনের বজ্রআঁটুনির জন্যে নিজের প্রাপ্য পেনশান আদায় করতে পারেননি সরকারের থেকে। বঞ্চিত হয়েছিলেন ন্যায্য অধিকার থেকে।

বীণা দাস

অনাদরে, অসম্মানে যাকে এভাবে মৃত্যবরণ করতে হয়েছিল, যাকে বঞ্চিত করা হয়েছিল তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে সেই বীণা দাস-এর জীবনকাহিনী সমগ্র বাঙালি জাতির কাছে এক চরম লজ্জার, কিন্তু হয়তবা তাঁকে জানার মধ্যে দিয়ে তাঁর প্রতি হওয়া সমস্ত অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত করার একটা প্রয়াসও।

১৯১১ সালে ২৪শে আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন বীণা দাস। তাঁদের আদি বাড়ি ছিল চট্টগ্রামে। তাঁর বাবা ছিলেন ব্রাহ্মসমাজী পণ্ডিত ও দেশপ্রেমিক বেণীমাধব দাস এবং মা ছিলেন সরলা দাস। তাঁর দিদি ছিলেন বিপ্লবী কল্যাণী দাস। পিতার আদর্শে প্রভাবিত হয়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। ছোটবেলা থেকে তিনি ছিলেন শান্ত প্রকৃতির। সংবেদনশীল কবি ও দার্শনিক মনের অধিকারী বীণা দাস সময়ের উত্তাল হাওয়ায় পরিণত হন অগ্নিকন্যায়, দীক্ষিত হন বিপ্লবী মন্ত্রে।

বীণা দাসের চার বছরের বড় দিদি কল্যাণী দাস ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ছিলেন। তিনি ছিলেন কলকাতা ছাত্রী সংঘের একজন নিষ্ঠাবান সংগঠক। বিপ্লবীদের বিভিন্ন গোপন সভায় তিনি যোগ দিতেন। এমনই এক গোপন সভার লিফলেট বহন করার দায়ে ব্রিটিশ আদালত তাঁকে কারাদণ্ড প্রদান করে। উচ্চশিক্ষিতা কল্যাণী দাস অনার্স গ্রাজুয়েট হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে কারাগারে তৃতীয় শ্রেণীর বন্দী করে রাখা হয়। এক স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়ে সেই কারাবাসের অবর্ণনীয় কষ্ট খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করেন কল্যাণী দাসের ছোট বোন বীণা দাস। দিদির এই আত্মত্যাগ তাঁকে চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞায় শাণিত করে, অনুপ্রাণিত করে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে।

বেথুন ও ডায়সেশন কলেজ থেকে বীণা স্নাতক হন ১৯৩১ সালে। ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে যখন বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়েছিল বীণা তখন বেথুন কলেজের ছাত্রী। তিনি অন্যান্য কর্মীদের সঙ্গে কমিশন বয়কট ও বেথুন কলেজে পিকেটিং করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছিলেন। ওই বছরই কলকাতা কংগ্রেসের অধিবেশনে তিনি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন এবং ধীরে ধীরে তিনি গান্ধীজির অহিংস আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু ব্রিটিশ শাসন-শোষণের উপর ক্রমশ জমে ওঠা প্রচণ্ড ক্ষোভ ও বিপ্লবী আন্দোলনের অগ্নিচ্ছটার সংস্পর্শে গান্ধীজির অহিংস মতবাদের থেকে সরে এসে শেষ পর্যন্ত বৈপ্লবিক পন্থাকেই বেছে নেন তিনি।

১৯৩২ সালে বীণা দাস তাঁর জীবনের সবচাইতে দুঃসাহসিক কাজ করার জন্য মনস্থির করে ফেলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে গুলি করে হত্যা করার। স্ট্যানলি জ্যাকসন ছিলেন একসময়ের ইংল্যাণ্ড ক্রিকেট দলের অধিনায়ক, যিনি ২০টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন এবং ৫-টিতে অধিনায়কত্ব করেন। পরবর্তীতে কনজারভেটিভ পার্টির হয়ে নির্বাচন করে ১৯১৫ সাল থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। জ্যাকসনকে হত্যার এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের কারণ বীণা দাস তাঁর জবানবন্দীতে এভাবে ব্যাখ্যা করেন-

“I have no sort of personal feelings against Sir Stanley Jackson, the man and Lady Jackson, the woman. But the governor of Bengal represents the system of repression which has kept enslaved 300 millions of my countrymen and countrywomen.”

এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বীণা দাস সাহায্য নেন তাঁর দিদি কল্যাণীর বান্ধবী কমলা দাসগুপ্তের। কমলা দাসগুপ্ত যুগান্তরদলের সাথে যুক্ত ছিলেন। বীণা দাস যুগান্তরের সদস্য না হলেও তাঁর সংকল্প এবং দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় মুগ্ধ হয়ে কমলা দাসগুপ্ত তাঁকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দেন। ২৮০ টাকা দামের একটি চোরাই রিভলবার সহযোদ্ধা সুধীর দত্তের কাছ থেকে জোগাড় করেন বীণা দাসের প্রিয় কমলাদি। কমলাদি শাড়ির ভেতর রিভলবারটি লুকিয়ে উত্তর কলকাতার রামমোহন রায়গ্রন্থাগারে নিয়ে আসেন। সেখানে তিনি বীণাকে রিভলবার চালানোর কৌশল শেখান। কিন্তু স্থানাভাবে বীণা তখন আর টার্গেট প্র্যাকটিস করার সুযোগ পান নি। ইতিমধ্যে বীণা অবশ্য দীনেশ মজুমদারের কাছে শারীরিক শিক্ষার প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।

১৯৩২ সালের ৬-ই ফেব্রুয়ারি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েল সমাবর্তন অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসন। অনুষ্ঠান চলাকালীন গভর্নর যখন বক্তব্য শুরু করছেন, তখন গাউনপরা বিশ-একুশ বছরের এক মেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে মঞ্চের দিকে অগ্রসর হয়ে গুলি চালায় জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে। আত্মরক্ষার্থে স্টানলি জ্যাকসন মাটিতে পড়ে যান। গুলি অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। গভর্নর ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা তৎক্ষণাৎ দৌড়ে নিরাপদ স্থানে চলে যান। সেসময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দ্দীর পিতা কর্ণেল হাসান সোহরাওয়ার্দ্দী ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তিনি দ্রুত বীণা দাসের হাত থেকে রিভলবারটি কেড়ে নেন। ততক্ষণে বীণার রিভলবার থেকে ৫টি গুলি বেরিয়ে গেছে।

বীণাকে গ্রেফতার করা হল। টানা ৪৮ ঘন্টা বিরতিহীনভাবে চলল জিজ্ঞাসাবাদ। রিভলবারের উৎস জানতে বীণার ওপর চালানো হল নির্যাতন। বীণা মুখ খুললেন না। বীণাকে মুখ খুলতে বলার জন্য তার বাবা বেণীমাধবকে বলা হল। বেণীমাধব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন সেই প্রস্তাব। সেসময় বীণাকে সাহস যোগাতে বৃটিশ শাসন-শোষণের প্রতিবাদে তিনি রাত জেগে লেখেন ২৫ পৃষ্ঠার একটি বিবৃতি। উজ্জীবিত বীণা দাস আদালতে দাঁড়িয়ে নির্ভীকচিত্তে গভর্নরের উপর হামলার সকল দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে জবানবন্দী দিলেন। ইংরেজির ছাত্রী বীণা স্পষ্ট ইংরেজিতে শুরু করলেন এভাবে- “I confess that I fired at the Governor on the last Convocation Day at the Senate House.” (আমিই সমাবর্তনের দিনে সিনেট ভবনে গভর্নরকে গুলি করেছি)। এরপর সংক্ষিপ্ত অথচ ভীষণভাবে সম্পূর্ণ এক বক্তব্যে তিনি তুলে ধরেন ব্রিটিশ শাসকদের অত্যাচারের কথা, ব্যাখ্যা করলেন কেন তিনি গভর্নরকে হত্যা করতে সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বললেন, “আমার উদ্দেশ্য ছিল মৃত্যুবরণ করা, এবং যদি আমাকে মরতে হত, আমি চেয়েছিলাম মহান মৃত্যু...এই ভারতবর্ষে এই পরিমাণ অন্যায়, অত্যাচার এবং বিদেশি শোষণের মধ্যে গুমরে কাঁদার চাইতে সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে প্রতিবাদ করে জীবন বিসর্জন দেওয়া কি অধিকতর ভালো নয়?”

১৫-ই ফেব্রুয়ারি একতরফা বিচারে বীণা দাসের ৯ বছরের কারাদণ্ড দেয় আদালত। এই সময় আদালতে বীণা দাসের শিক্ষিকা সিস্টার ডারোথি কাঁদতে কাঁদতে বীণাকে বলেন, “Ô Bina, I love you so much. How could you do this?” বিপ্লবী বীণা দাসের তৎক্ষণাৎ প্রতিউত্তর, “ÔSister, I love you no less. But, I love my country more.” বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলে স্থানান্তরিত হয়ে থাকার পর গান্ধীজির প্রচেষ্টায় অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীর সঙ্গে বীণাও মুক্তি পান। সাত বছর জেলে কাটিয়ে ১৯৩৯-এ তিনি মুক্তিলাভ করেন।

জেল থেকে মুক্তির পর বীণা থেমে থাকেননি। সেসময় বিপ্লবীদের অনেকে, বিশেষত তরুণেরা, গোপন সশস্ত্র সংগ্রামের পথ ছেড়ে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পথ বেছে নেন। মহাত্মা গান্ধী যখন সত্যাগ্রহ আন্দোলন করছিলেন, তখন সারা দেশে তা বিপুল সাড়া পায়। সেসময়েই আরও অনেকের মত বীণা দাসও কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ট্রেড ইউনিয়নের কাজ আরম্ভ করেন। তিনি দক্ষিণ কলকাতা জেলা কংগ্রেস কমিটির সম্পাদিকাও ছিলেন। টালিগঞ্জের চালকল বস্তিতে গিয়ে বস্তিবাসী দরিদ্র শ্রমিকদের সঙ্গে দিনের পর দিন মিশে তাদের চরম দুর্গতিতে পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি। এর পাশাপাশি সেসময় বীণা দাসের সাহিত্যপ্রতিভা ও দেশাত্মবোধক চিন্তার প্রকাশ পাওয়া যায় কমলা দাস গুপ্ত সম্পাদিত মন্দিরাপত্রিকায়।

১৯৪২-এ ভারত ছাড়োআন্দোলন শুরু হলে বীণা দাস দক্ষিণ কলকাতা কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সভা ডাকলেন হাজরা পার্কে। সভাকে বেআইনি ঘোষণা করা হল। সেখানে একজন সহকর্মীকে সার্জেন্ট ব্যাটন দিয়ে প্রহার শুরু করতেই বীণা তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। পুলিশ আবারও বীণাকে গ্রেফতার করে। এবারে তিনি রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে প্রেসিডেন্সি জেলে তিন বছর আটক থাকেন। এই দফায় ১৯৪৫-এ তিনি মুক্তিলাভ করেন। স্বাধীনতার পর তিনি কংগ্রেসের হয়ে নির্বাচন করে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য ছিলেন। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তার প্রভাব বীণা দাসকে ধীরে ধীরে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। বীণা দাসের স্বামী ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ যতীশ ভৌমিক। স্বামীর মৃত্যুর পর বীণা দেবী আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে যান রাজনীতি থেকে এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান।

১৯৬০ সালে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত হন বীণা দাস ভৌমিক। কিন্তু ভারত সরকারের কাছ থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে কোনওরকম পেনশন নিতে অস্বীকার করেন। বলেছিলেন 'দেশসেবার কোনও পেনশন হয় না।‘শৃঙ্খল ঝঙ্কার' এবং ‘পিতৃদান’ তাঁর দুটি আত্মজীবনী।

দক্ষিণ কোলকাতায় এক স্কুলে তৎকালীন এক কংগ্রেস মন্ত্রীর তদ্বিরে বীণা দাস-এর চাকরি জোটে। অবসর নেওয়ার পরে পেনশন-এর জন্য এদোর থেকে ওদোর, কম ঘোরেননি, কিন্তু তাঁকে বলা হয়, “আপনার সার্ভিস বুকে আপনার কোয়ালিফিকেশানের কোন উল্লেখ নেই। আপনি যে বি এ পাশ করেছেন তার প্রমাণ কোথায়? আপনাকে স্কুল কমিটি সিলেক্ট করেছিল কমপ্যাশানাট গ্রাউন্ডে। সার্ভিস বুকে শুধু লেখা রয়েছে, - সী হ্যাস বীন সিলেক্টেড অন দ্য রেকমেনডেশান অব এ সিনিয়র ক্যাবিনেট মিনিস্টার এন্ড দ্যা স্কুল কমিটি হ্যাজ বীন কমপেলড টু রিক্রুট হার অন কমপ্যাশানেট গ্রাউন্ড দ্যাট সি ওয়াজ এ ফ্রীডাম ফাইটার এন্ড হ্যাড বীন ইন জেল ফর এ সেভারেল লঙ ইয়ার্স।”

তাঁর মনে পরে গেলো, বি এ পাশ করার পর একটা চোথা কাগজ পেয়েছিলেন বটে যেটাকে মার্কশিট বলে। কিন্তু সেটাই বা কোথায়? ১৯৩১ সালে বি এ পাশ করলেন ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে। পরের বছরে হল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসব। সেই সমাবর্তনে তাঁর সারফিকেট পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হল কৈ? সেদিনই তো সেই ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে গুলি করে হত্যা করার প্রয়াসের কারণে পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করলো। তারপর দীর্ঘ কারাবাস। কারাবাস থেকে বাড়ি ফিরে এসে দেখলেন পুলিশ ঘরে ঢুকে তাঁর বইপত্র সবকিছু তছনছ করে চলে গেছে। অনেক খুঁজেও পাওয়া গেলো না তাঁর সেই মার্কশিট। এই সারটিফিকেটের জন্যে তিনি বহুবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে রেজাল্ট সেকশানে তদ্বির করেছেন। শেষে একজন এসিস্ট্যান্ট কন্ট্রোলার অনেক ফাইল ঘেঁটে-ঘুটে তাঁকে শেষে বলেছিলেন, 'আপনার সম্পর্কে সে সময় সিনেটে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল তা বর্তমান সিনেট কনডোন করে আপনাকে সার্টিফিকেট দেওয়ার সুপারিশ না করা পর্যন্ত আপনাকে কোন সারটিফিকেট দেওয়া যাবে না।'

অনেক চেষ্টা করে বৃদ্ধা একবার ভাইস চ্যান্সেলারের সাথে গিয়েও দেখা করেছিলেন। ভি সি যদিও খুব ভদ্র ব্যবহার করেছিলেন কিন্তু তিনিও তাঁকে সেই একই কথা বলেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রুলস অনুযায়ী সিনেটের পারমিশান ছাড়া কাউকে সারটিফিকেট দেওয়ার কোন প্রভিশান নেই।

দোরে দোরে ঘুরেও সমস্যার কোন সুরাহা হল না। উপরন্তু যারা তাঁকে কর্মসূত্রে চেনে বা জানে তারা আড়ালে-আবডালে বলতে লাগলো, মন্ত্রীর সুপারিশে কোন সার্টিফিকেট ছাড়া এতো বছর চাকরি করেও ক্ষিদে মেটেনি। এখন আবার পেনশনের জন্যে বুড়ি তদ্বির করতে শুরু করেছেন এখানে ওখানে। একদিন কথাটা কানে গেলো বৃদ্ধার। তাঁর স্বামীও গত হয়েছেন ততদিনে। নিঃসন্তান, সহায়সম্বলহীন বৃদ্ধার দু-চোখে তখন শুধু অন্ধকার। মনে করে দেখলেন, যেদিন তিনি কলকাতা ইউনিভারসিটির সারটিফিকেটের পরোয়া না করে শহিদ বিনয় বসুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ইউনিভারসিটির চ্যান্সেলর স্টানলি জ্যাকসনের দিকে তাক করে রিভলবার চালিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন সেদিন কিন্তু তাঁর দু-চোখে একটুও অন্ধকার ছিল না। ছিল শুধু স্বপ্ন! সে স্বপ্ন হল একদিন না একদিন দেশ স্বাধীন হবেই হবে। সে সব কোন যুগের কথা। আর কেই বা সেসব কথা মনে রেখেছে?

হতাশায় নিমজ্জিত, আশাহীন বৃদ্ধা চোখের জল ফেলতে ফেলতে একদিন মনের দুঃখে চলে গেলেন হরিদ্বারে। তারপর হরিদ্বার থেকে একদিন এলেন হৃষীকেশে। কবে গেলেন হরিদ্বার আর কবেই বা এলেন হৃষীকেশে। হৃষীকেশে কার কাছে গেলেন তিনি? কে তাঁকে আশ্রয় দিল? হয়তো দেখা যাবে কোন আশ্রমে সকালে ও সন্ধ্যায় অনাথ ভিখিরিদের সাথে পাত-পেরে তিনিও বসে গেছেন দুটো অন্নের লোভে! মানুষের পেটের দায় যে বড় বেশি!  

কখন যে তিনি হরিদ্বার চলে গিয়েছিলেন তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেন না। ইংরেজদের ত্রাস অগ্নিকন্যার প্রস্থান হল অজ্ঞাতে-নিভৃতে। অথচ, আমরা কজনই বা মনে রেখেছি অগ্নিযুগের এই অগ্নিকন্যার কথা? এদেশে, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিগর্ভ হতে উঠে আসা বিপ্লবীদের আমরা তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিচিত করে তুলতে পারি নি- তাঁদেরকে অনুপ্রেরণার উৎসমূল হিসেবে প্রোথিত করতে পারি নি আমাদের হৃদয়ে, মস্তিষ্কে, চিন্তন-মননে।

বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিপ্লবীরা- যারা বিনির্মাণ করবেন আগামীর ইতিহাস, রচনা করবেন আরও অনেক বীরত্বগাথা- তাঁরা বীণা দাসকে গ্রহণ করতে পারেন প্রেরণার এক অফুরন্ত উৎসধারা হিসেবে। প্রেরণার সেই উৎসমূল হিসেবে বীণা দাস অমর-অক্ষয় হয়ে থাকুক মহাকালের শিলালিপিতে।

(তারিণী খুড়ো)

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন