হ্যালডেন - বিজ্ঞানের ডিগ্রি না থাকা মহান বিজ্ঞানী

কলকাতার বুকে সাপের মতো ছড়িয়ে আছে কত না রাস্তা! আর এক একটা রাস্তার এক এক নাম, যাদের বেশীরভাগই মানুষের নামে। তপসিয়ার ওপর দিয়েই চলে গেছে এইরকম একটা রাস্তা। নাম, জে বি এস হ্যালডেন অ্যাভিনিউ। এই হ্যালডেন কে? গোটা বিশ্ব তাঁর পরিচয় জানলেও, আফসোসের কথা এই যে, কলকাতার খুব মুষ্টিমেয় লোকই শুনেছেন হ্যালডেনের নাম। পরিচিত হয়েছেন তাঁর কাজের সঙ্গে। এ লোকটার সম্পর্কে একবার জানতে শুরু করলে দুমিনিট বাদে বাদে মনে হয় – ‘ফ্যাসিনেটিং

জে বি এস হ্যালডেন
জন বার্ডন স্যান্ডারসন হ্যালডেন। ব্রিটিশ। ধমনীতে রীতিমতো নীলরক্ত। নিজের সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে বলেছিলেন, যদি বিজ্ঞানের আঙিনা থেকে ছুটি চাই তবে আমি গিয়ে সমর সাংবাদিকতায় নাম লেখাতে পারি, বাচ্চাদের জন্য গল্প লিখতে পারি, অথবা রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতেও পারি।’ হ্যালডেন কম করে আধডজন কাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন। গণিতবিদ হলেও চলত। স্ট্যাটিসটিকস তাঁর গবেষণার অন্যতম উপকরণ ছিল। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার নিরিখে তিনি ছাপ্পা-মারা লাতিন-গ্রিক ইত্যাদি প্রাচীন সাহিত্যবিশারদ। প্রথম সারির বিজ্ঞান গবেষণা করেছেন আজীবন, কিন্তু বিজ্ঞানে তাঁর কোনও ডিগ্রি ছিল না। ছিল লাতিন-গ্রিক সাহিত্যে।

জীবনের শেষ সাত বছর ভারতে কলকাতায় আর ভুবনেশ্বরে কাটিয়েছিলেন। পায়জামা আর খদ্দরের পাঞ্জাবি পরতেন, এক বঙ্গসন্তানের কাছে বাংলা শিখতেন নিয়ম করে। শেষ জীবনে খেতেন নিরামিষ।

এহেন মানুষটি সম্বন্ধে আলোকপাত করতেই এই নিবন্ধের অবতারণা।

১৮৯২ সালের ৫-ই নভেম্বর ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড এ জন্মগ্রহণ করেন জন হ্যালডেন। তাঁর বাবা জন স্কট হ্যালডেন ছিলেন একজন শারীরবৃত্তবিদ, বিজ্ঞানী, দার্শনিক। তাঁর মা লুইসা ক্যাথলিন ট্রটার ছিলেন রক্ষণশীল পার্টির নেত্রী। হ্যালডেনের বাবা, জন স্কট নিজেকে শারীরবৃত্তীয় বিজ্ঞানের নানারকম বিপজ্জনক পরীক্ষার সাবজেক্ট করতে ভালোবাসতেন। নিজের পুত্র, জেবিএস-কেও টেনে আনতেন তার মধ্যে।

তিনি তিন বছর বয়সে লিখতে পড়তে শিখেছিলেন। চার বছর বয়সে, তার কপালে আঘাত লেগে রক্তপাতের পরে ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "এটা কি অক্সিহিমোগ্লোবিন নাকি কার্বক্সিহিমোগ্লোবিন?" আট বছর বয়স থেকে তিনি তার বাবার সাথে তাদের বাড়ির পরীক্ষাগারে বিভিন্ন পরীক্ষানিরীক্ষার কাজ নিজেকে লিপ্ত রাখতেন। যার মধ্যে বেশ কিছু পরীক্ষায় প্রাণসংশয়-এর অবকাশ অবধি ছিল।

১৮৯৭ সালে অক্সফোর্ড প্রিপারেটরি স্কুলে (বর্তমানে ড্রাগন স্কুল) তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়; এখান থেকে “ফার্স্ট স্কলারশিপ” অর্জন করে ইটন-এ পড়ার সুযোগ পান। ১৯০৫ সালে তিনি ইটনে যোগ দেন। এখানে তিনি অহংকারী হওয়ার অভিযোগে সিনিয়র ছাত্রদের কাছ থেকে গুরুতর নির্যাতনের সম্মুখীন হন। অবশ্য এহেন বাধা ও নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েও স্কুলের ক্যাপ্টেন হওয়া থেকে তাঁকে কেউ আটকাতে পারেনি। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা তাঁর মধ্যে ইংরেজি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি চিরস্থায়ী বিদ্বেষের জন্ম দেয়।

১৯০৬ সালে তাঁর পিতার একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণামূলক পরীক্ষায় স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণ করেছিলেন; পরীক্ষাটি ছিলো, মানুষের মধ্যে ডিকম্প্রেশন (উচ্চ চাপ থেকে মুক্তি) এর প্রভাবগুলি কি সেটা অধ্যয়ন করা। ১৯০৬ সালের জুলাই মাসে, স্কটল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত রোথেস-এ এইচএমএস স্প্যাঙ্কারে চড়ে, তরুণ হ্যালডেন পরীক্ষামূলক ডাইভিং স্যুট নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে ঝাঁপ দেন এবং কোনক্রমে বেঁচে ফেরেন। এই গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও অভিজ্ঞতা হ্যালডেনের ডিকম্প্রেশন মডেল নামে একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

হ্যালডেন অক্সফোর্ডের নিউ কলেজে গণিত এবং ক্লাসিক অধ্যয়ন করেন এবং ১৯১২ সালে ‘ম্যাথামেটিকাল মডারেশন’ বিষয়ে প্রথম-শ্রেণীর স্নাতক সম্মান অর্জন করেন। সেই বছরেই তিনি জেনেটিক্স গবেষণায় নিমগ্ন হয়ে পড়েন এবং “গ্রীষ্মে মেরুদণ্ডী প্রাণীদের জিন সংযোগ”-এর উপর একটি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। তার প্রথম প্রযুক্তিগত গবেষণাপত্র, হিমোগ্লোবিন ফাংশনের উপর একটি ৩০-পৃষ্ঠার দীর্ঘ নিবন্ধ, সেই বছরই তার পিতার সাথে সহ-লেখক হিসাবে প্রকাশিত হয়।

হ্যালডেন তার শিক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তিনি ‘গ্রেটস’ নামক একটি ভিন্নধারার বিষয় গ্রহণ করেন এবং ১৯১৪ সালে প্রথম শ্রেণীর সম্মানে স্নাতক হন। ‘গ্রেটস’ আদপে Literae humaniores-এর সংক্ষিপ্ত নাম; অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসিকস (প্রাচীন রোম, প্রাচীন গ্রীস, ল্যাটিন, প্রাচীন গ্রীক, এবং দর্শন) –এর উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখা একটি স্নাতক কোর্স এটি।

যদিও তার ইচ্ছে ছিল শরীরবিদ্যা (ফিজিওলজি) অধ্যয়ন করার, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে সেই ইচ্ছে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। জীববিজ্ঞানে তার একমাত্র আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল মেরুদণ্ডী প্রাণীর শারীরবৃত্তির একটি অসম্পূর্ণ কোর্স।

১৯১৪ সালের ১৫-ই আগস্ট হ্যালডেন স্বেচ্ছায় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং ব্ল্যাক ওয়াচের (রয়্যাল হাইল্যান্ড রেজিমেন্ট) তৃতীয় ব্যাটালিয়নে অস্থায়ী দ্বিতীয় লেফটেন্যান্ট হিসেবে নিয়োগ পান। শত্রুর পরিখায় হাত বোমা মারার জন্য নিজ দলকে নেতৃত্ব দানের জন্য তাঁকে ট্রেঞ্চ মর্টার অফিসার হিসাবে নিযুক্ত করা হয়। ১৯১৫ সালের ১৮-ফেব্রুয়ারি তিনি অস্থায়ী লেফটেন্যান্ট এবং ১৮-ই অক্টোবর অস্থায়ী অধিনায়ক পদে উন্নীত হন।

ফ্রান্সে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর হয়ে কাজ করার সময়, তিনি একটি আর্টিলারি ফায়ারে আহত হন এবং তাঁকে স্কটল্যান্ডে ফেরত পাঠানো হয়। সেখানে তিনি ব্ল্যাক ওয়াচ রিক্রুটদের জন্য গ্রেনেডের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৬ সালে, তিনি মেসোপটেমিয়া (ইরাক) যুদ্ধে যোগ দেন যেখানে একটি শত্রু বোমা তাকে গুরুতর আহত করে। তাঁকে যুদ্ধের ফ্রন্ট থেকে মুক্তি দিয়ে ভারতে পাঠানো হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ না হওয়া অবধি তিনি ভারতেই অবস্থান করেন। ১৯১৯ সালে ইংল্যান্ডে ফেরেন এবং ১-লা এপ্রিল ১৯২০-তে তার অধিনায়কত্ব বজায় রেখে কমিশন ত্যাগ করেন।

১৯১৯  থেকে ১৯২২, এই সময়কালে তিনি অক্সফোর্ডের নিউ কলেজ, ফেলো হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি শারীরবিদ্যা এবং জেনেটিক্সে পড়ান এবং গবেষণা করেন; এই দুটি বিষয়ের কোনোটিতেই তাঁর কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। এই সময়েই তিনি শ্বাস-প্রশ্বাসের শরীরবিদ্যা এবং জেনেটিক্সের উপরে ছয়টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন।

১৯২৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োকেমিস্ট্রিতে নব্য গঠিত ‘রিডারশিপ’ পদ গ্রহণ করে সেখানে চলে যান এবং ১৯৩২ সাল অবধি সেখানেই পড়ান। কেমব্রিজে তার নয় বছর সময়কালে, তিনি এনজাইম এবং জেনেটিক্স, বিশেষ করে জেনেটিক্সের গাণিতিক দিক নিয়ে কাজ করেন। ১৯৩২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর হিসাবে কাজ করার সময়, তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন।

বিজ্ঞানী হিসেবেও হ্যালডেনকে কোনও একটা বিশেষ ক্ষেত্রে একটা বিশেষ ধারার গবেষক বলে দাগিয়ে দেওয়া খুব মুশকিল। অজস্র বিষয়ে কাজ করেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লেগে থাকেননি, এগিয়ে গিয়েছেন অন্য বিষয়ের দিকে। ডারউইনের বিবর্তনবাদকে গণিতের কাঠামোয় প্রথম যাঁরা গেঁথেছিলেন তাঁদের অন্যতম এই হলডেন। বিজ্ঞানক্ষেত্রে কোনও একটা কারণে তাঁকে মনে রাখতে হলে এই একটা বিষয়ের কথাই তুলতে হবে। পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি হল কীভাবে? এই প্রশ্নে আলেকজান্ডার ওপারিন-এর সঙ্গে একযোগে প্রস্তাবিত তাঁর তত্ত্ব খুব সাড়া ফেলেছিল। তাঁরা বলেছিলেন বিশেষ রাসায়নিক সমৃদ্ধ কোনও জলাধারে সম্ভবত জীবনের প্রয়োজনীয় অণুগুলো জন্ম নিয়েছিল। কিন্তু সেই ধারার গবেষণায় তিনি আর মন দেননি। ওপারিন যদিও ধারাবাহিকভাবে এ নিয়ে কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। জেনেটিকসের আরও অনেকগুলি প্রশ্ন নিয়ে কিছু কাজ করেছেন হ্যালডেন। কিন্তু একইভাবে বিষয়গুলো ধরেছেন, ভেবেছেন, কাজ করেছেন এবং তারপর ছেড়েও দিয়েছেন।

১৯৫২ এবং ১৯৫৪ সালে ভারতে বিজ্ঞান কংগ্রেসে যোগ দিতে আসেন জন হ্যালডেন। সেই সঙ্গে আইএসআই-তে বক্তৃতাও দিয়েছিলেন তিনি। স্ট্যাটিস্টিকস এবং বায়োস্ট্যাটিস্টিকস নিয়ে গবেষণার জন্য ১৯৫৭ সালে তিনি পাকাপাকিভাবে ইংল্যান্ড ছেড়ে চলে আসেন ভারতের কলকাতায় অবস্থিত ইন্ডিয়ান স্ট্যাস্টিক্যাল ইন্সটিটিউটে। হ্যালডেন ভারতে যাওয়ার অনেক কারণ দিয়েছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি বলেছিলেন যে সুয়েজ সংকটের কারণে তিনি যুক্তরাজ্য ত্যাগ করেছেন; এই বিষয়ে তিনি লেখেনঃ "অবশেষে, আমি ভারতে যাচ্ছি কারণ আমি মনে করি যে ব্রিটিশ সরকারের সাম্প্রতিক কাজগুলি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন হয়েছে।"

আমৃত্যু এই দেশেই ছিলেন তিনি। ভালবেসেছিলেন এখানকার মানুষদের, পরিবেশকে। ভালবেসেছিলেন সমগ্র ভারতকে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬১এই সময় যুক্ত ছিলেন আইএসআই-এর সঙ্গে। সেখানকার বায়োমেট্রি রিসার্চ ইউনিটের অধ্যাপক হিসেবে যুক্ত হন তিনি। পরবর্তীতে প্রশান্ত মহলানবিশের সঙ্গে কিছু মনোমালিন্যের জেরে ১৯৬১ স্ট্যাটিসটিক্যাল ইনস্টিটিউট ছেড়ে চলে যান ভুবনেশ্বরে। ১৯৬১ সালে, ভারতীয় নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তারপর থেকে ১৯৬৪ - মৃত্যুর দিন পর্যন্ত উড়িষ্যাতেই ছিলেন জন হ্যালডেন। এখানেই মারা যান তিনি।

ভারতে এসে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের কিছু কাজে লিপ্ত হয়েছিলেন। এখানে তাঁর গবেষণার ছত্রবাহী শিষ্যধারা তৈরি হওয়ার মতো যথেষ্ট সময় পায়নি। তিনি চাইতেন ভারতীয়রা গবেষণায় ব্যয়সাধ্য যন্ত্রের অপেক্ষায় না থেকে একেবারে মামুলি উপকরণে বা কোনও উপকরণ ছাড়াই যেসব গবেষণা সম্ভব তা নিয়ে কাজ করুক। বহু ভারতীয় অবশ্য এই মনোভঙ্গিকে পিছন-ফেরা ভাব বলে মনে করতেন। আজও করেন। কিন্তু হ্যালডেন বিচিত্র নানা বিষয়ে তাঁর প্রশ্ন তুলতেন। ফুলের পাপড়ির রং। কেঁচোর মাটি। শিউলি ফুলের পাপড়ির সংখ্যা আর বিন্যাস। তাঁর তত্ত্বাবধানে দেড় লক্ষ শিউলি ফুলের পাপড়ির সংখ্যা গোনা হয়েছিল। মাপা হয়েছিল ছয় টন কেঁচোর মাটি। যদি তেমন কোনও যুগান্তকারী ফল বেরোত, এসব উদ্যোগ নেহাত বাজে পরিশ্রম বলে মনে করতেন না কেউই।

আমরা যারা তাঁর বিজ্ঞান গবেষণার রস নিতে পারব না তাদের জন্য আছে তাঁর লেখাগুলো। পপুলার সায়েন্স? হ্যাঁ। বায়োলজি থেকে অ্যাস্ট্রোনমি সব বিষয়ে তিনি লিখতেন। জ্যোতির্বিদ্যার নিবন্ধগুলোতে ইংরেজি নামের পাশাপাশি তারাগুলোর ভারতীয় নাম বসাতেন।

হ্যালডেন ছিলেন মার্কসবাদী। কমিউনিজম নিয়ে বহু নিবন্ধ লিখেছেন, তারপর একদিন বীতশ্রদ্ধ হয়ে পার্টির সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন। যে কোনও আটপৌরে জিনিসকে ঘুরিয়ে দেখিয়ে তা থেকে সম্পূর্ণ অন্য অর্থ বার করা? অবশ্যই। তাঁর নিবন্ধগুলো সেই কারণেই এখনও আমাদের চমকে দেয়। এমন ঋজু, ক্ষুরধার, ঝকঝকে চিন্তা দুর্লভ। অনেক কথাই হয়তো মানতে দ্বিধা হবে পাঠকের, তর্কে নামার জেদ চাপবে, কিন্তু কিছুতেই অগ্রাহ্য করা যাবে না।

ভারতে অহিংসার ঐতিহ্য তাঁকে খুব টানত। বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের উপদেশাবলী তো ছিলই, সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মহাত্মা গাঁধীর বাণী। একাধিকবার লিখেছেন, এদেশে তাঁকে টানত ভারতীয়দের অহিংস নীতি। শুনে মনে হবে হলডেন নিশ্চয় ছিলেন মাটির মানুষ। একেবারে উলটো। বিশেষ একটা সৌজন্যের ধার ধারতেন না। রগচটা স্বভাবের কারণে এখানকার অনেকেই তাঁর সঙ্গে মিশতে ইতস্তত করতেন, ভয়জনিত দূরত্ব থাকত। নিজে বলেছেন, ভারতীয়দের সমস্যা হল, তারা বড্ড বেশি পোলাইট। এটা কাটাতে না পারলে তাদের দ্বারা কিছু হবে না। কেন যে তাঁর এরকম মনে হয়েছিল কে জানে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রণক্ষেত্রে গিয়ে গুলি চালিয়ে শত্রুনিধন করেছেন। সেই মানুষটাই ভারতে এসে প্রচার করতে লেগেছেন, জীববিজ্ঞানের গবেষণায় কোনও প্রাণী মারা চলবে না। সাধু প্রস্তাব। তাতে অনেকেরই নিশ্চয় মনে হয়েছিল যে এতে গবেষণার প্রকৃতিও হয়ে পড়বে ধরাবাঁধা। আজকের পৃথিবী অবশ্য তাঁর কথাই যেন ফিরে বিবেচনা করছে। তাঁর ধারণা হয়েছিল, ভারতীয়রা এতই অহিংস যে সাপও মারতে নারাজ। তিনি বলতে থাকলেন, কেউটে-গোখরোও মারা চলবে না। তার বদলে সাপের বিষের প্রতিষেধক টিকা বানাও, আর সমস্ত ভারতবাসীকে সেই টিকা দিয়ে দাও, যাতে তাদের সাপের কামড়ে আর কোনও ক্ষতি না হয়। পায়ের ধুলো থেকে বাঁচতে চামড়া দিয়ে পুরো পৃথিবী ঢেকে ফেলার মতো ব্যাপার!

ভারতে এসে তিনি সংস্কৃত সাহিত্য গুলে খেয়েছিলেন। ভারতীয় পুরাণের নজির তাঁর লেখায় এমনভাবে টানতেন যে, জন্মসূত্রে ভারতবাসী এমন বহু মানুষ লজ্জায় পড়তে পারেন। তিনি দীর্ঘদিন লন্ডনের সংবাদপত্রে সাংবাদিক-নিবন্ধ লিখেছেন। ফ্যান্টাসি গল্প লিখেছেন ছোটদের জন্য। মাই ফ্রেন্ড মিস্টার লিকিতাঁর সেই গল্প সংকলনের নাম। তবে, শেষ বিচারে অবশ্যই তিনি একজন বিজ্ঞানী।

লন্ডন-এর ডেইলি ওয়ার্কারপত্রিকায় ১৯৪০ সালে একটা লেখা লিখেছিলেন, ‘What I Require from Life’, ‘কী আমি চাই এ জীবনের কাছে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন কেমন মৃত্যু তিনি চান। লেখাটার কিছু অংশ এরকম: ‘‘জীবনের চাহিদার পরিপূরক হিসেবে আমার মৃত্যুরও কিছু চাহিদা আছে। যত মানুষের মৃত্যু নথিবদ্ধ অবস্থায় আছে, তার ভেতর ঈর্ষা করার মতো হল সক্রেটিসের মৃত্যু। তিনি মারা গিয়েছিলেন তাঁর দায়বদ্ধতার জন্য, সে দায়টুকু অস্বীকার করে তিনি চাইলে বেঁচেও যেতে পারতেন। তিনি মারা যান প্রায় সত্তর বছর বয়সে, তখনও তাঁর চিত্তবৃত্তি পূর্ণ সক্ষম, কিন্তু ততদিনে যে সব কাজ সেরে যাওয়ার আশা করা সঙ্গত ছিল, সেসবই তিনি সেরে ফেলেছিলেন। আর তিনি মারা যান হাসতে হাসতে। তাঁর শেষ কথা কটা ছিল একটা রসিকতা। সক্রেটিসের মতো এতটা সৌভাগ্যবান হতে চাই এমন দাবি আমি মৃত্যুর কাছে করি না। তাঁর মতো তিন-তিনটে লক্ষণ পূরণ করা মৃত্যু খুবই বিরল। তবে আমি যদি এর অন্তত দুটো লক্ষণ পূরণ করতে পারি তো বলব সেই অনেক। আমার বন্ধুরা যদিও শোক করবে, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আমাকে নিয়ে তাদের করুণার কিছু থাকবে না।’’

হ্যালডেনের মৃত্যু হয় ক্যানসারে। রোগটা ভয়াবহ জেনেও তিনি, সক্রেটিসের কথা ভেবেই হয়তো, তাকে নিয়ে ঠাট্টা করতে ছাড়েননি।

I wish I had the voice of Homer // To sing of rectal carcinoma, // Which kills a lot more chaps, in fact, // Than were bumped off when Troy was sacked.

এইভাবে শুরু হয়ে দীর্ঘ কবিতাটা শেষ হল,

 I know that cancer often kills, // But so do cars and sleeping pills; // And it can hurt one till one sweats, // So can bad teeth and unpaid debts. // A spot of laughter, I am sure, // Often accelerates one’s cure; // So let us patients do our bit // To help the surgeons make us fit. 

এক পরিচিত ব্যক্তিকে তিনি লিখেছিলেন, মরতে হবে তা নিয়ে ভাবিত নই, কথা দিয়ে কথা না রেখে মরাটা নিয়েই আপত্তি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন