ঋত্বিক – এক স্পর্ধার নাম

বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশের একরোখা স্রষ্টা ঋত্বিক কুমার ঘটক-এর জন্মদিন আজ। নিজে যা বিশ্বাস করেছেন, সে আদর্শ থেকে এক চুল পরিমাণ টলে যাননি যে মানুষটা কখনও, তিনি মাত্র ৮-টি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা তৈরি করেই দর্শক ও চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে এক বিস্ময়ের নাম হয়ে আছেন। তিনি বাংলা সিনেমায় স্বপ্নবিলাসী নির্মাতাদের সাহসের প্রতীক।

ঋত্বিক ঘটক
বাংলা চলচ্চিত্রের এই স্পর্ধার জন্ম ১৯২৫ সালের ৪ নভেম্বর ঢাকার ঋষিকেশ দাশ লেন-এ। ডাক নাম ভবা। তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন ময়মনসিংহ থেকে শুরু; রাজশাহীর বয়ে যাওয়া পদ্মার সাথে তাঁর রয়েছে চিরন্তন এক প্রেমের সম্পর্ক!

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তার পরিবারের সঙ্গে তিনি কলকাতায় চলে যান। তবে নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করে শরণার্থী হওয়ার মর্মবেদনা ঋত্বিক কোনো দিন ভুলতে পারেননি এবং তাঁর জীবন-দর্শন ও সিনেমা নির্মাণে এই ঘটনা ছিল সবচেয়ে বড় প্রভাবক। পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দেশভাগের বেদনা বারবার ফুটে উঠেছে। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষও তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিলো।

১৯৪৭ সালে দেশভাগ যে তাঁর মনে গভীর দাগ কেটে দিয়েছিলো তার প্রমাণ যেমন তাঁর লেখনীতে উঠে এসেছে, তেমনি তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র দেখেও এমনটা খুব সহজে বোঝা যায়। দেশভাগ মূলত তাঁর নিজের মাতৃভূমির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে বাধ্য করেছিলো। পাসপোর্ট-ভিসা নিয়ে নিজের দেশে চলাচল করা যে কতোটা অসম্মান আর লজ্জার, এই বোধ থেকেই বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত পশ্চিম বাংলা থেকে বাংলাদেশে আসেননি ঋত্বিক ঘটক।

১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে আসেন ঠিকই, কিন্তু নিজ চোখে দেখতে পান মায়ের উদর হতে এক সাথে পৃথিবীতে আসা যমজ বোন প্রতীতি দেবীর বিধ্বস্ত সংসার। ভাষা সংগ্রামী এবং পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের পুত্র সঞ্জীব দত্তের সঙ্গে বিয়ে হয় প্রতীতি দেবীর। ১৯৭১-এর ২৯ মার্চ প্রতীতির চোখের সামনে দিয়ে পাক সেনারা ধীরেন্দ্রনাথ ও তাঁর অন্য পুত্র দিলীপকে কুমিল্লার বাড়ি থেকে টেনে বার করে রাস্তায় নিয়ে গিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন করে হত্যা করে। চোখের সামনে অগ্নিদগ্ধ ঘরবাড়ি আর বিধ্বস্ত নিজের বোন ভবি-কে দেখে সেদিন আঁতকে উঠেছিল ঋত্বিক ঘটক!

এইসব প্রতি-পরিবেশে বোন তাঁর ক্ষ্যাপাটে ভাই ভবার হাতে এনে দেন প্রায় অর্ধদগ্ধ অদ্বৈত মল্ল বর্মণের উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি তিতাস একটি নদীর নাম। যা হাতে পেয়েই বুঁদ হয়ে পড়তে থাকেন ঘটক। হঠাৎ চিৎকার দিয়ে বোনকে উদ্দেশ্য করে খাতা-কলম আনতে বলেন ঋত্বিক। কিন্তু এই ভস্মীভূত ঘরে কলম পাওয়া গেলেও খাতা খুঁজে পাননি বোন ভবি। তাই নিজের একটি সাদা ধবধবে শাড়ি এনে দেন ভাইকে। আর পাগলাটে ভবা সারা রাত ধরে বোনের সাদা শাড়িতে লিখে চলেন তিতাস একটি নদীর নামএর চিত্রনাট্য…!

ঋত্বিক ঘটকের প্রথম ছবি নাগরিক। প্রথম ছবি নির্মাণের পাঁচ বছর পর ১৯৫৭ সালে ঋত্বিক ঘটক নির্মাণ করেন অযান্ত্রিক। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চমকে যান চলচ্চিত্রবোদ্ধারা। ক্ষ্যাপাটে এক নির্মাতার নির্মাণে মুগ্ধ হলেন দর্শক। সফল চলচ্চিত্রকার হিসেবে তিনি খ্যাতি লাভ করেন এই ছবিটি দিয়ে।

অযান্ত্রিক’-এর পর ঋত্বিক নির্মাণ করেন মেঘে ঢাকা তারা’ (১৯৬০),‘কোমল গান্ধার’ (১৯৬১) ও সুবর্ণরেখা’ (১৯৬৫)। তাঁর ক্যারিয়ারে সবচেয়ে ব্যবসা সফল সিনেমা মেঘে ঢাকা তারা। পারিবারিক গল্পে পরিবারের জন্য একজন নারীর আত্মত্যাগের করুণ চিত্র এখানে ফুটে উঠেছে। তবে অনেক গল্প-আড্ডায় জানা যায় যে এই ছবিটিকে ঋত্বিক নিজে পছন্দ করতেন না খুব একটা। বলতেন মশলাদার ভাবনায় সস্তা সেন্টিমেন্টের গল্প। কিন্তু এই বাস্তবিক অর্থে এই ছবিটি ষাট দশকের পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ ও ভারতের বাঙালি চিন্তা চেতনাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিলো।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশে এসে নির্মাণ করেন তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র তিতাস একটি নদীর নাম। এটি বাংলাদেশ-ভারতের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়। অদ্বৈত মল্লবর্মণের ধ্রুপদী উপন্যাস থেকে নেওয়া এ ছবিটি পেয়েছিল ব্যাপক প্রশংসা। এরপর ১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ঋত্বিকের শেষ ছবি যুক্তিতক্ক আর গপ্পো

এরপরই ঋত্বিক ঘটক মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। প্রায় তিন বছর মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। মানসিক ভারসাম্য হারানো অবস্থায় ১৯৭৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৫০ বছর বয়সে মারা যান এই সেলুলয়েড শিল্পী।

নির্মাণের পাশাপাশি ঋত্বিক ছিলেন চলচ্চিত্রের বিশ্লেষকও। চলচ্চিত্র নিয়ে তিনি তাঁর ভাবনাগুলোকে বলে গেছেন অবলীলায়, সহজ দৃষ্টিতে। ফিল্ম সোসাইটির পত্রপত্রিকার অন্যতম লেখক অজয় বসু লিখেছেন, ঋত্বিকের কথা শুনতে ভাল লাগে তাঁর বলার স্পর্ধার জন্যে। যেমন বার্গম্যান প্রসঙ্গরচনাটিতে ঋত্বিকের মন্তব্য: ভদ্রলোকের দ্য সেভেন্‌থ্ সীল অথবা দ্য ফেস দেখে আন্তরিকতার অভাব এবং চিন্তাশূন্য চমক ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি।

সিনেমাকে তিনি দেখতেন শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে। সিনেমা দিয়ে তিনি মানুষের মনের গোপন কুঠুরীতে প্রবেশ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর মতে, ‘সিনেমার কাজ দর্শকের মন যোগানো না, মন জাগানো।তিনি মনে করতেন, ‘ফিল্ম মানে ফুল নয়, অস্ত্র।

তবে ঋত্বিক সিনেমা নির্মাণ করতেন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য। নিজের বক্তব্য মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য। কখনও খ্যাতি কিংবা পুরস্কারের কাছে মাথা নত করেননি। তাই তাঁর কাছে দর্শক ছাড়া আর সব স্বীকৃতি কোনোদিন আদর পায়নি।

১৯৬৯ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৫ সালে যুক্তি তক্কো আর গপ্পোচলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ কাহিনীর জন্য ভারতের জাতীয় পুরস্কার লাভ করেন তিনি।

তাঁর বিখ্যাত এক উক্তি প্রজন্মের পর প্রজন্ম জনপ্রিয় হয়ে আছে। সেটি হলো ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।আর এই উক্তির প্রতি পূর্ণ আস্থার জায়গা থেকেই এই পেজ-এর নির্মাণ। সত্যি করেই, ভাবা একটা অভ্যেস, ভাবা দায়িত্ব, সমাজের বিকাশ ধারা বজায় রাখতে ভাবতেই হবে।

(সংকলন - তারিণী খুড়ো)


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন